অকুশল কর্মপ্রবৃত্তি বিবেচনা করা

অন্যান্য ভাষা সমূহ

আমাদের অকুশল কর্মপ্রবৃত্তি বা গঠনমূলক কর্মপ্রবৃত্তি থেকে যথাক্রমে অসংখ্য প্রকারের অকুশল বা গঠনমূলক কর্মের উদ্ভব হয়। যদিও আমাদের সমস্ত কর্ম আমাদের তিনটি প্রবেশদ্বারের – কায়, বাক বা চিত্ত – যেকোনো একটির মাধ্যমেই সংঘটিত হয়, তবুও আমরা যা কিছু করি, বলি বা চিন্তা করি, তার সবকিছুকে অল্প কয়েকটি শ্রেণীতে সুনির্দিষ্টভাবে শ্রেণীবদ্ধ করা যায় না।

যদিও, বুদ্ধ দশটি নির্দিষ্ট অকুশল কর্ম (মি-দগে-বা বচু, সংস্কৃত: দশ-অকুসলানি) চিহ্নিত করেছেন, যেগুলোর মধ্যে আরও অনেক কর্ম যোগ হয় এবং যেগুলো থেকে বিরত থাকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এর কারণ হলো, এই কর্মগুলো করার ফলে সেগুলো নেতিবাচক নিক্ষিপ্ত কর্মপ্রবৃত্তিতে (‘ফেন-ব্যেদ-ক্যি লাস) পরিণত হয়, যা আমাদের চিত্ত-চেতনাকে তিনটি নিকৃষ্টতম পুনর্জন্ম অবস্থার কোনো একটিতে পরবর্তী পুনর্জন্মে চালিত করে এবং সেই পুনর্জন্ম কোন ধরনের হবে, তা নির্ধারণ করে।  এগুলোর ভয়াবহ পরিণতি উপলব্ধি করে নিজেদেরকে তা থেকে বিরত রাখাই হলো দশটি গঠনমূলক কর্ম, যার ফলে তিনটি উত্তম অবস্থার কোনো একটিতে পুনর্জন্ম হয়।

যেমন বসুবন্ধু ‘অভিধর্মকোষের’, চতুর্থ অধ্যায়, শ্লোক ৬৬-তে বলেছেন:

(সর্বজ্ঞ) এই সকল (বিভিন্ন প্রকার কর্ম) থেকে ব্যাপকভাবে সংগ্রহ ও সংক্ষেপ করে ইতিবাচক বা নেতিবাচক, যেকোনো ধরনের আবেগপ্রবণ আচরণের দশটি পথের কথা বলেছেন।

আসুন, আমরা প্রথমে নেতিবাচক বা অকুশল পথগুলো বিবেচনা করি।

অকুশল কার্মিক প্রবৃত্তির প্রকৃত পথসমূহ

একটি অকুশল কার্মিক প্রবৃত্তির যেকোনো পথ, তা কায়, বাক বা চিত্তের প্রবেশদ্বার দিয়েই হোক না কেন, সেই কর্মটি সম্পূর্ণ হওয়ার জন্য (Tib. yan lag bzhi) চারটি উপাদান অবশ্যই জড়িত থাকতে হবে।  অবশ্যই থাকতে হবে:

  • একটি ভিত্তি (Tib. gzhi) বা বস্তু যার দিকে বা যার দ্বারা কাজটি পরিচালিত হবে
  • একটি প্রেরণাদায়ক চৈত্তিক কাঠামো (Tib. kun slong)
  • কাজটি ঘটানোর জন্য প্রয়োগ করা একটি পদ্ধতি (Tib. sbyor ba)
  • সেই কাজটি সম্পন্ন করা (Tib. mthar thug)।

অধিকন্তু, প্রেরণাদায়ক চৈত্তিক কাঠামোটিতে অবশ্যই অন্তর্ভুক্ত থাকতে হবে:

  • সংজ্ঞা (Tib. ’du-shes, সংস্কৃত: সংজ্ঞা)
  • ছন্দ (Tib. ’dun-pa, সংস্কৃত: ছন্দস) – একটি নির্দিষ্ট লক্ষ্য অর্জনের জন্য কাজটি করার ইচ্ছা
  • কোনো অশান্তকারী আবেগ বা মনোভাব।

যদি এই অংশগুলির কোনোটি অনুপস্থিত থাকে, তবে অকুশল কাজটি অসম্পূর্ণ থাকবে (Tib. yongs su mi rdzogs pa’i mi dge ba)। ফলস্বরূপ, এর নেতিবাচক কর্মফল, কর্মবীজ এবং ফলাফল ততটা সুনির্দিষ্ট বা শক্তিশালী হবে না।

বসুবন্ধুর ‘অভিধর্মকোষ’, চতুর্থ অধ্যায়, ১০ সূত্র অনুসারে, প্রেরণাদায়ক চৈত্তিক কাঠামোর দুটি স্তরকে পৃথক করা যায়:

  • “কারণমূলক প্রেরণাদায়ক চিত্ত” (Tib. rgyu’i kun slong gi blo) কায় বা বাকের সাতটি অকুশল কর্মের মধ্যে একটি করার বিষয়ে চিন্তা ও সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য চিত্তের তিনটি অকুশল কর্মের একটির সাথে থাকে।
  • “সমসাময়িক প্রেরণাদায়ক চিত্ত” (Tib. dus kun slong gi blo) মনের তিনটি অকুশল কর্মের একটি দ্বারা নির্ধারিত কায় বা বাকের অকুশল কর্মের সাথে থাকে।

আসুন, কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তির মুখে ঘুষি মারার অকুশল কার্মিক তাড়নার পথটি বিবেচনা করা যাক। যদি আমরা সেই ব্যক্তিকে খুঁজে না পাই, যাকে ঘুষি মারার চৈত্তিক তাগিদ আমরা অনুভব করছি; অথবা যদি আমরা তাকে খুঁজে পাই এবং তারপর ভুলবশত অন্য কাউকে ঘুষি মারি; অথবা যদি আমরা যাকে ঘুষি মারতে চেয়েছিলাম তাকেই মারি, কিন্তু তা অনিচ্ছাকৃতভাবে বা দুর্ঘটনাক্রমে করে ফেলি; অথবা যদি কোনো সঙ্গত কারণে তা করা হয়, কোনো বিক্ষুব্ধ চৈত্তিক অবস্থা থেকে নয়;  অথবা যদি আমরা বিরক্ত হওয়া সত্ত্বেও এবং ঘুষি মারতে ইচ্ছে করলেও তাকে ঘুষি না মারি; অথবা যদি আমরা ঘুষি মারতে গিয়েও নিজেকে সংযত করি বা এত হালকাভাবে মারি যে, তাতে কোনো ব্যথা হয় না – এই সমস্ত ক্ষেত্রে, এই ব্যক্তির মুখে ঘুষি মারার আমাদের অকুশল কাজটি সম্পূর্ণ হবে না। আমাদের দ্বারা সঞ্চিত নেতিবাচক কর্মফল উপস্থিত কারণগুলোর সংখ্যার সমানুপাতিক হবে।

অতএব, আমাদের উচিত নিম্নলিখিত দশটি সম্পূর্ণ অকুশল কাজের সাথে জড়িত সমস্ত কারণগুলোকে শনাক্ত করার চেষ্টা করা। যদি আমরা তা করতে পারি, তাহলে যখনই এই কাজগুলো করার চৈত্তিক তাগিদ জাগবে, তখন সেগুলোকে সম্পূর্ণ না করার মাধ্যমে আমরা আমাদের নেতিবাচক কর্মফল, কর্মবীজ এবং তার ফলস্বরূপ দুঃখ ও সমস্যার অভিজ্ঞতা হ্রাস করতে শুরু করতে পারব।

কায়ের তিনটি অকুশল কর্ম

কায়ের তিনটি অকুশল কর্ম (Tib. lus kyi mi dge ba gsum) হল:

  1. কারো জীবন হরণ করা (Tib. srog gcod pa, সংস্কৃত: প্রাণাতিঘাত, হত্যা করা)
  2. যা আমাদের দেওয়া হয়নি তা গ্রহণ করা (Tib. ma byin par len pa, সংস্কৃত: অদত্ত-দান, চুরি করা)
  3. অনুপযুক্ত যৌন আচরণে লিপ্ত হওয়া (Tib. log par g.yem pa, সংস্কৃত: মিথ্যাচার)।

উপরোক্ত কারণগুলোর সেট দ্বারা প্রত্যেকটিকে বিশ্লেষণ করে সেই পরিস্থিতিগুলো বর্ণনা করা যায়, যেখানে এই অকুশল কর্মগুলি সম্পূর্ণ হয় এবং এর যন্ত্রণাদায়ক পরিণতি সবচেয়ে ভয়াবহ হয়।

কারো জীবন হরণ করা

যখন কারো জীবন কেড়ে নেওয়া হয়, অর্থাৎ হত্যা করা হয়, তখন এই কাজের ভিত্তি অবশ্যই আমাদের নিজেদের ব্যতীত অন্য কোনো নির্দিষ্ট জীব হতে হবে, সে মানুষ হোক বা অমানুষ, জন্ম নেওয়া অবস্থায় থাকুক বা মাতৃগর্ভে থাকুক।  যদিও আত্মহত্যা নিঃসন্দেহে একটি অকুশল কাজ, তবুও এটি অন্য কাউকে হত্যা করার মতো গুরুতর নয়, বা আমাদের নিজেদের জন্য ততটা সমস্যাও সৃষ্টি করে না। এর কারণ হলো, এই কাজটি সম্পন্ন করার ক্ষেত্রে একটি জটিলতা রয়েছে। যেহেতু আমাদের কাজটি সম্পন্ন হওয়ার সাথে সাথেই আমরা মারা যাব, তাই হত্যার ফলে সৃষ্ট কর্মের বীজ এবং নেতিবাচক কর্মশক্তি মানসিক ধারায় তখনই জমা হবে, যখন তা ইতিমধ্যেই ভবিষ্যৎ পুনর্জন্ম লাভ করেছে বা বার্দোতে প্রবেশ করেছে। জীবিত থাকা অবস্থায়, আমাদের সম্পন্ন করা একমাত্র অকুশল কাজটি হবে, উদাহরণস্বরূপ, নিজেকে ছুরিকাঘাত করা, কিন্তু একটি জীবন কেড়ে নেওয়া নয়।

আমরা কাকে হত্যা করতে চাই, তাকে চিনতে আমাদের বিভ্রান্ত হওয়া উচিত নয়। ভুলবশত কারো জীবন নেওয়া ইচ্ছাকৃতভাবে তা করার চেয়ে কম গুরুতর। অধিকন্তু, আমাদের অবশ্যই তার অস্তিত্ব শেষ করার পূর্ণ উদ্দেশ্য থাকতে হবে। দুর্ঘটনাক্রমে কাউকে হত্যা করার পরিণতি পূর্বপরিকল্পিত হত্যার মতো নয়। সুতরাং, দুর্ঘটনাক্রমে একটি পিঁপড়ের উপর পা দেওয়া ইচ্ছাকৃতভাবে একটি মাছি বা মশা মারার চেয়ে কম গুরুতর। আমাদের পোকামাকড় হত্যার অকুশলতাকে অবমূল্যায়ন করা উচিত নয়। 

পরম পূজ্য চতুর্দশ দলাই লামা যেমন বলেছেন, “একটি মাছি মারা আপনার কাছে তুচ্ছ মনে হতে পারে। কিন্তু, যখনই কোনো কিছু আপনাকে বিরক্ত করে, আপনি যদি আঘাত করে এবং হত্যা করে পরিস্থিতি সামাল দেন, তবে এটি মনের মধ্যে এক অত্যন্ত বিপজ্জনক অভ্যাস তৈরি করে। শীঘ্রই আপনার সমস্যার সমাধানের জন্য হত্যা করা কোথায় থামাবেন, সেই সীমারেখা টানা কঠিন হয়ে পড়বে।”

কারও জীবন কেড়ে নেওয়ার কাজটি অবশ্যই তিনটি বিষাক্ত মনোভাবের কোনো একটি দ্বারা অনুপ্রাণিত ও অনুষঙ্গী হতে হবে। শত্রুতা থেকে আমরা হয়তো কোনো শত্রু, পোকামাকড় বা সাপকে হত্যা করতে পারি। তীব্র আকাঙ্ক্ষা বা আসক্তির কারণে আমরা হয়তো মাংসের জন্য একটি ভেড়া হত্যা করতে পারি অথবা আনন্দ ও বিনোদনের জন্য শিকার বা মাছ ধরতে পারি। সরলতার কারণে আমরা হয়তো কোনো স্থানীয় দেবতা বা দেবসত্ত্বাকে উৎসর্গ করে লাভবান হব—এই বিশ্বাসে কোনো পশু বা এমনকি মানুষের জীবনও কেড়ে নিতে পারি।

এই কাজের সাথে অবশ্যই বিষ, অস্ত্র, নিজের হাত, কালো জাদু ইত্যাদি যেকোনো উপায়ে অন্য কোনো প্রাণীকে হত্যা করা জড়িত থাকতে হবে। কাজটি আমাদের নিজেদের করতে হবে এমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। যদি আমরা অন্য কাউকে দিয়ে খুন করাই, তাহলে আমরা ঠিক ততটাই শক্তিশালী নেতিবাচক কর্মফল তৈরি করি, যতটা আমাদের ভাড়া করা গুণ্ডাটি করত। আমাদের খাওয়ার জন্য কোনো পশু, পাখি বা মাছ হত্যা করার আদেশ দেওয়া বা যুদ্ধের সময় সৈন্য মোতায়েন করার ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। উদাহরণস্বরূপ, যদি একজন সেনাপতি ১,০০০ সৈন্যকে যুদ্ধে পাঠান এবং তারা ১,০০০ জন লোককে হত্যা করে, তাহলে সেই সেনাপতি ঠিক ততটাই নেতিবাচক কর্মফল তৈরি করেন, যতটা তিনি নিজে সেই ১,০০০ জন লোককে হত্যা করলে করতেন।

যেমন বসুবন্ধু ‘অভিধর্মকোষ’ (IV.72b)-এ বলেছেন:

যুদ্ধ ইত্যাদিতে, যে ব্যক্তি (উস্কানি বা নির্দেশনা দেয়) সেও (জড়িত) সকলের মতোই একই (পরিণতি ভোগ করবে), কারণ তার উদ্দেশ্য একই ছিল।

মাংস খাওয়ার কাজটি, স্বয়ং, পশু হত্যা করা বা সরাসরি কাউকে আমাদের জন্য হত্যা করতে বলার কাজের মতো নয়। উদাহরণস্বরূপ, মাংসাশী প্রাণী হওয়ার জন্য বা আমাদের নিজেদের মাংস অন্যেরা ভক্ষণ করার জন্য এটি একটি নেতিবাচক কর্মফল তৈরি করতে পারে, কিন্তু হত্যাকারী হওয়ার জন্য বা নিজে খুন হওয়ার জন্য তা নয়।

জীবন হরণের কাজটি তখনই পূর্ণতা পায় যখন শিকার আমাদের আগে মারা যায়। এটি আমাদের হত্যামূলক কাজটি করার সাথে সাথেই ঘটতে পারে অথবা কিছু সময় পরেও ঘটতে পারে। যদি আমরা আমাদের শিকারের আগে বা তার সাথে একই মুহূর্তে মারা যাই, তাহলে আত্মহত্যার ক্ষেত্রে যেমনটা হয়েছিল, নেতিবাচক কর্মফল ততটা পূর্ণ হবে না। এর কারণ হলো, এটিকে সেই মানসিক ধারায় জমা হতে হবে যা ইতোমধ্যেই একটি ভিন্ন পুনর্জন্ম লাভ করেছে।

হত্যার কাজ সর্বদা অকুশলাত্মক, তা আত্মরক্ষার জন্যই হোক বা অন্যের জীবন রক্ষার জন্যই হোক।  আমাদের কাজে কোনো অশান্তকারী আবেগ বা মনোভাব জড়িত না থাকলেও, আমাদের অবশ্যই বুদ্ধের মতো সাহসী হতে হবে, যিনি পূর্বজন্মে জাহাজের ক্যাপ্টেন হিসেবে ৫০০ যাত্রীর জীবন বিপন্নকারী দাঁড়বাহক মিনিয়াগ দুমদুমকে হত্যা করেছিলেন। আমাদের প্রেরণা হিসেবে অবশ্যই গভীর করুণা থাকতে হবে এবং আমাদের কাজের দুঃখজনক পরিণতি নিজের উপর গ্রহণ করতে সম্পূর্ণরূপে ইচ্ছুক থাকতে হবে, এমনকি যদি তা আমাদের কোনো আনন্দহীন লোকে নিয়ে যায়।

যা আমাদের দেওয়া হয়নি তা গ্রহণ করা (চুড়ি করা)

যা আমাদের দেওয়া হয়নি তা গ্রহণ করার জন্য, আমাদের চুরির কাজের ভিত্তি অবশ্যই অন্য কারো মালিকানাধীন কোনো মূল্যবান বস্তু হতে হবে। এটি এমন যেকোনো কিছু হতে পারে যা গ্রহণ, ব্যবহার বা নিজের হিসাবে রাখার কোনো অধিকার আমাদের নেই এবং এর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে সেইসব বস্তু যা আমরা ধার নিয়েছি এবং ফেরত দিইনি, সেইসাথে কর, জরিমানা, টোল, প্রবেশমূল্য এবং ভ্রমণ ভাড়া যা আমরা পরিশোধ করতে বাধ্য। এমনকি যদি আমরা মাটিতে এমন কিছু খুঁজে পাই যা স্পষ্টতই কেউ হারিয়েছে, আমরা তার প্রকৃত মালিককে খুঁজে বের করার চেষ্টা করি এবং কেবল তা নিজের জন্য রেখে দিই না।  যদি আমাদের মানিব্যাগ হারিয়ে যায় এবং কেউ তা খুঁজে পেয়ে ফিরিয়ে দেয়, তাহলে কি আমরা স্বস্তি পাই না এবং খুশি হই না? অন্য যে কোনো ব্যক্তি কিছু হারালে তার ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য।

যখন আমরা এমন কোনো বস্তু নেওয়ার ইচ্ছা করি, যা আমাদের নয়, তখন আমরা কী চুরি করছি সে বিষয়ে আমাদের ভুল করা চলবে না। আমাদের অবশ্যই সেই বস্তুটি নেওয়ার পূর্ণ ইচ্ছা থাকতে হবে, আমরা তা সঙ্গে সঙ্গে সরিয়ে ফেলার পরিকল্পনা করি বা না করি, এবং এর সাথে তিনটি অশান্তকারী আবেগের মধ্যে একটি অবশ্যই জড়িত থাকতে হবে। শত্রুতার বশে, আমরা হয়তো কোনো ঘৃণিত শত্রুর সম্পদ লুট করতে পারি। তীব্র আকাঙ্ক্ষার বশে, আমরা হয়তো এমন কোনো জিনিস চুরি করতে পারি যা আমাদের কাছে অপ্রতিরোধ্যভাবে আকর্ষণীয় মনে হয়। সরলতার কারণে, আমরা হয়তো দাবি করতে পারি যে একজন সাধু ব্যক্তি হিসেবে আমাদের যা ইচ্ছা তাই নেওয়ার অধিকার আছে, অথবা একজন একনিষ্ঠ শিষ্য হিসেবে আমাদের গুরুর জন্য চুরি করতে যাওয়ার অধিকার আছে; অথবা আমরা হয়তো একগুঁয়ে ও নির্বোধ অবাধ্যতার সাথে ভাবতে পারি যে সরকারকে ঠকানো বা যতটা সম্ভব হাতিয়ে নেওয়ার মধ্যে কোনো ভুল নেই।

আমাদেরকে বাস্তবে কোনো পদক্ষেপ নিতে হয়, যেমন—দোকান থেকে জিনিস চুরি করা, কাউকে হরণ করা, কোনো দোকান বা বাড়িতে সিঁধ কেটে ডাকাতি করা, কিংবা অন্য কাউকে দিয়ে তা করানো, টোল না দিয়ে পার হয়ে যাওয়া, ইত্যাদি। আমাদের চুরির কাজটি তখনই পূর্ণতা পায়, যখন আমাদের মধ্যে এই মনোভাব গড়ে ওঠে যে, যা আমরা নিয়েছি তা এখন আমাদের।

অযথাযথ যৌন আচরণে লিপ্ত হওয়া

অযথাযথ যৌন আচরণ চার প্রকারের হতে পারে, যার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে:

  • এমন কোনো ব্যক্তি যার সাথে জড়িত হওয়া বুদ্ধিমানের কাজ নয়
  • একটি অবিবেচক আচরণ
  • একটি অবিবেচক স্থান
  • একটি অবিবেচক সময়।

যাদের সাথে যৌন সম্পর্ক স্থাপন করা বুদ্ধিমানের কাজ নয়, তাদের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত হলেন এমন কেউ যিনি অন্য কারো সঙ্গী অথবা, যদি ব্যক্তিটি অবিবাহিত হন, এমন কেউ যিনি অনিচ্ছুক বা যার পিতামাতা, অভিভাবক বা অন্য কেউ এতে অনুমতি দেবেন না এবং জানলে খুব মর্মাহত হবেন, অথবা এমন কেউ যিনি ব্রহ্মচর্যের ব্রত নিয়েছেন। এমন কোনো যৌনকর্ম করা যা ভবিষ্যতে সমস্যা সৃষ্টি করবে, তা কোনো শিশুর সাথে হোক, সমলিঙ্গের কারো সাথে হোক, নিজের সাথে হোক, কোনো পশুর সাথে হোক বা অন্য কিছুর সাথে হোক, তা আত্ম-ধ্বংসাত্মক এবং তাই অবিবেচকের কাজ। যদি আমাদের নিজেদের কোনো সঙ্গী থাকে, তবে সেই ব্যক্তি ছাড়া অন্য কারো সাথে যৌন সম্পর্ক স্থাপন করা অবিবেচকের কাজ।

অবিবেচক আচরণ, স্থান এবং সময় আমাদের নিজেদের সঙ্গীর সাথে করার ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।  এর মধ্যে প্রথমটি হলো অতিরিক্ত কামনা ও অসন্তোষ থেকে উদ্ভূত যেকোনো খেয়ালি পদ্ধতি, ভঙ্গি বা কৌশল, অথবা যন্ত্রণাদায়ক যেকোনো হিংসাত্মক পদ্ধতি। একটি অনুচিত স্থান হলো পূজার ঘর, প্রার্থনা কক্ষ, স্তূপের পাশে, আমাদের আধ্যাত্মিক গুরু, পিতামাতা, জনসমাগম অথবা বুদ্ধের কোনো মূর্তি বা থাঙকার সামনে। একইভাবে অনুচিত হলো এমন কোনো স্থান যা আমাদের নিজেদের বা আমাদের সঙ্গীর অসুস্থতা বা যন্ত্রণার কারণ হবে, যেমন পাথরে ঢাকা কোনো খালি, ভেজা জমি। যদি আমরা কেবল একটি ঘরেই বাস করি, তবে সম্মানের চিহ্নস্বরূপ আমরা সহবাসের আগে আমাদের থাঙকাগুলোর সামনে পর্দা দিই অথবা মূর্তিগুলোর উপর কাপড় দিয়ে দিই। এটি অনেকটা এমন যে, যদি আমরা কোনো উচ্চ আধ্যাত্মিক গুরুর সাথে একই ঘরে ঘুমাই, তবে তাঁর বিছানা এবং আমাদের বিছানার মধ্যে একটি পর্দা বা বিভাজক রাখাটাই সৌজন্য ও ভদ্রতার পরিচায়ক হবে, বিশেষ করে যদি আমরা অন্য কারো সাথে ঘুমাই।

অবিবেচনাপ্রসূত সময়গুলোর মধ্যে রয়েছে যখন আমরা বা আমাদের সঙ্গী একদিনের উপবাস সংবর (Tib. bsnyen gnas sdom pa, সংস্কৃত: উপবাস-সংবর) পালনের জন্য ব্রহ্মচর্যের ব্রত গ্রহণ করি, অথবা যখন আমাদের দুজনের মধ্যে এমন কোনো অসুস্থতা থাকে যা যৌন সংসর্গের ফলে আরও বেড়ে যেতে পারে বা অন্যজনের মধ্যে সংক্রামক হতে পারে।

এছাড়াও একটানা অতিরিক্ত সংখ্যকবার যৌনমিলন করা অথবা দিনের বেলায় নির্লজ্জভাবে যৌনমিলন করাও অবিবেচনাপ্রসূত, যখন আমাদের উপর গুপ্তচরবৃত্তি হতে পারে বা অসাবধানতাবশত কেউ ঘরে প্রবেশ করে সকলের জন্য বিব্রতকর পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে। একইভাবে অবিবেচনাপ্রসূত সময় হলো যখন সংশ্লিষ্ট নারী ঋতুস্রাবের মধ্যে থাকেন, গর্ভাবস্থার শেষ মাসগুলোতে থাকেন অথবা যখন তার স্তনে একটি শিশু স্তন্যপান করে।

এই চারটি বিষয়ের ক্ষেত্রে, কোনো অনুপযুক্ত যৌন আচরণের, যেমন ব্যভিচারের, ভিত্তি অবশ্যই আমাদের নিজেদের সঙ্গী ছাড়া অন্য কেউ হতে হবে, যদি আমাদের সঙ্গী থাকে, অথবা অন্য কারো সঙ্গী হতে হবে, যদি আমাদের কোনো সঙ্গী না থাকে। যখন যৌনকর্মে লিপ্ত হওয়ার অভিপ্রায় জাগে, তখন আমাদের উপলব্ধি অবশ্যই দ্ব্যর্থহীন হতে হবে।  আমাদের অবশ্যই উপলব্ধি করতে হবে যে ইনি আমাদের সঙ্গী নন। একইভাবে, এই ব্যক্তির সাথে যৌনকর্মে লিপ্ত হওয়ার জন্য আমাদের পূর্ণ ইচ্ছা থাকতে হবে। যদিও বেশিরভাগ যৌন অসদাচরণ তীব্র মোহ এবং তীব্র বাসনা দ্বারা চালিত হয়, এটি শত্রুতা থেকেও উদ্ভূত হতে পারে, যেমন শত্রুর স্ত্রী ও কন্যাদের ধর্ষণ করা, অথবা সরলতা থেকেও হতে পারে, যেমন যৌন মিলনকে একটি উচ্চ আধ্যাত্মিক অনুশীলন বা বিবাহ-বহির্ভূত সম্পর্ককে আড়ম্বরপূর্ণ বা সম্পূর্ণ নিরীহ বলে মনে করা।

যদি আমরা সন্ন্যাসী হই এবং ব্রহ্মচর্যের ব্রত গ্রহণ করে থাকি, তাহলে যেকোনো অশুচি আচরণ (Tib. mi tshangs spyod, সংস্কৃত: আব্রহ্মচর্য) অবিবেচনাপ্রসূত। যে ব্যক্তি আমাদের যৌনকর্মের ভিত্তি হিসেবে কাজ করে, তার সম্পর্কে আমাদের উপলব্ধি ভুল হোক বা না হোক, সঞ্চিত নেতিবাচক কর্মফল একই থাকে।

যৌন অসদাচরণের জন্য যে কাজটি অবশ্যই করতে হবে, তা হলো দুটি যৌন অঙ্গের মিলন। এই কাজটি তখনই পূর্ণতা পায় যখন আমরা অর্গাজমের পরমানন্দ অনুভব করি।

বাকের চারটি অকুশল কর্ম

বাকের চারটি অকুশল কর্ম (Tib. ngag-gi-mi-dge-ba bzhi) হল:

  1. মিথ্যা বলা (Tib. rdzun-du smra-ba, সংস্কৃত: মৃষবাদ)
  2. বিভেদ সৃষ্টিকারী কথা বলা (Tib. phra-ma, সংস্কৃত: পৈশুন্য)
  3. কঠোরভাবে কথা বলা (Tib. tshig-rtsub, সংস্কৃত: পারুষ্য)
  4. অর্থহীন বকবক করা (Tib. ngag-’khyal, সংস্কৃত: সংভিন্ন প্রলাপ)

বাকের এই চারটি অকুশল কর্মের সবচেয়ে গুরুতর পরিণতি ঘটার জন্য, সমস্ত উপাদান সম্পূর্ণ হতে হবে।

মিথ্যা বলা

মিথ্যা বলার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে এমন কিছু অস্বীকার করা যা আমরা প্রকৃতপক্ষে দেখেছি, শুনেছি, আমাদের অন্যান্য ইন্দ্রিয় দ্বারা অনুভব করেছি বা জেনেছি, অথবা এমন কিছু দেখার, শোনার, অনুভব করার বা জানার দাবি করা যা আমরা করিনি।  এর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে জেনেশুনে মিথ্যা তথ্যের মাধ্যমে অন্যদের বিভ্রান্ত করা, ইচ্ছাকৃতভাবে খারাপ পরামর্শ বা ভুল শিক্ষা দেওয়া, অন্যদের গুণাবলী অস্বীকার করে বা তাদের দোষ উদ্ভাবন করে তাদের মানহানি করা এবং এমনকি ছোটখাটো ‘সাদা মিথ্যা’ বলা, যা আমাদের মতে আপাতদৃষ্টিতে কারও কোনো ক্ষতি করে না। বুদ্ধদের মানহানি করে এমন মিথ্যা অথবা আমাদের আধ্যাত্মিক গুরু বা পিতামাতাকে বলা মিথ্যা বিশেষভাবে গুরুতর। যারা চীবর পরিধান করেন, তাদের জন্য একটি বড় পতন হলো নিজেদের আধ্যাত্মিক সিদ্ধি সম্পর্কে মিথ্যা বলা।

এর ভিত্তি অবশ্যই এমন কোনো ব্যক্তি হতে হবে, যিনি আমাদের মিথ্যা বলার সময় তা বুঝতে সক্ষম। যখন কথা বলার বা অঙ্গভঙ্গি করার অভিপ্রায় জাগে, তখন আমাদের অবশ্যই উপলব্ধি করতে হবে যে আমরা যা ইঙ্গিত করতে চলেছি তা সত্যের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। অন্য কথায়, আমাদের অবশ্যই স্পষ্টভাবে চিনতে হবে যে আসল সত্য কী ছিল এবং তারপর ইচ্ছাকৃতভাবে তা পরিবর্তন করতে হবে। যদি আমরা অনিশ্চিত থাকি এবং ভুল কিছু বলি, তবে তা সম্পূর্ণ মিথ্যা বলে গণ্য হবে না।

আমাদের প্রেরণা অবশ্যই মিথ্যা বলার পূর্ণ অভিপ্রায় হতে হবে এবং তিনটি বিষাক্ত মনোভাবের মধ্যে একটি অবশ্যই উপস্থিত থাকতে হবে।  আমরা হয়তো সম্পদ, খ্যাতি বা ক্ষমতা অর্জনের তীব্র আকাঙ্ক্ষা থেকে, অথবা শত্রুকে ধোঁকা দিতে বা অপছন্দের কারো সুনাম নষ্ট করার জন্য বিদ্বেষবশত মিথ্যা বলি। সরলতার বশে আমরা হয়তো মিথ্যা বলি কারণ আমাদের মনে হয় এটা মজাদার, অথবা আমরা বিশ্বাসই করতে চাই না যে এতে কোনো ভুল আছে। কিন্তু, যদি আমরা খুব বেশি মিথ্যা বলি, শীঘ্রই আমাদের বাস্তবতার বোধ অবিশ্বস্ত হয়ে পড়ে এবং আমরা নিজেদের বানানো গল্পকেই বিশ্বাস করতে শুরু করি।

এই মিথ্যা বলার কাজটি হতে পারে উচ্চস্বরে, লিখিতভাবে বা এমনকি অঙ্গভঙ্গি বা মাথা নাড়ার মাধ্যমে, অথবা অন্য কাউকে দিয়ে আমাদের হয়ে মিথ্যা বলানো। যদি কেউ আমাদের বলে, “আপনি এত দয়ালু, নিশ্চয়ই একজন সাধু,” এবং আমরা শুধু হেসে চুপ করে থাকি, তবে এটি একটি ভয়ানক মিথ্যা। অথবা ধরুন আমরা বললাম, “আমি একটি ধর্মগ্রন্থে পড়েছি যে, যদি আপনি বোধগয়ার বাইরের শ্মশানে একা একটি রাত কাটাতে পারেন এবং অক্ষত অবস্থায় বেঁচে ফিরতে পারেন, তবে আপনি নিশ্চয়ই একজন অর্হত। যাইহোক, আমি সেখানে রাত কাটিয়েছি এবং এই যে আমি!”  এটা এক প্রকার পরোক্ষ মিথ্যা, কারণ স্পষ্টতই আমরা কোনো অর্হত নই। আমাদের মিথ্যা বলার কাজটি তখনই পূর্ণতা পায় যখন অপর ব্যক্তি আমাদের কথা বোঝে এবং বিশ্বাস করে, অন্যথায় আমাদের কথা নিছক অর্থহীন বকবকানি হয়ে দাঁড়ায়।

যদিও মিথ্যা বলা একটি নেতিবাচক কাজ, এমন কিছু পরিস্থিতি আছে যখন প্রয়োজন এই নিষেধাজ্ঞাকে অগ্রাহ্য করে, যেমন জীবন বাঁচানোর ক্ষেত্রে। ধরুন, আমরা একটি হরিণকে ভয়ে দৌড়াতে দেখলাম, এবং তার কয়েক মিনিট পরেই একদল শিকারি সেটিকে তাড়া করছে। যদি তারা আমাদের জিজ্ঞাসা করে যে আমরা হরিণটি দেখেছি কি না, তবে তাদের সত্যিটা বলার কোনো প্রয়োজন নেই। আমরা বলতে পারি, “আমি এইমাত্র এখানে এলাম,” অথবা “আমি এইমাত্র অমুক জায়গায় যাচ্ছিলাম।” আমরা তাদের প্রশ্ন এড়িয়ে যাই অথবা তাদের মনোযোগ অন্যদিকে সরিয়ে দিতে এবং তাড়া করা থেকে বিরত রাখতে একটি দীর্ঘ, আজগুবি গল্পও বানিয়ে বলতে পারি।

আমাদের কথায় অবশ্যই কূটনৈতিক হতে হবে। যদি কেউ আমাদের জন্য একটি জঘন্য খাবার রান্না করে এবং জিজ্ঞাসা করে যে আমাদের কেমন লাগছে, তবে সত্যিটা বলে সেই ব্যক্তির অনুভূতিতে আঘাত করার কোনো প্রয়োজন নেই। তার উদ্দেশ্য ছিল আমাদের খুশি করা।  আমরা খুব সহজেই বলতে পারি, “আমার তেমন খিদে নেই,” বা “এই ধরনের খাবার আমার পছন্দ নয়,” বা “এই ধরনের খাবার আমার সহ্য হয় না,” বা “আজ আমার শরীরটা ভালো লাগছে না,” এবং তারপর আমাদের যা পরিবেশন করা হয়েছে তা না-ও খেতে পারি।

বিভেদ সৃষ্টিকারী কথা বলা

বিভেদ সৃষ্টিকারী কথা বলা হলো এমন কিছু বলা যা একটি ঐক্যবদ্ধ পক্ষকে বিভক্ত করে দেবে অথবা যারা একে অপরের বিরোধী তাদের মধ্যে ঘৃণা আরও বাড়িয়ে দেবে। সাধারণভাবে, এর উদ্দেশ্য হলো অনৈক্য এবং বৈরী মনোভাব সৃষ্টি করা। সুতরাং, এই ধরনের অকুশল কাজের ভিত্তি অবশ্যই দুই বা ততোধিক ব্যক্তির একটি দল হতে হবে, যারা একে অপরের প্রতি হয় ঘনিষ্ঠ অথবা শত্রুভাবাপন্ন। একজন শিষ্য এবং তার আধ্যাত্মিক গুরুর মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করা, অথবা সংঘের মধ্যে বিভাজন ঘটানোর ফল বিশেষভাবে ভয়াবহ।

যখন আমাদের বিভেদ সৃষ্টিকারী কথা বলার মানসিক তাগিদ জাগে, তখন সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো এবং একে অপরের প্রতি তাদের অনুভূতি সম্পর্কে আমাদের উপলব্ধি যেন ভুল না হয়। আমাদের প্রেরণা অবশ্যই গোলযোগ সৃষ্টি করা এবং অনৈক্য ও বিবাদ ঘটানোর পূর্ণ উদ্দেশ্য হতে হবে। তিনটি বিষাক্ত মনোভাবের মধ্যে একটি অবশ্যই উপস্থিত থাকতে হবে। তীব্র আকাঙ্ক্ষার বশে, আমরা স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে একজনকে নিজেদের জন্য পাওয়ার উদ্দেশ্যে তাদের মধ্যে ফাটল ধরানোর চেষ্টা করতে পারি। শত্রুতার বশে, আমরা আমাদের শত্রুদের মধ্যে বিবাদ সৃষ্টির চেষ্টা করতে পারি, যেমন 'বিভাজন ও শাসন' নীতির মাধ্যমে গুপ্তচরবৃত্তি করার সময়।  আমরা হয়তো সরলতার বশে, কোনো নির্দিষ্ট ধর্মের অনুসারীদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টির চেষ্টাও করতে পারি, যাতে তাদের জন্য কোনটি সর্বোত্তম, সে বিষয়ে আমাদের নিজস্ব সীমিত দৃষ্টিভঙ্গিতে তাদের ধর্মান্তরিত করা যায়।

এই কাজটি অবশ্যই করা হয় বন্ধুদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করতে, অথবা হস্তক্ষেপ করে এবং সত্য বা মিথ্যা কিছু বলে শত্রুদের মধ্যে মীমাংসা রোধ করতে। কাজটি সমানভাবে নেতিবাচক হয় যদি আমরা অন্য কাউকে দিয়ে এটি করাই। আমরা কী বলছি সে বিষয়ে আমাদের খুব সতর্ক থাকতে হবে। কোনো কথা সত্য হলেও, যদি আমরা দেখি যে, তা অন্য কারো সম্পর্কে কারো মনে খারাপ অনুভূতি তৈরি করবে, তবে তা বলার কোনো প্রয়োজন নেই। আমাদের বিভেদ সৃষ্টিকারী ভাষা ব্যবহারের কাজটি তখনই পূর্ণতা পায়, যখন অপর পক্ষগুলো আমাদের কথা বোঝে ও বিশ্বাস করে এবং ফলস্বরূপ একে অপরের প্রতি বিদ্বেষী হয়ে ওঠে।

ধরুন, একদল লোক কোনো ক্ষতিকর, সমাজবিরোধী কাজের ষড়যন্ত্র করছে, এবং আমরা অন্যদের ক্ষতি হওয়া থেকে বাঁচাতে নিছক করুণাবশতঃ তাদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করি।  যদিও আমাদের বিভেদ সৃষ্টিকারী ভাষা ব্যবহারের কাজটি অকুশল এবং এর ফল কেবলই কষ্টদায়ক হতে পারে, তবুও এর প্রভাব কিছুটা প্রশমিত হয়, কারণ এই কাজটি করার আগে যে উদ্দেশ্যটি জেগেছিল, তার সাথে কোনো অশান্তকারী আবেগ বা নেতিবাচক প্রেরণা যুক্ত ছিল না।

কঠোরভাবে কথা বলা

কঠোর এবং অপমানজনক ভাষা ব্যবহারের মধ্যে সব ধরনের বিদ্রূপ, অপমান, উপহাস এবং গালিগালাজ অন্তর্ভুক্ত। অন্য কথায়, এর অর্থ হলো এমন কিছু বলা বা এমন কোনো অঙ্গভঙ্গি বা মুখের ভাবভঙ্গি করা যা অন্য কারো অনুভূতিতে আঘাত হানবে। আমরা যা বলি তা সত্য বা মিথ্যা, তাতে কিছু যায় আসে না। আমরা যদি একজন পঙ্গুকে পঙ্গু বলি বা কোনো ব্যক্তিকে শূকর বলি, উভয় ক্ষেত্রেই সেই ব্যক্তি কষ্ট পাবে। এমনকি আমরা যদি এমন কথা মনোরম স্বরেও বলি, তবুও তা কষ্ট দেয়। এটি একটি গুরুতর অকুশল কাজ, কারণ এটি আমাদের এবং অপর ব্যক্তি উভয়কেই অসুখী করে তোলে। এটি বিশেষভাবে গুরুতর যদি আমাদের কঠোর এবং অপমানজনক ভাষা আমাদের আধ্যাত্মিক গুরু বা পিতামাতার প্রতি নির্দেশিত হয়।

এই কাজের ভিত্তি অবশ্যই এমন কেউ হতে হবে যার অনুভূতি আমাদের কথায় আঘাত পেতে পারে।  যখন নিষ্ঠুর কিছু বলার ইচ্ছা জাগে, তখন যাকে আমরা আঘাত করতে চাই, তাকে চিনতে আমাদের কোনো ভুল হওয়া চলবে না। আমাদের প্রেরণা হিসেবে অবশ্যই এমন কথা বলার পূর্ণ উদ্দেশ্য থাকতে হবে এবং তিনটি বিষাক্ত মনোভাবের মধ্যে একটি অবশ্যই উপস্থিত থাকতে হবে। তীব্র আকাঙ্ক্ষা থেকে, আমরা হয়তো একদল গুণ্ডার কাছে গ্রহণযোগ্যতা পাওয়ার জন্য কঠোর ও অপমানজনক ভাষা ব্যবহার করতে পারি। শত্রুতার বশে, আমরা হয়তো কোনো শত্রুকে বা আমাদের নিজেদের সৈন্যদের যুদ্ধে উস্কে দেওয়ার জন্য এটি ব্যবহার করতে পারি। সরলতার কারণে, আমরা হয়তো এমন ভাষা ব্যবহার করি কারণ আমরা মনে করি এটি ফ্যাশনেবল ও চতুর এবং এতে অন্যের অনুভূতিতে আঘাত লাগলেও কিছু যায় আসে না।

এর সাথে জড়িত কাজটি হলো বাস্তবে এমন কথা বলা, যা অন্যের দোষ বা দুর্বলতার উপর জোর দেয়, তা সত্য হোক বা না হোক। এর মধ্যে এটাও অন্তর্ভুক্ত যে, অন্য কাউকে দিয়ে আমাদের হয়ে এমন কটু কথা বলানো। কাজটি তখনই পূর্ণতা পায় যখন অন্য ব্যক্তিটি আমাদের কথা বোঝে, বিশ্বাস করে যে আমরা সত্যিই তাই বোঝাতে চেয়েছি এবং আঘাত পায়। যদি আমরা কোনো জড় বস্তুকে অপমান করি, তবে তার ফলাফল ততটা গুরুতর হবে না, কারণ তাতে কারও অনুভূতিতে আঘাত লাগে না।

অর্থহীন বকবকানি

অর্থহীন বকবকানির তিনটি প্রকারভেদ রয়েছে:

  • যা বিকৃত, যেমন কালো জাদুর মন্ত্র উচ্চারণ করা বা ভয়ানক কিছু ঘটার জন্য শয়তানি প্রার্থনা করা
  • যা জাগতিক বিষয় সম্পর্কিত, যেমন এমন সব বিষয়ে অর্থহীন কথাবার্তা বলা যা আমাদের কোনো বিষয় নয় বা আমাদের জন্য কোনো উদ্বেগের কারণ নয়
  • যা সত্য, যেমন বৌদ্ধধর্মের শিক্ষা তাদের কাছে ব্যাখ্যা করা যারা তা গ্রহণের জন্য অনুপযুক্ত মাধ্যম, উদাহরণস্বরূপ, যাদের কোনো শ্রদ্ধা বা আগ্রহ নেই।

এই নেতিবাচক কাজের সবচেয়ে খারাপ রূপ এবং যার পরিণতি সবচেয়ে ভয়াবহ, তা হলো আমাদের অর্থহীন কথা বা গান দিয়ে কোনো ধ্যানকারী বা প্রার্থনারত ব্যক্তিকে বাধা দেওয়া।

অর্থহীন বকবকানির ভিত্তি অবশ্যই এমন কোনো তুচ্ছ, নগণ্য বা উদ্দেশ্যহীন বিষয় হতে হবে, যাকে আমরা অর্থপূর্ণ, তাৎপর্যপূর্ণ বা গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করি। কথার পূর্ববর্তী তিনটি অকুশল কর্মের মতো, এক্ষেত্রে এমন কোনো ব্যক্তির উপস্থিতি আবশ্যক নয় যার কাছে আমরা আমাদের প্রলাপ প্রকাশ করি বা যে আমাদের কথাগুলো বোঝে।  যখন কথা বলার ইচ্ছা জাগে, তখন আমাদের উপলব্ধি হতে হবে যে, আমরা যা বলতে চাই তা অর্থবহ, তাৎপর্যপূর্ণ বা গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের প্রেরণা হতে হবে, সেই কথাগুলো প্রকাশ করার পূর্ণ উদ্দেশ্য, এবং তিনটি বিষাক্ত মনোভাবের মধ্যে একটি অবশ্যই উপস্থিত থাকতে হবে। আসক্তির কারণে, আমরা হয়তো কারো সাথে সময় কাটানোর ইচ্ছায় অহেতুক আড্ডায় মেতে উঠি; অথবা শত্রুতার বশে, এমন কাউকে বিরক্ত করার জন্য, যাকে আমরা কোনো ইতিবাচক কাজ করা থেকে বিরত রাখতে চাই। তবে বেশিরভাগ সময়, আমরা সরলতার বশে আড্ডা ও পরচর্চা করি, কারণ আমাদের মনে হয় না যে এতে কোনো ভুল আছে। এক্ষেত্রে কাজটি হলো অপ্রয়োজনে অহেতুক কথা বলা অথবা অন্য কাউকে দিয়ে তা করানো। আমাদের কাজটি তখনই সম্পূর্ণ হয়, যখন আমরা প্রকৃতপক্ষে সেগুলো উচ্চস্বরে প্রকাশ করি।

আমরা যা বলি তার ভিত্তির দৃষ্টিকোণ থেকে সাত ধরনের অসার কথাবার্তাকে আরও বিশদভাবে ভাগ করা যায়:

  • ঝগড়া করা, অন্যের পেছনে কথা বলা, তর্ক করা এবং উস্কানিমূলক কথা বলা
  • কোনো গঠনমূলক কারণ ছাড়াই অন্য ধর্মের স্তোত্র পাঠ করা বা আবৃত্তি করা এবং রাজনৈতিক বা বাণিজ্যিক স্লোগান ও জিঙ্গেল পুনরাবৃত্তি করা
  • অভিযোগ করা, বিলাপ করা এবং অসন্তোষ প্রকাশ করা
  • ঠাট্টা করা, বোকার মতো আচরণ করা, ফাজলামি করা, গান গাওয়া, গুনগুন করা এবং কোনো বিশেষ ইতিবাচক কারণ ছাড়াই শিস দেওয়া
  • সরকারি নেতা, সেলিব্রিটি, রাজনৈতিক বিষয়, যুদ্ধ, অপরাধ ইত্যাদি নিয়ে গল্প বলা এবং পরচর্চা করা, যখন পরিস্থিতিকে প্রভাবিত বা উন্নত করার কোনো উপায় আমাদের থাকে না এবং আমরা কেবল অন্যের ব্যাপারে নাক গলায়
  • মাতাল বা পাগলের মতো কথা বলা, আজেবাজে কথা বলা এবং বোকার মতো কথা বলা
  • পাঁচটি ভুল কাজের সাথে সম্পর্কিত কথা বলা, যেমন তোষামোদ করা, চাপ দেওয়া, ধমকানো, হুমকি দেওয়া, ঘুষ দেওয়া, বড়াই করা,  অহংকার করা, ভণ্ডামি বা কপটতার সাথে কথা বলা ইত্যাদি।

বুদ্ধগণ সমস্ত অসার, অর্থহীন বকবকানি এবং অপ্রয়োজনীয় কথাবার্তা থেকে নিজেদেরকে মুক্ত করেছেন। তাই, যদি কেউ আমাদের সাথে তর্ক করে এবং আমাদের কোনো কথাই শুনতে না চায়, তবে সে যতই অযৌক্তিক দাবি করুক না কেন, আমরা কেবল ‘হুম’ বলে সায় দিই। পাল্টা তর্ক করা হলো কথার অপচয় এবং অসার বকবকানি। আমাদের এই ভেবে আত্মম্ভরিতা বোধ করা উচিত নয় যে, আমাদের নিজেদের বক্তব্য প্রতিষ্ঠা করতেই হবে।

কৌতুক বা গল্প বলা কখনও কখনও উদ্দেশ্যমূলক এবং অর্থবহ হতে পারে, যদি তা কোনো উদ্বিগ্ন বা বিচলিত ব্যক্তিকে শান্ত করতে সাহায্য করে অথবা ধর্ম সম্পর্কিত আমাদের কোনো বক্তব্যকে স্পষ্ট করে তোলে। অন্যথায়, উদাহরণস্বরূপ, কেবল মনোযোগ আকর্ষণ করার জন্য বা আমরা কতটা চালাক তা দেখিয়ে অন্যদের প্রভাবিত করার জন্য কুরুচিপূর্ণ কৌতুক বলা সম্পূর্ণ অসার বকবকানি। গান গাওয়া বা সঙ্গীত রচনার ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। যদি আমরা কাউকে তার বিষণ্ণতা কাটিয়ে উঠতে সাহায্য করার জন্য বা নিজেদের মনোবল বাড়ানোর জন্য তা করি, তবে সেটা উপকারী হতে পারে। অন্যথায়, শুধুমাত্র আমাদের চারপাশে অন্যদের আকর্ষণ করার জন্য অথবা সময় কাটানোর জন্য, কারণ আমরা মনে করি, আমাদের করার মতো এর চেয়ে ভালো কিছু নেই বা আমরা আরও গঠনমূলক কিছু করা এড়াতে চাই, তা আমাদের মূল্যবান মানব পুনর্জন্মের অপচয়।

এই সমস্ত ধরনের অর্থহীন কথাবার্তা বেশ নিরীহ মনে হতে পারে। তবে, যেহেতু এগুলো আমাদের সময় নষ্ট করে, তাই এগুলো বেশ অকুশল এবং অনেক দোষের কারণ হয়। আমরা এমন কারো সম্পর্কে গল্প বলতে পারি, যিনি আমাদের অজান্তেই অন্য ব্যক্তির বন্ধু, খুব প্রভাবশালী কেউ বা এমনকি একজন বোধিসত্ত্ব। এর ফলে, আমরা অনেক সমস্যায় পড়ব।

শাক্য পণ্ডিত (Tib. sa-skya pandita kun dga’ rgyal mtshan) তাঁর ‘সুভাষিত রত্ননীধি’ (Tib. legs bshad rin po che’i gter), VI.36-এ বলেছেন:

বেশি কথা বলা অনেক ত্রুটিকে আমন্ত্রণ জানানোর একটি কারণ, অপরদিকে (কিছুই) না বলা দোষ থেকে মুক্তি পাওয়ার ভিত্তি। যেহেতু টিয়া পাখি কথা বলে, তাই তাকে খাঁচায় বন্দী করে রাখা হয়, অপরদিকে বোবা পাখিরা তাদের ইচ্ছেমতো উড়ে বেড়ায়।

যখন আমরা কোনো ইতিবাচক কাজ করার চেষ্টা করি, তখন আমরা দেখি যে আমরা দ্রুত ক্লান্ত হয়ে পড়ি এবং বেশি রাত জাগতে পারি না। কিন্তু, যদি আমরা কোনো বন্ধুর সাথে গল্পগুজব করি, তবে রাত যত গড়ায় আমরা ততই প্রাণবন্ত ও সজাগ হয়ে উঠি। অতএব, ক্যবজে ঠিজাঙ রিনপোছে আমাদের একটি অত্যন্ত বাস্তবসম্মত নির্দেশিকা দিয়েছেন।  যদি কখনও আমাদের কোনো ইতিবাচক বা গঠনমূলক কাজ করতে ইচ্ছা না করে, এবং আমাদের মেজাজ খিটখিটে থাকে বা আমরা মনমরা হয়ে থাকি, তবে শুধু সময় কাটানো এবং মন ভালো করার জন্য কারও সাথে কথা বলতে যাওয়া উচিত নয়। এর চেয়ে বরং ঘুমিয়ে পড়া বা অল্প সময়ের জন্য ঘুমিয়ে নেওয়া ভালো। এমনটা করলে হয়তো আমাদের কোনো ইতিবাচক অভ্যাস গড়ে উঠবে না, কিন্তু অন্তত কোনো নেতিবাচক অভ্যাসও গড়ে উঠবে না। বন্ধুদের সাথে অহেতুক গল্পগুজবের চেয়ে ঘুমের উদাসীন অবস্থা আরাম করার জন্য অনেক ভালো, এবং ঘুম থেকে ওঠার পর আমরা সতেজ বোধ করব এবং কোনো ইতিবাচক কাজ শুরু করার জন্য প্রস্তুত থাকব।

এই সবকিছুর সাথে এটা গুরুত্বপূর্ণ যে, যখন আমরা আমাদের আচরণগত অভ্যাস পরিবর্তন ও উন্নত করার চেষ্টা শুরু করি, তখন যেন আমরা গোঁড়া না হয়ে যাই বা কোনো চরমপন্থায় না যাই। যদি আমরা সারাক্ষণ পুরোপুরি গম্ভীর ও গুরুগম্ভীর হয়ে থাকি, কখনও না হাসি বা আরাম না করি, তবে আমরা নিজেদের জন্য অনেক সমস্যা তৈরি করে ফেলি। সম্ভবত আমরা পরে এর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করি এবং বিপরীত চরমপন্থার দিকে চলে যায়। আমাদের আচরণের সমস্ত সূক্ষ্ম দিক নিখুঁত করার বিষয়টি আধ্যাত্মিক পথের অনেক পরে আসে। শুরুতে, আমরা আমাদের স্থূলতম ধরনের কার্যকলাপের উপর নজর রাখি এবং একটি সুখী জীবন যাপন করার ও মনোরম হওয়ার চেষ্টা করি; অন্যদের থেকে দূরে থাকি না, অথবা এতটাই কঠোর ও পবিত্র হই না যে, লোকেরা বিরক্ত হয়।

যখন আমরা মিলারেপা বা চোঙখাপার মতো হই এবং নিবিড় সাধনায় নিযুক্ত হতে প্রস্তুত থাকি, তখন আমরা সারাদিন ধরে আমাদের সমস্ত অর্থহীন গান ও কথাবার্তা সম্পূর্ণরূপে নির্মূল করার বিষয়ে চিন্তা করতে পারি। মূল বিষয় হলো আচরণের কার্যকারণ সম্পর্ক সম্পর্কে জ্ঞান এবং অন্যদের প্রতি গভীর ও আন্তরিক বিবেচনার সাথে জীবন উপভোগ করা।

চিত্তের তিনটি অকুশল কর্ম

যদি আমরা সত্যিই অলস হই, তবে বাইরে গিয়ে কায় ও বাকের অকুশল কর্ম করা আমাদের জন্য অনেক বেশি পরিশ্রমের কাজ হবে। তবে, আমরা যতই অলস হই না কেন, নেতিবাচকভাবে চিন্তা করা সহজ। ধর্মচর্চা করার সময় যে প্রধান জিনিসটির উপর কাজ করতে হয় তা হলো আমাদের চিত্ত। আমাদের অবশ্যই আমাদের মনোভাবকে নতুন রূপ দিতে হবে এবং একটি উষ্ণ ও দয়ালু হৃদয় রাখার চেষ্টা করতে হবে। কেউ ভালো মানুষ কি না তা তার জীবনদর্শনের উপর নির্ভর করে, তার শারীরিক গঠন বা চেহারার উপর নয়।  আমাদের শারীরিক ও বাচনিক কার্যকলাপ হলো আমাদের অন্তরের মনোভাব ও চিন্তার প্রকাশ।

অতএব, অতীশ যেমন ‘বোধিসত্ত্বের রত্নমাল্য’ (Tib. byang chub sems dpa’i nor bu’i phreng ba, সংস্কৃত: বোধিসত্ত্বমান্যবলী), ২৮-এ বলেছেন:

যখন বহু মানুষের মাঝে থাকি, তখন যেন আমি আমার বাচনকে সংযত রাখি; যখন একা থাকি, তখন যেন আমি আমার চিত্তকে সংযত রাখি।

নেতিবাচক চিন্তা যেকোনো সময় আসতে পারে, এবং আমরা যদি কোনো দিব্যদ্রষ্টার সঙ্গে না থাকি, তবে এটি কখন ঘটে তা কেবল আমরাই জানতে পারি।

চিত্তের তিনটি প্রধান অকুশল কর্ম (Tib. yid kyi mi dge ba gsum) যা থেকে সতর্ক থাকতে হবে, সেগুলি হলো:

  1. লোভের সাথে চিন্তা করা (Tib. brnab sems, সংস্কৃত: অভিধ্যায়া)
  2. বিদ্বেষের সাথে চিন্তা করা (Tib. gnod sems, সংস্কৃত: ভ্যাপাদ, মন্দ ইচ্ছা)
  3. বিরোধিতার সাথে বিকৃত চিন্তা করা (Tib. log lta, সংস্কৃত: মিথ্যা দৃষ্টি, ভুল ধারণা)।

বিশেষত, এগুলি হলো কায় বা বাকের অকুশল কর্মগুলির মধ্যে একটি করার বিষয়ে চিন্তা করা এবং সিদ্ধান্ত নেওয়া। চিত্তের এই অকুশল কর্মগুলি সম্পূর্ণ হতে এবং তাদের চূড়ান্ত দুঃখজনক পরিণতির দিকে নিয়ে যেতে, পূর্বের মতোই একই উপাদানগুলি অবশ্যই উপস্থিত থাকতে হবে।

লোভী চিন্তা

লোভ হলো কোনো কিছুকে নিজের করে নেওয়ার, সেটিকে ‘আমার’ বলে অধিকার করার একটি তীব্র ও স্বার্থপর আকাঙ্ক্ষা। এই ধরনের চিন্তার ভিত্তি অবশ্যই অন্য কারো কোনো বাহ্যিক বস্তু বা অভ্যন্তরীণ গুণ হতে হবে, যেমন কারো সম্পদ বা খ্যাতি। এটি দোকানে দেখা কোনো জিনিস বা এমনকি বুদ্ধের কোনো গুণও হতে পারে, যা আমরা ক্ষমতা, খ্যাতি ইত্যাদি লাভের জন্য নিজের করে পেতে চাই। কখনও কখনও, এটি এমন কিছুও হতে পারে যা আমাদের পাওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে, কিন্তু আমাদের প্রাপ্য হওয়ার আগেই তা পাওয়ার জন্য আমরা লোভ করি, যেমন উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত সম্পত্তি বা উত্তরাধিকারের সারিতে আমাদের পালা।

আমরা যে বস্তুটির লোভ করছি, সে বিষয়ে আমাদের উপলব্ধি অবশ্যই দ্ব্যর্থহীন হতে হবে। এটি অবশ্যই সুনির্দিষ্ট হতে হবে। আমাদের প্রেরণা অবশ্যই বস্তুটি আমাদের হয়ে ওঠার আকাঙ্ক্ষার মনোভাব হতে হবে এবং তিনটি অশান্তিকর আবেগের মধ্যে একটি অবশ্যই উপস্থিত থাকতে হবে। আসক্তির কারণে, আমরা এমন অনেক অকেজো জিনিস লোভ করতে পারি যা আমাদের প্রয়োজন বলে মনে হয় বা যা আমাদের সুখী করবে। শত্রুতার বশে, আমরা হয়তো আমাদের অপছন্দের কোনো ব্যক্তি সুযোগ পাওয়ার আগেই দ্রুত কিছু একটা কিনে ফেলতে চাই, যাতে আমরা তাকে সেই বস্তুটির আনন্দ থেকে বঞ্চিত করতে পারি; অথবা আমরা হয়তো গ্রন্থাগার থেকে এমন একটি বই সরিয়ে নিতে চাই যা আমাদের প্রতিদ্বন্দ্বীর পড়াশোনার জন্য প্রয়োজন। সরলতার কারণে, আমরা হয়তো মনে করতে পারি যে অনেক জিনিস নিজের করে পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা থাকা ভালো, এটি অর্থনীতির জন্য স্বাস্থ্যকর।

এর সাথে জড়িত কাজটি হলো, কোনো বস্তু নিজের করে পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা এতটাই প্রবল হয়ে ওঠা যে আমরা সেটিকে নিজের করে নেওয়ার কথা ভাবতে শুরু করি। মনের এই নেতিবাচক ক্রিয়াটি তখনই পূর্ণতা পায় যখন আমাদের মোহ এতটাই তীব্র হয়ে ওঠে যে আমরা বস্তুটি সংগ্রহ করার চেষ্টা করার সিদ্ধান্ত নিই। সুতরাং, এই চৈত্তিক ক্রিয়ার প্রেরণা, পদক্ষেপ এবং সমাপ্তি—এই সবকিছুই একটি চিন্তার অনুক্রমেই ঘটতে হবে। অন্য কথায়, আমরা কোনো একটি বস্তু নিজের করে পেতে চাই, তারপর সেটিকে নিজের করে নেওয়ার কথা ভাবি এবং পরবর্তীতে তা ঘটানোর একটি উপায় খুঁজে বের করার সিদ্ধান্ত নিই। সুতরাং, পূর্ণ লোভ কেবল কোনো কিছু নিজের করে পাওয়ার ইচ্ছা নয়, বরং তা থেকে আরও এগিয়ে গিয়ে সে বিষয়ে কিছু করার দৃঢ় সিদ্ধান্ত নেওয়া এবং যা চাই তা পাওয়ার জন্য সত্যিই চেষ্টা করা। এই সিদ্ধান্তটি কাজে প্রকাশ বা বাস্তবায়ন করা আবশ্যক নয়। এখানে আমরা যে বিষয়টি নিয়ে উদ্বিগ্ন, তা হলো সৃষ্ট নেতিবাচক চৈত্তিক অবস্থা এবং চিন্তাধারা।

এছাড়াও, আমাদের লোভী চিন্তাভাবনা সম্পূর্ণ হতে এবং এর সবচেয়ে গুরুতর পরিণতি ঘটাতে আমাদের প্রেরণার সাথে নিম্নলিখিত পাঁচটি অশান্তকারী আবেগও অবশ্যই উপস্থিত থাকতে হবে:

  • আমরা যে বস্তুগুলো ব্যবহার করি এবং উপভোগ করি সেগুলোর প্রতি এক অস্বাভাবিক আসক্তি
  • লোভ (Tib. btkam chags), যার দ্বারা আমরা আরও বেশি কিছু জমা করতে চাই
  • নাক গলানোর স্বভাব (Tib. ’chums-pa), যার দ্বারা আমরা ভালো মানের যেকোনো জিনিস, যেমন অন্যের মূল্যবান সামগ্রী, পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পরীক্ষা করতে এবং নিজেরা তা পরখ করে দেখতে বা ব্যবহার করতে বাধ্য বোধ করি
  • কারো সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার একটি প্রতিযোগিতামূলক মনোভাব (Tib. ’khu ba’i sems), যার ফলে আমরা অনুভব করি যে, অন্য ব্যক্তির যা কিছু আছে, তা আমাদেরও পেতেই হবে
  • কারো উপর শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করার একটি একগুঁয়ে মনোভাব (Tib. zil gyis non pa’i sems), যেখানে লোভী হওয়ার জন্য বিন্দুমাত্র লজ্জা বোধ হয় না, এবং এটি যে একটি দোষ বা এটি থেকে মুক্তি পাওয়ার সংকল্প করা উচিত, সে বিষয়েও বিন্দুমাত্র উপলব্ধি থাকে না।

সুতরাং, কেবল এই দিবাস্বপ্ন দেখাটাই সম্পূর্ণ লোভ নয় যে, “আহা, যদি আমার কর্তা আমার হাতের পুতুল হয়ে থাকত, আর আমি তার সমস্ত ধন-সম্পদ ও ক্ষমতা পেতাম,” অথবা “আহা, যদি অন্যরা জানত আমি কত ভালো সাধক, কত জ্ঞানী ও উদার, বা তাদের জন্য আমি কত কঠোর পরিশ্রম করছি,” অথবা “আহা, যদি পৃথিবীর সবাই আমাকে সম্মান করত।” আমাদের মধ্যে অবশ্যই বস্তুর প্রতি তীব্র আসক্তি, লোভ, নাক গলানো, প্রতিযোগিতা এবং অন্যদের ছাড়িয়ে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষার এক প্রবল মনোভাব থাকতে হবে এবং তারপর, আমাদের লক্ষ্য অর্জনের জন্য কিছু করার প্রবল ইচ্ছা ও পূর্ণ সংকল্প নিয়ে খুব সচেতনভাবে ভাবতে হবে, “আমি ঈশ্বরের ধন-সম্পদ ও ক্ষমতা পেতে চাই,” অথবা “আমি পৃথিবীর সমস্ত টাকা পেতে চাই।” এই পাঁচটি অস্বস্তিকর মনোভাবের কোনো একটির অভাব থাকলেই আমাদের লোভ সম্পূর্ণ হয় না।

বিদ্বেষপূর্ণ চিন্তা

বিদ্বেষ হলো কোনো ব্যক্তি বা প্রাণীকে হত্যা করে, ঘুষি মেরে, চড় মেরে বা তার কোনো অপ্রীতিকর ক্ষতি করার ইচ্ছা। সুতরাং, এই ধরনের নেতিবাচক চিন্তার লক্ষ্যবস্তু অবশ্যই কোনো জীবন্ত প্রাণী হতে হবে, যেমনটা কঠোরভাবে কথা বলার ক্ষেত্রে হয়, যে আমাদের ইচ্ছা পূরণ হলে আঘাত পাবে। বিদ্বেষ, শত্রুতার মতোই, কোনো জীবন্ত বস্তুর প্রতি লক্ষ্য করে করা হয়, যেখানে রাগ এবং ঘৃণা যেকোনো সজীব বা নির্জীব বস্তুর দিকে পরিচালিত হতে পারে, যেমন আমাদের বিকল উনুন বা গাড়ি।

আমরা যাকে আঘাত করতে চাই, সেই ব্যক্তি বা প্রাণীকে চেনার ক্ষেত্রে আমাদের ভুল হওয়া চলবে না। আমাদের প্রেরণা অবশ্যই তাকে হত্যা করার, মুখে ঘুষি মারার ইচ্ছা ইত্যাদি অথবা এই ধরনের চিন্তা হতে হবে যে, “কী দারুণ হতো যদি আমি বা অন্য কেউ হঠাৎ করে তার সবকিছু কেড়ে নিতে পারতাম!” এই তিনটি বিষাক্ত মনোভাবের মধ্যে একটি অবশ্যই উপস্থিত থাকতে হবে। তীব্র আকাঙ্ক্ষার বশে, আমরা হয়তো আমাদের বাবাকে হত্যা করতে চাইতে পারি, যাতে আমরা তার উইলে রেখে যাওয়া টাকা পেতে পারি। শত্রুতার বশে, আমরা হয়তো বিরক্তিকর একটা মাছিকে পিষে ফেলতে চাইতে পারি, অথবা সরলতার বশে কাউকে আঘাত করতে পারি, কারণ আমরা মনে করি সহিংসতা ভালো কিংবা আমরা অন্যদের সাথে যা করি তাতে কিছু যায় আসে না।

এর সাথে জড়িত কাজটি হলো আমাদের ইচ্ছাকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার চিন্তা করা, এবং আমাদের এই নেতিবাচক মানসিক কাজটি তখনই পূর্ণতা পায় যখন আমরা সেই ব্যক্তি বা প্রাণীটিকে আঘাত করার জন্য চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিই। সুতরাং, পুরোপুরি বিদ্বেষপূর্ণ চিন্তা করা মানে শুধু কারো প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করা বা কারো ক্ষতি কামনা করা নয়। এটি সেই ক্ষতি ঘটানোর জন্য দৃঢ় সিদ্ধান্ত নেওয়ার চেয়েও ঊর্ধ্বে।

এখানে, লোভের মতোই, আমাদের অকুশল মানসিক কাজের পেছনের উদ্দেশ্য সম্পূর্ণ বিদ্বেষপূর্ণ হওয়ার জন্য পাঁচটি অশান্তকারী আবেগ অবশ্যই উপস্থিত থাকতে হবে:

  • শত্রুতা, যা আসে এমন কোনো প্রতীককে শক্ত করে আঁকড়ে ধরার মাধ্যমে, যা কাউকে আঘাত করার ইচ্ছার কারণকে প্রকাশ করে।
  • এটি সহ্য করতে না পারার (Tib. mi bzod pa’i sems) মনোভাব, কারণ কোনো ক্ষতি না করে আমরা আর এটি সহ্য করতে পারি না।
  • বিদ্বেষ পোষণ করার (Tib. ’khon du ’dzin pa, সংস্কৃত: উপানহ) মনোভাব, যা আসে আমাদের রাগান্বিত ও বিরক্ত হওয়ার কারণগুলো নিয়ে ভুল বিবেচনার (Tib. tshul min yid bcas) সাথে বারবার চিন্তা করার মাধ্যমে।
  • কারো সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার একটি প্রতিযোগিতামূলক মনোভাব, যার মাধ্যমে আমরা অনুভব করি, “যদি আমি আমার প্রতিদ্বন্দ্বীকে ঘুষি মারতে বা হত্যা করতে পারতাম, তাহলে কতই না ভালো হতো”।
  • কারো উপর শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করার একটি একগুঁয়ে মনোভাব, এবং তা করার জন্য সেই ব্যক্তিকে আঘাত করার ইচ্ছার ব্যাপারে বিন্দুমাত্র লজ্জা বোধ না করা। সুতরাং, এটি যে একটি দোষ, বা এটি থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য আমাদের সংকল্প করা উচিত—এই সামান্যতম উপলব্ধিও না থাকা।

‘কেবলমাত্র বিদ্বেষ’ (Tib. gnod sems tsam du ’gyur ba) হলো কেবল এই আশা করা যে, যে আমাদের আঘাত করেছে তার কোনো ক্ষতি হোক, অথবা এই প্রার্থনা করা যে কেউ তার সর্বস্ব হারাক বা নরকে যাক। অন্যদিকে, সম্পূর্ণ বিদ্বেষের সাথে চিন্তা করা হলো শত্রুতা পোষণ করা, তা সহ্য করতে না পারা, বিদ্বেষপূর্ণ আক্রোশ পুষে রাখা, প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা এবং কাউকে ছাড়িয়ে যাওয়ার ইচ্ছা পোষণ করা, এবং তারপর অন্য ব্যক্তির গলা টিপে মারার তীব্র আকাঙ্ক্ষা করা ও বাস্তবে তা করার পরিকল্পনা করা।

বিদ্বেষের সাথে চিন্তা করা যেকোনো আধ্যাত্মিক বিকাশের জন্য অত্যন্ত ধ্বংসাত্মক। যেহেতু এটি অন্যদের কষ্ট দেওয়ার ইচ্ছা, তাই বিদ্বেষ হলো মহান করুণার ঠিক বিপরীত, যার মাধ্যমে আমরা কামনা করি যে প্রত্যেকে সমস্যা থেকে মুক্ত থাকুক এবং আমরা নিজেরাই তা ঘটাতে পারি। অতএব, যদি আমরা এই ধরনের নেতিবাচক চিন্তার দিকে মানসিক তাগিদ অনুভব করি, তবে আমাদের চিন্তাধারা সম্পূর্ণ হওয়ার আগেই তা থামানোর চেষ্টা করতে হবে। অনাদি পুনর্জন্ম থেকে আমরা এই ধরনের ক্ষতিকর মানসিক অভ্যাসে অভ্যস্ত হয়ে এসেছি। তাই, যখন আমরা নিজেদেরকে বিদ্বেষপূর্ণ চিন্তা করতে দেখি, তখন তাতে অবাক হওয়ার কিছু থাকে না। তবে, একে দ্রুত কেটে যেতে দিন এবং মৈত্রী ও করুণার মতো বিপরীত শক্তি প্রয়োগ করে এর থেকে মুক্তি লাভ করুন।

যেমন নাগার্জুন ‘সুহৃল্লেখ’ (17)-এ বলেছেন:

জেনে রাখুন যে চিন্তা জলে, মাটিতে বা পাথরে আঁকা চিত্রের মতো হতে পারে। এদের মধ্যে, যাদের মধ্যে অশান্তকারী আবেগ আছে তাদের জন্য প্রথমটির মতো হওয়া সর্বোত্তম; আর যাদের ধর্মের প্রতি আকাঙ্ক্ষা রয়েছে তাদের জন্য শেষেরটির মতো হওয়া (সর্বোত্তম)।

বিদ্বেষপূর্ণ ও বিকৃত চিন্তাধারা

বিদ্বেষপূর্ণ ও বিকৃত চিন্তাধারা হলো এক ধরণের সংকীর্ণ ও অজ্ঞ মানসিক অবস্থা, যেখানে আমরা কোনো কিছুকে অস্বীকার বা প্রত্যাখ্যান করার জন্য একগুঁয়ে মনোভাব পোষণ করি। এর বিষয়বস্তু অবশ্যই এমন কোনো ঘটনা বা বিষয় হতে হবে যার বাস্তব অস্তিত্ব রয়েছে—যেমন জীবনের কোনো সত্য, কারো গুণাবলী, কোনো পরিস্থিতি ইত্যাদি। এক্ষেত্রে আমাদের ধারণা থাকে যে, ওই বিষয়টিকে অস্বীকার করাটাই সঠিক; যেমন—একজন অপরাধী যখন মনে করে যে সে যা করেছে তা ঠিক ছিল এবং আদালতে তা প্রমাণ করার জন্য লড়াই করতে চায়। এর মূল প্রেরণা হলো বিদ্যমান কোনো কিছুকে প্রত্যাখ্যান করার ইচ্ছা। তিনটি অশান্তকারী মানসিক প্রবৃত্তির যেকোনো একটির উপস্থিতি এতে থাকতে হবে। আসক্তির কারণে আমরা এমন বিকৃত ও বিদ্বেষপূর্ণ চিন্তা করতে পারি—যেমন, আমাদের কোনো প্রভাবশালী বন্ধু যদি এমনটা মনে করেন, তবে তাঁর আনুকূল্য লাভের আশায় আমরাও তাঁর সাথে একমত হতে পারি। আবার বিদ্বেষবশত, সঠিক দৃষ্টিভঙ্গি পোষণকারী কোনো ব্যক্তিকে অপছন্দ করার কারণে এবং তাঁর সাথে একমত হওয়াটা সহ্য করতে না পেরে, আমরা যেকোনো মূল্যে তার বিপরীত অবস্থান নিতে পারি। এ ধরণের ঝগড়াটে বা একগুঁয়ে স্বভাবের মানুষরা অনেকটা শিশুসুলভ আচরণ করে। এক ব্যক্তির এমন এক চরম শত্রু ছিল যে ঘোড়ার পিঠে উল্টো হয়ে (অর্থাৎ ঘোড়ার মাথার দিকে মুখ না করে) চড়ত। কেবল তার চেয়ে আলাদা হওয়ার জন্য, ওই ব্যক্তিটি ঘোড়ার লেজের দিকে মুখ করে জিন-এ চড়ত! তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রে, অজ্ঞতা বা অপরিণত বুদ্ধির কারণে আমরা এ ধরণের বিকৃত ও বিদ্বেষপূর্ণ চিন্তায় লিপ্ত হই; যেমন—কোনো বিষয়ে ভুল ধারণা থাকা সত্ত্বেও মনে করা যে, সঠিক বিষয়টি কী তা আমাদের বলার মতো কেউ নেই।

এর সাথে জড়িত কর্মটি হলো প্রত্যাখ্যান বা অস্বীকার করার চিন্তা—যেমন মিথ্যা প্রচারণা চালানো বা নিজের চিন্তাভাবনা অন্যদের কাছে প্রকাশ করা। যখন আমরা কোনো বিষয়কে প্রত্যাখ্যান করার বিষয়ে নিশ্চিত সিদ্ধান্ত নিই, তখনই এই কর্মটি পূর্ণতা পায়। সুতরাং, বিদ্বেষপূর্ণ ও বিকৃত চিন্তাধারা মানে কেবল কোনো সত্যকে (যেমন—পুনর্জন্মের অস্তিত্ব) অবিশ্বাস করা নয়; বরং তার চেয়েও এক ধাপ এগিয়ে সক্রিয়ভাবে সেটিকে অস্বীকার বা খণ্ডন করার দৃঢ় সিদ্ধান্ত নেওয়া।

কোনো কিছুকে প্রত্যাখ্যান করার এই চিন্তার মাধ্যমে আমরা কোনো কারণ, কার্যফল, কোনো কিছুর কার্যকারিতা কিংবা বিদ্যমান কোনো বিষয়কে অস্বীকার করতে পারি। প্রথমটির একটি উদাহরণ হলো—ভালো বা মন্দ কর্ম বলে কিছু আছে, কিংবা কোনো কাজ করা উচিত আর কোনো কাজে দোষ থাকতে পারে—এসব বিষয়কে অস্বীকার করা। কর্মফলকে প্রত্যাখ্যান করার অর্থ হলো বিদ্রূপাত্মকভাবে অস্বীকার করা যে, এ ধরণের কাজের কোনো ফলাফল বা পরিণাম আছে। আর যখন আমরা কোনো কিছুর কার্যকারিতাকে অস্বীকার করি, তখন কার্যত আমরা এটাই প্রত্যাখ্যান করি যে—বীজ রোপণ ও তার পরিচর্যার ফলে কোনো ফল উৎপন্ন হতে পারে।  এর একটি উদাহরণ হলো এমনটা ভাবা যে, আমাদের জীবনে যা কিছু ঘটে তা কোনো কারণ ছাড়াই ঘটে—যা অনেকটা বাবা-মা ছাড়াই কোনো শিশুর জন্ম হওয়ার বিশ্বাসের মতো। এর ফলে, সুফল পাওয়ার লক্ষ্যে গঠনমূলক কোনো কিছু করার গুরুত্বকেই আমরা অস্বীকার করে বসি। অথবা আমরা কার্যকারণ বা আসা-যাওয়ার প্রক্রিয়াকে অস্বীকার করি; যেমন—অতীত ও ভবিষ্যতের পুনর্জন্মকে অস্বীকার করা এবং এই জেদ ধরা যে, আমাদের জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে চলমান চৈত্তিক প্রবাহটি (mental continuum) কোনো উৎস ছাড়াই সৃষ্টি হয়েছে এবং মৃত্যুর সাথে সাথেই তা আকস্মিকভাবে শেষ হয়ে যায়। কিংবা আমরা বিশেষ কিছু সত্ত্বার অস্তিত্ব লাভ বা উদ্ভবকেও অস্বীকার করি—যেমন ‘বার্দো’ (অন্তর্বর্তী অবস্থা)-র সত্ত্বা, অথবা আনন্দহীন লোক বা স্বর্গীয় লোকে আটকা পড়া সত্ত্বারা—যারা প্রত্যেকেই তাদের মানসিক প্রবাহের পূর্ববর্তী মুহূর্তে বিদ্যমান কর্ম-প্রবৃত্তির প্রভাবে এক মুহূর্তেই উদ্ভূত হয়। যখন আমরা ‘অর্হত’-এর (যিনি সমস্ত মানসিক বা আবেগজনিত আবরণ দূর করেছেন) অস্তিত্বকে অস্বীকার করি, তখন আমরা একটি বিদ্যমান বাস্তবতাকে প্রত্যাখ্যান করি।

তাছাড়া, আমাদের এই বিকৃত ও বিদ্বেষপূর্ণ চিন্তাধারাকে পূর্ণতা পেতে হলে, আমাদের অভিপ্রায়ের মধ্যে নিম্নলিখিত পাঁচটি ক্ষতিকর বা অশান্তকারী আবেগের উপস্থিতি থাকতে হবে:

  • অন্ধত্ব বা অজ্ঞতা (Tib. zhva ba): কোনো বিষয় বা ঘটনা আসলে কীভাবে বিদ্যমান বা তার প্রকৃত অবস্থা কী—তা না জানার ফলে সৃষ্ট।
  • বিবাদপ্রিয়তা (Tib. drag shul gyi sems): নেতিবাচক আচরণ বা মনোভাব পোষণ করার মধ্যে এক ধরণের বিকৃত আনন্দ পাওয়ার প্রবণতা থেকে সৃষ্ট।
  • বিকৃত চিন্তাধারায় গভীরভাবে নিমজ্জিত থাকা (Tib. log par rgyun du zhugs pa’i sems): ভুল বিচার-বিবেচনার মাধ্যমে কোনো বিষয়কে নিশ্চিতভাবে বিশ্লেষণ করার ফলে সৃষ্ট মনোভাব।
  • চরম নীচতা বা হীনমনস্কতা (Tib. rab tu nyams pa’i sems): দানশীলতা, পরোপকার, সৎকর্ম, আধ্যাত্মিক অনুশীলন ইত্যাদির গুরুত্বকে প্রত্যাখ্যান করার ফলে সৃষ্ট।
  • অন্যকে পরাস্ত করার একগুঁয়ে মনোভাব: বিদ্বেষপূর্ণ আচরণ ও অন্যের বিশ্বাসকে প্রত্যাখ্যান করার বিষয়ে বিন্দুমাত্র লজ্জা অনুভব না করা এবং এটি যে একটি দোষ বা ত্রুটি—অথবা এটি থেকে মুক্ত হওয়ার সংকল্প করা উচিত—সে বিষয়ে সামান্যতম উপলব্ধিও না থাকা।  

বিকৃত ও বিদ্বেষপূর্ণ চিন্তাধারার অনেক স্তর থাকলেও, কেবল তখনই এর পূর্ণ ও অকুশল রূপটি প্রকাশ পায়—যখন আমরা কোনো বিষয়ে অন্ধ ও বিবাদপ্রিয় হয়ে পড়ি, নিজেদের বিকৃত ধারণায় গভীরভাবে আচ্ছন্ন থাকি, চরম সংকীর্ণ মানসিকতা নিয়ে অন্যকে পরাস্ত করতে চাই এবং সেই ব্যক্তির সঠিক বক্তব্যকে পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান করার সিদ্ধান্ত নিই। এটিই হলো বিকৃত চিন্তাধারার সবচেয়ে মারাত্মক ধরন; কারণ এ ধরনের তীব্র নেতিবাচক আচরণের ফলে আমাদের কোনো ইতিবাচক কর্মশক্তিই আর আধ্যাত্মিক অগ্রগতি ও সুখের ভিত্তি হিসেবে কাজ করতে পারে না। তাই, এ ধরনের আত্মধ্বংসী মনোভাব গড়ে ওঠা থেকে আমাদের অবশ্যই সতর্ক থাকতে হবে।

সারসংক্ষেপে, যদিও দশটি ধ্বংসাত্মক কর্মের প্রত্যেকটিই তিনটি বিষাক্ত মনোভাবের যেকোনো একটির দ্বারা শুরু হতে পারে, কিন্তু কারো জীবন হরণ করা, কঠোর কথা বলা এবং বিদ্বেষের সাথে চিন্তা করা শুধুমাত্র শত্রুতার সঙ্গেই পূর্ণতা লাভ করে; যা দেওয়া হয়নি তা গ্রহণ করা, অনুপযুক্ত যৌন আচরণে লিপ্ত হওয়া এবং লোভের সাথে চিন্তা করা তীব্র বাসনা বা আসক্তির সাথে পূর্ণতা পায়; অপরদিকে, বৈরিতার সাথে বিকৃত চিন্তা করা শুধুমাত্র সরলতার দ্বারাই পূর্ণতা লাভ করে। তবে, মিথ্যা বলা, বিভেদ সৃষ্টি করা এবং অর্থহীনভাবে বকবক করা এই তিনটির যেকোনোটির সঙ্গেই পূর্ণতা পেতে পারে।

[বসুবন্ধু কর্তৃক “অভিধর্মকোষ,” চতুর্থ. অধ্যায়, ৬৮-৭১; এবং অসঙ্গ কর্তৃক “অভিধর্ম সমুচ্চয়,” ২৫৭-২-৩ থেকে ৬-এ উদ্ধৃত।]

কায় ও বাকের সাতটি অকুশল কর্মের মধ্যে, অনুপযুক্ত যৌন আচরণে লিপ্ত হওয়া ব্যতীত বাকি সবগুলোই আমাদের মানসিক ধারায় একই নেতিবাচক কর্মফল সৃষ্টি করে, সেই কাজটি আমরা নিজেরা করি বা অন্য কাউকে দিয়ে করাই।  তবে, অনুচিত যৌন আচরণে লিপ্ত হওয়ার ক্ষেত্রে, সেই কাজটি আমাদের নিজেদেরই করতে হয়, কারণ আমাদের হয়ে অন্য কেউ অর্গাজমের পরমানন্দ লাভ করতে পারে না [বসুবন্ধু কর্তৃক ‘অভিধর্মকোষ’, চতুর্থ. ৬৭-এ উদ্ধৃত]।

একই সময়ে কতগুলি অকুশল কাজ করা যেতে পারে, অস্তিত্বের বিভিন্ন স্তরে কোনগুলি সম্ভব, ইত্যাদি বিষয়ে আরও বিশদ বিবরণের জন্য আমরা বসুবন্ধুর ‘অভিধর্মকোষ’ এবং অসঙ্গের ‘অভিধর্মসমুচ্চয়’ অধ্যয়ন করি। আমাদের এই বিভিন্ন সূক্ষ্ম বিষয়গুলি অনুধাবন করতে শিখতে হবে, যাতে আমরা আমাদের আচরণ সম্পর্কে আরও সচেতন হতে পারি। বিচারবুদ্ধিসম্পন্ন সচেতনতার মাধ্যমে, আমরা অকুশল কাজ থেকে নিজেদের সংযত করতে শুরু করতে পারি এবং প্রতিদিন অসচেতনভাবে যে নেতিবাচক কর্মফল তৈরি করি, তা হ্রাস করতে পারি।

যে কারণগুলো এই অকুশল কাজগুলোর ফলাফলকে গুরুতর বা লঘু করে তোলে, সেগুলোর মধ্যে পার্থক্য নিরূপণ

ছয়টি কারণ রয়েছে যা আমাদের অকুশল কাজ (Tib. lci yang gi khyad par drug) থেকে প্রাপ্ত ফলাফলের গুরুত্বকে প্রভাবিত করে:

  1. কাজের প্রকৃতি
  2. মানসিক তাগিদ
  3. প্রকৃত কাজ
  4. জড়িত ভিত্তি
  5. পুনরাবৃত্তি (Tib. dus rtag-pa, lan-mang)
  6. বিরোধী শক্তির অনুপস্থিতি (Tib. gnyen-po med-pa)।

[১] কায় ও বাকের সাতটি অকুশল কাজের মধ্যে, অন্য প্রাণীর জীবন হরণের পরিণতি স্বভাবতই সবচেয়ে গুরুতর। এরপর, এই ধরনের প্রতিটি কাজের গুরুত্বপূর্ণ হল সপ্তম কাজ, অর্থাৎ অর্থহীন বকবকানি পর্যন্ত কমতে থাকে, যা স্বভাবতই সবচেয়ে কম গুরুতর, কিন্তু সময়ের সবচেয়ে বড় অপচয়কারী। এই গুরুত্ব হ্রাসের কারণ হলো, প্রতিটি পরবর্তী কাজ জড়িত অপর প্রাণীর জন্য কম কষ্টের কারণ হয়। যেহেতু প্রতিটি জীব তার সম্পদের চেয়ে নিজের জীবনকে বেশি মূল্যবান মনে করে, তাই হত্যা করা স্বভাবতই চুরির চেয়ে বেশি গুরুতর। 

চিত্তের তিনটি অকুশল কর্মের মধ্যে, লোভের সাথে চিন্তা করার পরিণতি সবচেয়ে হালকা, যেখানে বিদ্বেষের সাথে বিকৃত চিন্তা করা এই দশটি কর্মের মধ্যে প্রকৃতিগতভাবে সবচেয়ে গুরুতর। এর কারণ হল এটি আমাদের সমস্ত ইতিবাচক কর্মশক্তির ফল উৎপাদনের ক্ষমতাকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে, যা এমনকি কারও জীবন কেড়ে নিলেও হয় না [বসুবন্ধু কর্তৃক “অভিধর্মকোষ" চতুর্থ. ৭৯-এ উদ্ধৃত]।

[২] অকুশল কাজ করার ইচ্ছার সাথে যে, নির্দিষ্ট অশান্তকারী আবেগ বা মনোভাব থাকে তা যত শক্তিশালী হয়, পরিণতি তত গুরুতর হয়। যদিও, সহজাতভাবে, বিদ্বেষের সাথে চিন্তা করা আসক্তি বা সরলতার চেয়ে একটি গুরুতর অশান্তকারী আবেগ – কারণ এটি বিদ্বেষী ব্যক্তি এবং অপর পক্ষ যার প্রতি এটি লক্ষ্য করা হয় উভয়েরই ক্ষতি এবং কষ্ট নিয়ে আসে – এখানে জড়িত নির্দিষ্ট মানসিক ব্যাধির প্রকৃতি অনুসারে কোনও পার্থক্য করা হয় না। একমাত্র পার্থক্য হল নেতিবাচক কর্মকে চালিতকারী নির্দিষ্ট অশান্তকারী আবেগের মাত্রা এবং পরিমাণ অনুসারে।  কথার প্রসঙ্গে কাউকে গালি দেওয়াটা, যদিও কঠোর এবং অপমানজনক, বেশ হালকা একটি বিষয়। কিন্তু, গভীর শত্রুতা নিয়ে সেই একই শব্দ ব্যবহার করা এবং রাগের মাথায় চিৎকার করে তা বলা অত্যন্ত গুরুতর হয়ে ওঠে।

[৩] কোনো অকুশল কাজের যন্ত্রণাদায়ক পরিণতি, আমরা যত বেশি যন্ত্রণা দিই, তার অনুপাতে তত বেশি গুরুতর হয়। হত্যা, চুরি, ধর্ষণ, ব্যভিচার, মিথ্যা বলা, নির্যাতন ইত্যাদি সব ক্ষেত্রেই এটি সত্য। ধরা যাক, কোনো প্রাণীর জীবন কেড়ে নেওয়া।

যখন আমরা কোনো পোকামাকড়ের উপর পা দিই, তখন সেটি তুলনামূলকভাবে কম যন্ত্রণায় দ্রুত মারা যায়। কিন্তু, যখন আমরা কোনো বড় প্রাণীকে পাথর ছুঁড়ে মারি, উদাহরণস্বরূপ, তখন মৃত্যু ততটা দ্রুত হয় না। যেহেতু তার শরীরের আকার অনেক বড় এবং সে অনেক বেশি যন্ত্রণা ভোগ করে ও তা দীর্ঘ সময় ধরে চলে, তাই এর ফলে আমাদের যে পরিণতি ভোগ করতে হবে তা অনেক বেশি গুরুতর হবে। আমরা যত বেশি যন্ত্রণা সৃষ্টি করব, আমাদেরও তত বেশি যন্ত্রণা হবে। এমনকি যদি আমরা ছোট পোকামাকড়ও মারি, তবুও যদি আমরা প্রথমে তার ডানা ও পা ছিঁড়ে ফেলি এবং তারপর তাকে আগুনে ফেলে দিই, তার পরিণতি কেবল দ্রুত এক আঘাতে মারার চেয়ে অনেক বেশি খারাপ হবে। কল্পনা করুন, কোনো দৈত্য আমাদের পা ছিঁড়ে ফেলছে এবং আমাদের আগুনে ছুঁড়ে দিচ্ছে!

হত্যা করার আগে কোনো শিকারকে যন্ত্রণা দেওয়া এবং ধীরে ধীরে নির্যাতন করা অত্যন্ত গুরুতর।  আমরা যে শারীরিক নৃশংসতা ঘটাই, তার পাশাপাশি যদি এর সাথে ভয়ানক মানসিক যন্ত্রণাও সৃষ্টি করি, তবে তা আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে। যেমন, কাউকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার আগে তার সমস্ত মানবিক মর্যাদা কেড়ে নেওয়া, তাকে আতঙ্কিত করা, তাকে অনাহারে রাখা, তাকে করুণার জন্য কাকুতি-মিনতি করতে ও চিৎকার করতে বাধ্য করা ইত্যাদি। অধিকন্তু, এর উপরে যদি আমরা নির্যাতন ও হত্যার মতো কাজ করার সময় বিকৃত আনন্দ ও উল্লাস লাভ করি, তা নিয়ে বড়াই করি, অন্যদের কাছে তা জাহির করি, কাজটি করার সময় গা শিউরে ওঠার মতো চিৎকার করি ইত্যাদি, তবে এর পরিণতি অবিশ্বাস্যভাবে গুরুতর হয়ে ওঠে। আমরা হয়তো কোনো কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পের এই দৃশ্যের মতো অপরাধী উন্মাদ খুনি নই, কিন্তু মশা, মাছি, ছারপোকা, আরশোলা, আমাদের ফসলে আক্রমণকারী অন্যান্য ক্ষতিকর প্রাণী ইত্যাদি শিকার করে হত্যা করার সময় আমাদের মধ্যে যে মনোভাব জন্মায়, তা আমাদের সতর্কভাবে খতিয়ে দেখা উচিত। নিজেদের মধ্যে যা দেখব, তাতে আমরা হয়তো আতঙ্কিত হয়ে পড়ব।

[৪] কোনো নেতিবাচক কাজের পরিণতির তীব্রতা সেই কাজের ভিত্তি যার প্রতি বা যার উপর কাজটি করা হয়েছে, তার কাছ থেকে অতীতে, বর্তমানে বা ভবিষ্যতে আমরা বা অন্যরা যে পরিমাণ উপকার ও সাহায্য পেয়েছি বা পেতে পারি, তার উপর নির্ভর করে বৃদ্ধি পায়। এইভাবে, আমাদের আধ্যাত্মিক গুরু, শিক্ষক, বোধিসত্ত্ব সংঘের সদস্য, আমাদের পিতামাতা ইত্যাদির দিকে নোংরা দৃষ্টিতে তাকানোও গুরুতর পরিণতি ডেকে আনতে পারে।

হত্যার ক্ষেত্রে, আমাদের হত্যার ভিত্তি একটি পোকামাকড় থেকে শুরু করে একটি ছোট প্রাণী, একটি বড় প্রাণী, একটি ভ্রূণ, একজন মানুষ, একজন ঘনিষ্ঠ বন্ধু, একজন ভাইবোন, একজন পিতামাতা, একজন আধ্যাত্মিক গুরু, একজন বোধিসত্ত্ব, একজন অর্হত, একজন বুদ্ধ পর্যন্ত, পরিণতির তীব্রতা বৃদ্ধি পায়।

চুরির তীব্রতা আরও বাড়ে যখন ভিত্তি হয় প্রচুর পরিমাণে বা উৎকৃষ্ট মানের বস্তু, অথবা যদি সেগুলি কোনো দরিদ্র ও নিঃস্ব ব্যক্তির সম্পত্তি, বা শিক্ষাসামগ্রী, প্রার্থনা পুস্তক, ধর্মগ্রন্থ, বা কোনো আধ্যাত্মিক গুরু, অর্হত, সংঘ, স্তূপ ইত্যাদির সম্পত্তি হয়।

অনুপযুক্ত যৌন আচরণ আরও গুরুতর হয়ে ওঠে যদি আমরা যার সাথে জড়িত থাকি তিনি আমাদের পিতা-মাতা, ব্রহ্মচর্য ব্রতধারী কোনো সন্ন্যাসী বা কোনো ঘনিষ্ঠ বন্ধুর সঙ্গী হন; যদি সেই আচরণে আমাদের বাক্-দ্বারকে যৌন অঙ্গ বা যন্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে অবমাননা করা হয়; যদি স্থানটি কোনো স্তূপের সামনে বা কোনো বিহারের প্রাঙ্গণ হয়; অথবা যদি সেই কাজের সময় আমরা বা আমাদের সঙ্গী একদিনের ব্রহ্মচর্য ব্রত গ্রহণ করে থাকি, অসুস্থ থাকি বা নারীটি গর্ভাবস্থার শেষ পর্যায়ে থাকেন।

মিথ্যার পরিণতি গুরুতর হয়ে ওঠে যখন আমরা আন্তরিকভাবে প্রশ্ন করা কোনো ব্যক্তিকে প্রতারিত করার জন্য ইচ্ছাকৃতভাবে ভুল উত্তর দিই, অথবা যখন আমরা অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে মিথ্যা বলি, এবং শরীরের তিনটি অকুশল কাজের মতোই, যখন আমরা যার কাছে বা যার সম্পর্কে মিথ্যা বলি তিনি আমাদের পিতা-মাতা, আধ্যাত্মিক গুরু, সংঘের সদস্য, বুদ্ধ ইত্যাদি হন। সবচেয়ে গুরুতর মিথ্যা হলো সেগুলো, যা সংঘে বিভেদ সৃষ্টির উদ্দেশ্যে বলা হয়।

বিভেদ সৃষ্টিকারী কথাবার্তা বিশেষভাবে গুরুতর হয়ে ওঠে যখন সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ বন্ধু বা পারিবারিক সম্পর্কে আবদ্ধ থাকে, বিশেষ করে কোনো শিশু ও তার পিতামাতা, অথবা কোনো আধ্যাত্মিক গুরু ও শিষ্য, বা সংঘের কোনো গোষ্ঠী। সুতরাং, আমাদের অবশ্যই খুব সতর্ক থাকতে হবে যেন আমরা কোনো আধ্যাত্মিক গুরুর কাছে তাঁর শিষ্যদের সম্পর্কে কোনো খারাপ কথা না বলি। এটি অত্যন্ত নেতিবাচক।

কঠোর কথাবার্তা গুরুতর হয়ে ওঠে যখন তা আমাদের পিতামাতা, আধ্যাত্মিক গুরু ইত্যাদির প্রতি নির্দেশিত হয়, যখন তা ইচ্ছাকৃতভাবে কাউকে আঘাত করতে বা তিরস্কার বা হুমকি দিতে ব্যবহৃত হয়, অথবা যখন এতে যথাযথ, সম্মানজনক বস্তু বা বিষয় সম্পর্কে কঠোর বা মিথ্যা কথা জড়িত থাকে।

অর্থহীন বকবকানির গুরুতর পরিণতি হয় যখন তা ঝগড়া, কারো পেছনে কথা বলা, তর্ক করা, উস্কানিমূলক কথা বলা বা অশান্তকারী আসক্তির কারণে অন্য ধর্মের স্তোত্র ও ধর্মগ্রন্থ পাঠ করার রূপ নেয়, অথবা যখন তা ব্যঙ্গাত্মক, অভদ্র বা অপমানজনক হয়, বা আমাদের পিতামাতা, আধ্যাত্মিক গুরু ইত্যাদির উদ্দেশ্যে বা তাঁদের সম্পর্কে অনুপযুক্ত বিষয় বা নিছক বাজে কথা বলা হয়।

লোভাতুর চিন্তা তখন ভারী হয়ে ওঠে, যখন আকাঙ্ক্ষিত বস্তু হয় সংঘ, আমাদের আধ্যাত্মিক গুরু বা কোনো স্তূপকে প্রদত্ত নৈবেদ্য বা জিনিসপত্র; অথবা যখন আমরা উদ্ধত মোহ ও অহংকারের বশে কোনো রাজা বা নিষ্কলঙ্ক নৈতিকতার অধিকারী বিদ্বান ব্যক্তির মতো সম্মান ও অভিজ্ঞতার সুবিধা লাভের আকাঙ্ক্ষা করি।

বিদ্বেষপূর্ণ চিন্তা বিশেষভাবে ভারী হয় যখন তা আমাদের পিতামাতা, আত্মীয়-স্বজন, আধ্যাত্মিক গুরু, নির্দোষ ব্যক্তি, দরিদ্র, নিপীড়িত, দুঃখী, করুণার পাত্র এবং যারা নিজেদের কৃত অন্যায়ের জন্য আন্তরিকভাবে ক্ষমা চেয়ে অনুতপ্ত হয়েছে, তাদের প্রতি পরিচালিত হয়।

বিদ্বেষপূর্ণ বিকৃত চিন্তা অত্যন্ত ভারী হয়ে ওঠে, যখন আমরা সক্রিয়ভাবে এই ধারণাকে অস্বীকার করার চেষ্টা করি যে বুদ্ধ, সকল সমস্যা ও দুঃখ থেকে মুক্তি অথবা আচরণের কার্যকারণ সম্পর্কের মতো কোনো কিছুর অস্তিত্ব থাকতে পারে। এই ধরনের চিন্তা, আধুনিক বিশ্বে কোনো অর্হত বা কোনো ভালো বা মূল্যবান কিছুর অস্তিত্বকে কেবল অস্বীকার করার মতো বিদ্রূপাত্মক চিন্তার চেয়েও অনেক বেশি ভারী।

[৫] আমরা যত ঘন ঘন একটি অকুশল কাজ করি, তার পরিণতি তত গুরুতর হবে। এর কারণ হল আমরা কাজটি পুনরাবৃত্তি করার জন্য একটি ক্রমবর্ধমান শক্তিশালী অভ্যাস গড়ে তুলি। অতএব, এমনকি অর্থহীন বকবক করাও, যদি ক্রমাগত এবং অবিরাম করা হয়, তার গুরুতর পরিণতি হবে, যেখানে একটি নেতিবাচক কাজ কেবল একবার করা হলে তা কম গুরুতর হয়।

[৬] পরিশেষে, যদি আমরা তাদের পরিণতির ভারসাম্য রক্ষা করার জন্য এবং প্রতিপক্ষ হিসাবে কাজ করার জন্য কোনও গঠনমূলক কাজ না করে অনেক অকুশল কাজ করি, তাহলে এই নেতিবাচক কাজগুলি আরও গুরুতর হয়ে ওঠে।

পাবোঙকার 'লিবারেশন ইন দ্য পাম অফ ইওর হ্যান্ড'-এ উপস্থাপিত এই ছয়টি উপাদানের বিপরীতে, চোঙখাপার 'গ্র্যান্ড প্রেজেন্টেশন'-এ পাঁচটি উপাদান দেওয়া হয়েছে:

  • উদ্দেশ্য
  • জড়িত ক্রিয়া
  • প্রতিপক্ষ শক্তির অনুপস্থিতি
  • বিকৃত বাধ্যতামূলক চালিকাশক্তি (Tib. log par mngon par zhen pa)
  • ভিত্তি।

পুনরাবৃত্তির উপাদানটি জড়িত ক্রিয়ার অন্তর্ভুক্ত, যেখানে ক্রিয়ার প্রকৃতি এই পাঁচটিতে আলোচনা করা হয়নি।  বিকৃত চালিকাশক্তি বলতে বোঝায় কোনো কাজের পেছনের শক্তি হিসেবে কোনো বিকৃত দৃষ্টিভঙ্গি আছে কি না; যেমন, আচরণের কার্যকারণ সম্পর্ক বিষয়ে একটি বিকৃত দৃষ্টিভঙ্গির উপর ভিত্তি করে উৎসর্গ হিসেবে কোনো পশু হত্যা করা।

চোঙখাপা এরপর অসঙ্গের ‘বস্তু সংগ্রহ’ (Tib. sa’i dngos gzhi, সংস্কৃত: বাস্তুসংগ্রহ)-এ প্রাপ্ত আরও ছয়টি উপাদানের একটি তালিকা দেন:

  • প্রকৃতি
  • প্রভাব বিস্তারকারী পূর্ববর্তী শক্তি (Tib. mngon par ‘du byed pa, সংস্কৃত: অভিসংস্কার)
  • স্বভাব
  • ভিত্তি
  • অসামঞ্জস্যপূর্ণ উপাদানের সুনির্দিষ্ট উপস্থিতি (Tib. mi mthun pa’i phyogs gcig tu nges pa)
  • অসামঞ্জস্যপূর্ণ উপাদানের নির্মূল (Tib. mi mthun phyog sel ba)।

পাবোঙকা ও চোঙখাপার তালিকায় অভিপ্রায়কে যেভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে, ঠিক সেভাবেই প্রভাব বিস্তারকারী পূর্ববর্তী শক্তিকেও ব্যাখ্যা করা হয়। অভ্যাসগত অবস্থা পৌনঃপুনিকতার অনুরূপ, অপরদিকে অসামঞ্জস্যপূর্ণ উপাদানের সুনির্দিষ্ট উপস্থিতি বা নির্মূল হওয়া অনেকটা বিরোধী শক্তির অনুপস্থিতিরই সমতুল্য।

বসুবন্ধুর ‘অভিধর্মকোষ’-এ, কোনো কর্মের ফলাফলের গুরুত্বকে পৃথক করার জন্য আরও ছয়টি উপাদানের একটি তালিকা উপস্থাপন করা হয়েছে:

  • উপসংহার বা অনুসিদ্ধান্ত
  • ক্ষেত্র
  • ভিত্তি
  • সংশ্লিষ্ট কর্ম
  • যে অভিপ্রায়ে কর্মটি সম্পন্ন করা হয়
  • যে অভিপ্রায়ে এটি প্রণোদিত হয়েছিল (Tib. bsam pa)।

উপসংহার বলতে বোঝায় আমরা ভবিষ্যতে কর্মটির পুনরাবৃত্তি করব কি না। ক্ষেত্র বলতে অসঙ্গ, চোঙখাপা এবং পাবোঙকার তালিকায় যাকে ভিত্তি বলা হয়েছে, তাকে বোঝায়, যেখানে এখানকার ভিত্তি বলতে অন্যরা যাকে কর্মের প্রকৃতি বলেন, তাকে বোঝায়।  [প্রথম দলাই লামা (Tib. rgyal-ba dGe-’dun grub) কর্তৃক “পথের ব্যাখ্যা” (Tib. mdzod-tik thar-lam gsal-byed), ২৭৫-এ উদ্ধৃত।]

যদি আমাদের কোনো নেতিবাচক কাজ করতেই হয়, আমরা চেষ্টা করি যেন সেই গুরুভারের সমস্ত উপাদান একসাথে পূর্ণ না হয়। উদাহরণস্বরূপ, যদি আমাদের ছারপোকা মারার জন্য ধোঁয়া দিতেই হয়, আমরা চেষ্টা করি কাজটি যতটা সম্ভব কম অশান্তকারী আবেগ বা মনোভাব নিয়ে করতে, যাতে ন্যূনতম পরিমাণ কষ্ট হয়, কাজটি যতটা সম্ভব কমবার করতে হয় এবং এর বিপরীতে এমন কিছু ইতিবাচক কাজ করতে হয়, যেমন—আমরা যা করছি তা যে ভুল, তা খোলাখুলি স্বীকার করা, অবিলম্বে অনুশোচনার মতো বিপরীত শক্তিকে জাগ্রত করা ইত্যাদি। আমরা সেই চিরায়ত উদাহরণের মতো হতে চাই না, যার মধ্যে ছয়টি উপাদানই পূর্ণ থাকে: একজন পেশাদার কসাই যে সর্বদা নেতিবাচক এবং কখনও কোনো ইতিবাচক কাজ করে না, যে প্রচণ্ড রাগের বশে নয়টি সবচেয়ে ভয়ঙ্কর ধরনের নির্যাতনের মাধ্যমে তার বাবা-মাকে হত্যা করে।

অবশ্যই, সর্বোত্তম হলো নিজেদেরকে কখনও নেতিবাচক কর্মফলের শক্তি দ্বারা কলঙ্কিত হতে না দেওয়া। যারা গুরুতর পরিণতির অকুশল কাজ করে, তাদের ঘৃণা করলেও, যতক্ষণ আমরা নিজেদের কাজকে লঘু রাখছি, ততক্ষণ আমাদের নেতিবাচক থাকাটা ঠিক বলে মনে করা উচিত নয়।

যেমন আর্যদেব তাঁর ‘চতুঃশতক’ (Tib. bzhi brgya pa, সংস্কৃত: চতুঃশতক)-এর ৩.২২ শ্লোকে বলেছেন:

যদি (তাদের মধ্যে কারও) কুষ্ঠরোগ থাকত, তবে মূত্রে আবৃত সকল মানুষ একরকম হতো না। যেমন মূত্রে আবৃত (অ-কুষ্ঠরোগীরা) কুষ্ঠরোগীদের প্রতি (নাক কুঁচকাত), তেমনি অন্য সবাই তাদেরও এড়িয়ে চলত।

আবার, যদি এমন একদল লোক থাকত যাদের সবাই মূত্রে আবৃত এবং তাদের মধ্যে কেউ কেউ কুষ্ঠরোগীও হতো, তবে কুষ্ঠরোগহীনরা হয়তো এই ভয়ানক রোগে আক্রান্তদের প্রতি অবজ্ঞায় নাক কুঁচকাত। কিন্তু, যেহেতু তাদের নিজেদের শরীর থেকে তখনও মূত্রের দুর্গন্ধ আসত, তাই অন্য সবাই তাদের প্রতি নাক কুঁচকাত। একইভাবে, যদি আমরা হালকাভাবে কোনো অকুশল কাজ করে থাকি কিন্তু তার চেয়েও খারাপ কাজ করা কাউকে অবজ্ঞা করা, তাহলেও আমাদের কৃতকর্মের জন্য অন্যরাও আমাদের অবজ্ঞা করবে। আমাদের মনে রাখতে হবে যে সামান্য অকুশল কাজের ফলেও দুঃখ সৃষ্টি হয়।

তাদের ফলাফলের ইঙ্গিত

প্রতিটি অকুশল কর্মের তিন প্রকারের ফল আছে:

  1. একটি পরিপক্ক ফল
  2. একটি ফল যা তার কারণের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ (Tib. rgyu mthun gyi ’bras bu, সংস্কৃত: নিষ্যাং ফলম)
  3. একটি অধিপতি ফল (Tib. bdag ’bras, সংস্কৃত: অধিপতি ফলম) ।

[১] সাধারণভাবে, পরিপক্ক ফলগুলি হল নিরপেক্ষ ঘটনা (Tib. lung ma-bstan, সংস্কৃত: ব্যাকৃত, নিরপেক্ষ) যা একটি সীমিত সত্তার (Tib. rnam-shes-kyis zin-pa) মানসিক ধারাবাহিকতার সাথে সংযুক্ত এবং যা তাদের পরিপক্কতার কারণ হিসাবে নেতিবাচক ঘটনা বা কলুষিত ইতিবাচক ঘটনা থেকে আসে। অন্য কথায়, এই প্রসঙ্গে এগুলি হল পরবর্তী পুনর্জন্মের অবস্থার অভিজ্ঞতার সমষ্টিগত উপাদান – কায়, চিত্ত, ইন্দ্রিয় ইত্যাদি – যা পূর্ববর্তী বাধ্যতামূলক আচরণের দ্বারা নির্মিত কার্মিক শক্তির ফলে পরিপক্ক হয়। যদিও এই ধরনের সমষ্টিগত উপাদানসমূহ গঠনমূলক বা অকুশল উভয় কর্মেই জড়িত থাকতে পারে, কিন্তু আদতে এগুলি বাধাহীন, এবং বুদ্ধ এদেরকে এই দুটির কোনোটিই নির্দিষ্ট করে দেননি; এগুলি নিরপেক্ষ।

একটি গুরুতর অকুশল কর্মের পরিপক্ক ফল হলো, মনঃসংযোগের মুহূর্তেই চিত্ত-চেতনার সেইসব সমষ্টিগত উপাদানের দিকে চালিত হওয়া, যা এক আনন্দহীন লোকে আবদ্ধ জীব অনুভব করে: তার কায়, তার দেখা ও অনুভব করা ভয়ংকর ঘটনা, তার ব্যথা, ভয় ইত্যাদি অনুভূতি। একটি মাঝারি স্তরের অকুশল কর্মের ফল হলো, আঁকড়ে ধরা প্রেতের অনুভূত উপাদানের দিকে চালিত হওয়া, আর এই ধরনের একটি ছোট কর্মের পরিপক্ক ফল হলো তির্যক প্রাণীর অনুভূত উপাদানের দিকে চালিত হওয়া। কোনো অকুশল কর্ম গুরুতর, মাঝারি বা ছোট মাত্রার হবে কি না, তা নির্ভর করে সেই কর্মটি সম্পাদন, সম্পাদন ও সমাপ্ত করার পেছনের অশান্তকারী আবেগ বা মনোভাবের তীব্রতার মাত্রার উপর, অথবা কর্মটি তার সমস্ত অংশসহ কতটা সম্পূর্ণ ছিল তার উপর, অথবা যে সমস্ত উপাদান একে সেরকম করে তুলতে পারে, তা দিয়ে এটি কতটা ভারাক্রান্ত ছিল তার উপর।  অতএব, যেকোনো নেতিবাচক কর্ম যদি সম্পূর্ণ, যথেষ্ট গুরুতর এবং সম্পূর্ণরূপে বিক্ষুব্ধ মানসিক অবস্থায় করা হয়, তবে তা পরিপক্ব হয়ে মৃত্যুর সময় এক আনন্দহীন-লোকে পুনর্জন্মের দিকে চালিত হতে পারে।

[২] কোনো অকুশল কর্মের পরিপক্ব ফল হিসেবে, সবচেয়ে খারাপ পুনর্জন্ম অবস্থাগুলোর কোনো একটিতে সমষ্টিগত উপাদানগুলোর অভিজ্ঞতা সম্পন্ন করার পরেও, সেই পূর্ববর্তী কর্ম দ্বারা সৃষ্ট কার্মিক শক্তির ফলস্বরূপ আমাদের পথে আরও কর্মান্ত (Tib. las mtha’, সংস্কৃত: কর্মান্ত) আসতে থাকে। যখন আমরা পূর্বজন্মে সঞ্চিত কিছু ইতিবাচক কার্মিক শক্তির পরিপক্ব ফল হিসেবে পুনরায় আরেকটি মানব রূপ লাভ করি, তখন আমরা এই প্রতিক্রিয়াগুলোকে তাদের কারণের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ ফলাফলের আকারে অনুভব করব। এই ফলাফলগুলো সেই জীবনে আমাদের অভিজ্ঞতা (Tib. myong-ba rgyu-mthun-gyi ’bras-bu) এবং আমাদের আচরণ (Tib. byed-pa rgyu-mthun-gyi ’bras-bu) উভয়ের ক্ষেত্রেই সঙ্গতিপূর্ণ হবে।

যদি আমরা খুন করে থাকি, তবে তার প্রাথমিক ফল হিসেবে পুনর্জন্ম হয়, যেমন, কোনো এক আনন্দহীন লোকে। অবশেষে যখন সেই নারকীয় জীবনের কর্মশক্তি নিঃশেষ হয়ে যায় এবং আমরা আরেকটি মানব জন্ম লাভ করি, তখন এই কারণে যে আমরা কারো আয়ু কমিয়ে দিয়েছিলাম এবং তার শারীরিক গৌরব কেড়ে নিয়েছিলাম, আমরা নিজেরাও বহু রোগব্যাধি ও ব্যক্তিগত দুর্ভাগ্যে ভরা এক সংক্ষিপ্ত জীবন যাপন করি। এছাড়াও, অতীতে আমরা যা করেছিলাম তার ফলস্বরূপ, আমরা ছোটবেলা থেকেই সহজাতভাবে পশুদের নির্যাতন করতে, পোকামাকড় মারতে ইত্যাদি কাজে আনন্দ পাব এবং আমাদের প্রবল কর্মপ্রবৃত্তির তাড়নায় অবশেষে আরও একবার খুন করতে চালিত হব।

যদি আমরা পূর্বজন্মে চুরি করে থাকি, তবে আমাদের মানব পুনর্জন্ম দারিদ্র্যে পূর্ণ হবে, আমরা নিজেরাও ডাকাতির শিকার হব, যা কিছু আমরা লাভ করব তা হয় ছেড়ে দিতে অথবা অনেকের সাথে ভাগ করে নিতে বাধ্য হব, এবং এমনকি শৈশব থেকেই আমরা সহজাতভাবে চুরি করতে থাকব।

যদি আমরা ব্যভিচার করে থাকি, তবে আমাদের জীবনসঙ্গীর সাথে আমাদের সম্পর্ক খারাপ হবে, তারা অবিশ্বস্ত হবে, আমাদের বৈবাহিক সম্পর্ক এবং ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্ব কখনও স্থায়ী হবে না, এবং আমরা নিজেরাও বিবাহ-বহির্ভূত সম্পর্কের প্রতি তীব্রভাবে আকৃষ্ট হব।

মিথ্যা বলার কারণে, কারও উপর আমাদের কোনো প্রভাব থাকবে না, কেউ আমাদের কথায় বিশ্বাস করবে না, অন্যরা আমাদের গালিগালাজ করবে এবং আমাদের অনুপস্থিতিতে আমাদের সম্পর্কে মিথ্যা গল্প ছড়াবে, এবং আমরা নিজেরাও অতিরঞ্জন বা বিকৃতি ছাড়া কোনো কথা বলতে পারব না।

বিভেদ সৃষ্টিকারী কথা বলার কারণে, আমাদের বন্ধু সংখ্যা কম হবে এবং তারা আমাদের ছেড়ে চলে যাবে বা পরিত্যাগ করবে, আমরা আমাদের আধ্যাত্মিক গুরু এবং প্রিয়জনদের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ব, এবং আমরা নিজেরাও পরনিন্দা করে, অযাচিত মতামত দিয়ে এবং ভুল বোঝাবুঝি সৃষ্টি করে ক্রমাগত অন্যদের জন্য ঝামেলা ও উপদ্রবের কারণ হব।

কঠোর কথা বলার কারণে, আমরা সর্বদা সমালোচিত হব, সকলের অপ্রীতিকর খবর শুনতে বাধ্য হব এবং চারপাশের কান-ফাটানো কোলাহলের মধ্যে বাস করব, এবং আমরা নিজেরাও অভ্যাসবশত অমার্জিতভাবে কথা বলব ও গালিগালাজ করব।

অর্থহীন বকবক করার ফলে আমরা অন্যদের আস্থা ধরে রাখতে পারব না, সবাই আমাদের নিয়ে হাসাহাসি করবে, কেউ আমাদের গুরুত্ব দেবে না, অথচ আমরা নিজেরাও কথা বলা এবং অন্যদের কথার মাঝে বাধা দেওয়া বন্ধ করতে পারব না। এমনকি কেউ গভীর ধ্যানে মগ্ন থাকলেও আমরা কথা বলার জন্য তাড়না অনুভব করব এবং তার মনোযোগ আকর্ষণের জন্য তার পাঁজরে খোঁচাও দেব।

লোভী চিন্তার ফলে আমরা কোনো কাজই শেষ করতে পারব না, আমরা লক্ষ লক্ষ কাজ শুরু করব এবং সেগুলোর কোনো একটি শুরু করতেই অন্য কিছু করতে চাইব, অথচ আমরা নিজেরা যা দেখব তাই ছুঁয়ে দেখতে চাইব, সবকিছুর দাম জানতে চাইব, এবং যখন শুনব কেউ নতুন কোনো জিনিস কিনেছে, তখন আমাদেরও সেটা দেখতে যেতে হবে এবং পরখ করে দেখতে হবে।

বিদ্বেষপূর্ণ চিন্তার ফলে আমরা সর্বদা অপরাধবোধে ভুগব, অন্যদের নিয়ে সন্দিহান ও সন্দেহপ্রবণ থাকব, অথচ আমরা নিজেরা মানুষ ও পশুদের বিকৃতভাবে কষ্ট দিয়ে এবং দুষ্টুমি করে আনন্দ পাব।  আমরা যানবাহনের ক্ষতি করার জন্য রাস্তায় পাথর ফেলব, বা কারও রান্নাঘরে ইঁদুর ঢুকিয়ে দেব, অথবা যখনই কোনো কুকুর দেখব, তাকে জ্বালাতন ও যন্ত্রণা দেওয়ার জন্য এক ধরনের তাগিদ অনুভব করব।

বিদ্বেষপূর্ণ বিকৃত চিন্তাভাবনার ফলে, ধর্মচর্চার চেষ্টা করার সময় আমরা সর্বদা নিস্তেজ বোধ করব, যেন আমাদের মাথার উপর একটি হাঁড়ি রয়েছে; কিন্তু ভ্রান্ত ও জাগতিক কাজে লিপ্ত হলে পালকের মতো হালকা বোধ করব। অথচ আমরা নিজেরাই ক্রমাগত অন্যদের সমালোচনা করব, সবকিছুর দোষ খুঁজে বেড়াব, অন্য কেউ যা-ই করুক না কেন তাকে ভুল বা মন্দ বলে মনে করব এবং ধর্মকে পুরোপুরি ভুল বুঝব। এইভাবে, একটি নেতিবাচক কাজের ফল সর্বদা তার কারণের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ হয়।

আমাদের সহজাত আচরণে যে ফলটি তার কারণের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ হয়, সেটিই সবচেয়ে তিক্ত ফল। অতীতের মতোই অকুশল কাজগুলি চালিয়ে যাওয়ার সহজাত প্রবণতা নিয়ে জন্ম নেওয়াটা সমস্যা ও অস্তিত্বের এক অনিয়ন্ত্রিত পূনরাবৃত্ত সমস্যা ও অস্তিত্বের এক দুষ্টচক্র- অর্থাৎ ‘সংসার’-এর সৃষ্টি করে; আর কেবল ‘ধর্ম’ এর বিধানসমূহ অনুসরণের মাধ্যমেই এই চক্রটি ভাঙা সম্ভব।

[৩] নেতিবাচক কর্মের পূর্ববর্তী প্রকারের ফলাফলগুলি আমাদের পুনর্জন্মের অবস্থা, সামাজিক পরিস্থিতি এবং আমাদের আচরণ গঠনকারী বাধ্যতামূলক কার্মিক তাড়নাকে প্রভাবিত করে। অন্যদিকে, প্রভাবশালী ফলটি আমাদের পরিবেশ, সম্পদ এবং মানুষ হিসাবে পুনর্জন্মের পরে সেগুলির সাথে আমাদের সম্পর্কের আকারে পরিপক্ক হয়। এটি সম্মিলিতভাবে অনেক প্রাণীকেও প্রভাবিত করতে পারে এবং কখনও কখনও এটিকে “আদেশকারী ফল” (Tib. dbang gi ’bras bu) হিসাবে উল্লেখ করা হয়।

হত্যা করলে, আমরা কোনও গৌরব ছাড়াই একটি হীন স্থানে এবং খুব নিম্ন বর্ণে জন্মগ্রহণ করব, সেখানে খুব দুর্বল চিকিৎসা ব্যবস্থা থাকবে, দেশে উপলব্ধ খাদ্য ও ঔষধ দুর্বল এবং নিম্নমানের হবে। এমনকি যদি আমরা সেই খাদ্য এবং ঔষধগুলিও পাই যা তাত্ত্বিকভাবে আমাদের সাহায্য করার কথা, তবুও আমাদের খাদ্য আমাদের সামান্য পুষ্টি সরবরাহ করবে এবং ঔষধগুলি আমাদের অসুস্থতার চিকিৎসায় অকার্যকর প্রমাণিত হবে।

চুরি করলে, আমরা যা কিছু রোপণ করব তা বাড়বে না বা খুব কম ফলন দেবে। কেউ আমাদের কাছে যদি একটি গরু বিক্রি করে, এবং এটি পূর্বের চেয়ে কম দুধ দেবে।  আমাদের মাতৃভূমি প্রায়শই বন্যা, খরা এবং শিলাবৃষ্টির শিকার হবে।

অশোভন যৌন আচরণের কারণে, আমাদের বসবাসের স্থান নোংরা, কর্দমাক্ত, অসুবিধাজনক হবে, বিষ্ঠার দুর্গন্ধে পূর্ণ এবং সম্পূর্ণ অপ্রীতিকর হবে।

মিথ্যা বলার কারণে, আমরা এমন এক জায়গায় জন্মগ্রহণ করব যেখানে সবাই দুর্নীতিগ্রস্ত ও অসৎ, আমাদের ব্যবসায়িক উদ্যোগ ব্যর্থ হবে, আমরা আমাদের মূলধন হারাবো, আমাদের কর্মচারীরা আমাদের কাছ থেকে চুরি করবে, এবং সবাই আমাদের ঠকাবে ও আমাদের সুযোগ নেবে।

বিভেদ সৃষ্টিকারী কথাবার্তার কারণে, আমাদের বাসস্থান পাথুরে ও অস্বস্তিকর হয়ে উঠবে, ভূমিতে থাকবে তীক্ষ্ণ উঁচু-নিচু, কারণ আমরা অন্যদের মনের সমতা নষ্ট করেছি।

কঠোর কথাবার্তার কারণে, আমাদের বাসস্থানে থাকবে অনেক কাঁটা, ধারালো পাথর এবং প্রচুর ভাঙা কাঁচ, এবং ভূদৃশ্য হবে রুক্ষ, শুষ্ক ও অনুর্বর, যেখানে কোনো জলাশয় থাকবে না, থাকবে অনেক বিছে, সাপ এবং বিশাল লবণাক্ত মরুভূমি।

অর্থহীন বকবক করার কারণে, আমাদের ফলের গাছগুলো সঠিক ঋতুতে ফল দেবে না, বরং বছরের ভুল সময়ে বাড়তে শুরু করবে, তাদের শিকড় হবে নড়বড়ে, সেগুলো টিকবে না বরং সহজেই পড়ে যাবে বা কেটে ফেলা হবে, আর আমাদের চারপাশের পার্ক, বন এবং হ্রদগুলো জনাকীর্ণ ও নষ্ট হয়ে যাবে।

লোভী চিন্তা করার কারণে, আমাদের সম্পত্তি, বাড়ি এবং জিনিসপত্র দ্রুত নষ্ট হয়ে যাবে, জীর্ণ ও ভেঙে যাবে। যখনই আমরা একটি নতুন ঘরে যাই, আসবাবপত্র ভেঙে পড়ে, রঙ উঠতে শুরু করে এবং খুব অল্প সময়ের মধ্যেই তা একটি ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়।  আমরা একটি নতুন জামা কিনি, এবং প্রথমবার পরতেই তা ছিঁড়ে যায় বা তাতে ফুটো হয়ে যায়।

বিদ্বেষপূর্ণ চিন্তা করার ফলে আমরা ক্রমাগত যুদ্ধ, দুর্যোগ ও মহামারীতে জড়িয়ে পড়ব, আমাদের বাসস্থান বিষাক্ত পোকামাকড় ও সাপ, ভয়ংকর বন্যপ্রাণীতে ভরে যাবে এবং ভয়ঙ্কর আত্মা ও ভূতেদের আনাগোনা থাকবে।

বৈরিতার বিকৃত চিন্তা করার ফলে আমাদের চারপাশের প্রাকৃতিক সম্পদ নিঃশেষ হয়ে যাবে, ঝর্ণা শুকিয়ে যাবে, পরিবেশ দূষিত হবে, সমস্ত আইন-শৃঙ্খলা বিলুপ্ত হবে, কোনো সুরক্ষা থাকবে না এবং কোনো কিছুই পবিত্র বলে গণ্য হবে না।

[নাগার্জুনের ‘রত্নাবলী’ (Tib. rin chen ‘phreng ba, সংস্কৃত: রত্নাবলী), ১৪–১৮; এবং ধর্মরক্ষিতের ‘ধারালো অস্ত্রের চাকা’, ১০–৪৫-এ উদ্ধৃত।]

আমাদের এমনটা ভাবা উচিত নয় যে এই সমস্ত ঘটনা কোনো কারণ ছাড়াই ঘটে।  আমাদের পুনর্জন্ম, অভিজ্ঞতা, সহজাত আচরণ এবং পরিবেশ—এই সবই আমাদের পূর্বজন্মের কর্ম থেকে সৃষ্ট কর্মফলের ফল। আমরা হয়তো ভাবতে পারি যে এই বিভিন্ন জিনিস এই জীবনে আমাদের করা কাজের ফল, কিন্তু এমনটা খুবই বিরল। যদি সবসময় তাই হতো, তাহলে আমরা সেইসব দয়ালু মানুষদের নিয়ে অবাক হতাম যাদের জীবনে ক্রমাগত দুর্ভাগ্যজনক ঘটনা ঘটে চলেছে। এই জীবনে আমরা যা কিছু অভিজ্ঞতা করি তার বেশিরভাগই আমাদের পূর্বজন্মের কর্মের ফল, আর এখন আমরা যা করি তা মূলত আমাদের ভবিষ্যৎ পুনর্জন্মকে প্রভাবিত করবে।

ধর্মরক্ষিত যেমন “ধারালো অস্ত্রের চাকা,” ৪৬-এ বলেছেন:

সংক্ষেপে, আমাদের মাথায় বজ্রপাতের মতো অনাকাঙ্ক্ষিত (বিপর্যয়ের) আঘাতগুলো হলো নেতিবাচক কর্মের ধারালো অস্ত্র, যা আমাদের দিকেই ফিরে আসে, ঠিক যেমন একজন তলোয়ার নির্মাতা তার নিজের (তৈরি) তলোয়ারের দ্বারাই নিহত হয়। এখন, আসুন আমরা আমাদের নেতিবাচক কর্মের বিষয়ে সতর্ক হই।
Top