শাস্ত্রার্থের উদ্দেশ্য এবং লাভ

বৌদ্ধ ধর্মে শাস্ত্রার্থের অর্থ চতুর যুক্তি দ্বারা কাউকে পরাজিত করা নয়। এটি হল শিক্ষার্থীদের তাদের বোধশক্তির ক্ষেত্রে নিশ্চয়তা বিকাশ করতে সহায়তা করা, যাতে তাদের মধ্যে ধ্যান সম্পর্কে কোনো সন্দেহের অবকাশ না থাকে। ক্লাসের প্রতিটি শিক্ষার্থী আর অবস্থান রক্ষার জন্য তার সহপাঠীকে প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করে এবং তাদের উত্তরের কোনও অসঙ্গতি দেখিয়ে চ্যালেঞ্জ জানায়। শেষ পর্যন্ত উভয় পক্ষই লাভবান হয়।

বৌদ্ধ প্রশিক্ষণের শাস্ত্রার্থের একটি প্রধান উদ্দেশ্য হ’ল- আপনাকে সিদ্ধান্তমূলক সচেতনতার বিকাশ করতে সহায়তা করা। আপনি একটি অবস্থান গ্রহণ করেন এবং আপনার শাস্ত্রার্থ-অংশীদার এটিকে বহু দৃষ্টিকোণ থেকে চ্যালেঞ্জ করে। আপনি যদি সমস্ত আপত্তি গুলির বিরুদ্ধে আপনার অবস্থানটির রক্ষা করতে পারেন তাহলে আপনি দেখতে পান যে, এতে কোনো যৌক্তিক অসঙ্গতি নেই এবং কোনও বিরোধ নেই। আপনি সেই অবস্থানের উপর মনোনিবেশ করতে পারেন বা সম্পূর্ণভাবে সিদ্ধান্তমূলক সচেতনতার সাথে বিবেচনা করতে পারেন যেটাকে নাড়ানো যায় না। আমরা এই মানসিক অবস্থাকে অধিমুক্তিও (অধিমোক্ষ) বলি। অনিত্যতা, স্ব-পরসমতা, নিজের থেকে অন্যরা অধিক মূল্যবান, বোধিচিত্ত, শূন্যতা ইত্যাদির মধ্যে যে কোন একটা বিষয়ের উপর একাগ্র-মনোভাবের সাথে ধ্যান করার সময় আপনার মধ্যে উক্ত সিদ্ধান্তমূলক সচেতনতা এবং অধিমুক্তি থাকা দরকার। আপনি যদি নিজেই বিচার-ধ্যান বা শুধু ধর্ম সম্পর্কে চিন্তা-ভাবনা করার মাধ্যমে ঐ সিদ্ধান্তমূলক সচেতনতা বিকাশের চেষ্টা করেন, তাহলে যখন একজন সু-জ্ঞাত অংশীদার ব্যাপক বিদ্যা-ভান্ডার সহ আপনার সাথে শাস্ত্রার্থ করবে তখন আপনি কখনই আপনার বোধগম্যটিকে যতটা আপত্তির সাথে প্রশ্ন করা দরকার ততটা করতে সক্ষম হবেন না। অন্যরা আপনার যুক্তিতে অসম্পূর্ণতা বা ভুলগুলি আরও সহজে চিহ্নিত করে ফেলবে যা আপনি কখনও করতে পারবেন না।

এছাড়াও শাস্ত্রার্থ প্রাথমিক সাধকদের ক্ষেত্রে সমাধির (একাগ্রতা) বিকাশের জন্য ধ্যানের চেয়ে বেশী অনুকূল তৈরী করে। শাস্ত্রার্থে আপনার সঙ্গী বা অংশীদারের চ্যালেঞ্জ এবং সহপাঠীর শ্রুতির প্রভাব আপনাকে একাগ্র হতে বাধ্য করে দেয়। একা ধ্যান করার সময় কেবল ইচ্ছাশক্তি আপনাকে মানসিক ভাবে বিক্ষিপ্ত হওয়া বা ঘুমিয়ে পড়তে বাধা দেয়। এছাড়াও ভিক্ষুদের শাস্ত্রার্থ স্থলে অনেক শাস্ত্রার্থ একে-অপরের পাশে খুব জোরে হয়। এটিও আপনাকে একাগ্র হতে বাধ্য করে। আপনার চারপাশের শাস্ত্রার্থ গুলি যদি আপনাকে বিভ্রান্ত করে বা বিরক্ত করে তোলে তাহলে তো আপনার গল্প শেষ। শাস্ত্রার্থ স্থলে যদি আপনি একবার একাগ্রতার দক্ষতা বিকাশ করেন তাহলে আপনি এগুলি ধ্যানের জন্য, এমনকি কোলাহলপূর্ণ জায়গায় ধ্যান করার জন্যও প্রয়োগ করতে পারবেন।


তদতিরিক্ত শাস্ত্রার্থ আপনার ব্যক্তিত্বকে বিকাশ করতে সহায়তা করে। আপনি লজ্জা পেতে পারেন না, শাস্ত্রার্থ চলতে থাকে। আপনার প্রতিপক্ষ যখন আপনাকে চ্যালেঞ্জ জানায় তখন আপনাকে অবশ্যই কথা বলতে হবে। অন্যদিকে আপনি যদি অহঙ্কারী হন বা রেগে যান তাহলে আপনার মন অস্পষ্ট থেকে যাবে এবং অনিবার্য ভাবে আপনার সঙ্গী আপনাকে পরাজিত করবে। সব সময় আপনাকে আবেগপ্রবণ ভারসাম্য বজায় রাখতে হবে। আপনি জয়ী হন বা পরাজয়ী, শাস্ত্রার্থ “অহং”-কে চিহ্নিত ক’রে সেটাকে খন্ডন করার জন্য একটা দুর্দান্ত সুযোগ প্রদান করে। আপনি যখন মনে করেন বা অনুভব করেন যে, “আমি জয়লাভ করেছি; আমি বড্ড চালাক,” অথবা “আমি হেরে গেছি; আমি বড্ড বোকা”, তখন আপনি একটা দৃঢ়, স্ব-গুরুত্বপূর্ণ “অহং (আমি)”-এর অভিক্ষেপকে স্পষ্টভাবে চিহ্নিত করতে পারবেন, যার ভিত্তিতে আপনি চিহ্নিত করছেন। এটি হ’ল- “অহং” যা হ’ল একটা বিশুদ্ধ কল্পনা এবং খন্ডনযোগ্য।

এমনকি আপনি যখন নিজের শাস্ত্রার্থ সঙ্গীকে প্রমাণ করেন যে, তার অবস্থান অযৌক্তিক, তখন আপনার মনে রাখা দরকার যে এটা প্রমাণ করে না, আপনি বুদ্ধিমান আর তিনি বোকা। আপনার অনুপ্রেরণাটি অবশ্যই সব সময় আপনার সঙ্গীর বোধগম্যতা এবং অধিমুক্তি বিকাশ করতে সহায়তা করা উচিত যার দ্বারা বিষয়টি যুক্তিযুক্তভাবে প্রমাণিত হতে পারে।

Top