প্রত্যেকে বুদ্ধ হতে পারে

আমরা সবাই দীর্ঘমেয়াদী সুখ অর্জন করতে চাই। তাই সবচেয়ে অর্থবহ যুক্তিসঙ্গত করণীয় হল সেই লক্ষ্যের জন্য বাস্তববাদী হয়ে কাজ করা। যদিও ভৌতিক বস্তু আমাদের কিছু সুখ প্রদান করতে পারে, কিন্তু সুখের আসল উৎস হ’ল আমাদের নিজের মন। যখন আমাদের সব ক্ষমতা পুরোপুরি বিকশিত হয়ে যায় এবং আমাদের সমস্ত দোষগুলি অভিভূত হয়ে যায় এবং আমরা বুদ্ধ হয়ে যাই। অর্থাৎ সুখের একটা উৎস হয়ে উঠি, কেবল আমাদের জন্য নয়, বরং সকলের জন্য। আমরা সকলেই বুদ্ধ হতে পারি, কারণ আমাদের সকলের মধ্যে কাজের উপাদানগুলি বিদ্যমান আছে যা আমাদের সেই লক্ষ্যে পৌঁছতে সক্ষম করে তোলে। আমাদের সকলের কাছে আছে বুদ্ধগর্ভ (তথাগতগর্ভ)।

বুদ্ধ জোর দিয়ে বলেছিলেন যে আমরা সকলেই বুদ্ধ হতে পারি, তবে আসলে এর মানেটা কী? বুদ্ধ হলেন এমন একজন, যিনি তাদের সমস্ত দোষ উন্মুলন করে ফেলেছেন, তাদের সমস্ত অভাবকে সংশোধন করেছেন, এবং তাদের সমস্ত সম্ভাবনা (সুপ্তশক্তি) উপলব্ধি করেছেন। প্রত্যেক বুদ্ধ ঠিক আমাদের মতো শুরু করেছিলেন; একটা সাধারণ প্রাণী, বাস্তব এবং অবাস্তবিক অভিক্ষেপের সম্পর্কে বিভ্রান্তির কারণে জীবনে বারবার অসুবিধা ভোগ করেছেন। তাঁরা উপলব্ধি করেছিলেন যে মূলতঃ তাদের জেদী অভিক্ষেপগুলির বাস্তবের সাথে কোন মিল ছিল না। দুঃখ থেকে মুক্ত হওয়ার দৃঢ় সংকল্প দ্বারা, তাঁরা অবশেষে তাদের মন দ্বারা প্রক্ষিপ্ত কল্পনাগুলি নিবৃত্ত করে ফেলেছিলেন যার প্রতি তাদের মধ্যে স্বয়ংক্রিয়ভাবে বিশ্বাস জাগত। সমস্ত দুঃখ থেকে মুক্ত হওয়ার জন্য তাঁরা তাদের বিরক্তিকর আবেগগুলি অনুভব করা এবং বাধ্যতামূলকভাবে কাজ-কর্ম করা বন্ধ করে দিয়েছিলেন।

এটির মাধ্যমে, তাঁরা তাদের ইতিবাচক আবেগ, যেমন- মৈত্রী এবং করুণাকে শক্তিশালী করতে কাজ করেছিলেন, এবং যতটা সম্ভব অপরের সহায়তা করেছিলেন। তাঁরা সকলের প্রতি মৈত্রী বিকশিত করেছিলেন, যেমনটা কি মায়েদের মধ্যে তাদের একমাত্র সন্তানের প্রতি থাকে। সকলের জন্য তীব্র মৈত্রী এবং করুণা দ্বারা চালিত এবং তাদের সকলকে সহায়তা করার অসাধারণ সংকল্পের কারণে তাদের বাস্তবতার বোধশক্তি হয়ে উঠেছিল শক্তিশালী এবং আরও শক্তিশালী। এটি এতটা শক্তিশালী হয়ে উঠেছিল যে, তাদের মন অবশেষে ভ্রান্তিজনক আকারগুলিও প্রক্ষেপ করা বন্ধ করে দিয়েছিল। এটা বোঝায় যে সবকিছু এবং প্রত্যেকে নিজের থেকে বিদ্যমান, অন্য সমস্ত কিছু থেকে অসংযুক্ত। তাঁরা যাবৎ বস্তুর (অস্তিমান বস্তু) পরস্পর সংযুক্ততা এবং পরস্পর নির্ভরশীলতাকে কোনও বাধাবিঘ্ন ছাড়া স্পষ্টভাবে দেখেছিলেন।

এই কৃতিত্বের সাথে, তাঁরা জ্ঞানদীপ্ত হয়ে উঠেছিল, তাঁরা বুদ্ধ হয়ে গেছিল। তাদের শরীর, তাদের যোগাযোগের দক্ষতা এবং তাদের মন সকল সীমাবদ্ধতা থেকে মুক্ত হয়ে গেল। তাদের দ্বারা উপদিষ্ট শিক্ষা কোনটা কোন ব্যক্তির উপর কী প্রভাব ফেলবে সেটা জেনে, তাঁরা এখন বাস্তব সম্মতভাবে যতটা সম্ভব সমস্ত প্রাণীদের সহায়তা করতে সক্ষম হয়েছে। তবে একজন বুদ্ধও কিন্তু সর্বশক্তিমান নন। একজন বুদ্ধ একটি ইতিবাচক প্রভাব প্রদান করতে পারে যারা তাদের উপদেশের জন্য উন্মুক্ত এবং গ্রহণযোগ্য আর যারা এটি সঠিকভাবে অনুসরণ করেন।

এবং বুদ্ধ বলেছেন যে তিনি যা প্রাপ্ত করেছিলেন তা প্রত্যেকে প্রাপ্ত করতে পারেন; প্রত্যেকে বুদ্ধ হতে পারেন। এর কারণ হ’ল আমাদের সকলের মধ্যে আছে “বুদ্ধগর্ভ”- যা হল মৌলিক কার্যকারী উপাদান, যেগুলি সত্ত্বকে বুদ্ধত্বর জন্য সক্ষম করে তোলে।

স্নায়ুবিজ্ঞান নিউরোপ্লাস্টিসিটির কথা বলে- আমাদের সারা জীবন জুড়ে পরিবর্তন করা এবং নতুন স্নায়বিক পথ বিকাশ করার জন্য মস্তিষ্কের ক্ষমতা। উদাহরণস্বরূপ, মস্তিষ্কের অংশটা, যা আমাদের ডান হাতকে নিয়ন্ত্রণ করে, যখন পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে যায়, ফিজিওথেরাপি দ্বারা প্রশিক্ষণ দেওয়ার ফলে নতুন স্নায়বিক পথ বিকাশ করার জন্য মস্তিষ্ককে সক্ষম করে তোলে আমাদের বাম হাত ব্যবহার করতে। সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে যে করুণা সংক্রান্ত ধ্যান, অধিক সুখ এবং মানসিক শান্তির দিকে যাওয়ার জন্য নতুন স্নায়বিক পথও তৈরি করতে পারে। সুতরাং আমরা যেমন মস্তিষ্কে নিউরোপ্লাস্টিসিটির কথা বলি, একইভাবে আমরা মনের প্লাস্টিসিটির কথাও বলতে পারি। বিষয়টি হল যে আমাদের মন, এবং আমাদের ব্যক্তিত্বের বৈশিষ্টগুলি, স্থির এবং স্থায়ী হওয়া থেকে বর্জিত, এবং নতুন ইতিবাচক পথগুলি বিকাশের জন্য অনুপ্রাণিত হতে পারে, যা হল আমাদের জ্ঞানদীপ্ত বুদ্ধ হতে সক্ষম করে তোলার মৌলিক উপাদান।

শারীরবৃত্তীয় স্তরে, যখনই আমরা গঠনমূলক কিছু করি, বলি বা ভাবি, আমরা তখন একটি ইতিবাচক স্নায়বিক পথকে শক্তিশালী করি। সেটা এটিকে আরও সহজ এবং সম্ভাব্য করে তোলে যে আমরা কাজটি পুনরাবৃত্তি করব। মানসিক স্তরে, বৌদ্ধ ধর্ম বলে যে এটি ইতিবাচক শক্তি এবং সম্ভাবনা (সুপ্তশক্তি) নির্মাণ করে। এই ধরণের ইতিবাচক শক্তির নেটওয়ার্কটাকে আমরা যত বেশী শক্তিশালী বানাই, বিশেষ করে আমরা যখন অপরের কল্যাণ করি, এটা তত বেশী প্রভাবশালী হয়। সকল প্রাণীদের বুদ্ধ হিসাবে সম্পূর্ণরূপে সহায়তা করার সক্ষমতার ভিত্তিতে পরিচালিত এই ইতিবাচক শক্তিই হ’ল তাই যা আমাদের সার্বজনীনভাবে সহায়ক হওয়ার লক্ষ্যে পৌঁছতে সক্ষম করে তোলে।

একইভাবে, আমরা যত বেশি আমাদের বাস্তবিকতার মিথ্যা অভিক্ষেপগুলির অনুরুপ কিছু বাস্তব সম্পর্কিত অনুস্থিতির উপর কেন্দ্রীভূত হই, আমরা তত বেশি স্নায়বিক পথকে দুর্বল করি। আমরা এটা করি প্রথমে এই মানসিক অর্থহীন কথায় বিশ্বাস করে এবং তারপর সেটাকে প্রক্ষেপ করে। অবশেষে, আমাদের মন এই ধরণের ক্লিষ্ট স্নায়বিক এবং মানসিক পথ থেকে মুক্ত হয়ে যায়, এবং তাদের উপর নির্ভরশীল বিশৃঙ্খল আবেগ এবং বাধ্যতামূলক আচরণের নমুনাগুলি থেকে মুক্ত হয়ে যায়। পরিবর্তে আমরা বাস্তবিকতার গভীর সচেতন সম্পর্কিত শক্তিশালী পথগুলি বিকাশ করি। যখন এই পথগুলি বুদ্ধের সর্বজ্ঞ চিত্তের জন্য উদ্দেশ্য করা বল দ্বারা পরিচালিত হয়, তখন গভীর সচেতনের এই নেটওয়ার্ক আমাদের বুদ্ধ-চিত্ত অর্জন করতে সক্ষম করে তোলে। এই ধরণের চিত্ত জানে যে কীভাবে প্রত্যেক এবং সীমিত সত্ত্বাকে শ্রেষ্ঠরুপে সহায়তা করা যায়।

কারণ আমাদের সবারই একটা শরীর আছে, অপরের সাথে যোগাযোগের সুবিধা- প্রাথমিকভাবে বাক্‌- এবং আছে একটা মনও। এইভাবে আমাদের সকলের কাছে আছে কার্যকারী উপাদান বুদ্ধের কায় (শরীর), বাক্‌ এবং চিত্ত প্রাপ্ত করার জন্য। এই তিনটি একইভাবে বুদ্ধগর্ভ-এর উপাদান। আমাদের সকলের মধ্যে কিছু মানের ভাল গুণ আছে- স্ব-সংরক্ষণ, প্রজাতি সংরক্ষণের জন্য আমাদের প্রবৃত্তি, আমাদের মাতৃ এবং পিতৃ সুলভ প্রবৃত্তি, এবং আরও; পাশাপাশি কাজ-কর্ম করা এবং অন্যদের প্রভাবিত করার ক্ষমতা। এগুলিও বুদ্ধগর্ভ-এর উপাদান; সেগুলি হল ভাল গুণাবলী, যেমন- অসীম মৈত্রী এবং যত্ন, এবং বুদ্ধের জ্ঞানময় কার্যকলাপ, উৎপন্ন করার জন্য আমাদের কাজের উপকরণ।

আমরা যখন পরীক্ষা করি যে আমাদের মনগুলি কীভাবে কাজ করে, তখন আমরা আরও বেশী করে বুদ্ধগর্ভকে আবিষ্কার করি। আমরা সকলেই একসাথে তথ্য, শ্রেণীবদ্ধ বস্তু নিতে সক্ষম হই যা কিছু গুণ ভাগ করে দেয়, বস্তুর স্বাতন্ত্র্যকে আলাদা করে, আমরা যা উপলব্ধি করি তার প্রতিক্রিয়া জানায়, এবং বস্তু যেমন সেটার বিষয়ে জ্ঞান হয়। এইভাবে আমাদের মানসিক কাজ-কর্ম এখন সীমিত, কিন্তু সেগুলি বুদ্ধ-চিত্ত প্রাপ্ত করার কাজের উপকরণও, যেখানে তাঁরা তাদের সর্বোচ্চ সম্ভাবনা নিয়ে কাজ করবে।

সারাংশ

আমাদের সকলের মধ্যে বুদ্ধ হয়ে ওঠার কাজের উপাদান বিদ্যমান আছে। যেটা দরকার সেটা হল শুধু আমরা জ্ঞানদীপ্ত হয়ে ওঠার আগে অনুপ্রেরণা এবং টেকসই কঠিন পরিশ্রম। উন্নতি কখনও রৈখিক হয় নাঃ কিছুদিন বেশি ভাল হয়, আবার কিছু দিন বেশি খারাপ; বুদ্ধত্বের পথটি লম্বা, তবে সহজ নয়। কিন্তু আমরা যত বেশি বুদ্ধগর্ভের উৎপাদকগুলির বিষয়ে নিজেদের স্মরণ করিয়ে দিই, আমরা তত বেশি নিরুৎসাহিত হওয়া থেকে এড়াতে পারি। আমাদের শুধু মনে রাখা প্রয়োজন যে আমাদের মধ্যে সহজাত কোনও দোষ নেই। আমরা যথেষ্ট শক্তিশালী এবং অনুপ্রেরণা দ্বারা আর সুকৌশলের সাথে করুণা এবং জ্ঞানে সংযুক্ত বাস্তবসম্মত উপায়গুলি অনুসরণ করে সমস্ত বাধাগুলি অতিক্রম করতে পারি।

Top