আমরা স্বয়ং অথবা আমাদের অনুভূতিগুলি কোনভাবেই বিশেষ কিছু নয়

ভূমিকা

মন-প্রশিক্ষণ অথবা মনোভাব-প্রশিক্ষণ, তিব্বতী ভাষায় ‘লোজঙ্‌’, এটা একটা অত্যন্ত বিস্তৃত বিষয় যা বর্ণনা করে যে, আমরা আমাদের জীবনকে কীভাবে অনুভব করি এবং আমরা সেটা অনুভব করি সেগুলির প্রতি আমাদের মনোভাবগুলিকে কীভাবে পরিবর্তন করতে পারি। আমরা সবাই জানি যে জীবন উত্থান-পতনে পূর্ণ এবং সাধারণতঃ এটা খুব সহজ হয় না। সবসময় আমাদের সাথে কিছু না কিছু ঘটতে থাকে, আর এই ঘটনাগুলি কারণ এবং পরিস্থিতির একটা বিস্তৃত বর্ণালী থেকে উদ্ভূত হয়।

একটি সহজ উদাহরণ হিসাবে, আজ সন্ধ্যায় আমরা এখানে সকলের একত্রিত হওয়ার ঘটনাটাকে দেখতে পারি। সেটা কী সেটা আপনাদের এখানে নিয়ে এসেছে? এটার একটা পুরো ভৌতিক দিক আছে অর্থাৎ ট্রাফিক এবং পরিবহন ব্যবস্থা; এটা সত্য যে আপনি এই শহরে বাস করেন এবং আপনাদের নিজ-নিজ আগ্রহ আছে; আপনাদের পারিবারিক, ব্যবসায়ীক এবং সাধারণ জীবনে যা যা ঘটে চলেছে। বিভিন্ন ধরণের কারণ এবং পরিস্থিতির ফলস্বরূপ আমরা সবাই এখানে একসাথে আছি, যেখানে প্রত্যেকের একটি ভিন্ন পটভূমি আছে এবং বিভিন্ন কারণ এবং প্রত্যয়ের সমষ্টিও আছে।

এখন, এখানে বসে থাকা আমাদের সকলের মধ্যে আপনিও আছেন, আমিও আছি এবং একজন অনুবাদকও আছেন। এছাড়াও এখানে একটা ক্যামেরাও আছে যেটা আমাদের সবাইকে রেকর্ড করছে। আপনাদের সকলের পক্ষ থেকে আমার দিকে তাকানো এবং ক্যামেরা আমার দিকে ঘোরানোর মধ্যে পার্থক্য কী আছে? আমাদের মতো ক্যামেরাটিও বিভিন্ন প্রকারের হেতু এবং প্রত্যয়ের কারণে এখানে আছে অর্থাৎ কেউ সেটাকে তৈরী করেছে, অন্য কেউ তার থেকে ক্রয় করেছে, আর তারপর অন্য কোন ব্যক্তি সেটা এখানে স্থাপন করেছে। ক্যামেরা এবং আমরা উভয়ই তথ্য সংগ্রহ করি। তবে দুটির মধ্যে আসল পার্থক্য হল যে, আমাদের দ্বারা গৃহীত তথ্যের ভিত্তিতে অনুভূতি বিকশিত হয়, যেমন সুখ অথবা দুঃখের কিছু স্তর। অন্যদিকে ক্যামেরা অথবা কম্পিউটার দ্বারা গৃহীত তথ্যের ভিত্তিতে তাদের মধ্যে কোন অনুভূতি বিকশিত হয় না।

সুখ কী?

জীবনের মূল নীতিটি হল যে, আমরা সবাই সুখ চাই এবং দুঃখ চাই না। এই নীতিটা আমাদের ভাবতে অনুপ্রাণিত করে, “আসলে, সুখ কী? আমরা প্রকৃতপক্ষে কী চাই?”

বৌদ্ধ দৃষ্টিকোণ অনুযায়ী, সুখকে এমন একটি অনুভূতি হিসাবে সংজ্ঞায়িত করা হয়, যা অনুভব করলে আমরা স্বাভাবিকভাবেই সেটা থেকে বিচ্ছিন্ন হতে চাই না; আমরা এটা পছন্দ করি এবং এটা চলতে থাকলে আমরা সন্তুষ্ট অনুভব করি।

এটা হল একটা মানসিক অনুভূতি যা কোনো বস্তু বা ব্যক্তিকে দেখার মতো একটি শারীরিক চেতনা অথবা কোন বস্তু অথবা ব্যক্তির বিষয়ে চিন্তা-ভাবনা করার মতো কোন মানসিক অনুভূতি যুক্ত থাকে। এখানে এই বিষয়টা ততটা গুরুত্বপূর্ণ নয় যে, আমরা যা দেখছি অথবা যার বিষয়ে চিন্তা-ভাবনা করছি, সেটাকে আমরা পছন্দ করি; বরং যেটা গুরুত্বপূর্ণ, সেটাকে দেখা অথবা তার বিষয়ে চিন্তা-ভাবনা করার সময় আমরা কেমন অনুভব করি। কিন্তু সুখ আনন্দের শারীরিক অনুভূতি নয়ঃ এটা হল মনের একটি অবস্থা। এটা আসক্তিরূপী অশান্তকারী আবেগের মতোও নয়, যার কারণে আমরা চকোলেট, আমাদের যৌবন অথবা সুখের মতো কোনো বস্তুর ভাল গুণাবলীকে অতিরঞ্জিত করে দেখি এবং সেটাকে ছেড়ে দিতে চাই না।

কোন বস্তু, যেমন কোন সিনেমা দেখতে-দেখতে আমাদের সুখের অনুভূতি হয়, তখন সিনেমাটির মান কমও হতে পারে, তবে কয়েক মিনিট পরও যদি আমরা সেটা দেখতে থাকি এবং আমরা নজর থামাতে না চাই, তাহলে এটা বোঝায় যে আমাদের মধ্যে যে অনুভূতি জাগছে, আমরা তাতে সন্তুষ্ট এবং সেটা থেকে বিচ্ছিন্ন হতে চাই না। আমরা হয়তো বলতে পারি, আমরা এখনও “এটা দেখে খুশী।” যদি আমরা এটা নিয়ে দুঃখী হতাম- দুঃখকে এমন একটি অনুভূতি হিসাবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে যার অনুভূতি হওয়ার পর আমরা স্বয়ংক্রিয়ভাবে সেটা থেকে আলাদা হতে চাইতাম- তখন আমরা সাধারণতঃ অন্যদিকে তাকিয়ে আমাদের অনুভূতিটাকে পরিবর্তন করার চেষ্টা করতাম। এরপর, অবশ্যই, মাঝে-মাঝে আমাদের নিরপেক্ষ অনুভূতিও জাগে, যেখানে আমরা কোনো বস্তু থেকে আলাদা হতে চাই আবার এরকমও চাই যে আমরা যেন সেই বস্তু থেকে আলাদা না হই; আমরা নিরপেক্ষ।

কিন্তু, আমরা যদি “সুখী” এবং “দুঃখী” শব্দগুলির কথা ভাবি, তখন আমরা উভয়কেই চরমতার পরিপ্রেক্ষিতে ভাবি- হয় আমাদের মুখে একটি বড় হাসি থাকবে অথবা আমরা অত্যন্ত দুঃখিত এবং উদাস হব। কিন্তু আমাদের সুখ অথবা দুঃখের ভাবনাগুলির অভিব্যক্তিকে নাটকীয় হওয়ার দরকার নেই, কারণ আমাদের জীবনের প্রতিটি মুহূর্তের অনুভূতি কোন না কোনভাবে সুখ অথবা দুঃখের হয়, এবং অধিকাংশ মুহূর্ত খুব বেশী নাটকীয় হয় না।

জীবনের উত্থান-পতন

প্রত্যেক মুহূর্তে আমাদের মধ্যে অনেক প্রকারের ঘটনার অনুভূতি হয়, যেমন আমি এখানে উপস্থিত আছি, এবং এই ঘটনাগুলি লক্ষ-লক্ষ হেতু এবং প্রত্যয়ের কারণে উৎপন্ন হয়। আমরা আমাদের আশেপাশে অথবা নিজের মনে যা কিছু ঘটে, তখন আমরা বিভিন্ন স্তরের সুখ অথবা দুঃখের সাথে সেটাকে অনুভব করতে থাকি। আমরা প্রায়শই এই ঘটনাটি আমাদের মেজাজের পরিপ্রেক্ষিতে বর্ণনা করি- একটা ভালো মেজাজ অথবা একটা খারাপ মেজাজ।

জীবনের স্বভাব হল যে সেখানে সবসময় উত্থান-পতন হতেই থাকে, তাই না? আমাদের মেজাজ সর্বদা আমাদের দ্বারা গৃহীত তথ্য, আমাদের চারিপাশে কী ঘটছে, এবং আমরা নিজেরা যেসমস্ত কাজকর্ম করি তার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ থাকে না। উদাহরণ স্বরূপ, আমরা এমন কোন কাজ করছি, যেটা সাধারণতঃ আমরা পছন্দ করি, কিন্তু আমাদের মেজাজ খারাপ হওয়ার কারণে হতে পারে যে আমরা তাতে সন্তুষ্ট নই এবং এইজন্য আমাদের ওই কাজটা করতে ভালো লাগে না, অথবা আমরা এমন কোন কাজ করছি, হতে পারে সেটা আমাদের খুব পছন্দের নয়, যেমন- শারীরিক পরিশ্রমের কাজ, কিন্তু যদি সেটা করার সময় আমরা আনন্দিত হই, তাহলে আমরা সেটাকে নিয়মিতভাবে করতে চাই। এটা খুবই মজাদার বিষয় যে, আমাদের মেজাজ সবসময় সেই কাজের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয় না যেটা আমরা করতে থাকি।

আমরা যখন কোন মুহূর্তকে অনুভব করি তখন সবসময় তার প্রতি আমাদের একটা নির্দিষ্ট মনোভাব বা দৃষ্টিভঙ্গি থাকে। এখন আমরা মনোভাব নিয়ে আলোচনা করছি, তাহলে মনোভাবটি কী? মনোভাব বলতে এটাকে বোঝায় যে, আমরা কোন বস্তুকে কীভাবে বিবেচনা করি। আমাদের মধ্যে অনেক রকমের মনোভাব থাকতে পারে এবং আমাদের মনোভাবই প্রভাবিত করে যে আমাদের মেজাজ কেমন হবে। স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে, আমরা আমাদের জীবনে সবসময় চলতে থাকা এই উত্থান-পতনকে পরিবর্তন করার জন্য বেশি কিছু করতে পারি না। আপনি যদি কোন ঔষধও গ্রহণ করেন, যা আপনাকে ভালো অনুভব করাবে, তবুও দীর্ঘমেয়াদে উত্থান-পতন হতেই থাকবে, তাই না? তবুও একটা বস্তু আছে যেটার উপর আমরা কাজ করতে পারি, সেটা হল আমাদের মনোভাব।

এখন, যেহেতু আমরা নিজের মনোভাব-প্রশিক্ষণের কথা বলছি, তাই এই মনোভাবের দুটি দিক আছে। প্রথমটা হল যে, বস্তুর প্রতি আমাদের নিজের মনোভাব শুদ্ধ করা অথবা ধ্বংসাত্মক মনোভাব রাখা বন্ধ করার চেষ্টা করতে হবে। এখানে “ধ্বংসাত্মক” শব্দটি একটু ভারী হতে পারে, তাই আমরা এখানে “অ-উৎপাদনশীল” শব্দও ব্যবহার করতে পারি। কিন্তু এক অর্থে এটা হল আত্ম-ধ্বংসাত্মক, কারণ এই মনোভাবগুলি আমাদের আরও খারাপ করে তোলে। অন্যদিকটি হল যে, আমরা নিজেদেরকে এমনভাবে প্রশিক্ষণ দিই যাতে আমরা বস্তুকে আরও উৎপাদনশীল ভাবে দেখতে পারি।

এখানে এই বিষয়টার প্রতি লক্ষ্য রাখা গুরুত্বপূর্ণ যে, আমরা এখানে অতি আশাবাদী হওয়ার বিষয়ে কথা বলছি না যেটাকে মানুষ সাধারণভাবে “ইতিবাচক চিন্তা-শক্তি” বলেঃ “সবকিছুই চমৎকার; খুব ভালো এবং নিখুঁত।” এটা লাভদায়ক হতে পারে, কিন্তু এটা একটু সরল হয়ে যায়। নিজের মনোভাবকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য বাস্তবে প্রভাবশালী উপায়ের ক্ষেত্রে আমাদের একটু গভীর ভাবে বিচার করতে হবে।

আমি যা অনুভব করছি তাতে বিশেষ কিছু নেই

প্রথমে আমাদের নিজের অনুভূতিগুলি সম্পর্কে নিজের মনোভাব, যেমন আমাদের দ্বারা অনুভূত সুখ বা দুঃখের স্তরের প্রতি নিজের মনোভাবকে ধ্যানকেন্দ্রিত করতে হবে। আমরা এটাকে এমন একটা সমস্যার পরিপ্রেক্ষিতে দেখব যা বেশিরভাগ মানুষেরই সামনে উৎপন্ন হয়- নিজের অনুভূতির গুরুত্বকে অতিরঞ্জিত করার ভাবনা।

আমরা আমাদের নিজেকে- “আমি”-কে অনেক বড় করে দেখি আর নিজের অনুভূতিকে একটা অনেক বড় আকার এবং গুরুত্ব দিই। আমরা সব বস্তুকে দ্বৈতবাদী পদ্ধতিতে অনুভব করি। উদাহরণ স্বরূপ, একদিকে “আমি”-এর বিষয়ে আমাদের এই মনোভাব থাকে এবং অন্যদিকে থাকে আমাদের দুঃখ। আমরা এই দুঃখকে ভয় পাই এবং যতটা সম্ভব এই দুঃখ থেকে নিজেকে সুরক্ষিত রাখার এবং এটা থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার জন্য চেষ্টা করি। কিন্তু এই ধরণের মনোভাবের কারণে আমাদের বাস্তবে কেমন অনুভব হয়? এটা মনোভাবের পরিস্থিতিকে আরও খারাপ করে তোলে, তাই না?

এক মুহূর্তের জন্য এটার সম্পর্কে বিচার করুনঃ যখন আপনার মেজাজ খারাপ থাকে এবং আপনি দুঃখী থাকেন তখন আপনার মনোভাব কেমন থাকে? আমার কথার তাৎপর্য সেই পরিস্থিতির বিষয়ে নয়, যখন আপনি কান্না করছেন এবং আপনি সত্যিই দুঃখী হয়ে আছেন, বরং আমার কথার তাৎপর্য এই অনুভূতিকে বোঝায় যে, আপনি যখন আপনার কাজ-কর্ম করছেন, আপনি টেলিভিশন দেখছেন অথবা অন্য কিছু করছেন এবং ভাবছেন, “ওহ, আমার খুব খারাপ লাগছে।” আমরা কি মনে করি যে, এটা তো এমনই যেন আমরা এখানে বসে আছি এবং একটা বড় কালো মেঘ আমাদের দিকে ধেয়ে আসছে, আর তখন আমরা আমাদের ঢাল দিয়ে নিজেকে ঢেকে নিতে চাইঃ “আমি এটা চাই না!” এটা কি আমাদের অনুভবের অংশ? এটা প্রায়শই এমন মনে হয় যে, খারাপ মেজাজ উৎপন্ন হয়েই থাকে যা আমরা কখনও চাই না। আমরা এর উপর যত বেশী মনোযোগ দিই, “এটা কতটা ভয়াবহ,” এই মনোভাবটা আরও খারাপ হতে থাকে। এখানে সমস্যাটি হল, আমরা আমাদের সাথে ঘটিত বিষয়গুলিকে অতিরঞ্জিত ক’রে তুলি এবং সেটাকে দুটি জিনিসে ভাগ করে নিই- একদিকে “আমি”, এবং অন্যদিকে আমাদের খারাপ মেজাজ।

এবারে সুখের বিষয়ে কী বলা যেতে পারে? পুনরায়, এখানে আমরা সুখকে অনুভব করার জন্য একটা দ্বৈতবাদী উপায় অনুসরণ করি, একদিকে থাকে “আমি” এবং অন্যদিকে থাকে সুখ- আর তারপর আমরা এটাকে হারাতে ভয় পাই। সেইজন্য আমরা সেটাকে আঁকড়ে ধরে থাকি এবং সেটাকে ধরে রাখার চেষ্টা করি। আমাদের ভিতরে একটি নিরাপত্তাহীনতার অনুভূতি জাগে, কারণ আমাদের ভয় লাগে যে এই সুখের সময় পেরিয়ে যাবে এবং আমরা এটাকে হারিয়ে ফেলব; আমাদের ভালো লাগাটা বন্ধ হয়ে যাবে। নিশ্চিন্ত হয়ে এই সুখের অনুভূতিকে উপভোগ করা কঠিন হয়ে ওঠে, কারণ নিরাপত্তাহীনতার ভাবনা সেটাকে ধ্বংস করে দেয়, তাই না? এছাড়াও, “আমি সুখী হওয়ার যোগ্য নই”, ইত্যাদির মতো অন্য জটিলতাও থাকতে পারে।

আপনি যদি এই বিষয়ে চিন্তা-ভাবনা করতে শুরু করেন, তাহলে আপনি একটা মজার বিষয় দেখবেন যে, আমরা প্রায়শই একটা ছোট্ট পশুর মতো আচরণ করি। লক্ষ্য করুন যে, একটি কুকুর কীভাবে আহার গ্রহণ করে; দেখে মনে হয়, সে যেটা খাচ্ছে, সেটাকে উপভোগ করতে-করতে খাচ্ছে, কিন্তু সে বার-বার নিজের চারিপাশে দেখতে থাকে; তার মনে একটা ভয় থাকে যে, কেউ তার খাবারটা কেড়ে নেবে না তো। আপনার কি কখন এরকম মনে হয়েছে? যদিও আমরা সুখে থাকি কিন্তু আমাদের মধ্যে এরকম একটা ভয় থাকে যে কেউ আমাদের খুঁজে বের ক’রে আমাদের সুখ কেড়ে নিয়ে চলে যাবে। একপ্রকার, এটা একটা অদ্ভূত বিষয়।

তারপর একটি নিরপেক্ষ অনুভূতি আছে; এটাও “আমি” এবং নিরপেক্ষ অনুভূতির মধ্যেকার দ্বৈতবাদী দৃষ্টিকোণের কারণে উৎপন্ন হয়। আমরা নিরপেক্ষ অনুভূতিকে অতিরঞ্জিত ক’রে শূন্য করে দিই, অনুভূতিহীন তৈরী করে দিই। প্রায়শই এরকম একটি পরিস্থিতি উৎপন্ন হয়, যখন আমরা অনুভব করি যে, আমাদের মধ্যে কোনও অনুভূতি জাগছে না। এর কারণে আমাদের এমন অনুভূতি হয়, যেন আমরা বাস্তবে জীবিত নেই। আসলে এই নিরপেক্ষ অনুভূতিতে আমাদের মধ্যে কিছুটা দুঃখের অনুভূতি হয়। আমরা অনুভূতিহীন হয়ে যাওয়া পছন্দ করি না।

সুখ, দুঃখ এবং নিরপেক্ষ অনুভূতির মধ্যে যে অনুভূতিকে আমরা যতবেশী অতিরঞ্জিত করে দেখব, প্রকৃতপক্ষে সেটা আমাদের ততবেশী দুঃখ অনুভব করাবে। সুতরাং, অনুভূতি সম্পর্কে আমাদের মনোভাব আমাদের অনুভূতিকে প্রভাবিত করার ক্ষেত্রে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আমরা সুখ, দুঃখ অথবা নিরপেক্ষ অনুভূতিকে বিশেষ কিছু হিসাবে দেখতে থাকি এবং সাধারণতঃ আমরা সেই অনুভূতিটিকে নিজেদের থেকে আলাদা করে দেখি।

কল্পনা করুন, আপনার সামনে তিন প্রকারের খাবার রাখা আছে। তার মধ্যে একটা খুব খারাপ স্বাদের, একটা খুব সুস্বাদু এবং আর একটা স্বাদহীন; এই খাবারগুলি দুঃখ, সুখ এবং নিরপেক্ষ অনুভূতির মতো। আমরা যখন এগুলি অনুভব করি, তখন এমন মনে হবে যেন আমরা সেগুলি গ্রহণ করছি, সেগুলি “খাচ্ছি”। আর এক অর্থে, আমরা এগুলি না খাওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে পারি, কিন্তু অনুভূতির ক্ষেত্রে আপনি এরকম করতে পারবেন না, পারবেন কি- “আমার ইচ্ছা, আমাদের মধ্যে যেন, কোনও রকমের অনুভূতি না জাগে।” কিন্তু তখন তো আবার আমাদের মধ্যে এই অনুভূতি জাগবে না যে আমরা জীবিত আছি কিনা, তাই এই পরিস্থিতিটা সন্তোষজনক নয়। আমরা এখানে “আমি”-এর অস্তিত্ব এবং মনোভাবটা আমাদের থেকে আলাদা হওয়ার এই দ্বৈতবাদী পরিস্থিতিকে পরীক্ষা করে দেখতে পারি।

শুধু এটা করে ফেলুন

নিজের মনোভাবকে প্রশিক্ষিত করার সময়, সর্বপ্রথম “বিশেষ কিছু নয়” এই মনোভাবকে অনুসরণ করতে হবে। এমন মনে হতে পারে যে এটা একটা বড় বিষয় নয়, কিন্তু আসলে এটা খুবই গভীর। “আমি এই সময় যা অনুভব করছি সেটা বিশেষ কিছু নয়”- জীবনে তো উত্থান-পতন হতেই থাকে, কখনো আমাদের মেজাজ ভালো থাকে, কখনো খারাপ থাকে, আবার কখনো-কখনো এমন হয় যে, আমাদের মনোভাবে বিশেষ কিছু হয়ে থাকে না। এতে আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই এবং আমরা এমন বিশেষ কেউ নই যে, আমাদের মধ্যে নির্দিষ্ট কিছু অনুভূতি থাকতে হবে এবং আমাদের মধ্যে ওর থেকে আলাদা কোন অনুভূতি থাকা উচিত নয়। মূল বিষয়টা হল, আমরা যেমনই করি না কেন, আমাদের জীবন চলতেই থাকে।

উদাহরণ স্বরূপ, যদি আপনাকে আপনার সন্তানদের যত্ন নিতে হয় তাহলে আপনার মেজাজ ভালো থাকুক বা খারাপ থাকুক, তাতে কিছু আসে যায় না, কাজটা তো আপনাকে করতেই হবে। আপনি নিজের গাড়ি চালিয়ে নিজের কাজে যান, তাতে আপনার ভালো লাগুক বা খারাপ লাগুক। আমরা যতবেশী নিজেদের উপর অথবা নিজের অনুভবের উপর কেন্দ্রিভূত হব, আমরা ততবেশী দুঃখী হতে থাকব। এর অর্থ এই নয় যে আমরা সবকিছু অনুভব করা বন্ধ করে দেব, এটা এরকম নয়। আমাদের নিজের অনুভূতিগুলির সম্পর্কে সচেতন হতে হবে, পাশাপাশি সেগুলিকে বড় করে দেখলে হবে না।

কিছু মানুষ দুঃখ অনুভব করতে ভয় পায়, কারণ তাদের মনে হয় যে এর কারণে তারা অসহায় হয়ে উঠবে। যেমন কারও মৃত্যু হলে অথবা খুব খারাপ কিছু হলে আপনি নিজেকে দুঃখী হওয়া থেকে রক্ষা করতে চান, কারণ আপনার কাছে সেটা অনেক অসহ্য মনে হয়। এটা অবচেতন অবস্থাতেও হতে পারে; এটা আবশ্যক নয় যে দুঃখের অনুভূতিটা অবরোধ করার জন্য আপনাকে সচেতন হতে হবে। আমরা সেটাকে এমনভাবে প্রত্যাখ্যান করতে চাই যেন সেটা কোন বাহ্যিক বস্তু, এবং সেটা ভিতরে ঢোকার চেষ্টা করছে। অন্যদিকে, এমনকিছু মানুষও আছে যারা ভাবে যে, তারা সুখী হওয়ার যোগ্য নয়। হতে পারে তাদের জন্য সবকিছু ঠিকঠাক চলছে, কিন্তু তাদের মনে হয় যে তাদের সুখী হওয়া উচিত নয়, কারণ তারা মূলতঃ এর যোগ্য নয়। আবার এমন কিছু লোক আছে যারা নিজের অনুভূতিকে নিরপেক্ষ রাখতে পারে না; তাদের সবসময় বিনোদন আবশ্যক হয়, যেমন তারা সবসময় গান শুনে থাকতে চায়। তাদের মনে হয় যে এর মাধ্যমে বিনোদিত হবে এবং তারা সুখী থাকবে। এইজন্য তারা নীরবতার নিরপেক্ষ অনুভূতিকে ভয় পায়। এইভাবে আমরা প্রায়শই অনুভূতিকে ভয় পাই। কেন? এইজন্য যে আমরা সেটাকে অতিরঞ্জিত করে দেখি। তবে অনুভূতি হল পূর্ণতঃ জীবনের একটি স্বাভাবিক অঙ্গ; সেটা এরকমই যে, আমরা প্রতিটি মুহূর্তকে এইরকম অনুভব করি। এটা হল সেই বস্তু যেটা আমাদের ক্যামেরা থেকে আলাদা করে, তাই এটাতে বিশেষ বলতে কিছু নেই। এটা শুনতে সহজ লাগছে, কিন্তু ততটা সহজ নয়।

আমাদের জানালার উপর উপবিষ্ট বন্য পাখির উদাহরণ

আমাদের যেটা প্রয়োজন সেটা হল একটা সূক্ষ্ম ভারসাম্য বজায় রাখতে হবে। অবশ্যই আমরা সুখী থাকতে পছন্দ করি তা সত্ত্বেও তার সাথে এই ভাবনাও জাগতে পারে যে আমরা এখন যে সুখ অর্জন করছি তার যেন অবসান না ঘটে এবং সেইজন্য আমরা সেটাকে আঁকড়ে ধরে থাকি আর সেটার বিষয়ে অনিরাপদ বোধ করি। আমার নিজস্ব অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে আমরা বুঝি যে আমাদের বর্তমান সুখ অবশ্যই অতিবাহিত হতে চলেছে। এটা চিরস্থায়ী হয় না কারণ জীবনের স্বভাব হল যে এর উত্থান এবং পতন হতেই থাকে। আমরা যদি এই বিষয়টার সাথে অবগত হয়ে যাই তাহলে সেখানে চিন্তিত হওয়ার কোন প্রশ্নই থাকে না। এই বোধগম্যতাটি আমাদের এইভাবে মুক্ত রাখে যে যতক্ষণ পর্যন্ত সুখটা স্থায়ী থাকে আমরা যেন ততক্ষণ পর্যন্ত সেটাকে উপভোগ ক’রে যেতে পারি।

একটা খুব সুন্দর উদাহরণ আছে যেটা আমি কখনো-কখনো এই বিষয়টাকে স্পষ্ট করার জন্য ব্যবহার করি। কল্পনা করুন, একটা খুব সুন্দর বন্য পাখি আমাদের জানালার উপর আসে এবং কিছুক্ষণের জন্য সেখানে বসে থাকে। এবার আমরা যেটা করতে পারি সেটা হল আমরা শুধু পাখিটির সৌন্দর্যতাকে উপভোগ করতে পারি কিন্তু আমরা জানি সেটা একটা বন্য পাখি এবং সে উড়ে চলে যাবে। আমরা যদি সেটাকে ধরে খাঁচায় রেখে দেওয়ার চেষ্টা করি তাহলে পাখিটি অত্যন্ত দুঃখী হয়ে উঠবে। পাখিটিকে ধরার প্রক্রিয়াকালে সে ভয় পেয়ে যাবে, উড়ে পালানোর চেষ্টা করবে আর উড়ে গেলে সে কখনো সেখানে ফিরে আসবে না। পরিবর্তে, আমরা যদি পাখিটির সম্পর্কে নিশ্চিন্ত থাকি এবং সেটা যতক্ষণ সেখানে থাকে কেবল তার সৌন্দর্যতাকে উপভোগ করি তাহলে কেউ ভয়ভীত বা দুঃখী হবে না আর সম্ভবতঃ এটা পুনরায় ফিরে আসবে।

সুখ ঠিক একই রকমভাবেই প্রতীয়মান হয়, তাই নয় কি? যে সমস্ত লোকজনকে আমরা সত্যিই পছন্দ করি তাদের ক্ষেত্রেও একই জিনিস প্রযোজ্য। তারা যখন আমাদের সাথে দেখা-সাক্ষাৎ করতে আসে, প্রায়শই আমাদের মনোভাব এরকম থাকে “আপনি কেন আরও কিছুক্ষণ থেকে যাচ্ছেন না?”, এমনকি তিনি তখন তার কোটও খুলে পারেননি। “আপনি আবার কবে আসছেন?” আমরা এই ধরণের আচরণ করি। এটা একপ্রকার দেখায় যে আমরা কীভাবে আমাদের সুখ নষ্ট করি।

এটা বিশেষ কিছু নয়। কিছুই তো বিশেষ নয়। একটা পাখি এসে জানালার উপর বসে যায়; একজন বন্ধু আমার সাথে দেখা সাক্ষাৎ করতে আসে; আমার বন্ধু ব’লে- বিশেষ কিছু নয়। যতক্ষণ সুখ আছে কেবল সেটা উপভোগ ক’রে যাও কারণ এটা নিশ্চিত যে এর সমাপ্তি ঘটবেই। তাতে কী হয়েছে, আপনি আর কী আশা করেন? হ্যাঁ, আমরা সুখী হতে চাই। আমরা যখন দুঃখী হই তখন যে অনুভূতি অনুভব করি তখন সেটাকে সেইভাবে গ্রহণ ক’রে নিই। এর বিষয়ও সেখানে বিশেষ কিছু নেই অথবা আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই। ঐ দুঃখ একই ভাবে সমাপ্ত হয়ে যাবে। আপনি যখন সেটাকে ঠেলে দূর করার চেষ্টা করেন তখনই পরিস্থিতি খারাপ হয়ে যায়।

এইভাবে আমরা বিশ্লেষণ করতে পারি এবং পরীক্ষা ক’রে দেখতে পারি যে আমরা কিসের কারণে সত্যিই ভয়ভীত। আমি কি দুঃখের অনুভূতির কারণে ভয়ভীত? আমি কি সুখের অনুভূতির কারণে এইজন্য ভয়ভীত, কারণ আমি সেটা প্রাপ্ত করার যোগ্য নই? আমি কি সমতার অনুভূতির কারণে ভয়ভীত, কারণ সেখানে কিছুই থাকে না? আমরা কাকে ভয় পাই?

আমি একটি সাধনার বিকাশ করেছি যাকে বলা হয় সংবেদনশীলতার প্রশিক্ষণ এবং তার একটা অনুশীলন মানুষকে তাদের ভয়ের অনুভূতিকে কাটিয়ে উঠতে সহায়তা করে। এটা একটা সাধারণ অনুশীলন; আপনি আপনার হাতে সুড়সুড়ি দিয়ে থাকেন, তারপর চিমটি কাটেন আবার তারপর আপনি সেটাকে ধরে রাখেন। এদের মধ্যে একটা হল সুখদ অনুভূতি, অন্যটা ততটা সুখদ নয় এবং একটা হল সমতার অনুভূতি। কিন্তু এদের মধ্যে একটা অনুভূতিও নেই যেটাকে নির্দিষ্টভাবে বিশেষ বলা যেতে পারে, আছে কি? এগুলিই হল অনুভূতি মাত্র। তাতে কী হয়েছে? এটা হল ঐ ধরণের মনোভাব যেটাকে আমাদের বিকাশ করার প্রয়োজন। আমার মেজাজ ঠিক নেই- তাতে কী হয়েছে? এটা তো বিশেষ কিছু নয়। আমরা স্বীকার করে নিই যে আমাদের মেজাজ ঠিক নেই এবং সেটাকে যদি শুধরানো যায় তাহলে আমরা সেটা করব না কেন? আর যদি শুধরানো না যায় তাহলে সেটার মোকাবিলা করতে হবে। প্রকৃতপক্ষে, আপনাকে সেটার মোকাবিলা করার প্রয়োজনই নেই, আপনি যেটা করছেন সেটাকে নিয়মিত ভাবে ক’রে যেতে পারেন। আমরা যদি সত্যিই চাই যে, আমরা যে অনুভূতি অনুভব করি সেটাকে কেমন হওয়া উচিত আর তারজন্য পরিস্থিতিকে পরিবর্তন করব তাহলে তখন আমাদের মনোভাবকে পরিবর্তন করার প্রক্রিয়া সম্পর্কে ভাবতে হবে।

“বিশেষ কিছু নয়”, এই ভাবনা থাকা হল প্রথম স্তর। আমি যা অনুভব করি সেখানে এমন কিছু নেই যা হল নির্দিষ্টভাবে বিশেষ এবং এমন কোন “আমি” অস্তিমান নেই যা এই অনুভূতিগুলি থেকে আলাদা আর যাদের রক্ষা করার প্রয়োজন আছে। উত্থান এবং পতন তো হতেই থাকে, জীবন এই ভাবেই চলে।

আমি কোন দৃষ্টিতে বিশেষ নই

“ঐ অনুভূতিতে বিশেষ কিছু নেই”-এর সাথে “আমি কোন দৃষ্টিতে বিশেষ নই এবং আমার বর্তমান অনুভূতিও বিশেষ নয়”-এই ভাবনাটি যুক্ত। এর সম্পর্ক ঐ বিষয়ের সাথে আছে যাকে আমরা বৌদ্ধধর্মে “স্ব-লালন বা নিজেকে গুরুত্ব দেওয়া” বলি। আমরা “স্ব-লালন”-এর দৃষ্টিতে সবকিছু অনুভব করি। এর আসল অর্থটা কী? এর অর্থ হল সম্পূর্ণভাবে কেবল নিজের বিষয়ে উদ্বিগ্ন থাকা। আমরা কেবল নিজের এবং নিজের বর্তমান অনুভূতির উপর কেন্দ্রীভূত হয়ে থাকি আর অন্য সকলকে উপেক্ষা করিঃ “বাকী সবাই কী অনুভব করে কি না করে তাতে কিছু আসে যায় না; ব্যস, আমি দুঃখী।”

পুনরায়, কৌশলটি হল আমাদের এইভাবে বিবেচনা করতে হবে যে আমরা নিজেরা এবং যার বিষয়ে আমরা চিন্তা-ভাবনা করি সেটা কোন দৃষ্টিতে বেশি বিশেষ নয়। “আমি”-একে আঁকড়ে ধরার পরিপ্রেক্ষিতে আমাদের মন যত সংকীর্ণ হবে আমরা আসলে ততই দুঃখী হতে থাকব। এর অবস্থা একধরণের আঁটসাঁট এবং টানটান মাংসপেশীর মতো। আমাদের মনের অবস্থাও এইরকম- “আমি, আমি, আমি”- তবে আমরা যদি এই গ্রহের সাত বিলিয়ন মানুষ এবং অসংখ্য প্রাণীদের সম্পর্কে চিন্তা-ভাবনা করি তাহলে আমরা বুঝতে পারব আমাদের বিষয়ে বিশেষ কিছু নেই। সকলেই এখন কিছু না কিছু অনুভব করছে। কেউ আছে সুখী, কেউ অসুখী আবার কেউ আছে নিরপেক্ষ অবস্থায় (তারা নিদ্রামগ্নও থাকতে পারে), আর প্রত্যেক ব্যক্তির ক্ষেত্রে অনুভূতিটি নিয়মিত ভাবে পরিবর্তন হতে থাকে। আমাদের এটাকে এই দৃষ্টিতে দেখতে হবে যে নিজেদের সম্পর্কে এবং এই মূহূর্তে আমি যা অনুভব করছি সেখানে বিশেষ কী আছে?

যেমন আপনি এক সময় যাতায়াতের ভিড়ে আটকে থাকেন। আপনি কি মনে করেন যানবাহনের ভিড়ে যারা ফেঁসে থাকে তারা সকলেই একটা চমৎকার এবং সত্যিই আনন্দদায়ক মুহূর্ত উপভোগ করে? আমরা যতবেশি ভাবতে থাকব, “আমি, আমি, আমি- আমি এখানে আছি, আমি ফেঁসে গিয়েছি এবং আমি বেরোতে পারছি না, পরিস্থিতিটি কত ভয়াবহ” ততবেশি দুঃখী হব, তাই নয় কি? আপনি যদি যাতায়াতের ভিড়ে আটকে থাকা সকলের কথা ভাবেন তাহলে এটা আপনার মনকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে আরও বেশি উন্মুক্ত এবং স্বাচ্ছন্দ ক’রে তুলবে।

আমার মনে আছে আমি যখন আজ এখানে আসছিলাম তখন রাস্তায় যানবাহন চলাচল একেবারেই ঠিক ছিল না। প্রধান রাস্তার পাশে অবস্থিত যে ছোট রাস্তায় আমাদের গাড়িটি ছিল অন্য সব গাড়ি সেই রাস্তা দিয়ে চলাচল করে এগিয়ে যেতে চেয়েছিল। ঐ গাড়িগুলি আমাদের ছোট রাস্তা বা গলি পার ক’রে অন্য প্রান্তে যাওয়ার চেষ্টা করছিল, কিন্তু অন্য গলিতেও যানবাহন চলাচল একেবারেই ঠিক ছিল না। যাইহোক, তারা যেকোন ভাবে আমাদের ছোট রাস্তার মতো অন্যান্য রাস্তা এবং গলি পার ক’রে অন্য প্রান্তে যেতে চেয়েছিল। এটা স্পষ্ট যে লোকজন তাদের অতিক্রম করতে দিচ্ছিল না। আপনি হয়তো ভাবতে পারেন, “হে ঈশ্বর, এই লোকগুলি কীভাবে অন্যান্য যানবাহন গুলিকে অতিক্রম ক’রে পার ক’রে যাবে?” তারা এক-এক ইঞ্চি ক’রে এগোতে থাকে আর পরবর্তী খালি জায়গায় গাড়ি ঢোকানোর চেষ্টা করে। বিষয়টি বড়ই মজাদার হতে থাকে। এরপর আমাদের গাড়ির আগের গাড়িতে যে ব্যক্তি বসে ছিল, যদিও সে তার গাড়িকে নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার জন্য খালি রাস্তা পেয়ে যায়, কিন্তু ওই গাড়ির মধ্যে সে সেলফোনে কথা বলতে শুরু করে আর আশপাশের পরিস্থিতি সম্পর্কে তার কোন মনোযোগ থাকে না। ফলে সে তার গাড়িকে নিয়ে এগোয় না আর এই কারণে তার পিছনে দাঁড়িয়ে থাকা গাড়ির মধ্যে থাকা লোকজন সবাই অস্থির হয়ে ওঠে।

যখন এসব ঘটতে থাকে তখন হঠাৎ আপনি কিন্তু মনে করেন নাঃ “ওহ্‌, আমি ট্রাফিকে আটকে আছি।” এ সবকিছুই আপনার ক্ষেত্রে একটা নাটকের মতো প্রতীয়মান হয়। আপনি আশ্চর্য হয়ে ভাবেন, “এই সমস্ত মানুষগুলি কীভাবে এই যানবাহনের ভিড় থেকে বাইরে বেরোবে? এরা কীভাবে রাস্তা বের করবে?” তখন আপনি কিন্তু কেবল আপনার বিষয়ে ভাবেন না। আপনি তখন আপনার দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন ক’রে ফেলেন। আপনি “আমি”-কে নিয়ে বড় একটা সূত্রপাত তৈরী করেন না। এইভাবে আপনি যখন “আমি”-কে নিয়ে বড় সূত্রপাত তৈরী করা বন্ধ ক’রে দেন- “আমি তো খুব বিশেষ। যানবাহনের ভিড়ে আমি হলাম বিশেষ”- তখন ঐ পরিস্থিতিকে অনুভব করার আপনার পুরো প্রক্রিয়াটি পরিবর্তন হয়ে যায়। বিষয়টিকে একবার ভেবে দেখুন।

স্ব-লালনের সমস্যা

খুনু লামা নামক একজন মহান তিব্বতী আচার্য একটি সাধনা অনুশীলন করার পরামর্শ দিয়েছিলেন যেটা খুবই লাভদায়ক। তিনি বলেছিলেন, “কল্পনা করুন, আপনি এক প্রান্তে আছেন আর বাকী সব আছে অন্য প্রান্তে। একজন পরিদর্শক হিসাবে দৃশ্যটাকে আলাদাভাবে দেখুন।” ঐ দুটি প্রান্তের এক দিকের দৃশ্যে “আমি” যেমন দুঃখী ঠিক তেমনই অপর দিকের দৃশ্যে সবাই একই রকম ভাবে দুঃখী। অথবা আপনি যেমন ট্রাফিকের ভিড়ে আটকে আছেন ঠিক তেমনই আপনার মতো অন্য সবাই ট্রাফিকে আটকে আছে। একজন নিরপেক্ষ পরিদর্শক হিসাবে এদের মধ্যে কে বেশি গুরুত্বপূর্ণ? “আমি”-নামক একজন ব্যক্তি যে সবাইকে অতিক্রম ক’রে সবার আগে যাওয়ার চেষ্টা করছে অথবা সবাই যারা ট্রাফিকে আটকে আছে? এটার বিষয়ে একবার ভেবে দেখুন।

অবশ্যই, একজন একাকী ব্যক্তির চেয়ে বড় গোষ্ঠী বেশি গুরুত্বপূর্ণ, তাই তো? এর অর্থ এই নয় আমরা কিছুই না। আসলে, আমরা যদি নিজেদের সাথে-সাথে অন্যদের সম্পর্কে যত্নশীল হই তাহলে আমরাও অন্যদের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাই। অতএব এটা একটা সাধারণ বিষয় যে আমরা অন্য কারও চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ নই, বিষেষ ক’রে আমাদের অনুভূতির পরিপ্রেক্ষিতে।

সুতরাং, সমস্যাটি হল স্ব-লালন ভাবনা, এই অবিরত “আমি, আমি, আমি। আমি খুব গুরুত্বপূর্ণ।” রূপী ভাবনা। আমরা যখন দুঃখী হই তখন এইরকম চিন্তা-ভাবনা করা যে আমার উপর মেঘ ভাসছে আর সেখানে একটা “আমি” আছে যা ঐ মেঘ থেকে আলাদা হয়ে রয়েছে, এটাই “আমি”-কে গুরুত্বপূর্ণ মনে করার বিষয়। আমরা যখন খুশী হই তখনও সেখানে, “আমি, আমি, আমি”-এর জপ লেগে থাকে। আমরা চাই না যে কোন একটা বড় আকৃতির কুকুর এসে আমাদের হাড়ের টুকরোটা কেড়ে নিয়ে যাক। আবার কখনো-কখনো আমরা ভাবি, “আমি, আমি, আমি। আমার কোন অনুভূতি হচ্ছে না। আমি বিনোদিত হচ্ছি না। আমাদের বিনোদন হওয়া উচিত।

পর-লালনের জন্য উন্মুক্ত থাকা

আমি যা মনে করি সেটা হল এই স্ব-তন্ময়তা অর্থাৎ “আমি”-এর প্রতি সীমাবদ্ধ হয়ে কেন্দ্রিভূত হওয়া হল ঐ সমস্যার কারণ। আমাদের যেটা করতে হবে সেটা হল এই দৃষ্টিকোণকে পরিবর্তন ক’রে সকলের জন্য ভাবতে হবে এবং সকলের জন্য প্রেরণা জাগাতে হবেঃ “সকলেই যেন এই ট্রাফিকের ভিড় থেকে বেরিয়ে আসতে পারে।” আপনি যদি এরকম চিন্তা-ভাবনা করেন তাহলে আমরা একা কীভাবে ট্রাফিকের ভিড় থেকে বেরিয়ে আসতে পারব? ট্রাফিককে ভিড় মুক্ত করতে হবে, যদি তাই হয় সেখানে তো আমরা প্রত্যেকেই ফেঁসে আছি। যদি আপনার উদ্বিগ্ন হওয়ার ভাবনাটা এতো ব্যাপক হয় যেখানে সবাই অন্তর্ভুক্ত থাকে তাহলে আমরা দুশ্চিন্তা থেকে মুক্ত হয়ে যাই। ট্রাফিকের ভিড়ে ফেঁসে থাকার কারণে আমরা ক্রুদ্ধ এবং বিধ্বস্ত হই না। আর অবশেষে যখন ঐ ট্রাফিকের ভিড় থেকে আমরা মুক্ত হয়ে যাই তখন আমাদের কেবল এরকম ভাবা উচিত নয়, “চমৎকার, আমি বেরিয়ে এসেছি!” পরিবর্তে আমাদের ভাবতে হবে, “চমৎকার, প্রত্যেকে ভিড় থেকে বেরিয়ে তারা যেন এবার তাদের গন্তব্যস্থলে পৌঁছে যেতে পারে।” এরকম ভাবলে তখন আমরা সেই আনন্দকে এমনভাবে আঁকড়ে ধরে থাকব না, যেমনকি কেউ এসে আমার কাছ থেকে আমার হাঁড়টা কেড়ে নিয়ে চলে যাবে।

মূলতঃ এটাকেই আমরা বলি করুণা যার অর্থ হল অন্যের সুখের বিষয়ে চিন্তা-ভাবনা করা, যত্নশীল হওয়া যে, যেভাবে আমরা নিজেদের সুখের জন্য যত্নশীল হয়ে থাকি ঠিক তেমনইভাবে আমাদের দায়িত্ব গ্রহণ করা উচিত যাতে আমরা প্রকৃতপক্ষে প্রত্যেককে দুঃখ থেকে মুক্ত হতে সহায়তা করতে পারি- তাতে সেখানে বিষয়টা বিশেষ কিছু না হলেও কিছু আসে যায় না। জগতের দুঃখ এবং ভয় সম্পর্কে চিন্তা-ভাবনা করার সময় দুঃখী হয়ে ওঠার কোন অর্থ নেই। এটা তো স্বাভাবিক এবং প্রতি মুহূর্তে ঘটতেই থাকে; তা হলেও ভালো হবে যদি সকলেই সুখী থাকে, তাই নয় কী?

আমরা যখন স্বেচ্ছায় দায়িত্ববোধ গ্রহণ ক’রে এইরকম চিন্তা-ভাবনা করি “আমি সকলের জন্য চিন্তিত হব এবং কামনা করব সকলেই যেন তাদের দুঃখ থেকে মুক্ত হয়ে যায়”, তখন আমরা এক ধরণের অস্বাভাবিক সাহস এবং আত্মবিশ্বাস বিকাশ করতে পারি। এটা এমন একটা বিষয় যার সম্পর্কে পরম পূজ্য দালাই লামা প্রায়শই আলোচনা করেন। আমরা যদি কেবল নিজেদের বিষয়ে এবং নিজেদের দুঃখের বিষয়ে ভাবতে থাকি তাহলে আমরা আসলে খুবই দুর্বল হয়ে পড়ি। স্বেচ্ছায় অন্য সবাই এবং তাদের দুঃখের বিষয়ে ভাবার জন্য অনেক সাহসের প্রয়োজন হয়। এটা কোন প্রকারের দুর্বলতার লক্ষণ নয় বরং দৃঢ়তার লক্ষণ যা মানুষের মধ্যে অবিশ্বাস্য আত্মবিশ্বাস জোগায়। এই ইতিবাচক মনোভাব স্বয়ংক্রিয় ভাবে সুখের অনুভূতি বিকাশ করে। সেখানে এই দৃষ্টিকোণটি থাকে না, “আমি বেচারা, এই ট্রাফিকের ভিড়ে আটকে পড়েছি।” এর পরিবর্তে আমরা ঐ ট্রাফিকের ভিড়ে আটকে থাকা প্রত্যেক ব্যক্তির বিষয়ে ভাবি আর সত্যিই কামনা করি যে তারা সবাই যেন ট্রাফিকের ভিড়ে আটকে থাকার কারণে যে সমস্যার মুখোমুখি হয়েছে তার থেকে যেন মুক্ত হয়ে যায়। ট্রাফিকের ভিড়ে আটকে থাকা প্রত্যেক ব্যক্তিদের জন্য চিন্তিত হওয়াটা হল অনেক বেশি সাহসের কাজ। আর আমরা যখন এটা করি তখন আমরা আমাদের প্রতি আরও বেশি ইতিবাচক ভাবনা বিকাশ করতে পারি। বাস্তবে আমরা দুর্বল হই না অথবা ট্রাফিকের ভিড়ের কারণে নিপীড়িত মনে করি না, বরং আমরা আরও দৃঢ় এবং সক্ষম হয়ে উঠি। আমরা যদি শুধু নিজেদের বিষয়ে না ভেবে ট্রাফিকের ভিড়ে আটকে থাকা অন্য সকলের বিষয়ে ভাবি তাহলে এটা পরোক্ষভাবে অন্যরা সহযোগিতা লাভ করে। উদাহরণ স্বরূপ, আমরা উগ্র হব না এবং অনবরত গাড়ির হর্ন বাজাবো না (এটা স্পষ্ট যে এতে কোন লাভ হয় না কারণ ঐ ভিড়ে কেউ আগে এগোতে পারে না)। যখন পাশের রাস্তা দিয়ে একটি গাড়ি আমাদের গাড়িকে আগে যেতে না দেওয়ার জন্য আমাদের গাড়িকে অতিক্রম ক’রে এগিয়ে যায় তখন আমরা আমাদের গাড়ির কাঁচ খুলে ঐ গাড়ির চালককে কোন অপশব্দ বলব না। এরকম করলে ঐ পরিস্থিতিতে উভয় পক্ষই নিরুদ্বেগ থাকবে। তবে আমরা এর মাধ্যমে খুব বেশি প্রভাবিত করতে পারি না।

এটা একটা সামান্য উদাহরণ যে আমরা কীভাবে আমাদের মনোভাব পরিবর্তন ক’রে আমাদের জীবনের উত্থান-পতনের অভিজ্ঞতাকে পরিবর্তন করতে পারি। এরজন্য যদি কিছুর প্রয়োজন হয় সেটা হল একটু অনুশীলন আর একটু সাহস। এর মাধ্যমে আমরা নিজেদের ভাবনার উপর নিয়ন্ত্রণ করতে পারি যে আমরা হলাম খুবই বিশেষ আর আমরা যা অনুভব করি সেটাও বিশেষ। আমরা নিজেদের ভাবনার উপর নিয়ন্ত্রণ করতে পারলে প্রত্যেক পরিস্থিতির মোকাবিলা সঠিক ভাবে করতে পারব।

ক্রোধের মোকাবিলা করা

আমরা যখন ট্রাফিকের ভিড়ে আটকে থাকি এবং ঐ সময় যদি কেউ আমাদের গাড়ি থামিয়ে অতিক্রম করার চেষ্টা করে সম্ভবত আমরা হঠাৎ ক’রে ক্রোধিত হয়ে উঠতে পারি যা আমাদের নিয়ন্ত্রণের অধীনে থাকে না। আমাদের মনোভাবকে পরিবর্তন করার আরও একটি পদ্ধতি হল আমাদের বিভিন্ন কারণ সম্পর্কে ভাবতে হবে যার কারণে এই ধরণের পরিস্থিতি উৎপন্ন হয়, যেমন- হতে পারে ঐ চালকের গাড়িতে একটি অসুস্থ শিশু আছে যাকে সে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে। এই চিন্তা-ভাবনা আমাদের সংযত থাকতে অনেক উপকার করে।

তবে যেটা হয় সেটা হল শুরুতে এইভাবে ক্রোধিত হওয়ার ঘটনা বার-বার ঘটতে থাকে। ক্রোধিত হওয়ার প্রবৃত্তি এবং অভ্যাসকে কাটিয়ে ওঠার প্রক্রিয়াটি অনেক দীর্ঘ সময় ধরে চলতে পারে। এই ধরণের উদাহরণের মাধ্যমে আমাদের মনোভাব পরিবর্তন করার জন্য তাড়াহুড়ো করার ক্ষেত্রে উচিত কারণ থাকতে পারে, তবে সেটা হবে ক্রোধের মোকাবিলা করার একটি অস্থায়ী উপায়। ক্রোধকে জড় থেকে উন্মুলন করার জন্য আরও গভীরে যেতে হবে আর এরজন্য আমাদের যেটা করতে হবে সেটা হল আমরা নিজেদের সাথে-সাথে অন্যদেরকে কেমন দৃষ্টিতে দেখি।

আমাদের মধ্যে যে প্রবৃত্তিটি আছে সেটি হল আমরা কেবল জীবনের একটি ছোট্ট ঘটনার উপর ভিত্তি ক’রে নিজেদের সাথে-সাথে অন্যদের সনাক্ত করি। উদাহরণ স্বরূপ, ট্রাফিকের ভিড়ে যে ব্যক্তিটি আমাদের অতিক্রম ক’রে এগিয়ে যেতে চায় তাকে একজন ভয়ঙ্কর ব্যক্তি হিসাবে দেখি। এরচেয়ে বেশি আমরা কোন চিন্তা-ভাবনা করি না। এইভাবে আমরা তাদের জীবনে ঘটিত একটা ঘটনার ভিত্তিতে তাকে বোঝার চেষ্টা করি, বিশেষ ক’রে ঐ রকম পরিস্থিতিতে যখন আমরাও সেই ঘটনার সাথে যুক্ত হয়ে পড়ি। আমরা তার সম্পর্কে একটি মূর্ত পরিচয় নির্মাণ করি ঠিক তেমনই যেমন আমরা আমাদের সম্পর্কে করে থাকি। আর তারপর এই মূর্ত “আমি” ক্রোধিত হয়ে ওঠে।

আমাদের এই পরিস্থিতিকে ঐ সীমা পর্যন্ত শিথিল করার চেষ্টা করতে হবে যেখানে আমরা অন্যদের অথবা নিজেদের পরিচয় কোন বস্তুর সাথে মিলিয়ে দেখি না। তবে এটি একটি গভীর এবং লম্বা প্রক্রিয়া। আপনি কারও একটি স্থির চিত্র সম্পর্কে ভাবুন। এটা ঐ ব্যক্তির জীবনের কেবল একটা মুহূর্ত। এটা ঐ ব্যক্তির সম্পর্কে সব কিছু দেখায় না। সুতরাং আমাদেরকে আমাদের এবং অন্যের জীবনের স্থির চিত্রের মতো দেখা বন্ধ করতে হবে। সব কিছুই সর্বক্ষণ পরিবর্তন হতে থাকে। আর একবার যখন আমরা বস্তু সম্পর্কে বিভ্রান্তিকর দৃষ্টিকোণ শিথিল করে দেব তখন আমাদের সেই বিষয়ে অভ্যস্থ হতে হবে কারণ এরকম না করলে এই ধরণের প্রবৃত্তি পুনরায় জেগে উঠবে। অবশেষে, ঐ অবস্থাকে প্রাপ্ত করা সম্ভব যেখানে ক্রোধ অথবা ঈর্ষার নিবিড়তা পুনরায় জাগবে না।

সুখী হওয়া অনুচিত কিছু নয়

নিজের ভাবনা অথবা নিজেকে কোন কোনো ভাবেই বিশেষ মেনে না নেওয়া আর নিজের সাথে অন্য কাউকে নির্ধারিত এবং সীমিত পরিচয়ে অভিক্ষেপ না করার অনুশীলনই হল আমাদের জীবনের গুণাবলীকে উন্নত করার সহায়ক বিষয়। এর কারণে কঠিন পরিস্থিতিকে মোকাবিলা করা আরও বেশি সহজ হয়ে ওঠে, ফলে আমাদের জীবন সংঘর্ষময় হয় না। আবেগগত ভাবে আমরা একজন বেশি ধীর এবং সুখী ব্যক্তি হয়ে উঠি।

এর থেকে বেশি লক্ষ্য হল আমাদেরকে অন্যদের সম্পর্কে বিচার করতে হবে এবং বুঝতে হবে যে আমরা তাদের সাথে কীভাবে আচরণ করি। আমরা যদি একটা পরিবারে বসবাস করি এবং সেখানে আমাদের সন্তান, বন্ধু-বান্ধব আর সহকর্মী থাকে তখন যদি আমরা সবসময় খারাপ মেজাজে থাকি এবং নিয়মিত ভাবতে থাকি “বেচারা আমি”, পাশাপাশি অন্যদের সম্পর্কেও যদি এরকম চিন্তা-ভাবনা করি তাহলে তাদের সহায়তা করার দৃষ্টিতে আমরা খুবই দুর্বল অবস্থায় পৌঁছে যাব। প্রকৃতপক্ষে, আমাদের আচরণ তাদের দুঃখী ক’রে তোলে। সুতরাং যেভাবেই হোক আমরা আমাদের মেজাজকে ইতিবাচক ভাবে মোকাবিলা করার চেষ্টা করতে চাই, কারণ এরকম না করলে এটা অন্যদের প্রভাবিত করবে, আমাদের পরিবারকেও প্রভাবিত করবে ইত্যাদি কারণ আমরা তো তাদের বিষয়ে চিন্তিত থাকি। নিজেদের শুধরানোর জন্য প্রচেষ্টারত হওয়া হল আরও একটা কারণ।

সুখ অর্জন করার প্রবল ইচ্ছা থাকাটা একটি জৈবিক প্রবৃত্তি আর সুখী হওয়াটা কোন অপরাধ নয় আর সেইজন্য আমাদের সুখ অর্জন করার জন্য চেষ্টা করা উচিত। কিন্তু সেটা যখন প্রাপ্ত হয়ে যায় তখন আমাদের ঐ সুখের স্বভাবকে বুঝতে হবে যে সময় হলে সেটা ব্যতীত হয়ে যাবে। সুতরাং সেটাকে ঐ সময় উপভোগ ক’রে নেওয়া উচিত। আমরা এই বিষয়ে যত নিরুদ্বেগ থাকব আমরা তত বেশি সুখী হব। কখনো-কখনো আমরা দুঃখীও হব কিন্তু তাতে কী আসে যায়? আমরা কী আশাই বা করতে পারি? দুঃখী হওয়াটা কোন বড় বিষয় নয়, সেখানে বিশেষ কিছু নেই।

আমরা যখন ভাবি যে, আমাদের আশেপাশে যে সমস্ত ঘটনা ঘটছে সেখানে অতিবিশেষ ব’লে কিছু নেই, এই মনোভাব নিজেরই সুখী হওয়ার একটা নিরুদ্বেগ সাধন। বিষয়টা হল আমরা চিন্তিত থাকি না; এই ধরণের পাগলামী অনবরত আমাদের উসকায় নাঃ “আমাকে সর্বদা সুখী থাকতে হবে; আমাকে সর্বদা নিশ্চিত থাকতে হবে; আমাকে সর্বদা নিজের মতো চলতে হবে।” এই ধরণের বিচার প্রকৃতপক্ষে অপ্রীতিকর হয়। মনে রাখবেন, আমি যা বলেছিলাম, এটা আবশ্যক নয় যে আপনি যা করছেন সেটা করার ফলে আপনি সুখী হবেন। এমনও হতে পারে যে একই কাজ ক’রে আপনি বিভিন্ন দিনে সুখী, দুঃখী অথবা সমভাব উপভোগ করবেন। এটা তো বিষয়ের উপর নির্ভর করে যে আপনি কিসের উপর ধ্যানকেন্দ্রীত হন।

আমি একটা উদাহরণ প্রস্তুত করব। আমি সত্যিই দন্ত-চিকিৎসকের কাছে যাওয়াটা উপভোগ করি, কারণ আমার দন্ত-চিকিৎসক একজন খুবই ভাল মানুষ এবং আমাদের মধ্যে অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্বের সম্পর্ক আছে। আমরা সবসময় হাসি-ঠাট্টা করি ইত্যাদি। আমার সেখানে যেতে ভাল লাগে, কারণ আমার মনোযোগ এই বিষয়টার উপর কেন্দ্রীভূত হয় না, “আমি সত্যিই চিন্তিত যে দন্ত-চিকিৎসক ড্রিল মেশিনটি চালাবে অথবা এমন কিছু করবে যার কারণে আমার ব্যথা লাগবে।” আমি একেবারেই চিন্তিত হই না। আমি সানন্দে এটার মুখোমুখি হই, “আরে বাহঃ! আগামীকাল আমার বন্ধুর সাথে দেখা হবে।”

আপনারা হয়তো আমাকে অদ্ভূত মনে করবেন, কিন্তু আমাকে একবার রুট ক্যানেলের চিকিৎসা করাতে হয়েছিল এবং আমি সেটাকে সম্পূর্ণ ভাবে উপভোগ করেছিলাম। এটা মজাদার ছিল, কারণ আমার মুখ পুরোপুরি খোলা ছিল এবং চিকিৎসক আমার মুখে অনেক রকমের যন্ত্রপাতি ঢোকাচ্ছিল। আমি হাসতে শুরু করে দিয়েছিলাম কারণ আমি কল্পনা করে পারছিলাম না যে তিনি আর কত যন্ত্রপাতি আমার মুখে ঢোকাতে চলেছেন। মনে রাখবেন, ঐ সময় আমি পুরোপুরি নোভোকিনের প্রভাবে ছিলাম। অতএব আমার কোন অনুভূতি হচ্ছিল না।

হ্যাঁ, অবশ্যই নোভোকেন ইনজেকশন নেওয়ার সময় ব্যথা লেগেছিল, কিন্তু তাতে কী হয়েছে? আপনি কি চান যে আপনাকে ইনজেকশনটা না দেওয়া হোক আর রুট ক্যানেলের চিকিৎসাকালীন পূরো ৩০ মিনিট ধরে ব্যথা সহ্য করেন অথবা তার বিপরীতে ইনজেকশনটা নেওয়ার সময় কয়েক সেকেন্ডের জন্য ব্যথা সহ্য করেন? ঐ ইনজেকশনটা নেওয়ার সময় একটু ব্যথা লাগলেও সেটা নিয়ে আপনি খুশী হন, কারণ ব্যথাটি কেবল অল্প সময়ের জন্য হয়।

সবকিছুই আমাদের মনোভাবের উপর নির্ভর করে। এটাই হল মনোভাব-প্রশিক্ষণের সাধনা। এটা কাজ করে এবং আমাদের জীবনের গুণাবলীকে উন্নত করে। আমাদের যদি রুট ক্যানেলের চিকিৎসার প্রয়োজন হয়, তাহলে কি আমরা ঐ চিকিৎসাটা করব পীড়া সহ্য করার জন্য, না সেটার পরিস্থিতি আরও খারাপ না হতে দেওয়ার জন্য? আমাদের তো সেটা অনুভব করতে হবে; অন্য কোন বিকল্পও তো নেই। সুতরাং ভাল হবে, যত শীঘ্র সম্ভব সেটাকে অনুভব করার যোগ্য তৈরী করা। এই হল এর পিছনের নীতি।

সারাংশ

সমস্যা এবং দুঃখের কামনা করতে-করতে কেউ সকালে ঘুম থেকে ওঠে না; আমরা যা কিছু করি তার পিছনে উদ্দেশ্য থাকে যে আমরা আরও সুখী হব। তা সত্ত্বেও এই অধরা লক্ষ্য কখনো আমাদের কাছে আসার মতো মনে হয় না। নিজেদের উপর কেন্দ্রীভূত হয়ে এবং নিজেদের অস্তিত্ব, কর্ম ও অনুভূতির গুরুত্বকে অতিরঞ্জিত করার কারণে আমরা ঐ সুখকে উপভোগ করতে ব্যর্থ হয়ে যাই, যে সুখ আমরা লাভ করি অথবা আমাদের সামনে উত্থিত অসুবিধার মধ্যে বাস করতে থাকি। অপরকে এবং তাদের অনুভূতিকে অন্তর্ভূক্ত করার জন্য আমাদের মনোভাবকে প্রশিক্ষিত ক’রে আমরা আমাদের জীবনের উত্থান এবং পতনের অভিজ্ঞতাকে আরও বেশী নিরুদ্বেগ ও সুখী করে তুলতে পারি, যার মোকাবিলা আমাদের সকলকে করতে হয়।

Top