একজন আধ্যাত্মিক গুরুর কাছে বৌদ্ধ শিক্ষা কীভাবে অধ্যয়ন করবেন

অন্যান্য ভাষা সমূহ

ভূমিকা

চোঙখাপা তাঁর ‘লাম-রিমের সংক্ষিপ্ত বিন্দু’-তে বলেছেন:

(৮) যদিও (অতীশের) সেই রীতি যা সমস্ত শাস্ত্রীয় ঘোষণার মূল বিষয়গুলিকে সম্পূর্ণরূপে ধারণ করে, তা একবার পাঠ বা শ্রবণ করার মাধ্যমেও (ইতিবাচক শক্তি সঞ্চিত হয়), তবুও, যেহেতু (এর মধ্যে থাকা) পবিত্র ধর্ম শিক্ষা দেওয়া বা অধ্যয়ন করার মাধ্যমে নিশ্চিতভাবে আরও বৃহত্তর এবং ব্যাপক উপকারের তরঙ্গ তৈরি হয়, তাই (এটি সঠিকভাবে করার জন্য) আমি বিন্দুগুলি বিবেচনা করছি।

ধর্ম অধ্যয়নের জন্য প্রথমে এটি সম্পর্কে শুনতে বা পড়তে হয়। এটি করার ইচ্ছা এবং আগ্রহ তৈরি করার জন্য, প্রাপ্তব্য সুবিধাগুলি জানা সহায়ক।  সাধারণত, কোনো কর্মপন্থার সুবিধা সম্পর্কে একবার আমরা নিশ্চিত হলে, আমরা সে সম্পর্কে আরও জানতে উৎসাহী ও আনন্দিত হব। বিশেষ করে, এই সুবিধার সর্বোচ্চ পরিমাণ লাভ করার জন্য আমরা তা সঠিকভাবে অনুসরণ করতে আগ্রহী হব।

ধর্ম শ্রবণের উপকারিতা বিবেচনা করে

বুদ্ধ ‘উদানবর্গের শ্লোক’ (Tib. ched du brjod pa’i tshoms, সংস্কৃত: উদানবর্গ, “তিব্বতি ধম্মপদ”) (২২.৬)-এ বলেছেন:

(ধর্ম শ্রবণ করে) তুমি জানতে পারবে (জীবনে) কী কী পদক্ষেপ নিতে হবে; শ্রবণ করে তুমি নেতিবাচক কর্ম থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে পারবে। শ্রবণ করে তুমি অর্থহীন বিষয় থেকে মুক্তি পাবে; শ্রবণ করে তুমি নির্বাণ লাভ করবে।

প্রথম উপকারিতাটি হলো, আমরা নিজেদের এবং অন্যদের সুখ সর্বাধিক করার জন্য কোন আচরণ ও চিন্তাভাবনা গ্রহণ বা বর্জন করতে হবে, সেই সমস্ত অপরিহার্য বিষয়গুলি শিখতে পারব। এই ধরনের বিচারবুদ্ধিসম্পন্ন সচেতনতা আমাদের জীবনে করণীয় পদক্ষেপগুলো জানতে সাহায্য করে।  ‘বিনয়পিটক’ (Tib. dul ba’i sde snod, সংস্কৃত: বিনয়পিটক) সম্পর্কে জ্ঞানার্জনের মাধ্যমে আমরা উচ্চতর নৈতিক আত্ম-শৃঙ্খলার প্রশিক্ষণের দ্বারা ধ্বংসাত্মক কর্ম থেকে বিমুখ হব। ‘সূত্রপিটক’ (Tib. mdo sde’i sde snod, সংস্কৃত: সূত্রপিটক) থেকে আমরা উচ্চতর সমাধির প্রশিক্ষণ লাভ করব, যার দ্বারা আমরা মানসিক বিচরণের মতো অর্থহীন কার্যকলাপ থেকে নিজেদের মুক্ত করব। অধিকন্তু, ‘অভিধর্মপিটক’ (Tib. mngon pa’i sde snod, সংস্কৃত: অভিধর্মপিটক) অধ্যয়নের মাধ্যমে আমরা উচ্চতর বিচারবুদ্ধির প্রশিক্ষণের দ্বারা আমাদের অশান্তকারী আবেগ, মনোভাব এবং ধ্বংসাত্মক আচরণ দূর করে সকল দুঃখ থেকে মুক্তি লাভ করব।

আর্যশুর (Tib. slob dpon dpa’ bo) (২য় শতাব্দী) তাঁর ‘জাতকমালা’ (Tib. skyes rabs ’phreng ba, সংস্কৃত: জাতকমালা) (XXX.৩২–৩৩) গ্রন্থে অতিরিক্ত কিছু উপকারিতার তালিকা দিয়েছেন:

(ধর্ম) শ্রবণ হলো সংকীর্ণমনের অন্ধকার দূর করার প্রদীপ। এটিই সর্বোত্তম সম্পদ, যা চোরেরা কেড়ে নিতে পারে না। এটিই সেই অস্ত্র যা দিয়ে শত্রুকে চরম হতবুদ্ধি করে পরাস্ত করা যায়। এটিই সর্বোত্তম বন্ধু, কারণ এটি আপনাকে পথনির্দেশক পদ্ধতি ও উপায় দেখায়। এটি এমন এক আত্মীয়, যে আপনি নিঃস্ব হয়ে গেলেও চঞ্চল হবে না। এটি রোগ ও যন্ত্রণার ঔষধ, কিন্তু এমন ঔষধ যা আপনার কোনো ক্ষতি করে না। এটিই মহাদোষের দলকে পরাজিত করার সর্বোত্তম আশ্রয়। এমনকি খ্যাতি, গৌরব ও সম্পদের জন্যও এটিই সর্বোত্তম। এটি আপনাকে মার্জিত ব্যক্তিদের সান্নিধ্যে শ্রেষ্ঠ ভদ্রলোক বা ভদ্রমহিলা করে তোলে এবং জ্ঞানী ব্যক্তিদের মাঝে থাকলে তাঁদের কাছে আপনাকে সম্মানিত করে।

সূর্য, টর্চ ইত্যাদি দিয়ে বাহ্যিক অন্ধকার দূর করা যায়, কিন্তু মুখে মোমবাতি জ্বালালেও ভেতরের অন্ধকারকে দূর করা যায় না। তবে, ধর্মোপদেশ শোনা ও অধ্যয়ন করা হলো অন্তরে এক উজ্জ্বল আলো লাভ করার মতো, যা সঠিক ও ভুলকে দেখতে সক্ষম করে।

দাগপো জাম্পেল ল্হুনড্রুব যেমনটি বলেছেন,

জীবন সম্পর্কিত কোনো বিষয়ের একটিমাত্র তথ্য বা ধারণা শেখার মাধ্যমে আপনি সেই বিষয়ে আপনার অজ্ঞতার অন্ধকার দূর করেন এবং একটি পরিস্থিতি কীভাবে সামলাতে হয়—সেই বিষয়ে সচেতনতার আলো লাভ করেন। আপনি যদি জীবন সম্পর্কে ত্রিশটি তথ্য বা বিষয় শেখেন, তবে ত্রিশটি ক্ষেত্রে আপনার অজ্ঞতা দূর হবে এবং ত্রিশটি পরিস্থিতি সামলানোর জ্ঞান বা আলো আপনি অর্জন করবেন।

তবে, আমরা যদি কখনোই ধর্ম শিক্ষা বা অধ্যয়ন না করি, তাহলে পাবোঙকা যেমনটি ব্যাখ্যা করেছেন—আমরা তখন এমন একজন চোখ-বাঁধা ব্যক্তির মতো হয়ে পড়ি যিনি এমন একটি ঘরে আছেন যেখানে প্রয়োজনীয় ও বিপজ্জনক—উভয় ধরনের বস্তুই রয়েছে; ফলে তিনি পার্থক্য করতে পারেন না এবং প্রয়োজনীয় বস্তুটি খুঁজেও পান না।

দস্যুরা আমাদের সঞ্চিত পার্থিব সম্পদ লুট করতে পারে, কিন্তু আমাদের অর্জিত শিক্ষা ও প্রজ্ঞা কেউ চুরি করতে পারে না। এটি বিশেষত তখনই সত্য হয় যখন আমরা কেবল শুষ্ক বুদ্ধিবৃত্তিক তথ্যের ভাণ্ডার জমা না করে, যা শুনেছি তা আত্মস্থ ও মনস্থ করেছি। আমরা এর অর্থ নিয়ে গভীর চিন্তাভাবনা করে এবং বিষয়টি বোঝার পর তার ওপর ধ্যান করে মনের অভ্যাসে পরিণত করার মাধ্যমে তা সম্পন্ন করি। এমনকি যদি মাঝরাতে আমাদের ঘর থেকে তুলে নিয়ে গিয়ে সারা জীবনের জন্য নির্জন কারাবাসে নিক্ষেপ করা হয়, তবুও আমাদের অর্জিত সমস্ত শিক্ষা আমাদের সাথেই থাকবে, যার ওপর ভিত্তি করে আমরা আরও গভীর অন্তর্দৃষ্টি লাভ করতে পারব। অন্যদিকে, কোনো বিষয়বস্তু বা কী করণীয়, সে সম্পর্কে পূর্ব-অধ্যয়ন ছাড়া কেবল ধ্যানের জন্য নির্জনে অবস্থান (রিট্রিট) করাটা অনেকটা খালি হাতে নিজেকে কারাগারে বন্দী করার মতো। আমরা শীঘ্রই চরম একঘেয়েমি ও হতাশায় নিমজ্জিত হব এবং সম্ভবত কিছুটা উন্মাদ হয়ে পড়ার ঝুঁকিও থাকবে।

তাই, সাংনিয়োন হেরুকা (Tib. gtsang smyon he-ru ka) (১৪৫২–১৫০৭) রচিত ‘জেচুন মিলারেপার জ্ঞানালোকিত জীবনী' (Tib. rnal ’byor gyi dbang phyug dam pa rje btsun mi la ras pa’i rnam thar thar pa dang thams cad mkhyen pa’i lam ston) গ্রন্থানুসারে, মিলারেপা সতর্ক করেছেন (১২৮. বি ৩):

যদি ধ্যানের জন্য আপনার কাছে কোনো গভীর নির্দেশিকা বা উপদেশ না থাকে, অথচ আপনি সমস্ত জাগতিক কার্যকলাপ ত্যাগ করেন (এবং পাহাড়ের চূড়ায় গিয়ে নির্জনে ধ্যানে বসেন), তবে তা কেবলই আত্ম-নির্যাতন।  

ক্যাবজে ঠিজাঙ রিনপোছেও একইভাবে বলেছেন:

যদি কোনো ক্লাসের সেরা ছাত্র এক বছরের জন্য নির্জন সাধনায় (রিট্রিট) চলে যায় এবং একজন সাধারণ মানের ছাত্র পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার জন্য থেকে যায়, তবে প্রথমজন ফিরে আসার পর তাদের অবস্থানের অদলবদল ঘটে যাবে।

তাই, আমাদের পড়াশোনার ধারাবাহিকতা বজায় রাখা জরুরি। নিবিড় সাধনা বা রিট্রিট তখনই অধিক ফলপ্রসূ হয় যখন আমরা আমাদের মূল প্রশিক্ষণ পর্বটি সম্পন্ন করি।

যেমনটি জা পেট্রুল বলেছেন:

তরুণ বয়সে সাধনা করা আর বৃদ্ধ বয়সে পড়াশোনা করাটা যেন এক কৌতুক!

এই ধরনের বোকামির ফলাফল ঠিক তেমনই, যেমনটি পাবোঙকা বর্ণনা করেছেন:

আমরা দীর্ঘ সময় ধরে সাধনা করি, কিন্তু আমাদের কোনো ক্ষতিকর আবেগ বা মোহকে কখনোই কমাতে পারি না। একমাত্র যে জিনিসগুলো আমরা ক্ষয়ে ফেলি বা কমিয়ে ফেলি, তা হলো আমাদের হাতের নখ আর জপমালার পুঁতি!

মাত্র দুই-তিন বছরের পড়াশোনা ও প্রশিক্ষণে আমাদের কখনোই সন্তুষ্ট হওয়া উচিত নয়। তিব্বতিদের মধ্যে, 'গেশে'-র মতো উচ্চতর মঠ-সংক্রান্ত উপাধিধারী পণ্ডিতরাও পঁচিশ বা ত্রিশ বছর ধরে পড়াশোনা করেন, তবুও তাঁরা মনে করেন না যে তাঁরা আসলে কিছু জানেন। লোঙছেন পা যেমন সতর্ক করেছেন:

যাদের জ্ঞান বা পড়াশোনা সামান্য, তারা পথভ্রষ্ট হয়ে পড়ে।

যেসব আর্য বোধিসত্ত্ব ‘ভূমি’ বা আধ্যাত্মিক উপলব্ধির তৃতীয় স্তরে পৌঁছেছেন, তাঁদেরও যদি ধর্মের বিষয়ে আরও শোনার বা শেখার প্রয়োজন হয়, তবে আমাদের মতো সাধারণ মানুষের কথা আর কী-ই বা বলা যায়?

অধিকাংশ মানুষ তাদের সংকীর্ণ মানসিকতা এবং চরম বিভ্রান্তির কারণে তাদের পূর্ণ সক্ষমতা কাজে লাগাতে পারে না। মানসিক জড়তার এই চোরাবালি কাটিয়ে উঠতে এবং মনকে উন্মুক্ত করতে পড়াশোনা ও জ্ঞানার্জনই হলো সর্বোত্তম হাতিয়ার। প্রয়োজনের মুহূর্তে এরাই আমাদের শ্রেষ্ঠ বন্ধু ও সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য আপনজন—যারা কখনোই আমাদের হতাশ করবে না বা পরিত্যাগ করবে না।

ইয়ে-শে গ্যালছেন (Tib. yongs ’dzin dka’ chen ye shes rgyal mtshan) (১৭১৩–১৭৯৩) যৌবনে অত্যন্ত দরিদ্র ছিলেন, কিন্তু ধর্ম শিক্ষার প্রতি তাঁর প্রবল আকাঙ্ক্ষা ছিল। যখন তিনি তাঁর আত্মীয়দের কাছে এই প্রচেষ্টায় সহায়তার অনুরোধ জানালেন, তখন তাঁরা তাঁকে ভর্ৎসনা করলেন এবং কিছুই দিলেন না। তিনি কখনোই নিরুৎসাহিত হননি; অবশেষে সম্পূর্ণ নিজের প্রচেষ্টায় তিনি অষ্টম দালাই লামার (rgyal dbang ’jam dpal rgya mtsho) (১৭৫৮–১৮০৪) শিক্ষক বা গুরু হয়ে ওঠেন। বিখ্যাত হওয়ার পর, বহু মানুষ তাঁর দরজায় এসে দাবি করতে লাগল যে তারা তাঁর দীর্ঘদিনের হারানো কোনো কাকা, মামা বা মামি। তিনি কাউকেই ফিরিয়ে দিতেন না; বরং সাদরে মেনে নিয়ে বলতেন, “হ্যাঁ, আপনারা আমারই আত্মীয়।” একদিন তিনি তাঁদের সবাইকে বাড়িতে ভোজের জন্য আমন্ত্রণ জানালেন। সবাই যখন সমবেত হলেন, তখন তিনি তাঁর পরিচারককে কাপড়-বাঁধা এক গাদা রুপা নিয়ে আসতে বললেন। টেবিলের ওপর সেগুলো রেখে তিনি তার সামনে সাষ্টাঙ্গে প্রণাম করলেন এবং বললেন, “আমি তোমাদের প্রণাম জানাই—তোমরাই আমাকে এত সব কাকা, মামা ও মামি উপহার দিয়েছ, যাদের কথা আগে আমার জানা ছিল না।”

ধর্ম-বিষয়ক শিক্ষা বা উপদেশ শ্রবণ করা হলো এক শক্তিশালী ওষুধের মতো, যা সব ধরনের বিষাক্ত মনোভাব ও সমস্যা প্রতিরোধ ও নিরাময় করে—এবং যার কোনো ক্ষতিকর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নেই। কুষ্ঠরোগ হলে আমরা যেমন মাত্র এক ডোজ ওষুধেই সেরে ওঠার আশা করি না, তেমনি কোনো বিষয় বা ধর্মগ্রন্থ কেবল একবার অধ্যয়ন করেই আমাদের সন্তুষ্ট হওয়া উচিত নয়।

চন্দ্রগোমিন (Tib. btsun pa zla ba) (সপ্তম শতাব্দী) তাঁর ‘দেশনাস্তব’-এ (Tib. bshags pa’i bstod pa, সংস্কৃত: দেশনাস্তব) বলেছেন:

আমাদের মন সর্বদা বিভ্রান্ত; আমরা দীর্ঘকাল ধরে অসুস্থতায় ভুগছি। হাত-পা হারানো কোনো কুষ্ঠরোগী যদি মাঝেমধ্যে ওষুধ সেবন করে, তবে তাতে কী লাভ হয়?

আসক্তি, বিদ্বেষ এবং সংকীর্ণ মানসিকতা আমাদের মনে এতটাই গভীরভাবে প্রোথিত যে, এগুলোর পুনরাবৃত্তি রোধের উপায় সম্পর্কে আরও জানার প্রতিটি সুযোগই আমাদের কাজে লাগানো উচিত। এমনকি আমরা যদি পথের ক্রমিক পর্যায়গুলো (লাম-রিম) বহুবার অধ্যয়ন করেও থাকি, তবুও নতুন কোনো ব্যাখ্যা শোনার মাধ্যমে আমরা সবসময়ই নতুন কিছু শিখতে পারি বা কোনো বিষয়কে আরও গভীরভাবে অনুধাবন করতে পারি। যেমনটি ক্যাবজে ঠিজাঙ রিনপোছে একবার বলেছিলেন:

আমি ‘লাম রিম ছেন মো’ গ্রন্থটি শতাধিকবার পড়েছি, এবং প্রতিবারই মনে হয়েছে যেন সম্পূর্ণ ভিন্ন কোনো গ্রন্থ পড়ছি।

একই বিষয় বা গ্রন্থের ওপর একাধিক আধ্যাত্মিক গুরুর ব্যাখ্যা শোনা বিশেষ উপকারী হতে পারে। তবে এক্ষেত্রে, কোনো স্কোরকার্ড রাখা বা ঘোড়া কেনার সময় যেমন যাচাই-বাছাই করা হয়, ঠিক সেভাবে শিক্ষকদের কথা বা অকথিত বিষয় নিয়ে তাঁদের পরীক্ষা করা বা মূল্যায়ন করা আমাদের উচিত নয়। বরং, কিছুটা ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাখ্যা শোনার ফলে আমাদের বোঝার পরিধি ও গভীরতা বৃদ্ধি পায়; কারণ তখন আমরা বুঝতে পারি যে, এই শিক্ষাগুলোতে বিভিন্ন স্তরের ব্যাখ্যা ও প্রয়োগের অবকাশ রয়েছে। সুতরাং, শোনা বা শেখাই হলো আমাদের দোষ-ত্রুটি কাটিয়ে ওঠার সর্বোত্তম উপায়।

আমরা যদি জ্ঞানী হই এবং ধর্ম সম্পর্কে প্রচুর জ্ঞান অর্জন করে থাকি, তবে তা আমাদের খ্যাতি ও সুনাম প্রতিষ্ঠার সর্বোত্তম ভিত্তি। তাছাড়া, আমাদের জ্ঞান ও অভিজ্ঞতাই হলো অন্যদের দেওয়ার মতো শ্রেষ্ঠ উপহার। এগুলো আমাদের একজন মার্জিত মানুষ হিসেবে গড়ে তোলে এবং জ্ঞানীদের সন্তুষ্ট করে। এর ফলে আমরা কোনো শিক্ষিত সমাবেশে নিজেকে হাস্যকর না করেই কথা বলতে পারি এবং তাদের করা যেকোনো প্রশ্নের বুদ্ধিদীপ্ত ও স্পষ্ট উত্তর দিতে সক্ষম হই। অন্যথায়, ধর্মরক্ষিত যেমনটি তাঁর ‘মনশুদ্ধকারী চক্র’ (Tib. blo sbyong mtshon cha’i ’khor lo) গ্রন্থে (৮৪ নং শ্লোকে) বর্ণনা করেছেন:

যেহেতু শিক্ষা শোনার বিষয়টি আমাদের ক্ষেত্রে নগণ্য, তাই সবকিছু নিয়েই আমাদের অন্ধকারে হাতড়াতে হয় এবং অনুমান-নির্ভর হতে হয়। ধর্মশাস্ত্র বিষয়ক আমাদের জ্ঞান অত্যন্ত সীমিত হওয়ায়, আমরা সবকিছু সম্পর্কেই বিকৃত ধারণা পোষণ করি।

শাক্য পণ্ডিত তাঁর ‘সুভাষিত-রত্ন-নিধি’ গ্রন্থে (৩.১১) এমন এক ব্যক্তির বর্ণনা দিয়েছেন:

এমন একজন ব্যক্তি যিনি মূর্খদের আসরে বেশ মিশুক ও সরব থাকেন, কিন্তু পণ্ডিতদের সান্নিধ্যে গেলেই বাক্যহীন হয়ে পড়েন এবং সংকোচে পেছনের সারিতে সরে যান—তাঁর পিঠে কুঁজ বা গলায় ঝুলে থাকা মাংসপিণ্ড না থাকলেও, তিনি আসলে ওপরের পাটির দাঁতওয়ালা এক ষাঁড় ছাড়া আর কিছুই নন।

তাই, ধর্ম শ্রবণের সুফলগুলোর কথা বিবেচনা করে আমাদের উচিত অত্যন্ত আগ্রহ ও উদ্দীপনার সাথে ধর্ম অধ্যয়নে ব্রতী হওয়া।

সংক্ষেপে বলতে গেলে, ক্যাবজে ঠিজাঙ রিনপোছে যেমনটি বলেছেন:

একজন আধ্যাত্মিক গুরুর সান্নিধ্যে অতিবাহিত অধ্যয়নের একটি দিন, মন্ত্র জপ বা সাধনায় কাটানো পুরো এক বছরের চেয়েও শতগুণ বেশি মূল্যবান। কারণ, সেই এক বছরে আপনি হয়তো অনেক নেতিবাচকতা দূর করেছেন এবং ইতিবাচক শক্তির ভাণ্ডার গড়ে তুলেছেন ঠিকই, কিন্তু নতুন কোনো জ্ঞান অর্জন করেননি। অথচ ধর্মের শিক্ষার একটি দিনের মাধ্যমে—এমনকি যদি সবকিছু নাও বোঝেন—তবুও যদি কেবল একটি নতুন সতর্কতামূলক উপায় বা প্রতিকারও শেখেন, তবে তা জীবনের নানা অস্বস্তিকর পরিস্থিতি মোকাবিলার ক্ষেত্রে আপনার অজ্ঞতার একটি অংশ দূর করে দেবে। এর তাৎক্ষণিক সুফল পাওয়া যাবে এবং এটি আপনাকে বুদ্ধত্ব লাভের পথে এক উল্লেখযোগ্য ধাপ এগিয়ে নিয়ে যাবে।

ধর্ম এবং যিনি আমাদের তা প্রদান করেন, তাঁর প্রতি প্রদর্শিত সৌজন্য বৃদ্ধি করা

সঠিকভাবে ধর্ম অধ্যয়ন করতে হলে, আমাদের কেবল উৎসাহী হলেই চলবে না, বরং বিষয়বস্তু এবং তার শিক্ষকের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে হবে এবং তাঁদের উভয়ের সাথেই যথাযথ সৌজন্য প্রদর্শন করতে হবে। অন্যথায়, আমরা তাঁদের মূল্য উপলব্ধি করতে পারব না। তাঁদের সাধারণ ভেবে আমরা তাঁদের গুরুত্বকে তুচ্ছ মনে করব।

ক্ষিতিগর্ভ সূত্রে (Tib. Sa’i snying po mdo, সংস্কৃত: ক্ষিতিগর্ভ সূত্র) বলা হয়েছে:

তোমার উচিত একনিষ্ঠ বিশ্বাস ও শ্রদ্ধার সাথে ধর্ম শ্রবণ করা, কখনও একে উপহাস বা বিদ্রূপ না করে। প্রকৃতপক্ষে, যিনি তোমাকে ধর্ম শিক্ষা দেন, তাঁর উদ্দেশ্যে তোমার নৈবেদ্য নিবেদন করা উচিত। এটি তোমার এই উপলব্ধি বৃদ্ধি করবে যে, তিনি ঠিক একজন নির্মল উন্নত বুদ্ধের মতোই।

এই কারণেই আমরা সর্বদা শিক্ষা গ্রহণের জন্য একটি উপযুক্ত ঘর পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন ও পরিপাটি করে রাখি এবং আমাদের আধ্যাত্মিক গুরুর জন্য সুন্দর ফুল ও একটি উঁচু, আরামদায়ক আসন দিয়ে তা সাজিয়ে রাখি।  আমরা এমনভাবে প্রস্তুতি নিই, যেন আমরা স্বয়ং বুদ্ধ শাক্যমুনিকে স্বাগত জানাচ্ছি। অধিকন্তু, আমাদের শিক্ষকের চেয়ে বেশি জাগতিক বা বৈজ্ঞানিক জ্ঞান আছে—এই ভেবে বৌদ্ধিক অহংকার নিয়ে ধর্মোপদেশ শোনা উচিত নয়। বরং, আমাদের সর্বদা বিনয়ী ও শ্রদ্ধাশীল থাকা উচিত।

এই প্রসঙ্গে, একজন আধ্যাত্মিক গুরুর কাছে অধ্যয়নের সময় অনুসরণ করার জন্য ছয়টি নির্দেশিকা রয়েছে:

  • আমাদের অবশ্যই সঠিক সময়ের প্রতি খেয়াল রাখতে হবে। যখন কোনো উচ্চ শিক্ষক অন্য কোনো কাজে ব্যস্ত বা মগ্ন থাকেন, তখন আমরা কখনোই অবিবেচকের মতো বাধা দেব না এবং ঔদ্ধত্যের সাথে শিক্ষা দাবি করব না। একবার গেশে পোতোয়া তাঁর কয়েকটি গ্রন্থের আলগা পাতাগুলো গোছাতে ব্যস্ত ছিলেন, যেগুলো বাতাসে উড়ে গিয়ে জট পাকিয়ে গিয়েছিল। একজন সম্ভাব্য শিষ্য সেই মুহূর্তে হুট করে ঢুকে পড়েন এবং সেখানেই শিক্ষা গ্রহণের জন্য জেদ ধরে বসেন। গুরু তাঁর আসন থেকে লাফিয়ে উঠে একটি লাঠি দিয়ে তাকে তাড়িয়ে দেন।
  • আমরা সম্মান প্রদর্শন করি, যেমন আমাদের আধ্যাত্মিক গুরু ঘরে প্রবেশ করলে উঠে দাঁড়াই এবং তিনি শিক্ষা দেওয়ার আগে তিনবার প্রণাম করি।  দীর্ঘ সময়ের জন্য বিদায় নেওয়ার আগে শেষ পাঠটি ছাড়া প্রতিটি পাঠের পর আমরা তিনবার প্রণাম করি। বিদায়ের আগে প্রণাম করাকে একটি অশুভ লক্ষণ বলে মনে করা হয়, যা বোঝায় যে আমাদের এবং আমাদের গুরুর আর কখনও দেখা হবে না। এটি বাদ দেওয়ার মাধ্যমে আমরা যত তাড়াতাড়ি সম্ভব তাঁর সাথে পুনরায় মিলিত হওয়ার জন্য আমাদের দৃঢ় ইচ্ছা ও প্রার্থনা প্রকাশ করি।
  • এছাড়াও, তিনি যখন শিক্ষা দেন তখন তাঁকে পানীয় জল বা চা, গরম থাকলে পাখা, ঠান্ডা থাকলে হিটার ইত্যাদি দিয়ে আমরা সর্বদা তাঁর সেবা করার চেষ্টা করি।
  • আমাদের শিক্ষক যখন আমাদের ভুল ধরিয়ে দেন বা সংশোধন করেন, তখন আমরা কখনও রাগ করি না বা আত্মরক্ষামূলক অবস্থান নিই না।
  • তিনি যেটা বলেন, সেটা আমরা সর্বদা মনেপ্রাণে গ্রহণ করি এবং অনুশীলন করি।
  • আমাদের আধ্যাত্মিক গুরু যদি আমাদের ব্যক্তিগত মতামতের থেকে ভিন্ন কিছু বলেন, তবে আমরা তাঁর সাথে কখনও আক্রমণাত্মকভাবে তর্ক করি না। তবুও, আমাদের সন্দেহ দূর করার জন্য আমরা তাঁর সাথে বিতর্ক করতে পারি।

 এছাড়াও, অসঙ্গ ‘বোধিসত্ত্বভূমি’ (Tib. byang chub sems dpa’i sa, সংস্কৃত: বোধিসত্ত্বভূমি) গ্রন্থে বলেছেন:

সম্পূর্ণ মোহগ্রস্ত না হয়ে এবং পাঁচটি অনুচিত বিবেচনা ছাড়া শ্রবণ করা উচিত।

যখন আমরা শিক্ষা গ্রহণ করি, তখন আমাদের এতটা মোহগ্রস্ত হওয়া উচিত নয় যে আমরা যা শুনছি বা যিনি বলছেন, তাঁকে ক্রমাগত ছোট করে দেখি এবং সমালোচনা করি। যদিও কোনো আধ্যাত্মিক গুরু এবং তাঁর শেখানো পদ্ধতিসমূহকে আন্তরিকভাবে গ্রহণ করার আগে তা যাচাই করার জন্য আমাদের অবশ্যই বিচারবুদ্ধি ব্যবহার করতে হবে, তবুও, একবার যখন আমরা কোনো নির্দেশনার পথ অনুসরণ করার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলি, তখন আর উদ্ধত বিচার করার সময় থাকে না। এগুলো আমাদের মনোযোগ সম্পূর্ণরূপে বিক্ষিপ্ত করবে এবং কোনো কিছু শিখতে বাধা দেবে।

অতএব, সর্বদা বিনয়ী ও ভদ্র থেকে, আমাদের পাঁচটি অনুচিত বিবেচনার (Tib. Gnas lngar yid la mi byed pa) নিরিখে দোষ ধরা উচিত নয়:

  • শিক্ষকের বাহ্যিক আচরণ সত্ত্বেও, তাঁর নৈতিক আত্মসংযমকে কখনও দুর্বল বলে বিচার করবেন না।
  • তার উৎস যাই হোক না কেন, তাকে নিম্ন সামাজিক শ্রেণীর বলে মনে করবেন না।
  • তার চেহারা যেমনই হোক না কেন, তাকে শারীরিক দিক থেকে কুৎসিত বা অদ্ভুত দেখতে বলে সমালোচনা করবেন না।
  • সে যদি অমার্জিত ভাষা ব্যবহার করে, তবে এই ভেবে বিরক্ত হবেন না যে তার আরও মার্জিত হওয়া উচিত ছিল।
  • সে যদি স্পষ্টভাষী ও সরাসরি কথা বলে, তবে এই ভেবে কখনো অপমানিত বোধ করবেন না যে, তার আরও নম্র হওয়া এবং কেবল ভালো কথাই বলা উচিত ছিল।

এইভাবে, খোলা মনে, মুখে সুখী ভাব নিয়ে – দাঁতের ডাক্তারের চেয়ারে বসা বিষণ্ণ চেহারার মতো নয় – নম্র ও শ্রদ্ধার সাথে বসে, আমাদের উচিত অমৃত পানের মতো সজাগতা ও আনন্দের সাথে ধর্মোপদেশ শ্রবণ করা।

অধ্যয়নের সঠিক পদ্ধতি

পড়াশোনায় সাফল্যের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সঠিক মানসিকতা নিয়ে অগ্রসর হওয়া। আগে যা আলোচনা করা হয়েছে তার পাশাপাশি, এমন কিছু নির্দিষ্ট ত্রুটি রয়েছে যা বর্জন করা প্রয়োজন এবং কিছু মনোভাব গড়ে তোলা জরুরি।

পাত্রের উদাহরণ ব্যবহার করে তিনটি ত্রুটি বর্জন করা—যেগুলো বাধার সৃষ্টি করে

‘পঁচিশ হাজার শ্লোকবিশিষ্ট প্রজ্ঞাপারমিতা সূত্র’-এ (Tib. shes rab kyi pha rol tu phyin pa stong phrag nyi shu lnga pa dumb u dang po, সংস্কৃত. পঞ্চবিংশতি-সহস্রিকা-প্রজ্ঞাপারমিতা সূত্র) তিনটি ত্রুটির কথা ব্যাখ্যা করা হয়েছে:

  • উপুড় করা পাত্রের মতো অবস্থা
  • নোংরা পাত্র
  • তলদেশে ছিদ্রযুক্ত পাত্র।

 যদি কোনো পাত্র উপুড় করা থাকে, তবে তার ওপর যতই বিশুদ্ধ অমৃত ঢালা হোক না কেন, কিছুই ভেতরে প্রবেশ করবে না। একইভাবে, শিক্ষকের সামনে শারিরীকভাবে উপস্থিত থাকলেও যদি আমাদের মন বাজারে ঘুরে বেড়ায়, তবে তিনি যা বলছেন তার কিছুই আমরা শুনতে পাব না। মনে হবে যেন আমরা সেখানে আদৌ উপস্থিতই নেই। তাই, কোনো পাঠ বা আলোচনার সময় আমাদের মনোযোগের সামান্য অংশও যেন বিচ্যুত না হয়, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। বরং, বাঁশির সুরে মুগ্ধ হরিণ যেমন চারপাশের বিপদ সম্পর্কে অসচেতন থাকে, ঠিক সেভাবেই আমাদের মনোযোগ দিয়ে শুনতে হবে।

পাত্রটি সঠিক অবস্থানে (সোজা করে) থাকলেও যদি তা নোংরা হয়, তবে তাতে যা-ই ঢালা হোক না কেন, তা দূষিত হয়ে যাবে। একইভাবে, আমরা মনোযোগ দিলেও আমাদের মন হয়তো পূর্বধারণা, কুসংস্কার বা ধর্ম অধ্যয়নের ক্ষেত্রে ভুল উদ্দেশ্য দ্বারা পূর্ণ থাকতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, আমরা কেবল বুদ্ধিবৃত্তিক কৌতূহলবশত অথবা ক্ষমতা, অর্থ বা খ্যাতি অর্জনের আকাঙ্ক্ষা কিংবা অন্য কোনো স্বার্থপর কারণে শুনতে পারি। সেক্ষেত্রে, আমাদের মনে কেবল বিকৃত ধারণার এক বিশৃঙ্খল ও দূষিত মিশ্রণই অবশিষ্ট থাকবে।

আমাদের মধ্যে যদি অনেক কুসংস্কার ও পূর্বধারণা থাকে, তবে সেগুলো আমাদের অনুশীলনের পথে বড় ধরনের বাধার সৃষ্টি করতে পারে।  একদিন মিলারেপা একটি গুহায় বসে ধ্যান করার চেষ্টা করছিলেন। তাঁর সামনের পাথরে একটি ফাটল ছিল এবং তিনি দুশ্চিন্তা করতে শুরু করলেন যে, হয়তো এর ভেতর থেকে কোনো ভয়ানক কিছু বেরিয়ে আসবে। হঠাৎ করেই হরিণের পিঠে চড়া এক নারী-প্রেতাত্মা সেখানে আবির্ভূত হলো। সে মিলারেপার পা আঁকড়ে ধরে বলল, “আপনার অদ্ভুত সব চিন্তাভাবনা দিয়ে কেন আমাকে ডেকেছেন? যদি আপনার মনে কোনো কুসংস্কার না থাকত, তবে আমাকে এখানে আসতে হতো না।” মিলারেপা বললেন, “কথাটা ঠিক, কিন্তু এখন আমাকে একা থাকতে দাও। অতীতের নেতিবাচক কর্মের কারণেই আপনি প্রেতাত্মা হিসেবে জন্মগ্রহণ করেছেন। কোনো নিষ্ঠাবান সাধকের ক্ষতি করলে আপনার পরবর্তী জন্ম আরও শোচনীয় হবে। আমাকে শান্তিতে থাকতে দিন, তাহলে আমি আপনাকে পরবর্তী জীবনে ভালো কোনো জন্ম লাভের উপায় বলে দেব।” এরপর তিনি তাকে কিছু প্রতিকারের কথা বললেন এবং সে চলে গেলেন।

সবশেষে ধরা যাক, পাত্রটি সোজা এবং পরিষ্কার। কিন্তু যদি এর তলদেশে কোনো ছিদ্র থাকে, তবে কোনো কিছুই তাতে জমা থাকবে না। একইভাবে, আমরা যখন ধর্মোপদেশ শুনি, এবং তারপর কক্ষ থেকে বেরিয়ে আসার সাথে সাথেই তা যেন আমাদের মন থেকে হারিয়ে না যায়। আমরা যা কিছু শুনেছি, সে সম্পর্কে আমাদের চিন্তা-ভাবনা করা উচিত এবং তা মনে রাখার চেষ্টা করা উচিত।

ক্যাবজে ঠিজাঙ রিনপোছে প্রায়ই তাঁর শিষ্যদের এই উপদেশ দিতেন:

ধর্মোপদেশকে এমন কোনো আচার-অনুষ্ঠানের সামগ্রী মনে করবেন না যা এই কক্ষের বাইরে নিয়ে যাওয়া যায় না। আমি যা বলছি তা যদি আপনারা মনোযোগ দিয়ে শোনেন এবং মনে রাখেন, তবে আপনারা যেখানেই থাকুন না কেন, সেগুলোর প্রয়োগ ঘটাতে পারবেন।

তাই পাবোঙকা সর্বদা পরামর্শ দিতেন যে, পাঠ গ্রহণের পর আমরা যেন বিষয়বস্তুগুলো পুনরায় পর্যালোচনা করি এবং সহপাঠীদের সাথে তা নিয়ে আলোচনা করি।

এ ছাড়াও, একজন আধ্যাত্মিক গুরুর কাছ থেকে ধর্মোপদেশ ধারণ করার মতো উপযুক্ত পাত্র হয়ে ওঠার জন্য শিষ্যের তিনটি গুণ থাকা আবশ্যক। আর্যদেব (Tib. ’phags pa lha) (তৃতীয় শতাব্দী) তাঁর ‘চতুঃশতক’-এ (Tib. bzhi brgya pa, সংস্কৃত: চতুঃশতক) (XII. 1) বলেছেন:

যে শ্রোতা (১) ঋজু ও নিরপেক্ষ, (২) কাণ্ডজ্ঞান বা বিচারবুদ্ধিসম্পন্ন এবং (৩) গভীর আগ্রহের অধিকারী—তাঁকেই উপযুক্ত পাত্র হিসেবে অভিহিত করা হয়।  

(১) একজন যোগ্য শিষ্য হয়ে ওঠার জন্য আমাদের সৎ হতে হবে এবং বন্ধু-শত্রু কিংবা পছন্দ-অপছন্দের ঊর্ধ্বে থেকে নিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করতে হবে। কোনো নির্দিষ্ট পক্ষের প্রতি পক্ষপাত বা প্রবল কোনো পূর্বসংস্কার রাখা আমাদের উচিত নয়; বরং আমরা যা অধ্যয়ন করছি, সে বিষয়ে আমাদের মুক্তমনা হতে হবে। পূর্বনির্ধারিত ধারণা বা বিচার-বিবেচনা কেবল আমাদের অগ্রগতির পথে বাধা হয়েই দাঁড়াবে।

তাছাড়া, অন্য কোনো চিন্তাধারা বা মতবাদের সাথে সর্বদা তুলনা করে বুদ্ধ-ধর্ম অধ্যয়ন করা উচিত নয়। এ ধরনের বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা মূলত এক ধরণের ভান বা লোকদেখানো বিষয়—বিশেষ করে যখন আমরা যে দুটি বিষয়ের তুলনা করছি, সেগুলোর কোনোটি সম্পর্কেই আমাদের পূর্ণাঙ্গ জ্ঞান থাকে না। এর পরিবর্তে, শিক্ষাগুলোকে তাদের নিজস্ব অভ্যন্তরীণ যুক্তি এবং নির্দেশিত ক্রমধারা অনুযায়ী বোঝার চেষ্টা করা উচিত।

পাশাপাশি, আমাদের আশেপাশের মানুষদের প্রতিও নিরপেক্ষ মনোভাব বজায় রাখা প্রয়োজন। অন্যদের দোষ-ত্রুটি আমাদের কাছে অত্যন্ত স্পষ্ট মনে হলেও, নিজের সীমাবদ্ধতাগুলোর বিষয়ে আমরা প্রায়শই অন্ধ থাকি। তাই অন্যদের সমালোচনা করার প্রবণতা কমিয়ে আমাদের উচিত নিজেদের সমস্ত দোষ সম্পর্কে সচেতন হওয়া এবং সেগুলো সংশোধনের দিকে মনোযোগ দেওয়া।

(২) দ্বিতীয়ত, সাধারণ বিচারবুদ্ধি বা কাণ্ডজ্ঞান থাকা জরুরি; তা না হলে আমাদের শেখানো বিষয়গুলোর মধ্যে আমরা সবসময়ই অসঙ্গতি দেখতে পাব। যেমন, কোনো পাঠে যদি বলা হয় গরম কাপড় পরতে এবং অন্যটিতে বলা হয় তা না পরতে, তবে সাধারণ বিচারবুদ্ধি খাটালেই আমরা বুঝতে পারব যে—ঠান্ডা আবহাওয়ায় গরম কাপড় পরা উচিত এবং গরমের সময় তা পরা উচিত নয়। একইভাবে, সাধারণ বিচারবুদ্ধি প্রয়োগ করলে আমরা বুঝতে পারব কীভাবে সমস্ত শিক্ষা একে অপরের সাথে মিলে একটি সুসংগত রূপ নেয়, যা আমাদের দৈনন্দিন জীবনে সমন্বিত অনুশীলনের জন্য উপযুক্ত।

অনেক সময় উচ্চস্তরের গুরুরা কোনো নির্দিষ্ট শিষ্যকে তাঁর প্রশিক্ষণের বিশেষ পর্যায়ে ব্যক্তিগতভাবে কিছু বিশেষ নির্দেশ বা পরামর্শ দিয়ে থাকেন। উদাহরণস্বরূপ, মিলারেপা এক পর্যায়ে রেছুঙপা-কে (Tib. ras chung pa rdo rje grags pa) (১০৮৩–১১৬১) বলেছিলেন যে, তাঁর আর কোনো তাত্ত্বিক বা বুদ্ধিবৃত্তিক পড়াশোনার প্রয়োজন নেই; বরং মনের মধ্যে উপকারী অভ্যাস গড়ে তোলার জন্য তাঁর কেবল ধ্যান করা উচিত। এখন, আমরা যদি এই নির্দেশটিকে সবার জন্য এবং সব পরিস্থিতির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য বলে ধরে নিই, তবে তা হবে একটি বড় ভুল।

(৩) পরিশেষে, আমরা যদি অধ্যবসায়ী না হই এবং যা শিখছি তার প্রতি আগ্রহ না দেখাই, তবে আমাদের শিক্ষা দেওয়াটা হবে কোনো মানুষের ছবির সামনে দাঁড়িয়ে বক্তৃতা দেওয়ার মতো। সেক্ষেত্রে ধর্ম-অধ্যয়ন থেকে আমাদের কোনো লাভ হওয়ার উপায় থাকবে না। 

অনুকূল পরিস্থিতি সৃষ্টিকারী ছয়টি উপলব্ধির ওপর নির্ভরতা

‘গণ্ডব্যূহ সূত্র’ (Tib. sdong po bskod pa’i mdo, সংস্কৃত: গণ্ডব্যূহ সূত্র) এবং 'সাগরমতি পরিপৃচ্ছ সূত্র' (Tib. blo gros rgya mtshos zhus pa’i mdo, সংস্কৃত: সাগরমতি পরিপৃচ্ছা সূত্র)-এ—যা শান্তিদেবের ‘শিক্ষাসমুচ্চয়’ এবং প্রজ্ঞাকরমতীর (Tib. shes rab ’byung gnas blo gros) (950-1030) ‘বোধিসত্ত্বচর্যাবতার-পঞ্জিকা’ (Tib. spyod ’jug dka’ ’grel)-য় উদ্ধৃত হয়েছে—ধর্ম শ্রবণের সময় আমাদের ছয়টি বিষয় উপলব্ধি করার কথা বলা হয়েছে:

  • নিজেকে একজন অসুস্থ ব্যক্তি হিসেবে বিবেচনা করা
  • যিনি ধর্ম শিক্ষা দিচ্ছেন তাঁকে একজন দক্ষ চিকিৎসক হিসেবে বিবেচনা করা
  • ধর্মকে ওষুধ হিসেবে বিবেচনা করা
  • ধর্মের নিষ্ঠাপূর্ণ অনুশীলনকে রোগমুক্তির উপায় হিসেবে বিবেচনা করা
  • বুদ্ধকে এমন এক পবিত্র সত্তা হিসেবে দেখা যাঁর ওষুধতুল্য শিক্ষাগুলো অমোঘ এবং যা পূর্ণ আস্থার সাথে অনুসরণ করা যায়
  • এই শিক্ষাগুলোর অন্তর্ভুক্ত পদ্ধতিগুলোকে এমন কিছু হিসেবে দেখা যা দীর্ঘকাল টিকে থাকুক—এমন প্রার্থনা করা উচিত।

আমাদের অধ্যয়ন ও অনুশীলনে সাফল্যের জন্য এই ধরনের মনোভাব পোষণ করা অত্যন্ত সহায়ক।

সর্বপ্রথম, এটা উপলব্ধি করা ও অনুভব করা গুরুত্বপূর্ণ যে আমরা একজন অসুস্থ ব্যক্তির মতো।  পাবোঙকা-এর ‘লিবারেশন ইন দ্য পাম অফ ইওর হ্যান্ড’ (৫৫. বি ৪) এবং চোঙখাপা-এর ‘গ্র্যান্ড প্রেজেন্টেশন’ (১৬. বি ৪)-এ উদ্ধৃত কামাওয়া-এর (Tib. zhang ka ma ba shes rab ’od) (১০৫৭–১১৩১) উক্তি অনুযায়ী, বিষয়টি যদি বাস্তবে সেরকম না-ই হতো, তবে এমন স্বীকৃতি বা উপলব্ধির কোনো অর্থ থাকত না। কিন্তু আমরা যদি সততার সাথে নিজেদের পর্যবেক্ষণ করি, তবে দেখব যে আমরা আসলে দিনরাত কামনা-বাসনা, ক্রোধ, অসন্তোষ ইত্যাদির মতো দীর্ঘস্থায়ী ব্যাধিতে ভুগছি।

এ ছাড়াও, শান্তিদেব ‘বোধিসত্ত্বচর্যাবতার’ (২. ৫৪)-এ বলেছেন:

সাধারণ কোনো রোগে ভীত হয়েও যদি আমাকে চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে চলতে হয়, তবে কামনা-বাসনার মতো যেসব রোগ শত শত ক্ষতির কারণ হয়ে প্রতিনিয়ত আমাদের পীড়িত করে, সেগুলোর ক্ষেত্রে পরামর্শ মানার প্রয়োজনীয়তা আছে, সে তো বলাই বাহুল্য।

তাছাড়া, আমরা কেবল স্বল্প সময়ের জন্য কোনো একটি রোগে ভুগছি না; বরং আমাদের মধ্যে রয়েছে সমস্ত অশান্তকারী আবেগের (ক্লেশ) অসংখ্য রোগ, যার প্রতিটিই অনাদিকাল থেকে বিদ্যমান।

আমাদের অনুভব করা উচিত যে আমাদের আধ্যাত্মিক গুরুই হলেন আমাদের চিকিৎসক— আর তিনি যেসব প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নির্দেশ করেন, সেগুলোই হলো ওষুধ। সেগুলোর অনুশীলনই হলো রোগমুক্তির উপায়। কোনো রোগী যদি তাকে নির্দেশিত ওষুধ কখনোই সেবন না করেন, তবে সর্বোত্তম চিকিৎসকদের দ্বারা পরিবেষ্টিত হয়ে ওষুধের বিছানায় শুয়ে থাকলেও তিনি আরোগ্য লাভ করবেন না। তিনি যদি এভাবেই মৃত্যুবরণ করেন, তবে তার দায়ভার কেবল তাঁর নিজেরই হবে—চিকিৎসক বা ওষুধের নয়।

‘সমাধিরাজ সূত্র’ (Tib. ting nge ’dzin rgyal po’i mdo, সংস্কৃত: সমাধিরাজ সূত্র)-এও (৪. ২৪, ৯. ৪৫) অনুরূপ ধারণা ব্যক্ত করা হয়েছে। এছাড়া শান্তিদেব ‘বোধিসত্ত্বচর্যাবতার সূত্রে’ (৪. ৪৮)-এ বলেছেন:

দৃঢ়ভাবে এমনটি বিবেচনা করে, আমি ঠিক যেভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে সেভাবেই সেই প্রশিক্ষণের অনুশীলন বাস্তবায়নের চেষ্টা করব। চিকিৎসকের নির্দেশ না শুনে, আরোগ্যপ্রার্থী কোনো রোগী কীভাবে তাঁর দেওয়া ওষুধের মাধ্যমে সুস্থ হতে পারেন?

তাছাড়া, একজন অসুস্থ ব্যক্তি যেমন তাঁর ওষুধের ব্যাপারে যত্নবান হন এবং সঠিক মাত্রায় ও সঠিক সময়ে তা সেবন করেন, ঠিক তেমনই আমাদেরও সাধনার বিষয়ে যত্নবান হতে হবে—কোনোভাবেই উদাসীন হওয়া চলবে না। ওষুধ হারিয়ে ফেললে আমরা যেমন অত্যন্ত বিচলিত হয়ে পড়ি, অথচ শিক্ষার কথা ভুলে গেলেও কিন্তু আমরা তেমন কোনো অনুশোচনা বোধ করি না।

ক্যাবজে ঠিজাঙ রিনপোছে যেমনটি তাঁর শিষ্যদের ভর্ৎসনা করে বলেছিলেন:

যদি আপনি এক চামচ দামি ও দুর্লভ ওষুধ মেঝেতে ফেলে দেন, তবে আপনার মনে হতে পারে যে আপনি হামাগুড়ি দিয়ে তা চেটে খেয়ে নেবেন। অথচ, কোনো ধর্মোপদেশ শোনার সুযোগ হাতছাড়া করলে—কিংবা সেখানে উপস্থিত থেকেও ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থাকার পরেও যদি তা মনোযোগ দিয়ে না শোনেন—তবে তার কোনো মূল্যই আপনার কাছে থাকে না।

তাছাড়া, আমাদের গুরুর নির্দেশিত ধর্ম-সংক্রান্ত উপদেশগুলো যে সম্পূর্ণ নির্ভরযোগ্য এবং নিশ্চিতভাবেই আমাদের কল্যাণ সাধন করবে—এই দৃঢ় বিশ্বাস নিয়ে আমাদের তা অনুশীলন করতে হবে। তাই, কেবল তথ্য সংগ্রহের মাধ্যমে অর্জিত বৌদ্ধিক স্তরেই আমাদের শিক্ষা সীমাবদ্ধ রাখা উচিত নয়; বরং সেই শিক্ষাকে আমাদের ব্যক্তিত্বের অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত করতে হবে। অন্যথায়, আমরা সেই অসুস্থ ব্যক্তির মতো হয়ে পড়ব, যে কেবল চিকিৎসার বইপত্র ও ওষুধের বোতলের গায়ে লেখা নির্দেশাবলি পড়ে, কিন্তু কখনোই কোনো ওষুধ সেবন করে না। ধর্মের বিষয়বস্তু নিয়ে আমাদের কেবল পাণ্ডিত্যপূর্ণ খেলা বা সামাজিক আড্ডার খোরাক হিসেবে ব্যবহার করাও উচিত নয়। এটি অনেকটা এমন এক গুরুতর অসুস্থ ব্যক্তির মতো, যে নিজের রোগের আধুনিক সব চিকিৎসার তালিকা শুনিয়ে অন্যদের চমকে দিতে চায়, অথচ নিজে কখনোই চিকিৎসকের শরণাপন্ন হয় না। কুষ্ঠরোগে আক্রান্ত কোনো নারীর নাক যদি খসে পড়ে গিয়ে থাকে, তবে তিনি যতই প্রসাধন ব্যবহার করুন বা সুন্দর নতুন পোশাক পরুন না কেন, কেউ তাঁকে সুন্দরী বলে মনে করবে না। একইভাবে, আমাদের মন যদি বশবর্তী বা সংযত না থাকে, তবে ধর্ম সম্পর্কে আমাদের অগভীর জ্ঞান দেখে কেউ মোটেও প্রভাবিত হবে না।

আমরা যত বেশি জ্ঞান অর্জন করব, ততই আমাদের অহেতুক বা অলস কথাবার্তা কমিয়ে আনা উচিত। আমরা যদি আখের স্বাদ কেমন তা জানতে চাই, তবে কেবল তার শক্ত খোসা বা ছাল ছাড়িয়ে তা চিবিয়ে দেখি না; বরং আমরা আখের ভেতরের মূল অংশ বা মজ্জার স্বাদ গ্রহণ করি।

‘অধ্যাশয়-সংচোদন সূত্র’-এ (Tib. lhag pa’i bsam pa bskul ba’i mdo, সংস্কৃত: অধ্যাশয়-সংচোদন সূত্র) বলা হয়েছে:

আখের ডাঁটার বাইরের খোসায় কোনো সারবস্তু বা আসল স্বাদ থাকে না; আনন্দদায়ক সেই স্বাদ থাকে তার ভেতরেই। কেবল খোসা চিবিয়ে খেলে গুড়ের মতো সুস্বাদু স্বাদ পাওয়া সম্ভব নয়।
আখের খোসার মতোই হল ধর্মের বাহ্যিক শব্দ বা বচনের অবস্থা; ধর্মের প্রকৃত ‘স্বাদ’ বা নির্যাস নিহিত থাকে তার অর্থের গভীর অনুধাবনের মধ্যে। তাই, কেবল শব্দের মোহে বা বাহ্যিক বচনে আনন্দ পাওয়া ত্যাগ করুন; সর্বদা সচেতন থাকুন এবং ধর্মের অর্থের গভীরতা নিয়ে অনুধাবন করুন।  

একইভাবে, আধ্যাত্মিক পথের ক্রমিক ধাপগুলো গড়ে তোলার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপগুলো নিয়ে অধ্যয়ন করার সময়, আমাদের অবশ্যই সেগুলোকে নিজেদের ব্যক্তিগত সমস্যা ও বিভ্রান্তিগুলোর সাথে সম্পর্কিত করতে হবে এবং নিজেদের দৃষ্টিভঙ্গি ও অভিজ্ঞতার সাথে তুলনা করে দেখতে হবে। ‘মানসিকতা প্রশিক্ষণের আটটি শ্লোক’ (Eight Verse Attitude-Training)-এর রচয়িতা গেশে লাংরি তাংপা (Tib. dge bshes glang ri thang pa rdo rje seng ge) (১০৫৪–১১২৩) যেমনটি বলেছিলেন:

যখনই আমি কোনো মহাযান ধর্মগ্রন্থ পাঠ করি, তখন আমার দৃঢ় উপলব্ধি হয় যে, সেখানে বর্ণিত সমস্ত ভুলত্রুটি আসলে আমারই, আর সমস্ত গুণাবলী হলো অন্যদের।

তাই, ক্যাবজে ঠিজাঙ রিনপোছের সতর্কবাণী আমাদের মনে রাখা উচিত:

কৃপণতা দূর করার উপায়গুলো শোনার সময়, এমনকি আপনি নিজেও যদি চরমভাবে সম্পদ কুক্ষিগতকারী বা কৃপণ হন, তবুও আপনি এমন ভান করেন যেন বিষয়গুলো আপনার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয় এবং দোষী দৃষ্টিতে আপনার প্রতিবেশীর দিকে তাকান। ধর্মোপদেশ শোনার এটি কোনো সঠিক পদ্ধতিই নয়।

একজন আন্তরিক সাধকের কাজ হলো নিজেকে যাচাই করা, অন্যকে নয়। অথচ আমরা যেন পেশাদার গোয়েন্দা—সবসময় অন্যের দোষ খুঁজে বেড়াই। চারপাশের মানুষের দিকে সমালোচনার আলো ফেলার পরিবর্তে, আমাদের উচিত সেই আলো নিজেদের দিকে ফেলা এবং নিজেদের দোষগুলো দেখতে শুরু করা। আয়নায় যদি দেখি আমাদের মুখে বা গালে কোনো কালো দাগ লেগে আছে, তবে আমরা তা ধুয়ে ফেলি। একইভাবে, শিক্ষারূপ আয়নায় যদি আমরা নিজেদের দোষগুলো দেখতে পাই, তবে তা দূর করার জন্য আমাদের সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালানো উচিত।

ডোমতোনপা বলেছেন:

যদি আপনি নিজের ত্রুটিগুলো দেখতে পান এবং অন্যের দোষ না খোঁজেন, তবে অন্য কোনো গুণ না থাকলেও বুঝতে হবে যে আপনার মধ্যে কিছুটা প্রজ্ঞা রয়েছে।

তাই, আমরা যে শিক্ষাই শুনি না কেন, নিজেদের প্রেক্ষাপটে তার অর্থ নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করা উচিত। এমন ব্যক্তির মতো হবেন না যার নাক বাঁকা ও কান বড়—যে আয়নায় নিজের দিকে তাকাতে পারে না এবং ছবি তোলাতেও রাজি হয় না। কোনো গুরুর কথা শোনার সময় যদি আমরা ভাবি, “তিনি তো আগেও ঠিক এভাবেই ব্যাখ্যা করেছিলেন, এসব কথা তো আমি বহুবার শুনেছি,” তবে নিশ্চিতভাবেই আমরা কোনো লাভবান হব না। নির্দেশিকা বা উদাহরণগুলোকে যদি কেবল সুন্দর গল্প বা রূপকথা বলে মনে করি, তবে একই কথা প্রযোজ্য হবে। বক্তা বা গুরু যে মূল বিষয়টি বোঝাতে চাইছেন তা অনুধাবন করার চেষ্টা করতে হবে এবং তা আমাদের নিজেদের মনে প্রয়োগ করতে হবে।  তাছাড়া, শিক্ষক উদ্ধৃতি বা গল্পগুলো হুবহু শব্দে শব্দে সঠিকভাবে বলছেন কি না—তা নিয়ে যদি আমরা সবসময় খুঁতখুঁতে মনোভাব পোষণ করি, তবে আমরা কখনোই কোনো অগ্রগতি লাভ করতে পারব না। বিভিন্ন বিষয় বা দিক ব্যাখ্যা করার প্রয়োজনে প্রায়শই একই ঘটনা বা উপাখ্যান সামান্য ভিন্নভাবে বলা হয়ে থাকে।

এ ছাড়াও, কোনো পাঠ্য বা আলোচনায় যখন কোনো আপত্তি বা যুক্তি উত্থাপন করা হয়—যেমন “কেউ কেউ মনে করেন...” —তখন আমাদের প্রতিক্রিয়া যদি এমন হয় যে, “আমি তো ওভাবে ভাবি না; এটা একটা হাস্যকর প্রশ্ন,” তবে তা আমাদের চরম আত্মকেন্দ্রিকতারই পরিচয় দেয়। ধর্মের শিক্ষা বা উপদেশ কেবল আমাদের নিজেদের প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার জন্য নয়, বরং সবার প্রশ্নের সমাধানের জন্যই প্রদান করা হয়। তাই, উত্থাপিত কোনো আপত্তিকে কেবল উড়িয়ে না দিয়ে বরং আত্মরক্ষামূলক মনোভাব ত্যাগ করে আমাদের নিজেদেরই গভীরভাবে পর্যালোচনা করে দেখা উচিত—যে ভুল ধারণাটি সেখানে স্পষ্ট করা হচ্ছে, আমরা নিজেরাও কি কোনোভাবে সূক্ষ্মভাবে সেই ধারণার বশবর্তী হয়ে আছি কি না।

উপরে উল্লিখিত ক্ষতিকর মনোভাবগুলোর কোনোটি যদি আমাদের মধ্যে থাকে, তবে প্রায়শই সমস্যাটি হলো—শিক্ষার প্রতি আমরা এক ধরণের অনাগ্রহ বা একঘেয়েমি অনুভব করতে শুরু করি। এর কারণ হলো— ধর্ম বিষয়ক প্রচুর আলোচনা শোনা বা গ্রন্থ পাঠ করা সত্ত্বেও, সেগুলোতে আলোচিত মনের উপকারী অভ্যাসগুলো গড়ে তোলার জন্য আমরা কখনোই ধ্যান বা অনুশীলন করিনি। এমন পরিস্থিতিতে, আমরা যা-ই শুনি না কেন, তা আমাদের মনে কোনো প্রভাব ফেলে না। জলের মধ্যে পড়ে থাকা পাথরের মতো, আমাদের মন কখনোই কোমল হয় না। কদম্পা পরম্পরার ‘গেশে’ বা পণ্ডিতদের একটি প্রবাদ আছে:

“ধর্ম একজন ঘোর দুরাচারী ব্যক্তির মনকেও কোমল করতে পারে, কিন্তু শিক্ষার প্রতি অনাগ্রহী বা ক্লান্ত হয়ে পড়া ব্যক্তির মনকে তা কখনোই কোমল করতে পারে না। যেমন, তৈলাক্ত মাখন শক্ত চামড়ার টুকরোকে নরম করতে পারলেও, যে থলিতে সেই মাখন রাখা থাকে—সেই চামড়ার থলিটিকে কখনোই নরম করতে পারে না।”

অধ্যয়নরত বিষয়বস্তু যখন আমাদের কাছে অত্যধিক বা দুর্বোধ্য মনে হয়, তখন বুঝতে হবে যে আমরা যথেষ্ট ধ্যান বা অনুশীলন করিনি। শিক্ষার অধ্যয়নের পাশাপাশি যদি আমরা সেগুলোর ওপর ধ্যান করারও চেষ্টা করতাম, তবে আমরা বিষয়গুলো আত্মস্থ করতে পারতাম এবং আরও শেখার জন্য আগ্রহী হয়ে উঠতাম। আমাদের মধ্যে শিক্ষার যথাযথ আত্মীকরণের অভাবের আরেকটি লক্ষণ হলো—কোনো ক্লাসে অংশ নেওয়ার সময় বা বই পড়ার সময় আমরা মনে করি যে, এরপর কী বলা হবে তা আমরা আগেই জানি। আমরা এতটাই একঘেয়েমি অনুভব করি যে, মনে হয় আমরা নিজেরাই তা আবৃত্তি করতে পারব। অথচ, শোনা বিষয়গুলো থেকে যদি আমরা ভালো অভ্যাস গড়ে তুলতাম, তবে প্রতিটি নতুন আলোচনার শুরুতে আমরা উচ্ছ্বসিত হতাম এবং সামান্য ভিন্নভাবে উপস্থাপিত বিষয়গুলো থেকে আরও গভীর অন্তর্দৃষ্টি লাভের চেষ্টা করতাম। পরম পূজ্য দালাই লামা বা তাঁর শিক্ষকরা যখন ‘পথের ক্রমিক পর্যায়’ বিষয়ে কোনো আলোচনা করেন, তখন দূর-দূরান্ত থেকেও সকল বিজ্ঞ পণ্ডিত ও আন্তরিক সাধকরা আগ্রহভরে তাতে অংশ নেন। এর কারণ এই নয় যে, তাঁরা আগে কখনো এই বিষয়ে শিক্ষা পাননি; বরং এর কারণ হলো—তাঁরা বারবার শোনার গুরুত্ব ও শক্তি উপলব্ধি করেন এবং কখনোই শিক্ষার প্রতি অনাগ্রহী বা ক্লান্ত হয়ে পড়েন না। আমাদেরও উচিত তাঁদের এই চমৎকার দৃষ্টান্ত অনুসরণ করা।

Top