ভয়ঃ বিরক্তিকর আবেগগুলির মোকাবিলা করা

জীবনে ইতিবাচক কিছু অর্জনের ক্ষেত্রে ভয় হল একটি অন্যতম শক্তিশালী বাধা। মনের একটি বিভ্রান্তিকর অবস্থা হিসাবে, বিশেষতঃ নিরাপদ কিছু অনুভব করার বিষয় সম্পর্কিত ক্ষেত্রে, এটা অসচেতনতার উপর আধারিত। তবে জরুরী এবং অস্থায়ী, উভয় পদ্ধতির বিস্তৃত শ্রেণিবিন্যাসের মাধ্যমে আমরা নিজেদেরকে ভয়ের পক্ষাঘাতগ্রস্ত গ্রাস থেকে রক্ষা করতে পারি।

ভয়কে মোকাবিলা করার জরুরি পদ্ধতি 

তিব্বতী বৌদ্ধধর্মে, স্ত্রী বৌদ্ধ-মূর্তি “তারা”, বুদ্ধের সেই দিকটি উপস্থাপন করেন, যা আমাদের ভয় থেকে রক্ষা করে। “তারা” আসলে দেহের বায়ুশক্তি এবং শ্বাসকে প্রতিনিধিত্ব উপস্থাপন করেন। আমরা যখন বিশুদ্ধ হয়ে যাই, তখন তিনি আমাদের কাজ করার দক্ষতা এবং লক্ষ্য অর্জন করার প্রতিনিধিত্ব করেন। এই প্রতীকটি শ্বাস-প্রশ্বাসের সাথে এবং ভয়কে নিয়ন্ত্রণ করার উদ্দেশ্যে সূক্ষ্ম শক্তির সাথে কাজ করার বেশ কয়েকটি জরুরী পদ্ধতি প্রস্তাব করে।

এই জরুরী পদ্ধতিগুলি প্রাথমিক অনুশীলন (আদ্য সাধনা) থেকে প্রাপ্ত হয় যা আমরা ধ্যান, অধ্যয়ন বা শিক্ষার শ্রবণের আগে করে থাকি। আমরা যখন প্রচন্ড ভয় পাই বা আতঙ্কিত হতে শুরু করি তখন এই অনুশীলনগুলি জরুরী পরিস্থিতিতে আমাদের শান্ত করতে সহায়তা করে। এমনকি এই পদ্ধতিগুলি গভীর কোন পদ্ধতিকে প্রয়োগ করার আগে প্রাথমিক পদক্ষেপ হিসাবেও কাজ করে। আমরা এদের মধ্যে কেবল একটা পদ্ধতি প্রয়োগ করতে পারি অথবা নীচের ক্রমানুযায়ী পাঁচটা পদ্ধতি অনুশীলন করতে পারিঃ

  1. চোখ বন্ধ করে শ্বাস-প্রশ্বাসের চক্র গণনা করুন,  শ্বাস-প্রশ্বাসের চক্রটি ভিতর এবং বাহির করুন আর শ্বাস-প্রশ্বাসের ভিতরে আসার অনুভূতি, শ্বাস নীচে যাওয়ার, তলপেটের বৃদ্ধি হওয়ার; তারপর কমে যাওয়ার এবং শ্বাস বেরিয়ে যাওয়ার চক্রের উপর মনোনিবেশ করুন।
  2.  অর্ধ-খোলা চোখের সাথে শ্বাস-প্রশ্বাসের চক্রগুলি গণনা করুন, আলগা মনোনিবেশের মাধ্যমে, মেঝের দিকে দৃষ্টি রেখে, শ্বাস-প্রশ্বাসের চক্রটি ত্যাগ করুন, বিরতি নিন, উপরোল্লিখিত মনোনিবেশের মাধ্যমে আবার শ্বাস গ্রহণ করুন এবং কিছুক্ষণ পর মেঝে বা চেয়ারে স্পর্শ করার দিকে সচেতন হন।
  3. (আরও শান্ত হয়ে) আমরা কী এবং কেন অর্জন করতে চাই তার প্রেরণা বা লক্ষ্য পুনরায় নিশ্চিত করুন।
  4. কল্পনা করুন যে, আমাদের মন এবং শক্তি ক্যামেরার লেন্সের মতো কেন্দ্রবিন্দুতে  আসছে।
  5. এবার শ্বাস-প্রশ্বাসকে গণনা না করে, শ্বাস গ্রহণের সময় তলপেটের উত্থিত হওয়া এবং নেমে যাওয়ার দিকে মনোনিবেশ করুন এবং অনুভব করুন যে শরীরের সমস্ত শক্তি সুরেলা ভাবে প্রবাহিত হচ্ছে। 

ভয় কী?

ভয় হল জানা বা অজানা কোন কিছু সম্পর্কে অনুভূত একটি শারিরীক বা মানসিক অস্থিরতা, যার সম্পর্কে আমরা মনে করি যে আমাদের সেটা নিয়ন্ত্রণ করার, পরিচালনা করার এবং আমাদের কাঙ্খিত ফলাফলে নিয়ে যাওয়ার ক্ষমতা নেই। আমরা যাকে ভয় করি সেটা থেকে মুক্ত হতে চাই এবং এইভাবে তার প্রতি একটা শক্তিশালী বিকর্ষণ ঘটে। এমনকি একটা নির্দিষ্ট কোন বস্তু যেটা আমরা ভয় করি সেটা ছাড়াই ভয় যদি একটা সাধারণ উদ্বেগও হয়, সেই অপরিচিত কিছু থেকে মুক্তি পাওয়ার আমাদের একটা প্রবল ইচ্ছা থাকে।

ভয় কেবল ক্রোধ নয়, তবুও এটা ক্রোধের মতোই। আমরা যে বস্তুটাকে ভয় করি তার নেতিবাচক গুণগুলির স্ফীতি বা বিস্তার এবং “আমি” ভাবনার স্ফীতির কারণে হয়। ভয় ক্রোধকে অন্তর্ভুক্ত করে, যেটা হল মানসিক অবস্থার একটা প্রভেদ, যে পরিস্থিতিকে আমরা নিয়ন্ত্রণ বা পরিচালনা করতে পারি না। এই ধরণের প্রভেদের ক্ষেত্রে আমরা তখন আমাদের ভয়ের দিকে এবং আমাদের নিজেদের দিকে মনোযোগ দিই। এইধরণের প্রভেদ এবং মনোযোগ হয়তো সঠিক বা ভুল হতে পারে।

ভয়ের সাথে অসচেতনতা যুক্ত 

ভয়ের সাথে সর্বদা বাস্তবের কিছু অসচেতন বিষয় (অবিদ্যা, বিভ্রান্তি) যুক্ত হয় সেটা না জেনে বা বাস্তব বিরোধী উপায়ে জেনে। আমরা এখানে নিম্নলিখিত ছয়টি সম্ভাব্য প্রকরণ বিবেচনা করবঃ

১) আমরা যখন ভয় পাই যে কোন্ পরিস্থিতি আমরা নিয়ন্ত্রণ করতে বা পরিচালনা করতে পারি না, তখন আমাদের ভয়ের সাথে কারণ এবং ফল আর বস্তুর অস্তিত্ব সম্পর্কে  অসচেতনতা যুক্ত হয়ে যায়।

  • একটা মূর্তভাবে অস্তিমান “আমি”- এমন একজন ব্যক্তি যে নিজের একার ক্ষমতা দ্বারা সমস্ত কিছু নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম হতে হয়, যেমন নিজের সন্তানদের আঘাত পেতে না দেওয়া।
  • একটা মূর্তভাবে অস্তিমান “বস্তু”- যেটা নিজে থেকেই অস্তিমান এবং অন্য কোন কারণে প্রভাবিত নয়, আমাদের যেটাকে নিজস্ব প্রচেষ্টায় নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম হওয়া উচিত, কিন্তু কোন অভাবের কারণে আমরা সেটা করতে বিফল হই।

এগুলো অস্তিমান হওয়ার অসম্ভব পদ্ধতি এবং এই পদ্ধতিতে কারণ ও ফল কাজ করে না।

২) আমরা যখন ভয় পাই যে, আমরা কোন পরিস্থিতি সামলাতে পারব না তখন সহগামী অসচেতনতা মনের স্বভাব এবং অনিত্যতার সাথে যুক্ত হয়ে যায়। আমরা ভয় পাই যে হয়তো আমরা আমাদের আবেগ বা প্রিয়জনকে হারানোর পরিস্থিতি সামলাতে পারব না। আমরা অসচেতন যে আমাদের দু:খ এবং পীড়া নিছকই সাময়িক ভাবে বাড়ছে এবং অনুভূত হচ্ছে। সেগুলো অস্থায়ী এবং অতিক্রম হয়ে যাবে, যেমন দাঁত ড্রিলিং করার পর ব্যথা দূর হয়ে যায়।

৩) পরিস্থিতি সামলাতে না পারার যে ভয় সেটা হয়তো নিজের দ্বারা সামলাতে না পারার একটা ভয়। এটা একা থাকা বা একাকিত্বের ভয়কেও অন্তর্ভুক্ত করা হতে পারে। আমরা মনে করি যে আমরা এমন কাউকে খুঁজে পাব যিনি এই পরিস্থিতিকে হালকা করতে পারেন। এখানে ধারণাগত বিষয়গুলি হলঃ

  • একটা মূর্তভাবে অস্তিমান “আমি”- এমন একজন ব্যক্তি যে অক্ষম, অযোগ্য, যথেষ্ট ভালো নয় এবং যে কখনোই শিখতে পারে না।
  • একটা মূর্তভাবে অস্তিমান “অন্য কেউ”- এমন একজন যে আমার থেকে ভালো এবং যে আমার রক্ষা করতে পারে।

এটা আমাদের এবং অন্যদের অস্তিত্ব সম্পর্কে অসচেতনতা আর কারণ ও ফল সম্পর্কে অসচেতনতার আর একটি রূপ। এটা সঠিক হতে পারে যে কোন পরিস্থিতি সামলানোর জন্য আমাদের যথেষ্ট জ্ঞান নেই, যেমন গাড়ী খারাপ হয়ে গেল এবং অন্য কোন্ ব্যক্তির মধ্যে সেই জ্ঞানটা আছে যে আমাদের সাহায্য করতে পারে। এর অর্থ এটা নয় যে আমরা সেই কাজের কারণ এবং ফল-এর মাধ্যমে আমরা সেটা শিখতে পারব না।

৪) আমরা যখন কাউকে ভয় পাই, উদাহরণ স্বরূপ, আমাদের নিয়োগকর্তাদের, আমরা তাদের গতানুগতিক স্বভাব সম্পর্কে অজ্ঞ থাকি। আমাদের নিয়োগকর্তারাও মানুষ, আমাদের মতো তাদেরও অনুভূতি আছে। তারা সুখী হতে চায়, অসুখী নয় এবং পছন্দসই হতে চায়, অপছন্দসই নয়। অফিসের বাইরেও তাদের জীবন আছে এবং এগুলি তাদের মেজাজকে প্রভাবিত করে। যদি আমরা আমাদের নিয়োগকর্তাদের সাথে মানবিক দৃষ্টিতে সম্পর্ক স্থাপন করতে পারি এবং আমাদের নিজ-নিজ অবস্থান সম্পর্কে সচেতন থাকি, তাহলে আমাদের ভয় কমে যাবে।

৫) একইভাবে, আমরা যখন সাপ বা পোকামাকড়কে ভয় পাই, তখনও আমরা অসচেতন হয়ে থাকি যে তারাও আমাদের মতোই সংবেদনশীল প্রাণী এবং তারাও সুখী হতে চায়, অসুখী হতে চায় না। বৌদ্ধ দৃষ্টিকোণ অনুযায়ী, বর্তমানে প্রত্যেকের মানসিক সন্ততির প্রকাশ হিসাবে এর একটা প্রজাতি বা অন্যকিছুর মতো সহজাত পরিচয় নেই। আমরা এবিষয়ে অজ্ঞ যে তারা হয়তো পূর্ব জন্মে আমাদের মা-ও ছিলেন।

 ৬) আমরা যখন ব্যর্থতা এবং অসুস্থতাকে ভয় পাই, তখন আমরা সংসারের সীমিত প্রাণী হিসাবে আমাদের প্রচলিত স্বভাব সম্পর্কিত বিষয়ে অজ্ঞ থাকি। আমরা নিখুঁত নই, অবশ্যই আমরা ভুল করব এবং কখনও কখনও ব্যর্থ হব আর অসুস্থও হয়ে পড়ব। “আপনি সংসার থেকে কী আশাই বা করতে পারেন?”

নিরাপদ বোধ 

বৌদ্ধ দৃষ্টিকোণ অনুযায়ী, নিরাপদ বোধ করার প্রয়োজন হয় নাঃ

  • আপনি সর্বশক্তিমান সত্ত্বের দিকে অভিমুখ করুন বা শরণে যান  যে আমাদের রক্ষা করবে, কারণ আপনার সর্বশক্তিমান হওয়া অসম্ভব।
  • এমনকি যদি কোনো শক্তিশালী সত্ত্ব আমাদের কোনভাবে সাহায্য করতে পারে, তবুও সেই সত্ত্বকে সন্তুষ্ট করতে বা সুরক্ষা অথবা সাহায্য পাওয়ার জন্য নৈবেদ্য বা বলি অর্পণ করতে হবে।
  • যে নিজেরা সর্বশক্তিমানে পরিণত হয়ে যাই।

নিরাপদ বোধ করার জন্য নিম্নলিখিত ক্রমগুলি প্রয়োজনঃ

  1. আমরা কী ভয় পাই সেটা জানতে হবে এবং এর অন্তর্নিহিত বিভ্রান্তিকর অবস্থা ও অজ্ঞতাকে সনাক্ত করতে হবে।
  2. আমরা যা বা যাকে ভয় পাই সেটাকে পরিচালনা করার অর্থ কী তার একটি বাস্তবসম্মত ধারণা থাকতে হবে, বিশেষতঃ অন্তর্নিহিত বিভ্রান্তি থেকে নিজে মুক্ত হওয়ার ক্ষেত্রে।
  3. নিজেদেরকে অবমূল্যায়ন বা অত্যধিক মূল্যায়ন না ক’রে, আমাদের উন্নয়নের বর্তমান পর্যায়কে গ্রহণ ক’রে এই মুহুর্তে এবং দীর্ঘমেয়াদে আমরা যাকে ভয় পাই সেটাকে সামলানোর জন্য আমাদের নিজস্ব ক্ষমতার মূল্যায়ন করতে হবে।
  4. এই মুহুর্তে  আমরা যা করতে পারি সেটাকে বাস্তবায়নের জন্য- যদি আমরা এখন এটা করছি তাহলে তাতে আনন্দিত হতে হবে; যদি সেটা না করি তাহলে আমাদের বর্তমান সামর্থ্যানুযায়ী এটা করার জন্য সংকল্প করতে হবে এবং তারপর সেটা করার চেষ্টা করতে হবে।
  5. আমরা যদি এখন এটা পুরোপুরি পরিচালনা করতে না পারি, তাহলে জানতে হবে যে, আমাদের কীভাবে এবং কোন স্তর পর্যন্ত নিজেকে বিকাশ করলে আমরা এটাকে সম্পূর্ণরূপে পরিচালনা করতে পারব।
  6. উন্নয়নের সেই পর্যায়ে পৌঁছানোর লক্ষ্যে কাজ করতে হবে।
  7. আমরা নিরাপদ পথে যাচ্ছি সেটা অনুভব করতে হবে।

উপরের সাতটি ধাপ ঐ পদ্ধতিকে বর্ণনা করে যাকে বৌদ্ধধর্ম অনুযায়ী “নিরাপদ দিকনির্দেশনা” বলা হয়। এটা কোন নিষ্ক্রিয় অবস্থা নয়, বরং আমাদের জীবনের একটা নিরাপদ দিকনির্দেশনার সক্রিয় দিক অর্থাৎ আমাদের নিজেদের ভয় থেকে মুক্ত হতে বাস্তবসম্মত উপায়ে কাজ করার একটা দিক। ফলস্বরূপ, আমরা নিরাপদ এবং সুরক্ষিত বোধ করি, কারণ আমরা বুঝতে পারি যে আমরা জীবনের ইতিবাচক এবং সঠিক দিকে অগ্রসর হচ্ছি যা শেষ পর্যন্ত আমাদের সমস্ত সমস্যা এবং অসুবিধা থেকে মুক্তি দিতে সক্ষম করে তুলবে।

কীভাবে ভয়াবহ পরিস্থিতি সামলাতে হয় তার একটা বাস্তবসম্মত দৃষ্টিকোণ

আমাদের মনে রাখতে হবেঃ

  • আমাদের প্রিয়জনদের প্রতি বা আমাদের নিজেদের প্রতি যা কিছু ঘটে সেটা হল প্রত্যেকের ব্যক্তিগত কর্মের বিশাল অন্তর্জালের সাথে-সাথে ঐতিহাসিক, সামাজিক এবং অর্থনৈতিক শক্তির ফল। আমরা যতই সতর্ক থাকি না কেন এবং তাদের সতর্ক থাকার পরামর্শ দিই না কেন, দুর্ঘটনা এবং অন্যান্য অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনাগুলি ঘটবেই, আমরা আমাদের প্রিয়জনদের সেগুলি থেকে রক্ষা করতে পারব না। তবে আমরা যেটা করতে পারি সেটা হল তাদের সঠিক পরামর্শ দেওয়ার চেষ্টা করা এবং তাদের জন্য মঙ্গল কামনা করা।
  • দুর্ঘটনা এবং ভয় কাটিয়ে ওঠার জন্য, আমাদের শূন্যতার নির্বিকল্পিত জ্ঞান অর্জন করতে হবে। শূন্যতায় সম্পূর্ণভাবে মগ্ন থাকার অর্থ মাটির গর্তে মাথা ঠেকিয়ে রাখার মতো নয়। এটার অর্থ ভয় থেকে দূরে পলায়ন করা নয়, বরং এটা অসচেতনতা এবং বিভ্রান্তি দূর করার একটা পদ্ধতি, যেটা আমাদের কর্মকে একটা অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনায় পরিণত করে এবং যারফলে আমাদের মধ্যে ভয় জাগে।
  • আমাদের কর্ম থেকে নিজেকে শুদ্ধ করার জন্য শূন্যতার নির্বিকল্পিত জ্ঞান নিয়ে কাজ করার সময়ও আমরা দুর্ঘটনার সম্মুখীন হব এবং সংসার থেকে মুক্তির অর্হত অবস্থা পর্যন্ত ভয় পাব। এর কারণ হল সংসারের যে স্বভাব তার উত্থান-পতন হতে থাকে। উন্নতি রৈখিক হয় না; কখনও কখনও পরিস্থিতি ভালো হয়, কখনও কখনও হয় না।
  • এমনকি আমরা যখন অর্হত্ হিসাবে মুক্তি লাভ করব, তখনও আমরা দুর্ঘটনার সম্মুখীন হব এবং এমন ঘটনা অনুভব করব যা আমরা চাই না যে ঘটুক। তবে আমরা কোন ব্যথা বা যন্ত্রণা ছাড়াই সেগুলো অনুভব করব, কারণ তখন আমরা কোনোরকম ভয় ছাড়া এই সমস্ত বিরক্তিকর আবেগ এবং মনোভাব থেকে মুক্ত হয়ে থাকব। আমরা শুধুমাত্র অর্হত্ অবস্থায় পৌঁছানোর পর সম্পূর্ণরূপে ও গভীরভাবে আমরা সব ভয় মোকাবিলা করতে সক্ষম হতে পারব।
  • আমরা যখন ঐ অনুভব লাভ করি, শুধুমাত্র তখনই আমরা আর দুর্ঘটনা বা অনাকাঙ্ক্ষিত কিছু অনুভব করি না। শুধুমাত্র একজন বুদ্ধই নির্ভীকভাবে নিম্নলিখিত ঘোষণা করতে সক্ষমঃ
    • তাঁর নিজস্ব উপলব্ধি; সব ভাল গুণ এবং দক্ষতা সম্পর্কে।
    • সৃষ্টিকারী সমস্ত  বাধা-বিঘ্নের যথার্থ নিরোধ মুক্তি লাভ এবং জ্ঞান লাভে বাধা  সম্পর্কে।
    • মুক্তি এবং জ্ঞান অর্জনের জন্য অন্যদের যে সব আবরণ থেকে মুক্তি পেতে হয় তাদের সম্পর্কে।
    • পরিত্রাণ পাওয়ার জন্য যে সব প্রতিপক্ষ শক্তির উপর অন্যদের নির্ভরশীল হতে হয় তাদের সম্পর্কে।

ভয়কে মোকাবিলা করার জন্য অস্থায়ী পদ্ধতি 

  1. উপরে বর্ণিত সাতটি ধাপের মাধ্যমে, জীবনে নিরাপদ দিকে যাওয়ার জন্য পুনর্নিশ্চিত হন।
  2. ক্যান্সারের পরীক্ষার মতো একটা ভীতিকর পরিস্থিতির সম্মুখীন হওয়ার সময়, সবচেয়ে খারাপ দৃশ্যটি কল্পনা করুন এবং কল্পনা করুন যে তখন কী হবে এবং আর আপনি কীভাবে এটা পরিচালনা করবেন। এটা অজানা ভয় দূর করতে সাহায্য করে।
  3. কিছু করার সময়, যেমন ঠিক সময়ে বিমান ধরার উদ্দেশ্যে বিমানবন্দরে পৌঁছনো, সেখানে অনেক রকমের সমাধানের সাথে তৈরী থাকেন, তবে যদি কোনটায় ব্যর্থ হয়েও যান তাহলে আপনার সামনে ভয় উৎপন্ন করার এমন কোন পরিস্থিতি যেন তৈরী না হয়ে যায় যে নিজের লক্ষ্য অর্জনের ক্ষেত্রে অন্য কোন বিকল্প না থাকে।
  4. যেমন শান্তিদেব শিখিয়েছিলেন, যদি আমাদের সামনে ভীতিকর পরিস্থিতি উৎপন্ন হয় এবং আমরা এটার জন্য কিছু করতে সক্ষম হতে পারি, তাহলে সেটা নিয়ে দুশ্চিন্তা ক’রে কী লাভ? ব্যস, সেটা করে ফেলুন। আর যদি সেখানে আমাদের কিছুই না করার থাকে, তাহলে তার জন্য চিন্তাই বা কেন করব? এতে কোন লাভ হয় না।
  5. যেহেতু আমাদের সমস্ত মুক্তির পথে ভয় ও অসুখীতা অনুভব করতে হবে, তাই আমাদের মনকে সমুদ্রের মতো গভীর এবং বিশাল হওয়ার উপর মনোযোগ কেন্দ্রীভূত করতে হবে এবং যখন ভয় বা অসুখীতা জাগবে, সেটাকে সাগরে উত্থিত স্ফীতির মতো অতিক্রমিত হতে দিতে হবে। সাগরে  উত্থিত স্ফীতি তার গভীরের শান্ত এবং স্থির ভাবকে নষ্ট করে না।
  6. আমরা যদি আমাদের গঠনমূলক কর্ম দ্বারা পর্যাপ্ত ইতিবাচক কর্ম শক্তি এবং পুণ্য অর্জন করে থাকি, তাহলে আমরা ভবিষ্যতের জীবনে একটা মূল্যবান মানব জন্ম লাভ করার প্রতি আত্মবিশ্বাসী হতে পারি। ভয় থেকে সর্বোত্তম সুরক্ষা হল আমাদের নিজস্ব ইতিবাচক কর্ম, তবুও আমাদের মনে রাখতে হবে যে সংসারের স্বভাব হল এর উত্থান এবং পতন হতে থাকে।
  7. কোন ভীতিকর পরিস্থিতির সম্মুখীন হলে আমরা কোন ধর্মরক্ষক বা কোন বুদ্ধমূর্তি, যেমন তারা অথবা ভৈষজ্যগুরুর সাহায্যের জন্য বিধি-অনুষ্ঠান করতে বা করাতে পারি। এই ধরণের মূর্তি কোন সর্বশক্তিমান সত্ত্ব নয় যারা আমাদের রক্ষা করতে পারে। আমরা আহ্বান করি এবং নিজেদেরকে তাদের আলোকিত প্রভাবের সামনে প্রস্তুত করি যাতে এটা আমাদের পূর্বে কৃত গঠনমূলক কর্ম থেকে কর্মক্ষম শক্তিতে পরিণত করতে সাহায্য করে, যা অন্যথায় নাও হতে পারে। এর একটা বোধক লাভ হল যে তার প্রভাবে আমাদের আগের ধ্বংসাত্মক কর্মের পরিণাম ছোট-ছোট অসুবিধারূপে ফলীভূত হয় যা আসলে গুরুতর বাধাবিঘ্নরূপে পরিণত হতে পারত এবং আমাদের সাফল্যকে অবরুদ্ধ করতে পারত। এইভাবে, অসুবিধাময় পরিস্থিতিতে ভয়ভীত হওয়ার পরিবর্তে, আমরা তাদের নেতিবাচক কর্মশক্তিকে “ভস্ম” করে দেয়, এই হিসাবে স্বাগত জানাই।
  8. নিজের বুদ্ধ-স্বভাবকে (তথাগতগর্ভ) পুনরায় নিশ্চিত করুন। কঠিন এবং ভয়াবহ পরিস্থিতিকে বোঝা (আয়নার মতো গভীর সচেতনতা), নিদর্শনগুলি চেনা (গভীর সচেতনতার সমতূল্য), পরিস্থিতির স্বতন্ত্রতার প্রশংসা করা (গভীর সচেতনতাকে পৃথকীকরণ করা) এবং কীভাবে কাজ করতে হয় সেটাকে জানার জন্য (যা উপলব্ধি করতে পারে যে আমরা কিছুই করতে পারি না) (গভীর সচেতনতা অর্জন) আমাদের মধ্যে গভীর সচেতনতার ভিত্তি স্তর আছে। আমাদের মধ্যে শক্তির আধারভূত স্তর আছে যা বাস্তবে কাজ করে।
  9. পুনরায় নিশ্চিত করুন যে বুদ্ধ-স্বভাব (তথাগতগর্ভ) থাকার অর্থ হল আমাদের মধ্যে সমস্ত ভাল গুণের স্তর বিদ্যমান আছে। পাশ্চাত্য মনোবৈজ্ঞানিক পরিপ্রেক্ষিতে, এই গুণগুলি সচেতন বা অচেতন হতে পারে (আমরা তাদের সম্পর্কে সচেতন হতে পারি বা নাও হতে পারি, সেগুলো বিভিন্ন মাত্রায় বিকশিত হতে পারে)। প্রায়শই আমরা অচেতন গুণগুলিকে “ছায়া” হিসাবে উপস্থাপন করি। যেহেতু অচেতনতা হল একটা অজ্ঞাত বিষয়, এটা সম্পর্কে অজ্ঞাত থাকার চিন্তা বিদ্যমান থাকার কারণে আমাদের মধ্যে একটা অজ্ঞাত ভয় এবং অচেতন গুণের একটা অজ্ঞাত ভয় জাগে। এইভাবে আমরা আমাদের সচেতন বুদ্ধিগত পক্ষকে চিহ্নিত করতে পারি এবং আমাদের যে অচেতন, অজানা, আবেগময় দিকটা আছে সেটা উপেক্ষা বা অস্বীকার করতে পারি। আমরা আবেগগত অনুভূতির দিকটাকে ছায়া হিসাবে কল্পনা করতে পারি এবং অন্যদের থেকে ভয়ভীত হতে পারি যারা অত্যন্ত আবেগপ্রবণ। আমরা আমাদের নিজের আবেগগত দিক থেকে ভয় পেতে পারি এবং আমাদের অনুভূতি থেকে বিয়োগ হওয়ার কারণে বাইরে উদ্বিগ্ন হতে পারি। আমরা যদি নিজেদেরকে আমাদের সচেতন মানসিক অনুভূতির দিক দিয়ে চিহ্নিত করি এবং আমাদের অসচেতন বুদ্ধিগত দিককে অস্বীকার করি, তাহলে আমরা বুদ্ধিগত দিকটিকে ছায়া হিসেবে কল্পনা করতে পারি। ফলে যারা বুদ্ধিজীবী তাদের কাছে ভয়ভীত হতে পারি। আমরা হয়তো কোন বিষয়কে বোঝার চেষ্টা করতে ভয় পাই এবং বুদ্ধিগতভাবে মন্দ হওয়ার কারণে উদ্বেগ অনুভব করি। এইভাবে, বুদ্ধ-স্বভাবের দিক হিসাবে আমাদের মধ্যে উভয় পক্ষকেই পুনরায় নিশ্চিত করতে হবে যে উভয় দিকই বুদ্ধ-স্বভাবের (তথাগতগর্ভ) দিক হিসাবে আমাদের মধ্যে অবস্থান করে। আমরা দুই পক্ষকে একটি দম্পতির আালিংগনবদ্ধ রূপে কল্পনা করতে পারি, যেমনকি তন্ত্র-সাধনায় কল্পনা করা হয় এবং আমরা অনুভব করতে পারি যে আমরা নিজেরাই সম্পূর্ণরূপে একটি যুগ্মরূপ, সেই যুগ্মরূপের কেবল একজন সদস্য নই।
  10. আমাদের বুদ্ধ-স্বভাবের আর একটি দিক পুনরায় নিশ্চিত করুন, যথা মনের স্বভাব হল স্বাভাবিকভাবেই সমস্ত ভয় থেকে মুক্ত এবং তাই ভয়ের সম্মুখীন হওয়াটা কেবল একটা ক্ষণস্থায়ী অতিমাত্রিক ঘটনা।
  11. বুদ্ধ-স্বভাবের আর একটি দিক পুনরায় নিশ্চিত করুন, যথা সাহসের সাথে ভয়াবহ পরিস্থিতির মুখোমুখি হওয়ার জন্য আমরা অন্যদের দ্বারা অনুপ্রাণিত হতে পারি।

সারাংশ

আমরা  যখন  ভয়ে আচ্ছন্ন হয়ে পড়ি, আমরা যদি  এটাকে  মোকাবিলা করার জন্য এই পদ্ধতিগুলি মনে রাখি, তাহলে কোনও পরিস্থিতি ভয়াবহ মনে হলে তখন আমরা নিজেকে শান্ত রাখতে এবং তার সাথে বাস্তবসম্মতভাবে মোকাবিলা করতে সক্ষম হব।

Top