কীভাবে চাপমুক্ত হওয়া যায়ঃ বৌদ্ধ বিশ্লেষণ

এই সন্ধ্যায় আমাকে পরিত্যাগ বিষয়ে বক্তব্য রাখার জন্য বলা হয়েছে। আমাদের সমস্যাগুলি থেকে মুক্ত হওয়ার জন্য, বিশেষ ক’রে মস্কোর মতো বড় শহরে বসবাস জনিত কারণে যে ধরণের চাপ থাকে, সেটাকে বোঝা এবং সেসব থেকে মুক্ত হওয়ার জন্য দৃঢ়সংকল্প নিয়ে তার মোকাবিলা করা, এটাই হল আজকের প্রতিপাদ্য বিষয়। কিন্তু আমি মনে করি আপনি যখন উক্ত শিরোনামটি নিয়ে বিশ্লেষণ করতে শুরু করবেন তখন দেখবেন আমরা যে ধরণের সমস্যার মুখোমুখি হই, তার অধিকাংশ শুধু মহানগরীতে বসবাসের কারণের মধ্যেই সীমিত নয়।

অতি-সক্রিয়তা চাপের একটি উৎস

শহরে বসবাস করলে আমরা অবশ্যই দূষণ, ট্রাফিক ইত্যাদি বিষয়গুলি দেখতে পাই। এগুলি গ্রামে নাও পেতে পারেন। তবে শুধুমাত্র এই সবই আমাদের চাপের একমাত্র কারণ নয়। একটু গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করলে আমরা দেখব যে আধুনিক বিশ্বের বেশীরভাগ মানুষ যে সমস্ত সমস্যার সম্মুখীন হয়ে থাকেন, যেটাকে সত্য হিসাবেও মেনে নেওয়া যেতে পারে, সেটা হল আমাদের পন্যের প্রাচুর্য, বহু বাছাই ক’রে নেওয়ার মতো বস্তু, অসংখ্য তথ্য, অনেক বেশী টিভি স্টেশন, পছন্দসই অনেক চলচ্চিত্র, বেছে নেওয়ার মতো হরেকরকম বস্তু ইত্যাদি। এক্ষেত্রে মানুষ কোথায় বসবাস করেন সেটা বিচার্য নয়। আজ অধিকাংশ মানুষ মোবাইল ফোন ব্যবহার করেন। এতে প্রতিনিয়ত ই-মেল আসছে, মেসেজ পাচ্ছেন, চ্যাট ইত্যাদি করছেন। এর সঙ্গে চাপের অনুভূতিও জাগছে- আমাকে সবকিছু দেখতে হচ্ছে; তৎক্ষণাৎ উত্তর দিতে হবে, কারণ প্রেরক উত্তরের প্রতীক্ষা করছেন। তবে এর কিছু উপকারী দিকও আছে। অন্যদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে হলে সেটা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু কোন কোন সময় সেটা মাত্রা ছাড়িয়ে যায়। আমরা অনিরাপদ বোধও করি। এরকম হওয়ার পিছনে মানসিকতাটি হল- “আমি কোন কিছু বাদ দিতে চাই না, প্রতিটি বার্তা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। আমি পিছিয়ে থাকতে চাই না।”

আর এইভাবে সবসময় কী হচ্ছে সেটা দেখার জন্য আমরা মোবাইল দেখতে বাধ্য হয়ে পড়ি। কিন্তু এটা অবশ্যই আমাদের আশ্বস্ত করে না, কারণ প্রতিনিয়ত নতুন কিছু না কিছু হয়ে চলেছে, আসছে নতুন বার্তা ও চ্যাট। টিভি বা ইউটিউবের কথাই বলা যাক, আমি জানিনা মস্কোতে আপনারা কতগুলো চ্যানেল দেখতে পান। ইউরোপ বা আমেরিকায় তো শত-শত রয়েছে। তাই আপনি কিছু একটা দেখে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করবেন না। ভাবছেন এর চাইতে ভাল কিছু অন্য চ্যানেলে দেখা যাবে। এইভাবে কিছু দেখার জন্য আমরা চাপে পড়ে যাই- হয়তো আরও ভাল কিছু আছে যা আমি মিস্‌ করছি।

আমাদের ভার্চুয়াল (অন্তর্জাল) জগতে সম্মতি ও গ্রহণযোগ্যতার অন্বেষণ

আধুনিক জগতে আমরা যেখানেই থাকি না কেন গ্রাম বা শহর, সেটা কোন বিষয় নয়, আমি মনে করি এই বিষয়গুলি সত্যিই আমাদের চাপ বাড়িয়ে দেয়। আমরা কোন বিশেষ সামাজিক গোষ্ঠী বা বন্ধুদের দলের সঙ্গে যুক্ত থাকতে চাই। তাই আমাদের ফেসবুকের পোস্টে যাই লিখি না কেন তাতে ‘লাইক’ দেখতে চাই। তাতে আমরা অনুভব করি যে, এরফলে আমরা কোনভাবে স্বীকৃত বা গ্রহণযোগ্য হয়েছি। কিন্তু এতে আমরা শান্ত হই না। আরও বহু সংখ্যায় লাইক পেলেও সন্তুষ্ট হই না, আমরা আরও ‘লাইক’ পেতে চাই অথবা ভাবি- “ওরা কি সত্যিই সেটা বোঝাচ্ছে?” ওরা শুধু একটি বোতাম টিপছে বা কোন একটি যন্ত্র বোতামে চাপ দিচ্ছে (মূল্য দিয়ে এরকম আপনি যেতে পারেন)। মোবাইল যখন কোন বার্তার সংকেত দেয় আমরা কিছু প্রত্যাশায় উত্তেজনা অনুভব করি। তবে সেটা কোন বিশেষ বার্তাও হতে পারে।

এই প্রত্যাশা নিয়ে ফেসবুকের পাতা খুলে দেখি- “আমরা আরও বেশি ‘লাইক’ পেলাম কি?” অথবা আমি নিজেকেও এইভাবে দেখি, আমি হয়ে পড়ি খবর-পাগল। আমি সবসময় খবর দেখি, দেখি নতুন কিছু পাই কিনা। আকর্ষণীয় নতুন কিছু হচ্ছে কিনা, কারণ আমি কিছুই বাদ দিতে চাই না। এই বিষয়টিকে যদি আমরা গভীরভাবে বিশ্লেষণ করি, দেখব এর পিছনে রয়েছে একটি ভাবনা- “আমি এত গুরুত্বপূর্ণ যে যা কিছু ঘটছে সেটা আমাকে জানতে হবে এবং সবাই আমাকে ‘লাইক’ করতে হবে।” বৌদ্ধ দৃষ্টিকোণে একে আরও গভীরভাবে বিশ্লেষণ করা যেতে পারে যে কেন আমি নিজেকে এত গুরুত্বপূর্ণ ভাবছি, কেনই বা আমাকে স্বীকৃত হতে হবে। কেনই বা আমরা নিজেকে নিয়ে এতো আচ্ছন্ন হয়ে থাকি। কিন্তু আজকের সন্ধ্যায় আমি ওই দিকে গভীরভাবে প্রবেশ করব না।

আমাদের অবস্থার বাস্তবিকতা থেকে পলায়ন

অন্যদিকে, আমাদের চারপাশের অবস্থা দেখে আমরা অনুভব করি যে আমরা এই পরিস্থিতিতে আচ্ছন্ন হয়ে পড়ি। এক্ষেত্রে হাতের মোবাইলটির দিকে তাকিয়ে পরিস্থিতি থেকে পালাতে চেষ্টা করি। মেট্রোতে থাকার সময় গান শুনি বা হাঁটতে থাকলেও তাই করি। আমরা আইপডে সবসময় ইয়ারফোন লাগিয়ে রাখি। বিষয়টি ভেবে দেখলে বৈপরীত্যে ভরা মনে হবে। একদিকে আমরা সামাজিক গোষ্ঠীতে গ্রহণযোগ্য হতে চাই, কিন্তু যখন আমরা প্রকৃত সমাজে থাকি, তখন কোন খেলা বা জোরে গান শোনার অজুহাতে সবার দরজা বন্ধ করে দিই।

এর অর্থ কী? এর অর্থ হচ্ছে একাকীত্ব, তাই নয় কী? আমরা একা তাই আমরা সামাজিক স্বীকৃতি চাই। আমরা গৃহীত হয়েছি, সেটা কখনও অনুভব করি না। অন্যদিকে, আমরা পালিয়ে আমাদের ভার্চুয়াল জগতে নিজেকে আবদ্ধ করে ফেলছি। তাও তো খুবই নিঃসঙ্গ অবস্থায়, তাই না?

আমরা ক্রমাগত একটি তাগিদ অনুভব করি- কেউ আমাদের কথা শুনুক, সঙ্গ দিক। কারণ আমাদের চারপাশে কিছুই ঘটছে না, এমনটি হতে পারে না। তাও একরকম স্ব-বিরোধীতা। কারণ একদিকে শান্তির জন্য আমাদের আকুল আকাঙ্খা আবার অন্যদিকে শূন্যতা, তথ্য বা গানের অপ্রতুলতায় ভীত হই।

বাহ্যিক জগতের চাপ থেকে যেভাবেই হোক আমরা পালাতে চাই। সেটা মেট্রো হোক বা অন্য কোথাও; এইজন্য আমরা আমাদের ফোন বা ইন্টারনেটের ছোট্ট ভার্চুয়াল জগতে লুকোতে চাই। কিন্তু সেখানেও বন্ধুদের কাছে স্বীকৃতি ইত্যাদি খুঁজি। মোটের উপর আমরা কখনই নিরাপদ অনুভব করি না। এই বিষয়টি নিয়ে সত্যিই আমাদের ভাবনার অবকাশ আছে। চাপ নিয়ে আমাদের সমস্যা থেকে মুক্ত হওয়ার জন্য মোবাইল নামক যন্ত্রে ঢুকে পড়া কি সত্যিই সমাধানের পথ? মহানগর বা যেকোন জায়গাতেই থাকি না কেন, এটা কি সমস্যা সমাধানের পথ?

নেতিবাচক অভ্যাসগুলির চিহ্নিতকরণ এবং মুক্ত হওয়ার জন্য সংকল্পের বিকাশ

তাহলে আমাদের কী করণীয়? এটা হচ্ছে এই ধরণের অভ্যাসের ফলে আমাদের যে সমস্যা, দুঃখ-কষ্ট অর্থাৎ অসুখীতার অভিজ্ঞতা হয় তার চিহ্নিতকরণ এবং তার উৎসটিকেও খুঁজে বার করতে হবে। কেন আমরা এই অভ্যাসগুলিতে আটকে থাকব?

তারপর এর উৎসগুলি থেকে কীভাবে মুক্ত হতে পারব তার পদ্ধতি জেনে এই অসুখীতা থেকে মুক্তির লক্ষ্যে দৃঢ় সংকল্পবদ্ধ হতে হবে। এই পদ্ধতিগুলি কার্যকর হবে, এই বিশ্বাসও থাকা চাই। কিন্তু তার মানে এই নয় যে আমরা এই সমস্ত অসুখীতা সরিয়ে দিয়ে আমরা হব নির্জীব, উদাসীন। আমাদের কোনরকম অনুভব থাকবে না। মৃতের মতো শহরে পদচালনা করব। দুঃখ-কষ্ট না থাকাই সুখ নয়। এটা হল প্রশান্তি ও সমতার থেকেও কিছু বেশী। অনুভবহীনতা আমাদের লক্ষ্য নয়। এ কোন লক্ষ্যবিন্দুই নয়।

আমাদের বাহ্যিক বিষয়াদি ও পরিস্থিতিগুলি আমাদের দুঃখ-কষ্ট এবং চাপ, আমরা যার সন্মুখীন হই তার একমাত্র উৎস নয়। আমাদের সেটা উপলব্ধি করা প্রয়োজন। তাই যদি হতো তাহলে সকলের অভিজ্ঞতাও হতো একইরকম।

সমস্যা আমাদের মোবাইল ফোন বা ইন্টারনেটে নেই। সঠিকভাবে যদি ব্যবহার করা যায়, তাহলে অবশ্যই এগুলি আমাদের জীবনে খুবই সহায়ক হতে পারে। এগুলির প্রতি আমাদের মনোভাব, এগুলি যে সমস্ত ভাবনা নিয়ে আসে, বার বার চালু করা, ইন্টারনেটের চমৎকার জগতকে কীভাবে আমরা ব্যবহার করছি, জীবনে কোন পরিস্থিতিকে আমরা কীভাবে সামলে নিচ্ছি এসবই হল সমস্যার উৎস।

আমাদের মধ্যে বহু আত্মবিনাশী অভ্যাস রয়েছে। আমাদের বিক্ষুব্ধ, উত্তেজিত মন এসবকে নিয়ে আসে। নিরাপত্তাহীনতা গৃহীত না হওয়ার ভয়, একা পড়ে যাওয়া বা বাধ্যবাধকতা ইত্যাদি হয়তো এসবের কারণ। কিন্তু তাদের থেকে মুক্ত হওয়ার জন্য আমরা যে কৌশল গ্রহণ করতে চেষ্টা করি অর্থাৎ সামাজিক মাধ্যমে পালানো ইত্যাদি সেটা আরও চাপ ডেকে আনে। এতে ফাঁসটি আরও চেপে বসছে। উদ্বেগ বাড়ছে- যেমন- “মানুষ কি আমায় পছন্দ করবে?”

এমনকি এর থেকেও বেশি শক্তিশালী ভাবনা আসে। আমরা যখন কিশোর-কিশোরীদের কথা ভাবি, তাদের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও খারাপ ভাবে দেখা যায় এবং ইন্টারনেটে নিন্দাও করা হয়। এটা শুধু আপনি কতটা লাইক পেলেন এবং সবাই দেখতে পাচ্ছে আপনি কতগুলো ‘লাইক’ পেলেন। কিন্তু যখন আপনি ‘পছন্দ করি না’ গোছের নিন্দা পেতে শুরু করেন তখনও সেটা সবাই দেখতে পায়। এটি সত্যিই অসহ্য, তাই নয় কী?

ওরা তাদের খারাপ সময়ের ছবি পোষ্ট করে না। আপনি দেখছেন আপনার বন্ধুরা সবাই দারুন সময় কাটাচ্ছে, আর আমি বেচারা ঘরে বসে ফোনের দিকে তাকিয়ে আছি। মনের এমনতর অবস্থা মোটেই সুখের নয়, তাই না?

এই সমস্ত সামাজিক মাধ্যমে কী চলছে সে বিষয়ে আমাদের বাস্তবোচিত মনোভাব থাকা প্রয়োজন। আমাদের বুঝতে হবে ফেসবুকে এই ধরণের অসংখ্য ‘লাইক’ আপনাকে নিরাপত্তার অনুভব দিতে পারবে না। তার এই ক্ষমতাই নেই, বরং এর বিপরীতটি দিতে পারে। সারল্যবশতঃ আমরা ভাবি সেটা বিরাট পরিবর্তন আনবে কিন্তু তার পরিবর্তে আরও ‘লাইক’ পাওয়ার লোভ নিয়ে আসে। যখন সেটা যথেষ্ট না পাই আর এক ধরণের নিরাপত্তাহীনতায় আরও লাইক পেলাম কি না সেটা বারংবার দেখি।

আমি স্বীকার করছি যে এই সমস্যা আবার ওয়েব সাইট নিয়েও হয়। আজকে কতজন সেটা দেখল তা জানার জন্য পরিসংখ্যান দেখি। এই বিষয়টিও একইরকম। অথবা প্রতিদিন টাকার বিনিময় মূল্য দেখা যে আপনি কতটা টাকা আজ খোয়ালেন। আমরা কখনও মনের শান্তি পাই না। অথবা আমরা সরলভাবে ভাবি যে কম্পিউটারের গেমের ভার্চুয়াল জগতে ঢুকে গেলে যেভাবেই হোক আমাদের সমস্যাগুলি দূর হয়ে যাবে। এটা অনেকটা ভদকা পান ক’রে ভাবার মত যে এইভাবে সব সমস্যা দূর হয়ে যাবে।

আমরা যদি এই লক্ষণগুলির মূল্যায়ন করি; তাহলে দেখব যে, এগুলি খুবই আত্ম-বিনাশী এবং জীবনের চাপ সামলানোর পরিবর্তে আমাদের চেষ্টাগুলি আরও সমস্যা সৃষ্টি করছে।

আমাদের অবস্থাকে কার্যকরভাবে সামলানোর জন্য প্রভেদমূলক চেতনার প্রয়োজন

আমরা যে অবস্থায় রয়েছি সেই অবস্থায় এসব লক্ষণগুলিকে মোকাবিলা করার জন্য আমাদের প্রভেদমূলক চেতনার প্রয়োজন। উদাহরণ স্বরূপ, একটি কাঙ্খিত চাকুরীর সঙ্গে আমাদের বোঝাপড়া করতে হয়। এটা একটা বাস্তব বিষয়। আর বাস্তবতাটি হল, আমরা যেন যথাসম্ভব কাজটি করতে পারি। আমরা যদি এই বাস্তবতাকে স্বীকার করে নিতে পারি তাহলে কাজটি সম্বন্ধে আমাদের কল্পিত মনোভাব, যেমন- এটি ভয়ঙ্কর অত্যাচার বিশেষ বা নিজেকে এর অযোগ্য মনে হওয়া, এমন চিন্তা বন্ধ করতে সাহায্য করবে।

সমস্যা হল যে আমরা ভাবি আমাদের নিখুঁত হতে হবে, কিন্তু বুদ্ধ ব্যতীত কেউ পূর্ণ নিখুঁত হয় না। আর আমাদের উর্দ্ধতন কর্তা যদি ভাবেন আমাদের নিখুঁত বা দক্ষ হওয়া উচিত এবং সেরকম হওয়ার জন্য চাপ দেন তাহলেও সেটা হবে অবাস্তব চিন্তা- অসম্ভব। যেহেতু এটা অসম্ভব, তাই আমরা নিজেদের দোষী মনে ক’রে দেওয়ালে মাথা ঠুকব কেন? যেটা অসম্ভব সেটা করতে পারি না বলে আমরা নিজেকে দোষী মনে করব কেন?

সুতরাং, আমরা যেটা করতে পারি সেটা হল শুধু আমরা সেরা কাজটি করতে পারি, অগ্র-পশ্চাদ্‌ স্থির ক’রে অবস্থাটির বাস্তবতা স্বীকার ক’রে নিতে পারি। তারপর আমরা মনঃসংযোগ করতে চেষ্টা করি, বিষয়টিকে সবরকম অতি অর্থাৎ “এ-তো অসম্ভব; এ থেকে পালিয়ে ফোনে গেম খেলব বা সার্ফ করব”-এই না ক’রে যে অবস্থার মুখোমুখি হয়েছি, তার বাস্তব অবস্থাটির উপর মনোসংযোগ করতে পারি।

আপনাকে এর মোকাবিলা করতে হবে। আপনাকে কাজটিও করতে হবে। যদি আমরা কাজটিকে গুরুত্ব না দিই, তাহলে ভাবতে বসব যে এটি বোধ হয় আমাকে করতে হবে না। উদাহরণ হিসাবে বলছি- “কাজের ক্ষেত্রেই ধরুন, আপনাকে একটা বিশেষ কাজ করতে হবে এবং এটা করতে হবে এরকম আপনার মনে হচ্ছে না, তখন আপনি কী করবেন? আপনার মধ্যে এমন শৃঙ্খলা বা সদিচ্ছা আছে যে এটা করব, নাকি তৎক্ষণাৎ মোবাইল দেখার ইচ্ছা জাগে এবং হয়তো দেখেন নতুন কোন ম্যাসেজ এল বা এর থেকেও আকর্ষণীয় কোন কিছু কেউ পোষ্ট করল।” এইসব হল বাস্তবে কাজটিকে কম গুরুত্ব দেওয়ার ফল। এইসবে থাকা বা যুক্ত হওয়ার ইচ্ছার সাথে সবকিছু জড়িয়ে রয়েছে।

আমরা কীভাবে এর মোকাবিলা করি?

কর্ম কীভাবে হরমোনের সাড়া দেওয়াকে প্রভাবিত করে সেটা জানা

আমরা আত্ম-সংযম এবং ছোট্ট বিষয় নিয়ে শুরু করি এবং চাপ সামলাতে আমরা যে পদ্ধতি গ্রহণ করি সেটা কীভাবে কাজ করছে বুঝতে পারি। আমরা যদি হরমোন ইত্যাদির কাজ অর্থাৎ বিজ্ঞানের দৃষ্টিতেও দেখি তাহলে সেটা আমাদের একটি সম্পূর্ণ ভিন্ন অন্তর্দৃষ্টি দান করে। বৌদ্ধধর্ম কী বলছে তার সম্বন্ধে একটি বৈজ্ঞানিক ভিত্তি প্রদান করে।

কোরটিসল এবং ডোপামিন হরমোন

আপনি চাপ অনুভব করছেন, তাহলে হরমোনের স্তরে তখন কী চলছে? আমাদের কোরটিসল স্তর কি বেড়ে গেছে? কোরটিসল হল একটি চাপের সঙ্গে যুক্ত হরমোন। সুতরাং, আমরা কিছুটা পরিত্রাণ চাই। অতএব, আমাদের কৌশল কী? আমরা ভাবি যে দেহে কোরটিসল বৃদ্ধি রোধ করতে কিছুটা আনন্দ নেওয়া যাক, ভাবি একটা সিগারেট টানব যা সাহায্য করবে অথবা ইন্টারনেট সার্ফ করব, সামাজিক মাধ্যম দেখব অথবা আকর্ষণীয় কিছু দেখে এই চাপ থেকে মুক্ত হব। প্রকৃতপক্ষে, যেটা হয় সেটা হল আমরা কোন কিছুর আশায় উত্তেজিত হই এবং এটা আমাকে কিছুটা ভাল রাখবে ভেবে আনন্দিত হই। এরফলে ডোপামিন হরমোনের স্তর বৃদ্ধি পায়। ডোপামিন হল পুরস্কারের পূর্বাভাস বিষয়ের হরমোন। যখন একটা প্রাণী অন্য একটা প্রাণীকে তাড়া করে তখন এই হরমোনটি কাজ করে, সেখানে এই প্রত্যাশা পূরণ থাকে। যখন আপনি কোন প্রিয় মানুষের সঙ্গে দেখা করতে যান তখন সেটা সহজে চিহ্নিত করা যায়, কিছুটা সেরকম। অত্যাশ্চার্য কিছু ঘটবে এরকম প্রত্যাশার সময় ডোপামিনের স্তর খুবই বেড়ে যায়। যখন আপনি লোকটির সঙ্গে থাকলেন সেটা প্রত্যাশামত খুবই সুন্দর নাও হতে পারে কিন্তু আপনার প্রত্যাশা সুখের মাত্রা বাড়িয়ে দিল, তার মূলে হল এই ডোপামিন হরমোন।

আমরা খুবই জীববিদ্যা জনিত প্রাণী। কিন্তু সিগারেট বা ইন্টারনেট চেক করার পরও তা আমাদের তৃপ্ত করে না এবং চাপ আবার ফিরে আসে। তাই এটা একটা খুব ভাল কৌশল নয়।

তাই সিগারেট সমস্যার সমাধান করবে এই ধরণের ভুল ধারণার বিশ্বাসগুলির ক্ষতি প্রভেদ করা প্রয়োজন। কিছু আকর্ষণীয় খবর অথবা কিছু কৌতুহল উদ্দীপক ফেসবুক পেজের তথ্য আমার সমস্যা দূর করবে এমন ধারণাকেও ভাল-মন্দ বিচার ক’রে দেখতে হবে।

এইগুলি হল সর্বোত্তম কৌশল, এই ধরণের চিন্তা-ভাবনার ক্ষতিকারক দিকটি যখন বুঝতে পারব, তারপর থেকে এই অভ্যাসগুলি থেকে মুক্ত হওয়ার জন্য দৃঢ় সংকল্প বিকাশ ঘটাতে পারব, কারণ এই অভ্যাসগুলি কাজ দেয় না।

নেতিবাচক অভ্যাস অনুসরণ করা থেকে বিরত থাকার অনুশীলন

অতএব, আমরা সিগারেটের শরণ নেওয়া বন্ধ করলাম। সিগারেটের ধূমপানের একটি সম্পূর্ণ অন্য দিকও রয়েছে। সিগারেটের ধূমপানের কি সত্যিই কোন উপকারীতা আছে? না, তা নেই। কিন্তু ইন্টারনেট সামাজিক মাধ্যম বা ম্যাসেজ অনবরত চেক করার ক্ষেত্রে আমাদের নিয়ন্ত্রণ করা প্রয়োজন। সবসময় খোলার প্রয়োজন নেই। অন্যভাবে বলতে গেলে এদের কাছে শরণ নেওয়া বন্ধ করুন। তাতে পালানো বন্ধ করুন। এসমস্ত যেটা পূর্ণ করতে পারে না তাতে নির্ভর না হয়ে শুধুমাত্র এর উপকারী দিকটি ব্যবহার করুন।

তবে, যখন আমরা একঘেঁয়েমীতে ক্লান্ত কাজের জায়গা হোক বা বাড়িতে এমন কিছুর মুখোমুখি যা করতে অপছন্দ করি, তখন আপনার ফোনের দিকে নজর দিতে তাগিদ অনুভব করেন, তাই নয় কি? এইজন্য বিষয়টি খুবই কঠিন। যেমন শারীরিক স্থূলতা থেকে বাঁচতে নিয়ন্ত্রিত খাদ্য গ্রহণ প্রয়োজন হয়, তেমনই মানসিক স্থূলতা থেকে পরিত্রাণের জন্য আমাদের প্রয়োজন তথ্যের খাদ্য। আমরা যেমন খাদ্য নিয়ন্ত্রণ করি তেমন ভাবেই তথ্য, ম্যাসেজ, সংগীত ইত্যাদি গ্রহণ করাকেও নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করতে হবে।

এখন, আমাদের পুরনো আত্মবিনাশী অভ্যাস থেকে মুক্তি পেয়ে, আমাদের করটিসল স্তর বৃদ্ধি পেয়ে চাপ সৃষ্টি করে। এর কারণ হল পুরনো অভ্যাসগুলি খুবই শক্তিশালী হয়। সুতরাং যখনই আমরা সিগারেট, মদ অথবা মাদকদ্রব্য ছেড়ে দিই আমাদের মধ্যে তীব্র শারীরিক ও মানসিক যন্ত্রণাদায়ক প্রতিক্রিয়া দেখা দেয় (Withdrawal Symptoms)। একইভাবে আপনি যখন ইন্টারনেট, ম্যাসেঞ্জার, সংগীত, সামাজিক মাধ্যম ইত্যাদি থেকে বিরাম নেবেন সেক্ষেত্রেও সেরকম চাপ অনুভূত হবে। সেটা অনেকটা বিষক্রিয়া বা আসক্তি দূর করার ওষুধের মতো (Detoxification)। অনেকেরই এমন অভিজ্ঞতা হয়। বিশেষ ক’রে যারা সংগীতের প্রতি আসক্ত, সবসময় কানে ইয়ার ফোন বা আইপডে সংযুক্ত, শোনার পরও কানে ইয়ার ফোন থাকে, সেরকম অবস্থায় আপনার মাথায় তখনও গান ঘুরতে থাকে। তখন শান্ত হওয়ার জন্য অনেক সময় লাগে। আপনার মাথায় সংগীতের অনুরণন চলতে থাকে। আমি মনে করি সেটা খুবই সুন্দর দৃশ্য, আপনারাও সেটা জানেন।

আপনি কোন কাজ করতে পারছেন না, আপনি ভাবতে পারছেন না, কারণ আপনার মাথায় তো গান চলছে। বিশেষ করে গানের একটি পদই যখন বার বার বাজে সেটা আপনাকে পাগল করে দেয়। কিন্তু সেটাকে যদি আমরা সংরক্ষণ করি অর্থাৎ স্মরণে রাখি তাহলে উত্তোলনের ঐ চাপের স্তর ক্ষীণ হয়ে যাবে এবং আমরা চিত্তের প্রশান্তি লাভ করব। তারপর আমরা নেতিবাচক বা ক্ষতিকর অভ্যাস পরিবর্তন ক’রে সদর্থক অভ্যাসে পরিণত করার মতো অবস্থায় থাকব।

এরজন্য একটি খুব সুন্দর বৌদ্ধ পদ্ধতি রয়েছে, তবে সেটা শুধুমাত্র বৌদ্ধদের জন্য নয়। আমরা যেমন সমগ্র মানবজাতির অবিচ্ছেদ্য অংশ এবং আমরা সবাই একে অন্যের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত, তাই আমাদের মঙ্গল সকলের উপর নির্ভরশীল। অপরের সঙ্গে যুক্ত ও আবদ্ধ আছি এই অনুভূতির তৃপ্তি উক্ত পদ্ধতিতে আসে এবং সেটা খুবই মজবুত। সামাজিক মাধ্যম সমূহে যুক্ত থেকে এই অনুভূতি আসতে পারে না।

অক্সিটোসিন (Oxytocin) হরমোন

তারজন্য অক্সিটোসিন নামে একটি হরমোন রয়েছে। অক্সিটোসিন হরমোনটি হল স্নেহের বন্ধনের হরমোন, মা ও সন্তানের মধ্যে যেমনটি থাকে। একে অপরের মধ্যে বন্ধনের প্রয়োজনীয়তা আমাদের মধ্যে থাকা এই হরমোনটির জন্য বুঝতে পারি এবং সেটা আমাদের সেদিকে এগিয়ে দেয়। এর জন্যই আমি একটি গোষ্ঠীর সদস্য এই মনোভাবটিও আসে। এই হরমোনটি সদর্থক ভাবে তৃপ্তি দিতে পারে, যেমন আমরা সমগ্র মানব জাতির অংশ, আমরা সবাই সমান, সকলে সুখী হতে চায় কেউ দুঃখী হতে চায় না; এইরকম। ‘লাইক’ এর মতো বিষয় নির্ভর সামাজিক মাধ্যম নির্ভর ক’রে সুখী হওয়ার চাইতে এইভাবে অনেকবেশী তৃপ্ত হওয়া যায় এবং তা অনেক বেশি মজবুত।

হরমোন বিষয়ে এই সমস্ত তথ্য আমি একটি বিশেষ কারণে উত্থাপন করেছি। পরম পূজনীয় চতুর্দশ দালাই লামা প্রায়শই বলেন যে- “আমাদের একুশ শতকের বৌদ্ধ হতে হবে।” এর অর্থ হল বিজ্ঞান ও বৌদ্ধ উপদেশের মধ্যে সেতু নির্মাণ, এইভাবে বৌদ্ধ উপদেশাবলীতে যে বহু বিষয় আছে যা বিজ্ঞানের সঙ্গে সদৃশ রয়েছে সেটা দেখানো যেতে পারে। এই কারণে তিনি প্রায়ই বৈজ্ঞানিকদের সঙ্গে মিলিত হওয়ার জন্য ‘মন ও জীবন’ শীর্ষক আলোচনা চক্রগুলি আয়োজন করেন। এইভাবে তিনি দেখতেন ও বুঝতেন যেন উভয় পক্ষের (বিজ্ঞান-বৌদ্ধ উপদেশ) মধ্যে সাধারণ মিল কোথায় এবং কীভাবে জীবনের পূর্ণাঙ্গ চিত্র পাওয়ার জন্য একে অপরকে সাহায্য করতে পারে।

একান্ত দৈহিক ও জীববিদ্যার স্তরেও যদি আমরা বুঝতে পারি যে আমরা সুখ অনুভব করছি, আমরা ভাল আছি, তাহলে এর ভিত্তি হল দেহস্থিত নির্দিষ্ট কিছু হরমোন। তারপর আমরা যে কৌশল নিয়েছি যা এই হরমোনগুলিকে তৃপ্ত করতে পারে, তার বিশ্লেষণ করতে পারব আর কৌশলগুলি যদি কাজ না করে তাহলে সদর্থক, আত্ম-বিনাশী না হয়ে অন্য উপায়ের সুবিধা নেব, যেটা উপকারী হতে পারে।

প্রত্যাশার হরমোন ডোপামিন (Dopamine) এবং সৃষ্টিশীল লক্ষ্য

আমরা ডোপামিন নিয়ে আলোচনা করছিলাম; এটা হল পুরস্কারের প্রত্যাশা বা ওই জাতীয় বিষয়ের হরমোন। যেমন একটা সিংহ এন্টিলোপ হরিণ খাবার জন্য তাড়া করে, তেমন ভাবে এই হরমোনটি আপনাকে উত্তেজনার অনুভব করায়। ডোপামিন হরমোনের সুবিধা নেওয়ার জন্য আমরা কিছু ক্ষতিকর উপায় ব্যবহার করি যা বাস্তবে কাজ দেয় না- যেমন ফেসবুকের পাতায় আরও বেশি লাইক দেখার প্রত্যাশা ইত্যাদি।

অথবা একে তৃপ্ত করার জন্য আমরা কিছু নিরপেক্ষ উপায় গ্রহণ করতে পারি। আমার একজন ভারোত্তলক বন্ধু আছে। সে বর্তমানে ১৮০ কেজি ওজন তুলতে পারে এবং প্রত্যাশা করছে সে ২০০ কেজি ওজন তুলতে সক্ষম হবে। সে খুবই উত্তেজিত। পুরস্কারের আশা তাকে সুখী করছে। তারপরও, ধরুন সে ২০০ কেজি তুলতে পারল; কিন্তু একজন বৌদ্ধধর্মে বিশ্বাসী হয়ে আমরা বলব সেটা কি আপনাকে উন্নত পরজন্ম দিতে পারবে? ২০০ কেজি তুলতে সক্ষম হলে সেটা কি তাকে আরও ভাল পরজন্ম প্রদান করতে পারবে? সে তো সন্তুষ্ট হবে না; এখন সে ২১০ কেজি তুলতে চাইবে।

কিন্তু আমরা যদি এই ডোপামিন-এর লক্ষণকে কাজে লাগাতে চাই, যেমন ধরুন, শমথ লাভ করা অর্থাৎ পূর্ণ মনঃসংযোগ (একাগ্রতা) অথবা ধৈর্য ধরতে পারা, ক্রোধ প্রশমন ইত্যাদি, এসব ক্ষেত্রে সেটা খুবই উত্তেজক হয়ে দাঁড়ায়। “আমি যথেষ্ট ভাল নই, আমি এটা নিতে সক্ষম নই” এরকম হতাশাজনক অনুভবের পরিবর্তে আপনি তাকে নিয়ে কাজ শুরু করতে পারেন। ভাবতে পারেন- “আচ্ছা, এটি একটি কঠিন কাজ। এই কঠিন কাজটি সম্পন্ন করতে চেষ্টা করব ভেবেই আনন্দ লাগছে।”

ধ্যানের সময় কথিত উপদেশ নির্দেশ, কোনরকম প্রত্যাশা বা হতাশা ছাড়া আমাদের একে করার চেষ্টা করতে হবে। আপনি যদি প্রত্যাশা ক’রে থাকেন যে আপনি তাৎক্ষণিক ফল পেতে যাচ্ছেন তার মানে অবশ্যই আপনি হতাশ। সুতরাং কোন রকম প্রত্যাশা না রেখে আমরা লক্ষ্যে পৌঁছনোর জন্য কাজ করি। লক্ষ্যটি যদি অর্থবহ হয়, তাহলে সেই অনুযায়ী কাজ করি আর সেটা হয় সুখের উৎস। সেই সুখ, যা আমরা অনুভব করব তার একটি জীববিদ্যা সংক্রান্ত ভিত্তি আছে। অতএব, বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির সঙ্গে এর একটি সঙ্গতিপূর্ণ যোগাযোগ আছে; এই হল একুশ শতাব্দীর বৌদ্ধ মতবাদ। অন্যভাবে বলতে গেলে, কীভাবে এবং কেন বৌদ্ধ পদ্ধতিগুলি কার্যকর হয় সেটা আমরা বৈজ্ঞানিকদের কাছে গ্রহণযোগ্য করে তোলার মত ব্যাখ্যা করতে পারি। এটাই হল এর উদ্দেশ্য।

ত্রি-অধিশিক্ষা (উচ্চ শ্রেণীর তিনটি প্রশিক্ষণ)- আত্ম-শৃঙ্খলা (শীল), একাগ্রতা (সমাধি) এবং প্রভেদমূলক চেতনা (প্রজ্ঞা)

সংক্ষেপে, মুক্ত হওয়ার জন্য আমাদের সংকল্প বিকাশ করতে হবে যাকে আমরা বৌদ্ধধর্মে বলি পরিত্যাগ। তারপর পুরনো নেতিবাচক অভ্যাসগুলি থেকে নিজেকে মুক্ত করার জন্য আমাদের আত্ম-শৃঙ্খলা, একাগ্রতা এবং প্রভেদমূলক চেতনায় নিজেকে প্রশিক্ষিত করা প্রয়োজন। এই হল তথাকথিত তিনটি শিক্ষা বা প্রশিক্ষণ। কোনটি উপকারী কোনটি ক্ষতিকারক, কোনটি কাজ করবে কোনটি কাজ করবে না তার পার্থক্য বোঝার জন্য মনসংযোগে একাগ্র চিত্ত হতে হবে। অবশেষে শৃঙ্খলা সেই অনুযায়ী আমাদের আচরণ পরিবর্তন করবে।

আত্ম-শৃঙ্খলা বাঁধা- অনুশোচনা

এই তিনটির কাজ একসঙ্গে সমন্বয় সাধন ক’রে করতে হবে। কিন্তু এগুলির সঠিক বিকাশের জন্য তাদের বাধাসৃষ্টিকারী বিষয়গুলি থেকেও মুক্ত হতে হবে। অনুশোচনা আমাদের আত্ম-শৃঙ্খলা বাধা সৃষ্টি করে। উদাহরণ স্বরূপ, ইন্টারনেট দেখিনি, কোন ম্যাসেজ বা মেল এর তৎক্ষণাৎ প্রত্যুত্তর বা জবাব দেয়নি বলে আমরা অনুশোচনা করি, দুঃখিত হই। দিনের একটি নির্দিষ্ট সময়ে দেখার যে শৃঙ্খলা রাখার কথা হচ্ছে, সেরকম অনুশোচনা তাতে বাধা সৃষ্টি করে।

কার্যকর কৌশলটি হল নোটিস এলার্মটি বন্ধ করে দেওয়া। নতুন মেল পেয়েছ এরকম বিপদাশঙ্কা যা আমাদের কম্পিউটার বা মোবাইল ফোনে আসে সেটা বন্ধ করা উচিত। দিনের একটি নির্দিষ্ট সময়েই তা দেখা উচিত। শুধু গুরুত্বপূর্ণ বার্তাগুলিরই তৎক্ষণাৎ উত্তর দিন। অন্য প্রশ্ন-উত্তর দেওয়ার জন্য সময় নিন, অবসর সময়ে বা নির্দিষ্ট সময় যখন আপনি উপযুক্ত মনে করবেন তখন উত্তর দিন, অর্থাৎ যখন আপনি ব্যস্ত নন তখন এরজন্য আত্ম-শৃঙ্খলা প্রয়োজন। আমাকেও স্বীকার করতে হবে যে আমিও এই দোষে দোষী এবং প্রচুর মেল সামলানোর জন্য আমি একটা কৌশল নিয়েছি। আমি সামাজিক মাধ্যমে নেই এবং আমি এরকম ম্যাসেজ পাই না। কিন্তু দিনে অন্তত তিরিশটি মেল পেয়ে থাকি। আমি করি কি, তৎক্ষণাৎ উত্তর দেওয়ার পরিবর্তে, আমি দেখি কোনটি বেশি গুরুত্বপূর্ণ এবং সেটার উত্তর দিই, আর বাকীগুলি রেখে দিই। আমি জানি সন্ধ্যা বেলা যখন লেখা বা অন্য কোন গুরুত্বপূর্ণ কাজের জন্য মন খুব একটা স্বচ্ছ থাকে না তখন আমি সেগুলির উত্তর দেবো। সুতরাং, আপনারা একটি নির্দিষ্ট সময় স্থির করতে পারেন। নতুবা আপনি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলবেন।

একাগ্রতায় বাধাঃ তন্দ্রা, নিস্তেজতা এবং অস্থির চিত্ততা

তন্দ্রা, নিস্তেজতা এবং অস্থির চিত্ততা হল আমাদের একাগ্রতার পক্ষে বাধাস্বরূপ। অনবরত ম্যাসেজ দেখা থেকে দূরে থাকলে জীবন অনেক সহজ হবে, এই সত্যের একাগ্রতা উক্ত যেকোন একটি বিষয় ভঙ্গ করতে সক্ষম। এই লক্ষ্যে স্থির থাকতে হলে মনে রাখবেন, স্মৃতি একেই বোঝায়।

মনে রাখতে চেষ্টা করবেন যে, আমার জীবন হবে অনেক চাপমুক্ত, অস্থিরতা রহিত, যদি আমি মেনে নিই যে, আমি অধিকাংশ ম্যাসেজ-এর উত্তর সন্ধ্যা বেলায় দেব, এরকম বলা যাক। অথবা সে সময়ই দেখব যে সময়টা আমরা স্থির করব। একমাত্র তখনই আমরা এদের দেখব, তখন যে বাধা উৎপন্ন হয় সেটা হল আপনি তন্দ্রাচ্ছন্ন, আপনি ক্লান্ত এবং তাই আপনি ভুলে যান। আর এইভাবে আপনার ফেসবুক পেজে যাওয়া সহজ হয়ে যায় অথবা আপনি নিস্তেজ অবসন্নতা অনুভব করেন। আপনি উঠে এক গ্লাস জল পান করা এরকম কিছুর পরিবর্তে ইন্টারনেটে ঢুকে পড়লেন। অথবা অস্থির হয়ে পড়লেন- আমার মন বিভিন্ন জায়গায় উড়ে বেড়াচ্ছে এবং সেটা ঘটছে আর আপনি কোন কিছু চিন্তা-ভাবনা না ক’রে ম্যাসেজের উত্তর দিয়ে দিলেন। আপনি পড়তে যান- ‘আমি কোন কিছু বাদ দিতে চাই না’।

প্রভেদমূলক সচেতনতার বাধাঃ অনিশ্চিত সংকল্পে স্থির না থাকা এবং সন্দেহ

সর্বশেষে, সংকল্পে স্থির না থাকার জন্য আমাদের প্রভেদমূলক সচেতনতায় বাধা আসে। আমরা শুধুমাত্র একটা নির্দিষ্ট সময়ে ম্যাসেজগুলি দেখব- সেটা কি সঠিক সিদ্ধান্ত নিলাম? এরকম অনিশ্চিত কিছু চিন্তা ক’রে সংকল্পে স্থির থাকতে পারি না। এই অনিশ্চয়তার জন্য আমাদের মধ্যে সংশয় জাগে।

এরকম সংশয় জাগার কারণ হল, ম্যাসেজ দেখা থেকে বিরত থাকা কঠিন ও চাপের বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। এরকম সংশয় মোকাবিলার জন্য আমাদের অভ্যাস পরিবর্তনের সুবিধাগুলি, যেমন- যদি সঠিকভাবে সুবিন্যস্ত ক’রে বিষয় গুলির যত্ন নিতে পারি তাহলে আমার জীবন অনেকটা পরিপূর্ণ হবে, এই কথাগুলি স্মরণে রাখতে পারি। নতুবা সেটা হবে বিশৃঙ্খলা আর বিশৃঙ্খলা মানেই হল চাপ।

সমতা এবং করুণা

আমাদের জীবনকে সুখী করার জন্য অন্য কৌশলও আছে যেটা আমরা গ্রহণ করতে পারি। উদাহরণ স্বরূপ, একটা ভিড়ে পরিপূর্ণ মেট্রোতে আমরা কীভাবে সামলে নিই। আমরা যত নিজের দিকে লক্ষ্য রাখি এবং নিজেকেই শুধু নিরাপদে রাখতে চাই এবং মোবাইলে পালিয়ে বাঁচি আমরা ততই নিজেকে আবদ্ধ অনুভব করি। মেট্রোতে শান্তভাবে সময় কাটানোর কথা বলছি না, যে ক্ষেত্রে আপনাকে অনেক দূরে যেতে হবে আর আপনি বই পড়তে বসলেন। আপনি যখন মোবাইলে পালিয়ে গেলেন অর্থাৎ মোবাইল দেখা, গান শোনা বা খেলা দেখছেন তার কথা বলছি।

আমরা যত বেশী নিজেদের উপর লক্ষ্য রাখব এবং নিজেদের রক্ষা করত চাইব, মোবাইলের জগতে ডুবে যাব, এর সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা অনুভব করব, আমাদের শক্তি নিঃশেষিত হতে থাকবে এবং আমরা আরও বেশি চাপ অনুভব করব। আমরা স্বস্তি পাব না, কারণ আমরা বিপদের আশঙ্কায় ভীত। বিশেষ ক’রে, এই মস্কোতে, এখানে মেট্রোতে অবিশ্বাস্য রকমের ভীড়। বার্লিনে এতটা ভীড় হয় না।

এমনকি আমরা মোবাইলে খেলতে খেলতে যখন মগ্ন হয়ে পড়ি বা আইপডে উচ্চ স্বরে গান শুনতে থাকি, আমরা আমাদের চারপাশে দেওয়াল তুলে দিই, কোনরকম বাধা চাই না, ফলে আমরা রক্ষণাত্মক হয়ে পড়ি। এটি খুবই অস্বস্তিকর অভিজ্ঞতা, এমনকি কেউ আমাদের খেয়াল রাখুক এমনটি চাইলেও, তাই হয়। আমরা শান্তি পাই না। অন্যদিকে, আমরা যদি মেট্রোর এই বিপুল জনতার মধ্যে আমিও একজন, এমন ভাবি এবং আমি যে অবস্থায় আছি তাতে অন্যদেরও এই অবস্থায় কী কষ্ট হয় সেটা বুঝে ওদের প্রতি ভাবনা ও করুণার উদ্রেক করতে সক্ষম হই, তবে তাতে আমাদের মন ও হৃদয় উদার হবে। অবশ্যই আমরা বিপদের বিষয়ে সতর্ক থাকব কিন্তু শুধুমাত্র নিজের কথা ভেবে আতঙ্কিত হব না। আমরা চাইব সবাই নিরাপদে থাকুক। আমরা সকলকে সংগীত বা খেলাধূলায় নিমজ্জিত করতে চেষ্টা করি না। তাতে আমরা নিজেদের নিঃসঙ্গ করে তুলব। আমরা নিজেদের নিঃসঙ্গ, একা করতে চাই না।

সকলের প্রতি খোলামনের অনুভব

যেটা সবচেয়ে বেশি উপকারী হবে তা হল সকলের প্রতি মন খুলে দেওয়া, কিন্তু খোলা হতে গেলেও সেটা অতি স্পর্শকাতর, কোমল হয়। যদি আপনার মধ্যে একটি মূর্ত ‘আমি’-কে আঁকড়ে ধরে রাখেন এবং ভাবেন যে এবার আমি খোলা, এখন আমি আক্রম্য, এখন আমি মর্মাহত হতে যাচ্ছি; ঐরকম ভাবে তা করা যাবে না। সকলের জন্য ভাবনাতেই খোলা যায়; অন্যদিকে বিষয়টি প্রাণীদের মৌলিক বৈশিষ্ট অর্থাৎ আমিও দলের একজন এই ভাবনায় সন্তুষ্টি প্রদান করে। আপনি যখন দলের একজন, সেই অবস্থায় আপনি নিরাপদ অনুভব করবেন, দল থেকে নিঃসঙ্গ হয়ে নয়।

সুতরাং প্রাণীদের স্তরে সেটা কাজ করে। আমাদের চারপাশের দেওয়ালটি ভেঙে আমাদের আমিত্ব ভাঙার সময়ও সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। মনে হতে পারে- “এখন আমাকে সবাই আক্রমণ করবে।” যদি আপনি সেটা করতে পারেন তাহলে এটি খুবই তৃপ্তিদায়ক পদ্ধতি হবে। এটা করার জন্য আমাদের আত্ম-শৃঙ্খলা, একাগ্রতা এবং প্রভেদমূলক সচেতনতাকে সংযুক্ত করতে হবে।

প্রচন্ড কাজকর্ম থেকে কার্যকর বিরতি গ্রহণ

আমাদের জীবনের চাপ থেকে নিবৃত্তি লাভের আরও নানা রকম কৌশল রয়েছে। এমনকি খুবই সাধারণ পদ্ধতিও আছে। যেমন- ধরুন, প্রচন্ড কাজ-কর্ম থেকে যদি একটু বিরাম নিতে হয় তখন ইন্টারনেট দেখার পরিবর্তে, উঠে দাঁড়ান, একটু জলপান করুন, জানালা দিয়ে বাইরের দিকে দেখুন, এমনতর কিছু করুন। অন্যভাবে বলতে গেলে, বেশী উদ্দীপনা থেকে কম উদ্দীপনা ভাল। অতিরিক্ত উদ্দীপনা থেকেই চাপ সৃষ্টি হয়। আপনি আরও বেশি উদ্দীপনা উৎপন্ন হলে সেটা দূর করতে পারবেন না। কম অপেক্ষাকৃত উত্তম।

আত্ম-শৃঙ্খলা, একাগ্রতা এবং প্রভেদমূলক সচেতনতার মত তিনটি প্রশিক্ষণ প্রয়োগ ক’রে আমাদের দৈনন্দিন জীবনের চাপ হ্রাস করা থেকে আত্মবিনাশী অভ্যাসগুলি মুক্ত হওয়ার দৃঢ় অঙ্গীকার করতে পারি। কর্মক্ষেত্র, পরিবার, অর্থনৈতিক অবস্থা ইত্যাদির চাপ মোকাবিলার জন্য আমাদের মন অনেক শান্ত থাকবে। বিশেষ ক’রে আধুনিক যুগে যেখানে ইন্টারনেট, সামাজিক মাধ্যম বা সংগীতের মতো বিষয়গুলির প্রাচুর্যের পরিস্থিতিতে তাদের সামলানোর বিষয়টা অনেক কার্যকরভাবে করা যাবে। এর মানে এই নয় যে আমরা ইন্টারনেট ব্যবহার করব না, হাতের মোবাইল ছুড়ে ফেলে দেব বা কখনও গান শুনবো না; না, এর অর্থ তাই নয়। বরং এটা এই শেখায় যে কীভাবে এই সমস্তকে স্বাস্থ্যকর ও উপকারী উপায়ে ব্যবহার করা যায় এবং এরজন্য ভাল পরিকল্পনার ও অভ্যাসের বিকাশ করতে পারি। ধন্যবাদ।

প্রশ্নঃ

সমস্যা হল যে আধুনিক জীবনে বহু বিষয়ে আমাদের প্রতিক্রিয়া করতে হয়। উদাহরণ স্বরূপ, আমাদের যদি খবর দেখতে হয়, সেটা শুধু আমাদের মনের আবিষ্ট অবস্থায় দেখি বা পড়ি না, বরং আমাদের করণীয় কী এবং কোনকিছুর প্রতি কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানাব, সেটা জানতে চাই। উদাহরণ স্বরূপ, জিনিসপত্রের দর, কোন কোন সময় অনলাইনে দেখানো হয়, সেটা কীভাবে পরিবর্তিত হচ্ছে এবং আমাদের হয়তো সেই অনুযায়ী কাজ করতে হয়। অথবা কেউ হয়তো আপনাকে খবর পাঠান যে কোন একজন ব্যক্তি অসুস্থ এবং তার সহায়তা দরকার বা আমাদের সহকর্মী কিছু জানতে চেয়ে লিখে পাঠিয়ে দিল এবং সেটা না দেখলে আমরা ওর বিষয়টি পাবো না। আবহাওয়ার কথাই ধরা যাক, আমরা যদি সকালে আবহাওয়ার খবর না দেখি এবং বেরিয়ে পড়ি, তাহলে হয়তো ঠান্ডা লাগতে পারে; আমরা জানতাম না, ফলে অসুস্থ হয়ে পড়তে পারি। উক্ত সমস্ত বিষয়ে আমাদের যোগ্যতা বা সক্ষমতা হ্রাস পায় এবং আমরা হয়তো স্বাস্থ্য ইত্যাদি বিষয়ে কালক্ষেপ ক’রে বসি।

এই কারণে আমি বলেছি যে ইন্টারনেট ব্যবহার করার জন্য আমাদের একটি স্বাস্থ্যকর ও বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে রচিত কৌশলের বিকাশ করতে হবে। আমরা যদি শারীরিক স্থূলতার জন্য খাদ্য নিয়ন্ত্রণ করি তার মানে এই নয় যে আমরা সব খাবারই বন্ধ করে দেব। একই রকম ভাবে আমাদের যদি তথ্যের প্রাচুর্য থাকে, আমরা কী দেখব এবং কী দরকার সেটা দেখব। কী সহায়ক হবে সেটা দেখা যেতে পারে। অন্ততঃ আমার ই-মেল এর বিষয়ে যেমনটি বলেছি, আপনি কিছু চিহ্ন দিয়ে রাখতে পারেন যেটা পরে দেখতে পারেন।

কিন্তু এই কৌশল বলতে চাইছে যে কোন বিষয়ে আমরা যা কিছু তথ্য পাব সেটা গ্রহণ ক’রে উত্তর দেওয়ার বা না দেওয়ার জন্য বেছে নেব, তবুও তো সব ম্যাসেজগুলি পড়তে হবে এবং আমরা সব খবর পড়ি, এইভাবেই চলতে থাকে।

আবারও, আপনাকে ভিন্ন ভিন্ন কৌশল গ্রহণ করতে হবে। সকালে উঠে, আবহাওয়ার খবর দেখা আর সারা রাত্রে কয়টি ‘লাইক’ পেলেন, সেটা চেক করার মধ্যে পার্থক্য আছে। কতটি লাইক পেলেন সেটা দেখতে হবে না। আর আপনি যে সমস্ত ম্যাসেজ পেলেন তার মধ্যে কিছু হবে বিজ্ঞাপন, কিছু এসেছে আপনার কাজের ক্ষেত্রে এটা ততটা গুরুত্বপূর্ণ নয়, এমন স্বল্প পরিচিতদের কাছ থেকে ইত্যাদি কিছু অবশ্যই আপনি পরে সামলাতে পারবেন। আপনার অ্যাড্রেস বুক দেখে কোনটি গুরুত্বপূর্ণ আর কোনটি ততটা নয় সেটা নিজেই জানতে পারেন। আমার একজন বন্ধু আছেন যিনি প্রাতঃরাশ তৈরী ক’রে ছবি তুলে সবাইকে পাঠিয়ে দিতে পছন্দ করেন। আমি অবশ্যই সেটা দেখি না।

তিনি জানেন যে আপনি দেখেন না?

আমি সেটা পরে দেখব, কিন্তু অবশ্যই আমার কাজ বন্ধ ক’রে সেটা দেখব না।

‘ভাল আছি’ এই হরমোনের প্রভাবজাত এই অনুভবের কথা অন্য ধর্মগুলিও বলে। তাদের সঙ্গে বৌদ্ধ মতবাদের পার্থক্য কোথায়?

এটা সত্য যে অন্য ধর্মগুলিও সেটা অবশ্যই দিতে থাকে। যেমন ধরুন, ‘যীশু আমায় ভালবাসেন’, ‘ভগবান আমায় ভালবাসেন’ জাতীয় বাক্য স্বীকার ক’রে নিলে সেটা লক্ষ্যে পৌঁছতে সাহায্য করে। এগুলি সত্যিই আছে। যে পদ্ধতি আমি আপনাদের বলেছি সেটা একান্তভাবেই বৌদ্ধধর্মের বিষয় নয়। এগুলি যেকোন ধর্মীয় পরিসর ছাড়াই পাওয়া যায়। এগুলি সাধারণ কৌশল যা সকলের জন্য হিতকর। আমি যা বলছিলাম সেটা সবই পূর্ণতঃ বৌদ্ধ মতবাদে সীমাবদ্ধ নয়।

আমরা যখন জিজ্ঞাসা করি তবে কোনটি একান্তই বৌদ্ধ, সেটা হয়ে যায় খুবই সূক্ষ্মস্তরের বাস্তব দৃষ্টিভঙ্গি। আর বৈজ্ঞানিকদের সঙ্গে আলোচনায় যেটা উঠে আসে সেটা অদ্বিতীয় না হলেও কোয়ান্টাম জগতের সঙ্গে তার মিল আছে। আপনি যদি জগতের গঠনের বিষয়ে যুক্তিযুক্ত সিদ্ধান্তে উপনীত হতে চান তাহলে আপনি শূন্যতা ও পারস্পরিক নির্ভরতা বা প্রতীত্যসমুৎপাদ তত্ত্বের বৌদ্ধ উপদেশ পাবেন।

যখন আমাদের কারও সঙ্গে দেখা করতে যেতে হবে এবং যাবার পর দেখলাম তিনি তার মোবাইল নিয়ে ব্যস্ত আর আমাদের দিকে তার ততটা মনোযোগ নেই, তখন আমাদের কী করতে হবে? এরকম অবস্থায় লোকটিকে কি খুলে বলা উচিত যে বিষয়টা ভাল হচ্ছে না এবং আমাদের সাক্ষাৎটি গুরুত্বপূর্ণ?

ব্যক্তিগতভাবে আমি তাই মনে করি। আমি মনে করি “এই যে, আমি এসেছি” লোকটিকে এরকম বলা যথাযথ হবে। মোবাইল ফোন নিয়ে একটি শিষ্টাচার অবশ্যই আছে। বিষয়টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়ায় যখন আপনারা মাতা-পিতা হন এবং আপনাদের কিশোর-কিশোরী সন্তান আছে, ডিনার টেবিলে ফোনে কথা বলা বা ম্যাসেজ না করতে বলে আপনি শৃঙ্খলা শেখাতে পারেন। হ্যাঁ, আপনি বলবেন এর অনুমতি নেই এবং আপনি ফোনটি সরাতে তাদের বাধ্য করতে পারেন। আমার একজন আমেরিকান অধ্যাপক বন্ধু তার ছাত্র-ছাত্রীদের ফোন তাদের ক্লাস চলাকালীন একটি আলাদা ডেস্কে রাখতে বাধ্য করতেন। তাদের বসার জায়গায় মোবাইল রাখার অনুমতি দেন না। আমি মনে করি সেটা একেবারে সঠিক কাজ। মজার কথা হল, তিনি ছাত্রদের প্রতি ৪৫ বা এক ঘন্টা অন্তর টেলিফোনের জন্য বিরতি দিতেন, আমার ঠিক মনে নেই। আলোচনা সভাটি তিন ঘন্টার ছিল। এমন নয় যে ছাত্রদের শৌচালয়ে যেতে হতো, কিন্তু ব্রেক পড়লেই ওরা মোবাইল দেখার জন্য ছুটে যেত কিছুতেই না দেখে থাকতে পারত না। সমাজবিদ্যার দৃষ্টিকোণে বিষয়টি খুবই কৌতুহলজনক।

এটি সত্যিই একটি দীর্ঘস্থায়ী আসক্তি। কোন কোন সময় অপরকে কিছুটা সামাজিক শৃঙ্খলা শেখানোর জন্য আপনাকে উদ্যোগী হতে হবে। তবে যদি সেটা কোমলভাবে করা যায় আমি মনে করি সেটা ঠিকই হবে। সেখানেও একটি পার্থক্য আছেঃ সেখানে কি সাংঘাতিক কিছু আছে যা তাদের জানতে হবে, নাকি গুরুত্বপূর্ণ নয় এমন বিষয়ে চ্যাট করছে। একটু বাস্তববাদী হওয়া যাক, আমরা ফোনে কতবার দুর্ঘটনার খবর পাই? আপনাদের সঙ্গে যদি কোন ব্যক্তির দেখা হয় আর তখন আপনার সন্তানের নিরাপদে বাড়ি পৌঁছে যাওয়ার খবর শুনতে ফোনের প্রতিক্ষা করছেন, সেই মুহূর্তে সেটা পেলে লোকটিকে বলে দিতেই পারেন বিনম্র হোন, বলুন- “আমি একটি ফোনের অপেক্ষা করছি। আমার সন্তান নিরাপদে বাড়ি পৌঁছেছে সেটা নিশ্চিত হতে চাই।” তাহলে ওরা বুঝবেন, সবই পরিষ্কার হয়ে যাবে।

আমি যখন সাবওয়েতে মেট্রোয় চলাফেরা করি, আমি সবসময় গান শুনি কিন্তু আমি আরও বেশি উত্তেজনা অনুভব করার জন্য সেটা করি না বরং প্রকৃতপক্ষে নেতিবাচক উত্তেজনা প্রশমনের জন্য গান শুনি। তার কারণ আমার চারপাশের লোকজন কখনও এমন সব কথাবার্তা বলে যেটা আমি শুনতে চাই না। সে সব কথাবার্তায় প্রচুর নেতিবাচক বিষয় থাকে। তারপর মেট্রোতে থাকে বিজ্ঞাপন, যা আপনি জানেন। তাই এইসব নেতিবাচক উদ্দীপনা থেকে বাঁচতে আমি গান শুনি। আমি কি পালিয়ে যাচ্ছি? নাকি আমি নেতিবাচক গভীর প্রভাব বিস্তারকারী উদ্দীপকগুলিকে স্বল্প প্রভাব ও কম বিনাশী উদ্দীপকে পরিবর্তন করছি?

এটি খুবই আকর্ষক প্রশ্ন। প্রথমেই আমার মনে একটি ভারতীয় জবাব এল। হয়তো সেটা যথাযথ উত্তর হবে না। আপনি যখন সারারাত ব্যাপী একটি ভিডিও কোচে যাত্রা করছেন, এমন বাস যাতে ভিডিও চলে এবং সেটা সারারাত চালু থাকে। একটি সিনেমা বারবার চলতে থাকে, শব্দ থাকে উচ্চগ্রামে। যদি চালককে বলেন- “আপনি কি আওয়াজ একটু কম করতে পারেন?” বা এমন কিছু বলেন, ভারতীয় জবাব হবে- “শোনো না।”

মেট্রোতে অন্যরা কি বলছে সেটা আপনার শোনার দরকার নেই। এটি মনোযোগের বিষয়। আপনি কীসে মনসংযোগ করছেন? আপনার মনোযোগ যদি সমস্ত মানুষ হয়, তাদের দেখেন, বলা যাক তাদের মুখমন্ডলের ভাবভঙ্গী, হয়তো তারা খুব আনন্দে নেই। তাহলে তাদের জন্য পরম করুণায় প্রার্থনা করুন ওরা যেন তাদের দুঃখকষ্ট থেকে মুক্তি পায়। সুখী হয়। তাহলে ওরা কী বলছে সেটাতে আপনার মন যাবে না। বিজ্ঞাপনেও আপনার দৃষ্টি পড়বে না। আপনার মনোযোগ থাকবে অন্য কোন বিষয়ে।

সেটা যদি না করতে পারেন, তাহলে সংগীত চলতে পারে। কিন্তু মানুষকে উপেক্ষা করার জন্য সংগীত একটি অজুহাত হওয়া উচিৎ নয়। করুণার অনুশীলনের জন্য এটা হল একেবারে সঠিক সুযোগ।

‘তোংলেন’ (আদান-প্রদান) এর মৌলিক নীতির কথা চিন্তা করুন, এটা হল দেওয়া-নেওয়ার বিষয়ে উন্নত বৌদ্ধ অনুশীলন বা সাধনা। এতে করবেন কি, অন্যদের সরিয়ে দেওয়া বা আপনার চারদিকে অদৃশ্য দেওয়াল না তুলে অন্যরা যা বলছে সেটা স্বীকার করে নিন। এইভাবে আপনার মন খুলে যাবে। ওরা যা বলছে আপনি স্বীকার ক’রে নিলেন, সেটা নেতিবাচক বা মামুলি কথাবার্তা মাত্র। তারপর আপনি তাদের জন্য কামনা করুন যে ওদের যেটা মনোবেদনার কারণ সেটা থেকে যেন ওরা বেরিয়ে আসতে পারেন। ওঁরা সদর্থক বিষয়াদিতে আরও বেশী ক’রে যুক্ত হতে সক্ষম। সুতরাং বিষয়টা ‘তোংলেন’ অনুশীলনের জন্য একটি মস্ত বড় সুযোগ।

প্রায়ই, মুক্ত হওয়ার জন্য আমরা প্রথমে যখন মনস্থির করি, একটা সময়ে সেটা কমে যায় এবং হতে পারে আলস্যজনিত কারণে আমরা সেটা অনুভব করতে পারি না। সেরকম ঘটলে কী করব, কীভাবে সেটা পুনরায় জাগিয়ে তুলব?

সাধারণতঃ প্রধান যে উপদেশটি দেওয়া হয় সেটা হল আমরা যা থেকে মুক্ত হওয়ার জন্য মনস্থির করেছি তার ক্ষতিকর দিকগুলি স্মরণ করা; এর সঙ্গে যা কিছু দুঃখজনক পরিস্থিতি এবং সেটা থেকে মুক্ত হলে কী উপকার হবে এসবেরও স্মরণ করা। এই মুক্ত হওয়ার প্রয়াসে আমরা যে পদ্ধতি গ্রহণ করেছি, সেটা শুধু কার্যকর নয়, এটা আমরা করতেও পারব, এইভাবে নিজেকে বুঝিয়ে পুনরায় ইচ্ছাশক্তি জাগিয়ে তুলতে হবে। এসবই মুক্ত হওয়ার কামনায় খুবই গুরুত্বপূর্ণ অংশ। অন্যকথায় বলতে গেলে আমাদের নিজেকে স্মরণ করিয়ে দিতে হবে যে “আমি এটা থেকে মুক্ত হতে পারি এবং আমি এরজন্য কঠিন কাজ করছি।” নইলে আপনি শুধু নিরুৎসাহিত হবেন এবং আপনি কিছুই করবেন না, একসময় ছেড়েও দেবেন।

আমরা যদি ধ্যান সাধনা করি সেটা আমাদের অনেক সুস্থিত করে এবং মোটামুটি এইটুকু আমাদের প্রাপ্তি হয়। কিন্তু নিজেদের আরও বেশি স্থির করার জন্য যখন আমরা ওষুধ খাই তাতে অনায়াসে সেটা হয় কিন্তু এতে আমাদের কোন পরিবর্তন হয় না। একজন মানুষ যখন অসুস্থ হন তখন ওষুধ নেওয়ার অবশ্যই প্রয়োজন আছে। কিন্তু যদি কেউ তার দৈনন্দিন অবস্থায় চাপ এবং মনে অন্যান্য নেতিবাচক প্রভাব কমানোর জন্য কিছু নেয় তখন কী হবে?

আমি মনে করি বৌদ্ধ পদ্ধতিগুলির বিষয়ে আমাদের বাস্তববাদী হতে হবে। যারা ইতিমধ্যে পরিপক্কতা এবং স্থিরতার কিছু নির্দিষ্ট স্তর পর্যন্ত পৌঁছে গেছেন এমন ব্যক্তির পক্ষে বৌদ্ধ পদ্ধতিগুলি যথেষ্ট কার্যকর। আপনি যদি আবেগ, মানসিক দিক দিয়ে বিপর্যস্ত অবস্থায় থাকেন সেক্ষেত্রে আপনি বৌদ্ধ পদ্ধতিগুলি প্রয়োগে অসমর্থ হবেন। আপনাকে কিছুটা স্থির হতে হবে এবং এই অবস্থায় ওষুধ খুবই উপকারী হতে পারে। সেটা হতে পারে ঘুমের ওষুধ বা হতাশা নিরোধক যাই হোক না কেন কাজে লাগবে। সহায়ক হিসেবে আপনার কিছু প্রয়োজন আছে। “আচ্ছা ধ্যান করা যাক”, যারা এমন বলে, তারা কিন্তু এখনও তৈরী নয়। কিন্তু আপনার যখন কিছুটা স্থিরতা আসবে তখন অবশ্যই আপনাকে ওষুধের আসক্তি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। তারপর যখন আপনি আরও বেশি স্থির, অটল হবেন তখন আপনি সেরকম মন নিয়ে ধ্যান সাধনা করতে পারেন। তার আগে আপনি তো বিপর্যস্ত, তাই মনোসংযোগ করতে পারবেন না।

বার্মাতে রেষ্টুরেন্টের বিজ্ঞাপনে ‘বুদ্ধ কানে হেডফোন লাগিয়ে রেখেছেন’ এমন ছবি দেওয়ায় তিনজনকে কারাদন্ড দেওয়া হয়েছিল, বৌদ্ধ দৃষ্টিকোণে আপনি এর উপর কী মন্তব্য করবেন?

বুদ্ধের ঈর্ষাপরায়ণ তুতোভাই দেবদত্ত সবসময় বুদ্ধের ক্ষতি করতে চাইত। কিন্তু বুদ্ধের তো ক্ষতি করা যায় না এবং তিনিও তাতে অবশ্যই ব্যথিত হতেন না। সুতরাং কানে হেডফোন লাগানো ছবি দেখে বুদ্ধও নিশ্চয়ই রাগ করবেন না। কিন্তু বৌদ্ধ বা অন্য সকল ধর্মের অনুসরণকারীদের কাছে যখন তাদের প্রধান ব্যক্তিত্বদের প্রতি অশ্রদ্ধা দেখেন সেটা তাদের কাছে খুবই অপমানজনক বোধ হয়, অসহ্য লাগে। মানুষকে বিক্ষুব্ধ করা কোন কাজের কথা নয়, এটা হল নিষ্ঠুরতা। তাদের জেলে ভরে দেওয়া বা খুব বেশী জরিমানা করা সম্ভবত ঠিক নয়। যাইহোক, এটা তাদের করা উচিত ছিল না। বাক্ স্বাধীনতার অর্থ এই নয় যে মানুষকে বিক্ষুব্ধ করার স্বাধীনতা পেয়ে গেলাম, বিশেষ করে, আপনি যখন বোঝেন যে এতে মানুষকে খেপিয়ে তুলতে পারে। এখন প্রশ্ন হল কী অপমানজনক এবং কী নয়, সেটা কে বিচার করবে এবং সেখানে (ক্ষমতার) অপব্যবহারের সুযোগ থাকতে পারে। কিন্তু এটা যখন ধর্মের ক্ষেত্রে আসে, যেমন যীশু, মহম্মদ বা বুদ্ধের প্রতি অশ্রদ্ধাজনক কিছু করা হয়, এটা নিশ্চিত যে সেটা গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। একটি নতুন আইপডের বিজ্ঞাপনে যদি দেখানো হয় যীশু ক্রুশে তাঁর আইপড থেকে হেডফোন লাগিয়ে শুনছেন, খ্রিষ্টানদের কাছে কেমন লাগবে? গোঁড়া খ্রিষ্টান বিশ্বাসীগণ সেটা পছন্দ করবেন বলে আমি মনে করি না। 

আমরা আধ্যাত্মিক মোক্ষ বা জাগতিক লক্ষ্য প্রাপ্তির জন্য চেষ্টা করতে পারি। আমি দেখেছি সেখানে দুটি অতি (চরম অবস্থা) থাকতে পারে। একটি হচ্ছে জাগতিক লক্ষ্যে মনসংযোগ কিন্তু এক্ষেত্রে সেটা হল অসীম এবং আপনি একটা লক্ষ্য পুরণ করতে পারেন। তারপর আর একটি। অপরটি যা আমি বৌদ্ধ সমাজে দেখতে পাই, উদাহরণ স্বরূপ, ওরা আধ্যাত্মিক লক্ষ্য অর্জনের চেষ্টা করে, কিন্তু ওরা জাগতিক লক্ষ্য ভুলে যায়। এই বিষয়টির সমাধান এবং ভারসাম্য আনয়নে কি কোন পদ্ধতি বা পথ রয়েছে? 

পরমপূজ্য দালাই লামাজী বলেন সেটা ৫০/৫০। আমাদের জীবনের বাস্তবতা কী সেটা আমাদের দেখতে হবে। আমাদের দায়িত্ব-কর্তব্য, আমাদের অর্থনৈতিক অবস্থা, আমাদের উপর নির্ভরশীল কি কেউ আছে? তাও দেখতে হবে। অতএব বাস্তববাদী হন।

Top