ঈর্ষাঃ অশান্তকারী মনোভাবের সাথে মোকাবিলা করা

ঈর্ষার (হিংসা) অনেক রূপ আছে। এটা কেবল অন্যের সাফল্যকে সহ্য করার অক্ষমতা হতে পারে, অথবা সেখানে এই আকাঙ্খাও অন্তর্ভুক্ত হতে পারে যে ঐ সাফল্য যেন আমরা অর্জন করতে পারি। আমরা এই ধরণের লোভ করতে পারি যে অন্যের কাছে যা আছে সেটা যেন আমরা প্রাপ্ত করি এবং আমরা এই কামনাও করতে পারি যে তারা যেন সেই বস্তু থেকে বঞ্চিত হয়ে যায়। সেখানে প্রতিস্পর্ধার ভাবনাও জড়িত হতে পারে এবং সেই সাথে নিজেদেরকে “পরাজয়ী” এবং অন্যদের পরম “বিজয়ী” হিসাবে দেখার দ্বৈতবাদী চিন্তা-ভাবনাও জড়িত হতে পারে। এই সমস্ত ভাবনার মধ্যে অন্তর্নিহিত থাকে আমাদের নিজেদেরকে নিয়ে তন্ময়তা ভাব। এই সমস্ত উপাদান বিশ্লেষণ ক’রে বৌদ্ধধর্ম আমাদেরকে অশান্তকারী মনোভাবের বিনির্মাণ এবং সেগুলি থেকে নিজেকে মুক্ত করার জন্য অত্যাধুনিক পদ্ধতি শেখায়।

অশান্তকারী মনোভাব (ক্লেশ)

আমরা সকলেই অশান্তকারী মনোভাবের (সংস্কৃত ভাষায়- ক্লেশ) কারণে প্রভাবিত হই।। এটি মনের এমন একটি অবস্থা যখন এটি বিকশিত হয় তখন আমরা আমাদের মানসিক শান্তি হারিয়ে ফেলি আর এটি আমাদের এমন ভাবে অক্ষম করে তোলে যার কারণে আমরা আমাদের আত্ম-নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলি। লোভ, আসক্তি, শত্রুতা, ক্রোধ, ঈর্ষা এবং হিংসা হল এর সাধারণ উদাহরণ। এগুলি বিভিন্ন মানসিক প্রেরণার (কর্ম) জন্ম দেয়, যেগুলি সাধারণতঃ ধ্বংসাত্মক আচরণের দিকে পরিচালিত করে। এই প্রেরণাগুলির কারণে আমরা অন্যের প্রতি ধ্বংসাত্মক আচরণ করি অথবা কিছু ক্ষেত্রে স্ব-ধ্বংসাত্মকও হয়। এরফলে আমরা অনিবার্যভাবে অন্যদের জন্য সমস্যা ও দুঃখ সৃষ্টি করি আর তার সাথে নিজেদের জন্যেও করে ফেলি।

অশান্তকারী মনোভাবের একটা বিস্তৃত পরিসর আছে অর্থাৎ অশান্তকারী মনোভাব অনেক প্রকারের হয়। প্রত্যেকটি সংস্কৃতি মানসিকভাবে তার সমাজের বেশিরভাগ মানুষের সাধারণ আবেগপ্রবণ অনুভবের ভিত্তিতে একটা সেটকে কেন্দ্র ক’রে নিজের ইচ্ছা মতো রেখা টেনে রাখে। এটি কিছু সংজ্ঞায়িত বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেয় যা এটিকে একটি শ্রেণী হিসাবে বর্ণনা করে। আর তারপর ঐ শ্রেণীকে একটা নাম দেয়। অবশ্যই প্রত্যেকটি সংস্কৃতি সাধারণ আবেগপ্রবণ অনুভবের বিভিন্ন সেট এবং সেটাকে বর্ণনা করার বিভিন্ন সংজ্ঞায়িত বৈশিষ্ট্য বেছে নেয়। এইভাবে এটি অশান্তকারী মনোভাবের বিভিন্ন শ্রেণী তৈরী হয়।

বিভিন্ন সংস্কৃতি দ্বারা নির্ধারিত অশান্তকারী আবেগের শ্রেণীগুলি সাধারণতঃ পুরোপুরি ভাবে সমান হয় না, কারণ আবেগের সংজ্ঞায় একটু পার্থক্য দেখতে পাওয়া যায়, উদাহরণ স্বরূপ, সংস্কৃত এবং তিব্বতী ভাষায় এরকম এক-একটা শব্দ আছে যার অনুবাদ সাধারণতঃ ইংরেজী ভাষায় “জেলসি” রূপে করা হয়। অন্যদিকে অধিকাংশ পাশ্চাত্য ভাষায় এর জন্য দুটি শব্দ আছে। ইংরেজী ভাষায় “জেলসি” এবং “এন্‌ভি” নামক এই দুটি শব্দ আছে, অন্যদিকে জার্মান ভাষায় “আইফারসুস্ত” এবং “নাইড” এই দুটি শব্দ আছে। ইংরেজী ভাষায় ব্যবহৃত ঐ দুটি শব্দের মধ্যে যেমন পার্থক্য দেখতে পাওয়া যায়, সেটা জার্মান ভাষায় ব্যবহৃত শব্দ দুটির মধ্যে তেমন কোন পার্থক্য নেই। আর সংস্কৃত এবং তিব্বতী ভাষায় ব্যবহৃত শব্দার্থের সাথে এই দুটি ভাষার শব্দার্থের সাথে মিল খায় না। পাশ্চাত্য জগতের মানুষ হিসাবে আমরা যদি এই সাধারণ শ্রেণীর আবেগপ্রবণ সমস্যা অনুভব করি এবং যেটাকে আমাদের নিজস্ব সংস্কৃতি ও ভাষা দ্বারা নির্ধারণ করা হয়েছে, আর যেগুলি থেকে কাটিয়ে ওঠার জন্য আমরা বৌদ্ধ পদ্ধতি শিখতে চাই, তাহলে আমাদের আবেগের বিশ্লেষণ এবং বিনির্মাণ করতে হবে। এর কারণ হল বৌদ্ধধর্মে সংজ্ঞায়িত বিভিন্ন প্রকারের অশান্তকারী আবেগের সংমিশ্রণে আমরা সেগুলির কল্পনা করি।

আমরা এখানে “এন্‌ভি” শব্দার্থকে বোধ করানো বৌদ্ধ অভিব্যক্তির উপর ধ্যান কেন্দ্রিত করব, কারণ এই শব্দটি তার পরম্পরাগত সংজ্ঞার খুবই কাছাকাছি থাকে। সম্পর্কের দৃষ্টিতে আমরা “মৌলিক তত্ত্ব” বিভাগে ঈর্ষা নিয়ে আলাদাভাবে আলোচনা করেছি (দ্রষ্টব্যঃ সম্পর্কের ক্ষেত্রে ঈর্ষা কীভাবে মোকাবিলা করা যায়)।

ঈর্ষা কী

বৌদ্ধ গ্রন্থগুলিতে “ঈর্ষা”-কে শত্রুতার অঙ্গ হিসাবে শ্রেণীবদ্ধ করা হয়েছে। গ্রন্থগুলিতে এর অর্থকে সংজ্ঞায়িত ক’রে বলা হয়েছে যে “এটা একটা অশান্তকারী আবেগ যা অন্য লোকজনদের সাফল্যের উপর কেন্দ্রীভূত হয়, যেমন- তাদের ভালো গুণাবলী, সম্পদ বা সাফল্য আর নিজের লাভ বা অর্জিত সম্মানের প্রতি অত্যাধিক আসক্তি এবং অন্যের সাফল্যকে সহ্য করতে না পারার অক্ষমতার কারণে এটা হয় ।

এখানে আসক্তির অভিপ্রায় হল যে, আমরা জীবনে এমন কিছুক্ষেত্রে কেন্দ্রিভূত হয়ে থাকি যেখানে আমাদের চেয়ে অন্যরা বেশি অর্জন করে আছে আর আমরা তার ইতিবাচক দিকগুলিকে অতিরঞ্জিত ক’রে দেখি। আমরা আমাদের মনে এই ক্ষেত্রটিকে আমাদের জীবনের সবচেয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হিসাবে মেনে নিই। আর তার ভিত্তিতে আমাদের আত্মসম্মান উপস্থাপন করি। এখানে “আমি”-কে অনাবশ্যকরূপে বেশি গুরুত্ব দেওয়া এবং তার প্রতি আসক্তিভাব অন্তর্নিহিত থাকে। এইভাবে আমরা ঈর্ষান্বিত হই কারণ আমরা আমাদের ঐ ক্ষেত্রের পরিপ্রেক্ষিতে “আমাদের নিজেদের লাভ অথবা অর্জিত সম্মানের প্রতি আসক্ত থাকি।” উদাহরণ স্বরূপ, আমাদের মধ্যে এই ধরণের বিষয় নিয়ে অত্যাধিক আসক্তি থাকতে পারে যে আমাদের কাছে অনেক পরিমাণে টাকা-পয়সা আছে অথবা আমরা দেখতে কী সুন্দর এবং আকর্ষক। শত্রুতার একটি দিক হিসাবে অন্যরা জীবনে যে সাফল্য অর্জন করেছে সেখানে এই আসক্তির মধ্যে ঈর্ষা একটা প্রবল বিদ্বেষ ভাবনার উপাদান যোগ ক’রে দেয়। এই পরিস্থিতিটা হল অন্যরা যে সাফল্য অর্জন করেছে তার প্রতি আনন্দিত এবং প্রসন্ন হওয়ার বিপরীত। প্রায়শই ঈর্ষায় এমন একজন ব্যক্তির প্রতি শত্রুতার একটি উপাদান অন্তর্ভুক্ত হয় যে আমাদের বিচারে আমাদের চেয়ে অনেক বেশি সুবিধা ভোগ করে। অবশ্যই ঐ সুবিধাটি সত্যিও হতে পারে অথবা মিথ্যাও, তবে উভয় পরিস্থিতিতেই আমরা নিজেদের নিয়ে তন্ময়তা দেখাই যা প্রকৃতপক্ষে আমাদের মধ্যে নেই।

এছাড়াও বৌদ্ধধর্মে সংজ্ঞায়িত অর্থ অনুযায়ী “ঈর্ষা” শব্দে ইংরেজী শব্দের “এন্‌ভি”-তে আংশিক অর্থ সন্নিহিত আছে, পূর্ণ অর্থ নয়। ইংরেজী ধারণায় এই শব্দটির অর্থ একটু বেশি বিস্তৃতভাবে সন্নিহিত। এটা ঐ শব্দের অর্থকেও অন্তর্ভুক্ত করে যাকে বৌদ্ধধর্মে “লোভ” বলা হয়। লোভ শব্দের অর্থ হল “এমন কিছু প্রাপ্ত করার অযৌক্তিক ইচ্ছা যেটা অন্যের কাছে থাকে।” সুতরাং ইংরেজী ভাষায় “ঈর্ষা” শব্দের সংজ্ঞা হল অন্য কারও দ্বারা উপভুক্ত একটি সুবিধা সম্পর্কে বেদনাদায়ক বা বিরক্তিকর ভাবনার বোধ যেটা আমরা নিজেরা আসক্তি ভাবের সাথে উপভোগ করতে চাই।” অন্যকথায় কোন একটি ক্ষেত্রে অন্যের সাফল্যকে সহ্য করার অক্ষমতাকে ঈর্ষা বলা হয়। এছাড়াও বৌদ্ধধর্মে উল্লেখ করা হয়েছে যে আমরা ঐ বিষয়টিকে অতিরঞ্জিত করে তুলি এবং ঈর্ষাবশে আমরা নিজেই সেই সাফল্যকে অর্জন করতে চাই। হতে পারে আমরা এক্ষেত্রে দুর্বল বা অভাবগ্রস্ত অথবা এক্ষেত্রে আমাদের মধ্যে পর্যাপ্ত অথবা গড় পরিমাপের চেয়েও বেশি যোগ্যতা আছে। তাসত্ত্বেও আমরা অন্যের সাফল্যকে সহ্য করতে পারি না। আমরা যদি ঈর্ষান্বিত হই এবং সেটা আরও বেশি পরিমাণে পেতে চাই তাহলে ঐ ঈর্ষা লোভে পরিণত হয়ে যায়। প্রায়শই, যদিও এটা আবশ্যক নয়, ঈর্ষার কারণে এই ভাবনা জাগে অন্যরা যে সাফল্য অর্জন করেছে তারা যেন সেগুলি থেকে বঞ্চিত হয়ে যায়, যাতে আমরা সেটা অর্জন করতে পারি। এক্ষেত্রে ঈর্ষার এই ভাবনার সাথে বিদ্বেষের উপাদানও যুক্ত হয়ে যায়।

ঈর্ষা ভাব লোভের সংমিশ্রণে প্রতিস্পর্ধার রূপ ধারণ করে। এই কারণে ট্রুংপা রিনপোছে ঈর্ষাকে একটি অশান্তকারী আবেগরূপে বর্ণনা করেছেন যা আমাদের অত্যন্ত প্রতিস্পর্ধামূলক হতে এবং নিজেদের অথবা অন্যদের অতিক্রম করে ধর্মান্ধভাবে কাজ করতে পরিচালিত করে। এটি উগ্র কর্মের সাথে যুক্ত হয় অর্থাৎ তথাকথিত “কর্মপরিবার।” অন্যরা যে সাফল্য অর্জন করেছে তার প্রতি ঈর্ষান্বিত হওয়ার কারণে আমরা নিজেদেরকে অথবা অন্যদেরকে আমাদের অধীনে আরও বেশি কাজ করার জন্য চাপ দিই, যেমন- ব্যবসা-বানিজ্য অথবা খেলা-ধূলায় চরম প্রতিস্পর্ধা করা। এই কারণে বৌদ্ধধর্ম ঈর্ষাকে প্রতিনিধিত্ব করতে ঘোড়ার দৃষ্টান্ত ব্যবহার করে। এটি ঈর্ষার কারণে অন্যান্য ঘোড়ার সাথে দৌড় প্রতিযোগিতায় অংশ গ্রহণ করে। এটি সহ্য করতে পারে না যে অন্য ঘোড়াটি তার থেকে আরও দ্রুত দৌড়াক।

ঈর্ষা এবং প্রতিস্পর্ধামূলকতা

এটা সত্য যে বৌদ্ধধর্ম অনুযায়ী প্রতিস্পর্ধার সাথে হিংসা ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত। যদিও ঈর্ষা যে সবসময় প্রতিস্পর্ধার কারণ হয়ে দাঁড়াবে তার কোন মানে নেই। হতে পারে কেউ অন্যের প্রতি ঈর্ষান্বিত হয়। তবে আত্মসম্মানের কারণে প্রতিস্পর্ধামূলক হলেই যে সেখানে ঈর্ষা থাকতে হবে তার কোন মানে নেই। কিছু মানুষ মনোরঞ্জন করার জন্য এবং অন্যদের সাথে আনন্দ উপভোগ করার জন্য খেলা-ধূলায় প্রতিস্পর্ধা করে, সাফল্যকে সঞ্চয় করার জন্য নয়।

বৌদ্ধধর্ম ঈর্ষা এবং প্রতিস্পর্ধাকে আলাদাভাবে সংযুক্ত করে। উদাহরণ স্বরূপ, মহান ভারতীয় আচার্য শান্তিদেব বোধিচর্যাবতার নামক গ্রন্থে একটি বর্ণনায় বলেছেন যে, উচ্চপদে আসীন ব্যক্তিদের প্রতি ঈর্ষা, সমতুল্যদের সাথে প্রতিস্পর্ধা এবং যারা নিজের থেকে নিম্নস্তরে আসীন তাদের প্রতি দম্ভ দেখানো হয়। তার আলোচনাটি সমস্ত প্রাণীকে সমানভাবে দেখার পরিপ্রেক্ষিতে ব্যাখ্যা করা হয়েছে।

এখানে বৌদ্ধধর্ম যে সমস্যার সমাধান করছে সেটা হল এই অনুভূতি যে “আমি” হলাম বিশিষ্ট, এই ভাবনাটি তিনটি অশান্তকারী আবেগে অন্তর্নিহিত থাকে। আমরা যদি মনে করি এবং অনুভব করি “আমি” হলাম একমাত্র ব্যক্তি যিনি একটি নির্দিষ্ট কাজ করার যোগ্যতা রাখেন, যেমন- জীবনে এগিয়ে যাওয়া, আর এই পরিস্থিতিতে যদি অন্য কেউ এই কাজে সফল হয়ে যায় তাহলে আমি ঈর্ষান্বিত হই এবং তারসাথে প্রতিস্পর্ধা করতে শুরু করি। আমি যদি পরিমিত ভাবে এতে সফল হয়েও যাই তাসত্ত্বেও আমি তাকে ছাড়িয়ে যেতে চাই। এখানে ঈর্ষা হল “আমি”-এর একটি প্রবল অনুভূতি এবং কেবল নিজেকে অত্যধিক গুরুত্ব দেওয়ার পরিণাম। আমরা একইভাবে অন্যদের জন্য ততটা বিবেচনা করি না। আমরা শুধু নিজেদেরকে বিশেষ মনে করি।

এই ধরণের ঈর্ষা, প্রতিস্পর্ধাভাব এবং দম্ভতার সমস্যার কারণে সৃষ্ট সমস্যা এবং দুঃখের প্রতিকারের জন্য বৌদ্ধধর্ম এই পথ প্রদর্শন করে যে আমাদের “আমি” এবং “তুমি” সম্পর্কিত অন্তর্নিহিত বিভ্রান্তিকে দূর করতে হবে। আমাদের উপলব্ধি করতে হবে এবং দেখতে হবে যে সকলেই সমান। প্রত্যেকেরই মধ্যে একটি মৌলিক ক্ষমতা আছে অর্থাৎ ঐরূপ ক্ষমতা যে সকলের মধ্যে আছে বুদ্ধ-স্বভাব (তথাগতগর্ভ)। এর অর্থ হ’ল প্রত্যেকের মধ্যে ঐ ক্ষমতা আছে যা বোধিলাভ করার জন্য সহায়ক হয়। এছাড়াও সকলেরই মধ্যে সুখী হওয়ার এবং সাফল্য অর্জন করার ইচ্ছা থাকে, কেউ দুঃখী হওয়া বা ব্যর্থ হতে চায় না। আর প্রত্যেকেরই সুখী হওয়ার এবং সাফল্য অর্জন করার সমান অধিকার আছে এবং আছে অসুখী না হওয়া এবং ব্যর্থ না হওয়ার সমান অধিকার। সুতরাং এই বিষয়ে “আমি” বলতে বিশেষ কিছুই নেই। বৌদ্ধধর্ম মৈত্রী সম্পর্কে শিক্ষা প্রদান করে, যার অর্থ সকলে সমানভাবে সুখী হওয়ার কামনা।

আমরা যখন সবাইকে বুদ্ধ-স্বভাব (তথাগতগর্ভ) এবং মৈত্রীর পরিপ্রেক্ষিতে দেখতে শিখি তখন আমরা উন্মুক্ত হয়ে বুঝে যাই যে কীভাবে এমন ব্যক্তির সাথে সম্পর্ক স্থাপন করতে পারি, যে আমার চেয়ে বেশি সফল হয়েছে অথবা আমরা সফল হতে না পারলেও সে সফল হয়েছে। আমরা তার সাফল্যে আনন্দিত হই যেহেতু আমরা কামনা করি যে প্রত্যেকেই যেন সুখী হয়। যারা আমাদের সমতুল্য তাদের সাথে প্রতিস্পর্ধা করা এবং তাদের থেকে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করার পরিবর্তে আমরা তাদের সহযোগিতা করার চেষ্টা করি। যারা আমাদের চেয়ে কম সফল তাদের দেখে নিজের সাফল্যের উপর গর্বিত হওয়া এবং দম্ভতার সাথে নিজেকে তাদের চেয়ে ভালো বোধ করার পরিবর্তে তাদের সহযোগিতা করার চেষ্টা করি, যাতে তারাও ভালো প্রদর্শন করতে পারে।

ঈর্ষা এবং প্রতিস্পর্ধামূলক ভাবনার সাংস্কৃতিক শক্তি বৃদ্ধি

এই প্রস্তাবিত বৌদ্ধ পদ্ধতিগুলি অত্যন্ত উন্নত এবং এগুলিকে প্রয়োগ করা ঐ সময় বিশেষভাবে কঠিন হয়ে ওঠে যখন আমাদের মধ্যে স্বয়ংক্রিয়ভাবে উদ্ভূত ঈর্ষা এবং প্রতিস্পর্ধার ভাবনা কিছু পাশ্চাত্য সাংস্কৃতিক মূল্যের কারণে শক্তিশালী এবং প্রবল হয়। সর্বোপরি প্রায় সব শিশুরাই স্বয়ংক্রিয়ভাবে জয় লাভ করতে চায় এবং হেরে গেলে তারা কান্না শুরু করে। কিন্তু তার উপরে পাশ্চাত্য জগতের অনেক সংস্কৃতি স্বাভাবিক ভাবে পুঁজিবাদ গণতান্ত্রিক সমাজের সর্বশ্রেষ্ঠ ব্যবস্থাকে শেখায়। এর মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠভাবে জীবিত থাকার তত্ত্ব অন্তর্নিহিত যা মৈত্রী এবং স্নেহের পরিবর্তে প্রতিস্পর্ধাকে জীবনের মৌলক চালিকা শক্তি হিসাবে নির্ধারণ করে। এছাড়াও পাশ্চাত্য সংস্কৃতিগুলি প্রতিস্পর্ধামূলক খেলাধূলার প্রতি আবেগ, শ্রেষ্ঠ খেলোয়াড় এবং বিশ্বের সবচেয়ে ধনবান ব্যক্তিদের সাফল্য এবং জয়ের গুরুত্বকে বেশি শক্তিশালী করে তোলে।

তদতিরিক্ত, গণতন্ত্রের পুরো রাজনৈতিক ব্যবস্থা এবং ভোটের প্রক্রিয়ার ক্ষেত্রে প্রতিস্পর্ধা অপরিহার্য। এর কারণ হল এখানে নিজেকে নিজের প্রতিদ্বন্দ্বীর চেয়ে কতটা বেশি যোগ্য তার প্রচার করা হয়। পাশ্চাত্য দেশে এটাকে সাধারণভাবে প্রচার করা হয় যে ভোটের প্রচারের সময় প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের প্রত্যেকটি সম্ভাব্য দুর্বল দিক খুঁজে বের করার জন্য একটি তীব্র প্রচেষ্টা চালানো, এমনকি তাদের ব্যক্তিগত জীবনের পরিপ্রেক্ষিতেও সেটাকে আরও বড় ক’রে দেখিয়ে বদনাম করার জন্য ব্যাপক ভাবে প্রচার করা হয়। অনেকে ঈর্ষা এবং প্রতিস্পর্ধার উপর ভিত্তি ক’রে এই ধরণের আচরণকে প্রশংসনীয় এবং ন্যায়সঙ্গত ভাবে দেখে। এখানে “ঈর্ষা” নামক বৌদ্ধ শব্দাবলীটিকে হিংসা হিসাবে অনুবাদ করা বেশি উপযুক্ত মনে হয় যদিও উভয় পরিস্থিতির পিছনে একই রকম ভাবনা থাকে।

অন্যদিকে তিব্বতী সমাজে এমন শ্রেণীর মানুষদের পছন্দ করা হয় না যারা অন্যদের অবজ্ঞা করে এবং দাবী করে যে তারা তাদের চেয়ে ভালো। সেখানে এই ধরণের স্বভাব নেতিবাচক চরিত্রের বৈশিষ্ট্য হিসাবে বিবেচিত হয়। প্রকৃতপক্ষে, বোধিসত্ত্বের প্রথম মূল সম্বর (ব্রত) হল কখনো নিজের প্রশংসা না করা এবং যারা নিজের থেকে নিম্নপদে আসীন এই ধরণের মানুষকে ছোট না ভাবা। এখানে ভোটের সময় জনসাধারণের সামনে অন্যদের ছোট ভাবার শব্দগুলির বিজ্ঞাপন অন্তর্ভুক্ত হয়। এই ধরণের আচরণ উদ্দেশ্য প্রণোদিত ব্যক্তিদের কাছ থেকে লাভ, প্রশংসা, ভালবাসা, সম্মান ইত্যাদির কামনার সহকারে করা হয়। আর যে ব্যক্তিদের নিজের থেকে ছোট ভাবা হয় তাদের সাথে ঈর্ষা করা হয়। আমরা ঐ ব্যক্তির সম্পর্কে যা কিছুই বলি না কেন তাতে কিছু আসে যায় না। এর বিপরীতে আমরা যখন নিজেদের সম্পর্কে কথা বলি তখন আমরা অত্যন্ত বিনম্রতার সাথে বলি, “আমার মধ্যে কোন ভালো গুণ নেই; আমি কিছুই জানি না।” এই ধরণের কথাবার্তাকে প্রশংসনীয় বলে মনে করা হয়। সুতরাং গণতন্ত্র এবং ভোটের প্রচারের যদি পাশ্চাত্য প্রক্রিয়াকে অনুসরণ করা হয় তাহলে তিব্বতী সমাজে সেটা পুরোপুরিভাবে বেমানান হবে, কার্যকর হবে না।

এমনকি যদি কেউ বলে যে সে কোন পদ লাভ করার জন্য ভোটে প্রতিদ্বন্দ্বীতা করতে চায় তাহলে সেটাকেও সন্দেহজনক অহংকারী লক্ষণ এবং অপরোপকারী উদ্দেশ্য হিসাবে মানা হয়। একমাত্র প্রার্থীদের প্রতিনিধিদের জন্য সেই সম্ভাবনাটার সমঝোতা হতে পারে, মনোনিত প্রার্থীদের জন্য নয়। কেবলমাত্র ঐ প্রতিনিধিরাই তাদের প্রার্থীদের ভালো গুণাবলী এবং কৃতিত্ব সম্পর্কে অন্যদের বোঝাতে পারে, সেটাও ঐ প্রার্থীদের প্রতিদ্বন্দ্বীদের সাথে তুলনা না ক’রে অথবা তাদের সম্পর্কে খারাপ কিছু না বলে। তবে এটা খুবই কম করা হয়। সাধারণতঃ যে সমস্ত প্রার্থীরা বেশি পরিচিত, যেমন সম্ভ্রান্ত পরিবার অথবা অবতারী লামাদের প্রার্থীরূপে মনোনিত করা হয়, এমনকি তাদের মধ্যে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করার ইচ্ছা আছে কিনা সেটা জিজ্ঞাসা না করেও। যদি তারা বলে যে তারা নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে ইচ্ছুক নয় তাহলে সেটাকে বিনয়ের লক্ষণ হিসাবে বিবেচিত হয়। এর কারণ হল অবিলম্বে “হ্যাঁ” বলাকে অহংকার এবং ক্ষমতার লোভের লক্ষণ মনে করা হয়। মনোনিত করার পর কোন ব্যক্তির পক্ষে প্রত্যাখ্যান করা প্রায় অসম্ভব হয়ে ওঠে। এরপর কোন রকমের প্রচার ছাড়াই ভোট দেওয়া হয়। মানুষ সাধারণতঃ সেই প্রার্থীকে ভোট দেয় যিনি বেশি পরিচিত।

এইভাবে অন্যদের জয়লাভে আনন্দ করার বৌদ্ধ পদ্ধতি অর্থাৎ অন্যদের জয়লাভে আনন্দিত হওয়া আর নিজেদের পরাজয় স্বীকার করে নেওয়া, এই পদ্ধতিটি পাশ্চাত্য জগতের মানুষদের পক্ষে সবচেয়ে উপযুক্ত প্রতিকার নাও হতে পারে, কারণ তারা হল প্রবলভাবে পুঁজিবাদে বিশ্বাসী এবং পাশ্চাত্য নির্বাচন ব্যবস্থার প্রশংসক। পাশ্চাত্য নাগরিক হিসাবে আমাদের সবচেয়ে প্রথমে যেটা প্রয়োজন সেটা হল আমাদের সাংস্কৃতিক মূল্যবোধের পুনর্মূল্যায়ন করা এবং ঐ মূল্যগুলিকে মেনে নেওয়ার কারণে উত্থিত হিংসা, ঈর্ষা এবং প্রতিস্পর্ধার স্ফূর্তভাবে উদ্ভূত স্বরূপকে মোকাবিলা করার আগে ঐ মূল্যের উপর আধারিত স্বরূপ সম্পর্কে আলোচনা করা।

পাশ্চাত্য জগতে সংস্কৃতির উপর আধারিত হিংসা, ঈর্ষা এবং প্রতিস্পর্ধার আপেক্ষিকতার পরিস্থিতিকে আমরা ভারতীয় বাজারের উদাহরণের সাহায্যে জানতে পারি। ভারতে কাপড়ের বাজার, গহনার বাজার, শাক-সবজির বাজার ইত্যাদি রয়েছে। প্রত্যেকটি বাজারে সারি-সারি স্টল এবং দোকান আছে আর এগুলি রয়েছে একে-অপরের পাশে যেখানে সবাই প্রায় একই ধরণের জিনিস বিক্রয় করে। সেখানকার বেশির ভাগ দোকানদাররা একে-অপরের বন্ধু এবং প্রায়ই তারা তাদের দোকানের বাইরে একসাথে বসে চা-পান করে। তাদের মনোভাব হল যে তাদের দোকান ভালো চলুক বা না চলুক সেটা তাদের কর্মের উপর নির্ভর করে।

ঈর্ষায় অন্তর্নিহিত প্রতারণামূলক রূপ

যেমন আমরা দেখেছি, ঈর্ষা হল আমাদের অক্ষমতা, যা আমাদের ক্ষেত্রে অন্য কোন ব্যক্তির সাফল্যকে সহ্য করতে দেয় না, যার গুরুত্বকে আমরা অতিরঞ্জিত করি, যেমন- তার আর্থিক সাফল্য। ঈর্ষান্বিত হয়ে আমরা কামনা করি যে ঐ ব্যক্তির পরিবর্তে সাফল্যটি যেন আমি অর্জন করতে পারি। সে যখন অন্য কারও কাছ থেকে ভালোবাসা অথবা স্নেহ অর্জন করে তখন এর একটি রূপান্তর ঘটে। ঐ রকম পরিস্থিতিতে আমাদের মধ্যে ইচ্ছা জাগে যে ঐ ব্যক্তির পরিবর্তে ভালোবাসা অথবা স্নেহ যেন আমি পাই।

ঈর্ষার এই অশান্তকারী আবেগ দুটি প্রতারণামূলক আভাস বা রূপ থেকে উৎপন্ন হয়- বিভ্রান্তির কারণে এবং বস্তু কীভাবে অস্তিমান সেটা সঠিকভাবে না জানার কারণে আমাদের মনের কল্পনায় সেটা জাগে। এই দুটির মধ্যে প্রথমটি হল (১) দ্বৈত আভাস, যার অর্থ হল একটি আপাতদৃষ্টিতে “আমি” অস্তিমানের ভাবনা যার মধ্যে কিছু প্রাপ্ত করার যোগ্যতা থাকে কিন্তু প্রকৃতপক্ষে সেটা হয় না। দ্বিতীয়টি হল (২) আপাতদৃষ্টিতে একটি মূর্ত “তুমি” যে সহজাতভাবে সেটাকে প্রাপ্ত করার যোগ্য নয়।

অচেতন মনে আমরা ভাবি যে আমাদের প্রতি পৃথিবীর কিছু দায়িত্ব আছে এবং সেইজন্য ঐ বস্তুটি আমাদের না দিয়ে যদি অন্য কাউকে দিয়ে দেওয়া হয় তাহলে যেটা অন্যায় হয়ে যায়। আমরা এই পৃথিবীকে দুটি কঠিন শ্রেণীতে বিভাজন করিঃ “পরাজয়ী” এবং “জয়ী”, আর কল্পনা করি যে মানুষ সত্যতঃ অস্তিমান এবং আপাতদৃষ্টিতে এই মূর্ত শ্রেণীর মানুষ অস্তিমান এবং তাদের দুটি আলাদা-আলাদা বাক্সে খুঁজে পাওয়া যায়। এরপর আমরা নিজেদেরকে “পরাজয়ী” নামক মূর্ত এবং স্থায়ী শ্রেণীতে রাখি আর অন্য ব্যক্তিকে রাখি “জয়ী” নামক মূর্ত স্থায়ী শ্রেণীতে। এটাও হতে পারে যে আমরা নিজেদের ছাড়া অন্য সবাইকে “জয়ী” বাক্সে রাখি। এরকম করার পর আমরা শুধু আক্রোশ বোধ করি না বরং তার পাশাপাশি নিজেদের অভিশপ্ত মনে করতে লাগি। এর কারণে আমরা সবসময় একটি বেদনাদায়ক চিন্তায় গ্রাসিত হই অর্থাৎ আমরা নিজেদেরকে “বেচারা আমি” অনুভব করি।

আচরণ সম্পর্কিত কারণ এবং ফল সম্পর্কে নির্বোধতা সাধারণতঃ ঈর্ষার সাথে যুক্ত থাকে। উদাহরণ স্বরূপ, আমরা বুঝতে পারি না এমনকি বিষয়টাকে অস্বীকারও করি না, যে ব্যক্তি একটি পদোন্নতি বা স্নেহ লাভ করেছেন তিনি সেটা উপার্জন বা প্রাপ্ত করার যোগ্যতা লাভের জন্য পরিশ্রম করেছিলেন। তদুপরি, আমরা ভাবি যে, কিছু না করেই আমাদের সেটা পাওয়া উচিত। বিকল্পভাবে আমরা ভাবি যে আমরা অনেক কিছু করেছিলাম কিন্তু তা সত্ত্বেও আমরা কোন পুরস্কার প্রাপ্ত করতে পারিনি। এইভাবে আমাদের মন একটি দ্বিতীয় প্রতারণামূলক আভাস তৈরী করে এবং সেটাকে অভিক্ষেপ করে। ফলে আমাদের বিভ্রান্ত মন অকারণে বা কেবল একটি কারণের ভিত্তিতে কল্পনা করতে থাকে যে আমরা একাকী কী করেছি।

প্রতারণামূলক আভাসের বিনির্মাণ

আমাদের এই দুটি প্রতারণামূলক আভাসের বিনির্মাণ করতে হবে। আমাদের সংস্কৃতি হয়তো শিখিয়েছে যে জীবের জগতের অন্তর্নিহিত প্রেরক নীতি হল প্রতিস্পর্ধাঃ জয়ী হওয়ার প্রেরণা, যোগ্যতমদের জীবিত থাকা। কিন্তু সেই অনুমানটি সত্য নাও হতে পারে। তা সত্ত্বেও আমরা যদি সেটা মেনে নিই তাহলে আমরা বিশ্বাস করব যে জগতটা সহজাত ভাবে বিভাজিত হয়ে আছে, সম্পূর্ণভাবে জয়ী এবং পরাজয়ী নামক দুটি বিভাগে বিভক্ত। ফলস্বরূপ, আমরা জগতকে জয়ী ও পরাজয়ীদের নির্দিষ্ট ধারণাগত শ্রেণীতে উপলব্ধ করি এবং অবশ্যই নিজেদেরকেও একই ধারণাগত কাঠামোর সাথে দেখি।

যদিও জয়ী, পরাজয়ী এবং প্রতিস্পর্ধার এই ধারণাগুলি বিবর্তনকে বর্ণনা করার জন্য উপযোগী হতে পারে কিন্তু আমাদের বুঝতে হবে যে এগুলি হল কেবল নির্বিচারে মনগড়া রচনা। “জয়ী” এবং “পরাজয়ী” হল কেবল মানসিক প্রজ্ঞপ্তি। নির্দিষ্ট মানসিক ঘটনাকে বর্ণনা করার জন্য ব্যবহার করার ক্ষেত্রে এগুলি হল সুবিধাজনক মানসিক শ্রেণী। যেমন- দৌড় প্রতিযোগীতায় প্রথম হওয়া, কর্মক্ষেত্রে অন্য কেউ পদোন্নতি পাওয়ার আগে নিজের পদোন্নতি লাভ করা অথবা কোন গ্রাহক বা ছাত্রকে অন্য কারও হাতে হারিয়ে ফেলা ইত্যাদি এই ধরণের কিছু ঘটনা উল্লেখ করার জন্য শ্রেণী বিভাজন করা হয়। একইভাবে “ভালো” শব্দের সংজ্ঞার উপর ভিত্তি ক’রে আমরা “ভালো মানুষ” এবং “ভালো মানুষ নয়” এইভাবে শ্রেণী বিভাজন করতে পারি।

আমরা যখন বুঝতে পারি যে এই ধরণের সমস্ত দ্বৈতবাদী শ্রেণীগুলি হল মনের কল্পনামাত্র, তাহলে আমরা তখন বুঝতে শুরু করব যে “আমি” অথবা “তুমি”-তে সহজাত অস্তিত্ব কিছুই নেই যা আমাদের একটি মূর্ত শ্রেণীতে আবদ্ধ করে রাখে। এটা এমন নয় যে আমরা মূলতঃ পরাজয়ী আর নিজেকে সহজাত ভাবে পরাজয়ী ভেবে আমরা অবশেষে সত্যের আবিষ্কার ক’রে ফেলেছি অর্থাৎ সেই বাস্তবিক “আমি” হল একজন অসফল ব্যক্তি। পরিবর্তে, অন্য ব্যক্তির হাতে নিজেদের গ্রাহককে হারানো ছাড়াও আমাদের মধ্যে আরও অনেক গুণ আছে। যদি তাই হয় তাহলে আমরা কেন এমন ভাবে ভাবব যে সেটাই হল প্রকৃত “আমি”? এছাড়াও শুধুমাত্র আমাদের সীমিত মন এবং “বেচারা আমি” ও “তুমি অজাত”-এর সম্পর্কে চিন্তা-ভাবনা করার কারণে এরকম মনে হয় যে সফলতা এবং বিফলতা, লাভ এবং লোকসান, এই ধরণের ঘটনাগুলি অকারণে বা অপ্রাসঙ্গিক কারণে ঘটে। এরফলে আমরা মনে করি যে আমাদের সাথে যা ঘটেছে সেটা অন্যায়। জগতে যা কিছু ঘটে সেটা কারণ এবং ফলের বিশাল নেটওয়ার্কের কারণে ঘটে। সুতরাং আমাদের এবং অন্যের সাথে যা কিছু ঘটে সেটা অনেক কিছুকে প্রভাবিত করে। তাদের প্রত্যেকটি বিষয়কে এখানে অন্তর্ভুক্ত করা আমাদের কল্পনার বাইরে।

আমরা যখন এই দুটি প্রতারণামূলক আভাসকে (জয়ী এবং পরাজয়ী আর এই কারণে ঘটিত ঘটনা) বিনির্মান করি আর তাদের অভিক্ষেপ করা বন্ধ করে দিই তখন আমরা আমাদের অন্যায়ের অনুভূতিকে শিথিল করি। আমাদের ঈর্ষার পিছনে যে সাফল্য অর্জন হয়ে থাকে, যা কিছু ঘটে থাকে তার সম্পর্কে বোধমাত্রই হয়। আমরা কোন-কোন ব্যক্তির হাতে আমাদের গ্রাহককে হারিয়ে ফেলি যার কারণে ঐ গ্রাহক তার হয়ে যায়। এর কারণে আমাদের মনে একটি লক্ষ্য অর্জন সম্পর্কে চেতনা জাগ্রত হয়। আমরা যদি এটা অর্জন করা অথবা প্রাপ্ত করার জন্য পূর্বাগ্রহ না দেখাই তাহলে সম্ভবতঃ আমরা শিখতে পারব না যে ঐ ব্যক্তিটি কীভাবে সাফল্য অর্জন করেছেন। এটা আমাদের শিক্ষা দেয় যে আমরা নিজেরা কীভাবে ঐ সাফল্য অর্জন করতে পারি। আমাদের মধ্যে জাগ্রত ঈর্ষা অথবা সাফল্যকে অর্জন করতে পারি। আমাদের মধ্যে ঈর্ষা অথবা হিংসা তখনই জাগে যখন আমরা এই বোধগম্যতাকে দ্বৈতবাদী আভাস এবং মূর্ত পরিচয় দিয়ে ঢেকে দিই।

সারাংশ

 এইভাবে বৌদ্ধধর্ম ঈর্ষার অশান্তকারী আবেগকে মোকাবিলা করার জন্য নানারকম পদ্ধতি নির্ধারণ করেছে যেটাকে আমরা বৌদ্ধ দৃষ্টিকোণ অথবা পাশ্চাত্য দৃষ্টিকোণের ভিত্তিতে সংজ্ঞায়িত করতে পারি। আমরা যখন একটি অশান্তকারী আবেগ নিয়ে সমস্যায় পড়ি তখন আমাদের সামনে এই চ্যালেঞ্জটা থাকে যে আমরা যেন ঐ আবেগকে সংজ্ঞায়িত বৈশিষ্ট্য এবং আমাদের সাংস্কৃতিক পটভূমিকে উপলব্ধি করি। ধ্যান অনুশীলনের মাধ্যমে যখন আমরা নিজেদেরকে বিভিন্ন পদ্ধতির মাধ্যমে অভ্যস্থ করে ফেলি তখন আমরা আমাদের যেকোন মানসিক সমস্যার সমাধান করার জন্য সহায়তা করতে এদের মধ্যে যেকোন একটি উপযুক্ত পদ্ধতি বেছে নিতে পারি।

Top