সার্বজনীন নৈতিকতা কী

সার্বজনীন নৈতিকতার অর্থ

কেন আমাদের কাছে এই শব্দটি “সার্বজনীন নৈতিকতা” রয়েছে? “সার্বজনীন”- এতে এমন কিছুর মূল ধারণা নিহীত আছে যা বিশ্বাসী (আস্তিক) বা অবিশ্বাসী (নাস্তিক) প্রত্যেকে গ্রহণ করতে পারে। হিন্দু, মুসলিম, খ্রীষ্টান, বৌদ্ধ, ইহুদী বা জৈন অথবা অন্য যে কেউ হোক না কেন তারা সকলেই মূল্য গ্রহণ করতে পারে। বিজ্ঞানী বা অবিজ্ঞানী, শিক্ষিত বা অশিক্ষিত যেই হোক না কেন সকলেই এই মূল্যগুলি গ্রহণ করতে পারে এবং দেখতে পারে যে তাদের নিজের সুখের জন্য এগুলি অনুসরণ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সেটাই সার্বজনীন অংশ। নৈতিকতা এমন আচরণের একটা উপায় যার সাথে যুক্ত করে আপনাকে একজন সুখী মানুষ করে তোলে এবং অন্যের সুখকে সমর্থন করে। সমাজে সুখী হয় এবং আপনিও সুখী হন। এই দুটি একত্রিত করে সার্বজনীন নৈতিকতা।

তারপরে আমরা আমাদের বুদ্ধি ব্যবহার করে সেই চিন্তাধারাকে প্রতিপালন করতে পারি যে কাঙ্খিত চিন্তাধারার ফলাফলগুলিকে উৎপাদন করতে এবং এমন ধরণের মনকে ত্যাগ করতে সহজ করে তুলি যা আমাদের মনকে হ্রাস করে এটাই নৈতিকতা এবং যে উপাদানটি নৈতিকতার সমস্ত নীতিকে বোঝায় সেটা হল করুণা।

তারপর যা সুখ এবং অসুখীতাকে জন্ম দেয় সেই হল আমাদের মন। এটাও আবার নির্ভর করে চালিকা আবেগ এবং আবেগপ্রবণ কারণগুলির উপর। আবেগ আমাদের চিন্তা-ভাবনা পরিচালনা করে আর আমাদের চিন্তা-ভাবনা পরিচালনা করে আমাদের ক্রিয়াকলাপকে। যে আবেগ আমাদের সুখের কারণ হিসাবে কাজ করে সেটা হল “ইতিবাচক আবেগ”। সার্বজনীন অর্থে, আমরা “মৌলিক পাপ” বা এই মৌলিক বা ঐ মৌলিক, এর সম্পর্কে কথা বলতে পারি না। আমাদের খুব সার্বজনীন ভাবে কথা বলতে হবে। সার্বজনীন ভাবে আমরা বলতে পারি যে যা প্রকৃত সুখের জন্ম দেয় সেটা হল ইতিবাচক আবেগ এবং যা দুঃখকে জন্ম দেয় সেটা হল ধ্বংসাত্মক আবেগ। আমাদের মনের মানচিত্রের অংশ হিসাবে এগুলির অধ্যয়ন করতে হবে এবং শিখতে হবে; আমাদেরকে এই ধরণের মানচিত্রের মাধ্যমে মানুষকে প্রশিক্ষণ দিতে হবে।

স্কুল ব্যবস্থায় সার্বজনীন নৈতিকতার অধ্যাপনা

আমরা কীভাবে মানুষকে অধ্যাপনা করার জন্য আগ্রহী করতে পারি যে ব্যক্তি এবং সম্প্রদায়ের জন্য কোনটা অর্থপূর্ণ? এমন এক শ্রেণী আছে যাদের নৈতিকতা ঈশ্বর ভীতির উপর আধারিত। এমন এক শ্রেণী আছে যারা ঈশ্বরের অস্তিত্বকে বিশ্বাস করে না, বরং তাদের মধ্যে কর্মের প্রতি বিশ্বাস আছে। কর্মের উপরে নির্ভর করে তারা ভাবে যে ভালোভাবে আচরণ করার জন্য তাদের যত্নবান হওয়া উচিত। কিন্তু এমন আরও এক শ্রেণী আছে যারা ঈশ্বর বা কর্ম কারও প্রতি বিশ্বাস করে না। ঈশ্বর বা কর্মের ধারণা ব্যতীত আমরা কীভাবে মানুষকে বোঝাতে পারি যে নৈতিকতা এমন একটা জিনিস যেটাকে আগ্রহের সাথে গ্রহণ করা যেতে পারে? এরজন্য পরম পূজ্য দালাই লামা নিম্ন তিনটি বিষয় নিয়ে উপস্থিত হয়েছেনঃ 

  • সাধারণ অভিজ্ঞতা/ অনুভক
  • সাধারণ জ্ঞান
  • বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার

এর উপর ভিত্তি করে পরম পূজ্যজী আধুনিক শিক্ষা ব্যবস্থায় সার্বজনীন নৈতিকতা অধ্যাপনা করার জন্য তিনটি পদক্ষেপের প্রস্তাব দিয়েছেন।

সাধারণ অভিজ্ঞতার উপর ভিত্তি করে অধ্যাপনার উদাহরণটি হল বিশ্বাসী বা অবিশ্বাসী যেই হোক না কেন ছোট্ট বাচ্চা হিসাবে আমাদের মায়েরা আমাদের স্তন পান করান। এটা একটা সাধারণ অভিজ্ঞতা যার কোন ধর্মীয়তা বা দর্শন নেই। এটা বিশুদ্ধ ভালোবাসা এবং স্নেহ, যা আমরা আমাদের মায়েদের কাছ থেকে প্রাপ্ত করি। এই ভালোবাসা এবং স্নেহ মা এবং সন্তানের মধ্যে একে অপরের প্রতি আস্থা এবং আত্মবিশ্বাস গড়ে তোলে। আর সেখান থেকে সব কিছুই দ্রবীভূত হয়ে যায়। ধ্বংসাত্মক আবেগগুলি দ্রবীভূত হয় আর দ্রবীভূত হয় বিশ্বের সমস্ত বিশৃঙ্খলাও। রয়ে যায় শুধু ভালোবাসা আর স্নেহ। অপরের প্রতি ভালোবাসা এবং স্নেহের অভাবের কারণে সন্ত্রাসবাদ, লিঙ্গবৈষম্য এবং ধনী-দরিদ্রের মধ্যে ব্যবধান সবকিছুই বিদ্যমান থাকে।

সাধারণ জ্ঞান হল আমরা যখন দেখি যে একজন ব্যক্তি আরও বেশি প্রীতিপূর্ণ হয় তাহলে তার চারপাশে আরও বন্ধু-বান্ধব থাকে, সে ঘরে বসে থাকার মতো অনুভব করে এবং সে এও অনুভব করে যে আশপাশের লোকজন তার ভাই-বোনের মতো। আমরা যখন অন্যের প্রতি এই ভালবাসা এবং স্নেহ অনুভব করব না। এমনকি আমাদের নিজের ভাই-বোনেরাও শত্রুর মতো মনে হয়। সাধারণ জ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে আমাদের নিশ্চিত হতে হবে যে ভালবাসা এবং স্নেহ হল সার্বজনীন নৈতিকতার নোঙর।

সর্বশেষে বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার, উদাহরণস্বরূপ, এমন পরীক্ষা-নিরীক্ষাকে বোঝায় যেখানে শিশু বানর তাদের মায়েদের থেকে আলাদা হয়ে যায়। এই সময় তারা অনুভব করেনা যে তাদের মায়েরা তাদের যত্ন নিচ্ছে। তারপরে তারা বড় হওয়ার সাথে সাথে ভীষণ উগ্র হয়ে ওঠে। তারা জানেনা যে অন্যদের সাথে কীভাবে খেলাধূলা করতে হয়, শুধু তারা নিজেদের রক্ষা করে এবং অন্যের সাথে লড়াই ঝগড়া করে। অন্যদিকে যারা মায়েদের সাথে থাকে তারা সুখী এবং কৌতুকপূর্ণ হয়।

এই তিনটি ধারণার ভিত্তিতে পরম পুজ্যজী যুক্তি দেন যে প্রকৃত ভালোবাসা এবং স্নেহ- সার্বজনীন নৈতিকতার নোঙর- হল সেই উপাদানগুলি যাদেরকে সকলের মনে উৎপাদন করা উচিত।

মানুষ হিসাবে সার্বজনীন পরিচয় ধারণ করে রাখা

সার্বজনীন নৈতিকতার প্রবর্তনের মুখোমুখি হওয়ার একটা চ্যালেঞ্জ হল আমাদের পরিচয়। আমরা যখন ভাবি “আমি তিব্বতী, আমি চীনা, আমি বৌদ্ধ, আমি হিন্দু”, যে মুহুর্তে আমাদের নিজস্ব পরিচয়ের সাথে এই ধরণের আসক্তি জাগে, অন্যের প্রতি বিদ্বেষ ঘটতে বাধ্য। এটা একটা বিশাল বড় চ্যালেঞ্জ এবং একটা অত্যন্ত গুরুতর বিষয়।

একজন ব্যক্তির শত শত আলাদা আলাদা পরিচয় থাকতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, আমি বলতে পারি যে আমি একজন মানুষ, এর ভিত্তিতে পুরুষ শ্রেষ্ঠত্বে বিশ্বাসের ভাবনা জাগে। পুরুষ শ্রেষ্ঠত্বে বিশ্বাসের ভিত্তিতে স্ত্রীত্ববাদ জন্মায়, আমি যদি মনে করি আমি একজন বৌদ্ধ তাহলে আপনি হবেন একজন অবৌদ্ধ। আমি যদি হিন্দু বা মুসলমান হই তাহলে আপনি হবে অহিন্দু বা অমুসলিম। যতক্ষণ পর্যন্ত একজন ব্যক্তি উচ্চভাবে বিকশিত না হয় ততক্ষণ পর্যন্ত কম উল্লেখযোগ্য পরিচয়কে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য পরিচয় হিসাবে ধারণ করে রাখার বিপদ বা প্রবণতা থেকে যায়। মৌলবাদ বা উগ্রবাদ সবকিছুর জন্ম হয় অল্প উল্লেখযোগ্য পরিচয়কে সর্বোচ্চ রূপে ধরে রাখার কারণে।

কেন আমরা সকলেই মানুষ হিসাবে চিহ্নিত করি না? যদি এলিয়েনরা এসে আমাদের লক্ষ্য করে গুলি চালাতে শুরু করে, এই বলে যে তারা পৃথিবী গ্রহ থেকে এসেছে, তাহলে তখন আমাদের সকলের পরিচয় হবে যে আমরা পৃথিবী গ্রহের প্রাণী। এই বলে আমরা সবাই এক হয়ে যাব। আমাদের নিজেদের পরিচয় তৈরি করতে তৃতীয় উপাদানের অপেক্ষা করতে হবে কেন? কেন আমরা এখন আমাদের নিজস্ব পরিচয় তৈরী করি না? কোন পরিচয় আমাদের সুখী এবং বিশ্বকে আরও সুখী করে তোলে? মানুষের পরিচয় ধারণ করে আমরা দেখতে পাই যে আমরা আরও বেশি সুখী আর আমরা সকলকে আমাদের ভাই-বোন হিসাবে দেখতে পাই।

Top