অপরকে সাহায্য করার জন্য এগারোটি উপায়

প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ ও জীবজন্তু দুঃখভোগ করছে। তাদের সহায়তা করার মতো অনেক উপায় আছে। সর্বাপেক্ষা উত্তম উপায়টি কী হতে পারে তা পরিস্থিতির সঠিক অনুধাবন ও নির্ণয়ের উপর নির্ভর করে। শুধুমাত্র কারুণিক এবং কুশল হলেই তা যথেষ্ট নয়। আমাদের নিজেদের সময়ের কথাও মাথায় রাখতে হবে। থাকতে হবে আত্মসংযম, ধৈর্য, চেষ্টা, মনোযোগ এবং প্রজ্ঞা। অপরকে সহায়তা করার জন্য এখানে এগারোটি উপায় বলা হল। এগুলি শুধু কাঙ্ক্ষিত জনের উপকার করবে না; বরং একাকীত্বের খোলস ছেড়ে আমাদেরও একটি সদর্থক জীবন তৈরি করতে সাহায্য করবে।

  1. দুঃখীদের সেবাযত্নঃ- যারা অসুস্থ, শারীরিক ভাবে অক্ষম এবং যন্ত্রণা পাচ্ছে তাদের সেবাযত্ন করা আমাদের প্রয়োজন। আমরা যদি দেখি যে কোনও ব্যক্তি ভারী ওজন বহন করতে সমস্যায় পড়েছে, তাহলে আমরা এগিয়ে গিয়ে তাদের সাহায্য করি।
  2. যারা নিজের যত্ন নিতে অসমর্থ তাদের দিশা দানঃ- প্রতিকূল অবস্থায় যারা কিংকর্তব্যবিমুঢ় বা, সেই অবস্থায় যদি ওঁরা চান তবে তাদের পরামর্শ দিতে পারি; অন্তত শুনতে তো পারি। যদি আমাদের ঘরে একটি কুকুর বা বিড়াল আটকে যায়, আমরা দরজা খুলে তাকে যেতে দিই। জানালার সামনে পলায়ন উন্মুখ মাছির সঙ্গেও এই উপায় প্রয়োগ করি। মাছিটি আমাদের কক্ষে আটকে থাকতে চায় না। খুলে দিই জানালা, যেন সে যেতে পারে।
  3. যাদের দ্বারা উপকৃত হয়েছি তার ঋণ পরিশোধঃ- যাদের কর্মে এই পৃথিবীটি চলছে তাদের সকল কর্মের প্রশংসা করা মহত্ত্বপূর্ণ। যেমন, আমাদের মাতা-পিতা আমাদের জন্য অনেক কিছু করেছেন, তাদের সাহায্য করতে সচেষ্ট হব। অপরাধবোধ বা বাধ্যবাধকতা থেকে নয়; আন্তরিক শ্রদ্ধা সহ তা করতে হবে।
  4. ভীতদের রক্ষা ও স্বস্তি দানঃ- যে সকল মানুষ ও জীবজন্তু ভীত-সন্ত্রস্ত তাদের স্বস্তি দেওয়ার জন্য আমাদের ঝাঁপিয়ে পড়া উচিত। কেউ যদি এমন কোন বিপজ্জনক জায়গায় যেতে চায় যেখানে তার আঘাত পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে, সেক্ষেত্রে আমরা তার পাশে দাড়াই ও রক্ষা করতে রাজী হই। অতীতে হিংসাদীর্ণ পরিস্থিতি থেকে আগত শরণার্থীদের আমরা দিই নিরাপত্তা ও বসবাসের সুবিধা। যুদ্ধ ও নিপীড়নের শিকার হয়ে আতঙ্কিতদের ভাবাবেগের ক্ষত নিরাময়ের জন্য আমাদের বিশেষ অনুধাবন ও সাহায্য প্রয়োজন।
  5. শোকার্তদের সান্তনা দানঃ- মৃত্যু, প্রিয় মানুষদের হারানো বা বিবাহ বিচ্ছেদের কারণে মানুষ যখন শোকার্ত হয়, করুণায় উদ্বুদ্ধ হয়ে আমরা তাদের সান্ত্বনা দিতে চেষ্টা করি। ‘আহা বেচারা’ ব’লে বোঝাটি আর বাড়ানো উচিত নয়, বরং সহকর্মী হয়ে দুঃখটি ভাগ করে নিতে পারি।
  6. দরিদ্রদের জিনিসপত্র দিয়ে সহায়তাঃ- পরোপকারের জন্য দান করা ভালো, তার থেকেও ভালো হল পথের ভিক্ষুকদের দান করা। নোংরা, কুৎসিত, গৃহহীন এমনকি দেখতে চাই না এমন ভিকারীরা সামনে দাঁড়ালে মনে কুকথা এলেও বাক্‌সংযমী হয়ে স্মিত হাসিতে তাদের সম্মান দেওয়া আমদের প্রয়োজন। একবার ভাবুন, পথবাসী ওই ব্যক্তিটি যদি আমাদের মা বা পুত্র হতেন আমরা কি তাদের আবর্জনার স্তুপ ভেবে পাশ কাটিয়ে যেতে পারতাম?
  7. ঘনিষ্টদের ধর্মের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়াঃ- যারা আমদের সঙ্গে সবসময় থাকতে চান তাদেরও আমাদের সাহায্য করা প্রয়োজন। আমরা চাই না তারা পরনির্ভর হোন। আর যদি সম্পর্কটি হয় গভীর তবে সুখ ও অপরকে সহায়তা দানের বিষয়ে মৌলিক বৌদ্ধ উপদেশ ও উপায়গুলি বলে তাদের সহায়তা করতে পারি। এই বিষয়ে তাদের আগ্রহ থাকলেই তা হতে পারে। এ কিন্তু ধর্মান্তকরণ নয়, বরং তা সাধারণ সাহায্য বা উপদেশ দান মাত্র। এইভাবে সম্পর্কটি সার্থক করে তুলতে পারি।
  8. অপরের ইচ্ছানুযায়ী তাদের সহায়তাঃ- অপরকে সাহায্য করার প্রচেষ্টাটি যেন তাদের উপযুক্ত হয়। কেউ যদি আমাদের কাছে কোন একটি উপদেশ চায় এবং সেটি আমাদের প্রিয় বিষয় না হলেও, তাদের পক্ষে যদি যথাযত হয়, তাহলে আমরা তা দিতে পারি এবং খুব ভালোভাবে তা দেওয়ার চেষ্টা করা উচিত। বিষয়টি অনেকটা বন্ধুদের সঙ্গে রেস্তোঁরায় যাবার মতো। সেখানে গিয়ে সবসময় আমাদের পছন্দসই খাবার চাইব, এটি অবিবেচকতা ও স্বার্থপরতা বিশেষ। কোন-কোন সময় অপরের পছন্দটিও আমরা পরীক্ষা করে দেখতে পারি। বিষয়টি অনেকটা সম্পর্কের মতো, আমদের চাহিদা এবং অপর ব্যক্তিটি কী চায় তা নিয়ে আপস করা প্রয়োজন। এটি সবসময় আমাদের পছন্দ মতোই হতে হবে তা নাও হতে পারে।
  9. সদাচারীদের অনুপ্রাণিত করণঃ- যে সকল মানুষ একটি সদর্থক জীবন অনুসরণ ক’রে ভালো কাজ করছেন, অযথা গর্বিত না করে তাদের অনুপ্রেরণা জাগিয়ে উপকার করতে পারি। যাদের নিজের উপর বিশ্বাসটি নড়বড়ে তাদের সঙ্গে মেলামেশার সময় এটি বিশেষ প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে। ভালোগুণ থাকা স্বত্ত্বেও যারা উদ্ধত, অপরের কাছে আমরা তাদের প্রশংসা করব, তার সামনে নয়। এরপর পরকল্যান করার জন্য তাদের ক্ষমতা প্রয়োগের উদ্দেশ্যে তাদের দেব উৎসাহ। আর যদি কোন ভুল করে, তবে তা দেখিয়ে দিয়ে তাদের অহংকার হ্রাস করতে সাহায্য করব।
  10. ধ্বংসাত্মক জীবন-যাপন করছে যারা তাদের গঠনমূলক আচরণের শিক্ষা দান: আমরা যদি এমন কোনও মানুষের সম্মুখীন হই যারা অত্যন্ত ধ্বংসাত্মক ও নেতিবাচক জীবন-যাপন করছে, তাহলে তাদের প্রত্যাখ্যান, নিন্দা বা অবহেলা করা উচিত নয়। মানুষকে বিচার না করে, ওরা যদি পরিবর্তিত হতে চায় তবে নেতিবাচক আচরণ থেকে কীভাবে বেরিয়ে আসা যায় তার পথ দেখানোর চেষ্টা করা উচিত।
  11. সব প্রচেষ্টা ব্যর্থ হলে যেকোনও অসাধারণ ক্ষমতার ব্যবহারঃ- আমাদের মধ্যে কোন-কোন মানুষের মধ্যে অসাধারণ ক্ষমতা আছে। হয়তো আমরা কেউ মার্শাল আর্টে দক্ষ, কিন্তু অপরের সামনে বড়াই করি না। তবু যদি দেখি কেউ আক্রান্ত হয়েছেন, আক্রমণকারীকে দমন করার জন্য নিরুপায় হলে বিশেষ ক্ষমতাটি আমাদের ব্যবহার করা উচিত।

অপরকে সহায়তা দানের জন্য বহু উপায় রয়েছে। কখন, কাকে, কীভাবে এবং কোন সময় সরে গিয়ে তাকে স্বনির্ভর করে তোলা যাবে, এসব জানাই হল কুশলতা। দৃশ্যতই যারা শারীরিক বা মানসিক কষ্টে আছেন তাদের তাৎক্ষনিক সাহায্য করা আমাদের প্রয়োজন। কিন্তু সাহায্যটি প্রয়োজন অনুসারে করা উচিত, কম-বেশি নয়। হতভাগ্যদের স্বাবলম্বী করার মতো সাহায্য আমাদের করা প্রয়োজন। তবে দীর্ঘমেয়াদি সহায়তার পক্ষে সর্বশ্রেষ্ঠ উপায় হল অপরের জন্য অনুকূল অবস্থা ও উপায় জোগান দেওয়া, যাতে তারা স্বনির্ভর হয়ে চলতে পারে এবং ভালোভাবে নিজের দেখাশোনা করতে পারে।

Top