বৌদ্ধ অনুশীলন কী?

বৌদ্ধ ধর্মের প্রধান কেন্দ্রবিন্দু হল নিজের দোষগুলির উপর বিজয় প্রাপ্ত ক’রে ইতিবাচক সুপ্ত ক্ষমতাগুলিকে হৃদয়ঙ্গম করা। এই দোষগুলির মধ্যে স্বচ্ছতার অভাব এবং আবেগের ভারসাম্যহীনতা, যা কিছু আমাদের জীবন সম্বন্ধে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে, এসব কিছু দোষের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত হয়। পরিণামস্বরূপ, আমরা ক্রোধ, লোভ এবং অজ্ঞান-এর মতো ক্লেশে বশীভূত হয়ে আচরণ করতে থাকি। আমাদের স্পষ্টভাবে যোগাযোগ করার ক্ষমতা, বাস্তবিকতা কে বুঝতে পারা, অন্যদের প্রতি সহমর্মিতা রাখা এবং নিজেদের উন্নতিসাধন করার ক্ষমতাগুলি, আমাদের ইতিবাচক সুপ্ত ক্ষমতার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

বৌদ্ধ সাধনার শুরু হয় নিজের চিত্তকে শান্ত করা এবং মনোযোগী হওয়া থেকে, অর্থাৎ আমাদের নিয়মিত ভাবে এই বিষয়ে সচেতন হওয়ার অভ্যাস করা, যে আমরা অপরের সাথে কেমনভাবে কথা বলি, আর যখন আমরা একলা থাকি তখন আমরা কী চিন্তা-ভাবনা করি। এটা এমন নয় যে আমরা স্রেফ অন্যদের পর্যবেক্ষণ করব এবং তারা যেমন আছে তাদের সেই ভাবেই ছেড়ে দেবো। যখন আমরা মনোযোগী হয়ে থাকি, তখন আমরা প্রভেদ করতে পারি যে কোনটা গঠনমূলক আর কোনটা ধ্বংসাত্মক। কিন্তু এটা নিজের মধ্যে নিজের থাকাকে বোঝায় না, আসলে এর দ্বারা আমরা অপরের প্রতি আরো বেশী যত্নশীল এবং উদার হয়ে যাই।

আমাদের এই আত্মদর্শন এবং আত্ম-সচেতনতার উদ্দেশ্য হল নিজের সমস্যাগুলির কারণগুলি খুঁজে বের করা। বাইরের কারণ এবং অন্য লোকজন নিশ্চিতভাবে আমাদের সমস্যাগুলির উৎপত্তির জন্য পরিস্থিতি তৈরী করে, কিন্তু বৌদ্ধ দৃষ্টিকোণ অনুযায়ী এর গভীরতর কারণগুলিকে শনাক্ত করার প্রয়াস করতে হবে, এবং এর জন্য আমাদের চিত্ত অবলোকন করা আবশ্যক [দ্র. চিত্ত কী?]। আমাদের মানসিক স্বভাব এবং আমাদের ইতিবাচক আর নেতিবাচক আবেগগুলি আমাদের জীবনের অনুভবকে প্রভাবিত করে।

আমরা যখন কাজের ধকল, অবসাদ, চিন্তা, একাকীত্ব এবং অসুরক্ষার অনুভব করি, তখন তাদের মোকাবিলা করার অসুবিধাটা আমাদের নিজেদের মানসিক এবং আবেগময় দশা থেকে উৎপন্ন হয়, স্বয়ং ঐ সমস্যাগুলি থেকে নয় [দ্র. উদ্বেগের সঙ্গে কীভাবে মোকাবিলা করব?]। জীবনের একটানা চ্যালেঞ্জগুলির সম্মুখীন হওয়ার সবথেকে ভাল উপায় হল আমাদের চিত্তকে শান্ত করা এবং আবেগপ্রবণতার ভারসাম্য বজায় রাখা আর মনের স্বচ্ছতা লাভ করা।

যে আবেগ, মনোভাব এবং ব্যবহারগুলি আমাদের দুঃখ এবং সমস্যার জন্ম দেয়, আমরা যদি একবার তাদের প্রতি সচেতন হয়ে যাই, তাহলে আমরা তাদের প্রতিকারের উপায়গুলি প্রয়োগ করতে পারব।

বাস্তবিকতার স্পষ্ট বোধশক্তি এবং চিত্তের ক্রিয়াকলাপের উপর ভিত্তি করে আমাদের আবেগপ্রবণ স্বাস্থ্যবিধি প্রয়োগ করতে হবে।– চতুর্দশ দলাই লামা

আমরা সবাই নিজেদের শারীরিক স্বাস্থ্যবিধির যত্ন নিই, কিন্তু নিজের মানসিক অবস্থার খেয়াল রাখাও ততটাই প্রয়োজন। আবেগপ্রবণ স্বাস্থ্যবিধি বিকশিত করার জন্য আমাদের তিনটি জিনিসের উপর সতর্ক হওয়া প্রয়োজন: আমাদের মনে রাখতে হবে অশান্ত মনোভাবের প্রতিষেধকগুলি, কখন এগুলি প্রয়োগ করা দরকার এটাও মনে রাখতে হবে, এবং এগুলি বজায় রাখা ও মনে রাখতে হবে।

এই সকল প্রতিষেধক মনে রাখার জন্য, আমাদের করতে হবে:

  • শিখতে হবে ঐ মনোভাবগুলি কী কী?
  • ততক্ষণ ভাবতে হবে যতক্ষণ না আমরা সঠিক ভাবে বুঝতে না পারি, কীভাবে তাদের প্রয়োগ করতে হবে, এবং নিশ্চিৎ হওয়া যে এগুলি কাজ করবে।
  • তাদেরকে গভীরভাবে জানার জন্য নিজের ধ্যান-সাধনার অভ্যাসের মধ্যে শামিল করো।

আমাদের স্বয়ংকে নিজের চিকিৎসকের মতো হওয়া প্রয়োজন: নিজের রোগের সঙ্গে পরিচিত হতে হবে, তাদের কারণগুলিকে বুঝতে হবে, এবং এটা দেখতে হবে যে এর জন্য কী কী প্রতিষেধক উপলব্ধ আছে আর সেগুলিকে কীভাবে প্রয়োগ করতে হবে, এবং তারপর বাস্তবে সেগুলিকে প্রয়োগ করার অভ্যাস তৈরী করা আবশ্যক।

আমরা যখন দীর্ঘকাল ধরে অসুস্থ থাকি তখন নিজের জীবনশৈলীতে পরিবর্তন আনার আগে আমাদের নিজেদেরকে সেই পরিবর্তনের ফলে যে উপকারগুলি হবে সেগুলি বিশ্বাস করতে হবে। অধিকাংশ মানুষ খাওয়া-দাওয়া এবং সুস্থতার অভ্যাসের গভীরভাবে অধ্যয়নের আগে আহার এবং ব্যায়ামের নিয়ম দিয়ে শুরু করার চেষ্টা করে। স্বভাবত, এইগুলি শুরু করার আগে, তাদের কারোর থেকে নির্দেশাবলী শিখতে হবে, কিন্তু একবার যখন এগুলির থেকে উপকারী ফলাফল অনুভব করবে, তখন নিজে থেকেই অভ্যাসগুলি করতে অনুপ্রাণিত হবে।

আবেগপূর্ণ স্বাস্থ্যকে ঠিক করার জন্যও আমাদের একই প্রকারের প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়েই যেতে হয়। একবার যখন আমাদের নিজের সচেতনতার অভ্যাসের দ্বারা সুখের অনুভব হয়ে যায় তখন আমাদের জীবনের গুণের বিকাশ এবং অন্যদের বেশী সহায়তা করার জন্য বৌদ্ধ সাধনাগুলিকে ভালো করে শেখার প্রেরণা এবং রুচি জাগৃত হবে।

একসময় বুদ্ধও আমাদেরই মতোই একজন সাধারণ ব্যক্তি ছিলেন, যিনি জীবনের সংঘর্ষগুলির সঙ্গে সংগ্রাম করেছেন। আর আমাদের মতোই স্বয়ং তিনিও নিজের এবং নিজের আশপাশের সকল মানুষের জীবনকে উন্নত করার চেষ্টা করতেন। আত্মবিশ্লেষণ করার পর তাঁর মধ্যে বোধশক্তি জেগেছিল যে আমাদের আশেপাশে যেমনই পরিস্থিতি হোক না কেন, আমাদের ভিতরে এই শক্তি এবং ক্ষমতা আছে যে আমরা শান্ত এবং সচেতন থাকতে পারি, এবং আমাদের আবেগগুলির উপর নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারি।

এইগুণ- যেটিকে দলাই লামা ‘আবেগপ্রবণ স্বাস্থ্যবিধি’ বলেন- এটা এমন একটি গুণ যা সংস্কৃতি এবং ধর্মের সীমার বাইরে, কারণ এটি আমাদের সব সমস্যাগুলি থেকে মুক্ত, সুখী এবং শান্তিপূর্ণ জীবন যাপনের অভিলাষার সারতত্ত্ব।

Top