শরণ গমনের বা জীবনের নিরাপদ পথে এগিয়ে যাওয়ার অনুপ্রেরণা হিসেবে আমাদের তিনটি মানসিক অবস্থাকে গড়ে তুলতে হবে। এগুলোকে সাধারণত ভয়, বিশ্বাস বা আস্থা এবং করুণা বলা হয়। মূল বিষয়টি হলো—এগুলোকে এমনভাবে সমন্বিত করা শেখা, যাতে সেগুলো আমাদের কাছে ইতিবাচক ও যৌক্তিক মনে হয়।
ভয়
পূর্ববর্তী আলোচনায় আমরা দেখেছি যে, নিরাপদ পথের দিকে এগিয়ে যাওয়ার অনুপ্রেরণা হিসেবে আমরা যে ভয়ের কথা বলছি, তা হলো নেতিবাচক আচরণ বা অভ্যাসের ধারা বা সন্ততি অব্যাহত রাখার বিষয়টি নিয়ে আতঙ্কিত হওয়া। ঝগড়া-বিবাদে জড়িয়ে পড়া, মানুষের অবিশ্বাস বা অনীহা, প্রত্যাখ্যান বা উপেক্ষা, অন্যদের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া, একাকীত্ব ও বিষণ্নতা—এসব ঘটনা ঘটার আশঙ্কায় কি আমরা ভীত? আমরা কি সত্যিই চাই না যে, এসব ঘটুক? আমরা কি এমনটা ভাবি যে, “আমার সারা জীবন যদি এসব চলতে থাকে, তবে তা হবে ভয়াবহ!” এই ধরনের দুশ্চিন্তা বা উদ্বেগই হলো সেই আবেগের প্রথম অংশ যা আমরা এখানে জাগিয়ে তুলতে চাই। যখন এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়, তখন তা অব্যাহত থাকার আশঙ্কায় আমরা আতঙ্কিত হয়ে পড়ি; আমরা মনে করি এটি অত্যন্ত শোচনীয় একটি বিষয়। আর বারবার একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটার কথা ভেবেও আমরা শিউরে উঠি। আমরা কি সত্যিই এমন কেউ হতে চাই—একজন তিক্তস্বভাবের বৃদ্ধ বা বৃদ্ধা, যার সঙ্গ কেউ চায় না এবং যার কাছে কেউ এলে কেবল অভিযোগই শুনতে পায়? এর ফলে, সবাই আমাদের কাছ থেকে দূরে সরে যেতে চায় এবং আমরা সম্পূর্ণ একা ও নিঃসঙ্গ হয়ে পড়ি। জীবনের পথে আমরা কি সত্যিই এমন কোনো অভিমুখ বেছে নিতে চাই? নরকের কথা ভাবার কোনো প্রয়োজন নেই—এই ধারণাটিই যথেষ্ট ভীতিকর!
ভয় দুই ধরনের হতে পারে। প্রথমত, এমন এক ধরনের ভয় যা আমাদের মনে পরিস্থিতির কোনো আশু সমাধান নেই বা সব আশা শেষ—এমনটা ভাবতে বাধ্য করে। আমরা তখন নিজেকে ‘অসহায়’ হিসেবে বড় করে দেখি এবং আমাদের ভয়ের কারণ ও সেই ভয়—উভয়কেই এক ধরণের সুদৃঢ় ও স্থায়ী বিষয় হিসেবে গড়ে তুলি। “আমার কিছুই করার নেই, আমি বড় অসহায়, সব আশা শেষ।” এমনটা করার সময় চিন্তাভাবনায় কোনো নমনীয়তা বা পরিবর্তনশীলতা থাকে না। আমরা এখানে সেই ধরনের ভয়ের কথা বলছি না যা মানুষকে কেবল অচল বা স্থবির করে দেয়। বরং আমরা যেটা চাই সেটা হলো সঠিক বোঝাপড়া বা সচেতনতা; যেসব বিষয় আতঙ্কিত করে, সেগুলোকে এড়িয়ে চলার উপায় রয়েছে এইরকম আত্মবিশ্বাস আমাদের গড়ে তুলতে হবে।
খুব সাধারণ একটি উদাহরণের কথা ভাবা যাক: যখন আমাদের মধ্যে কোনো ধ্বংসাত্মক বা অশান্তকারী কাজ করার প্রবণতা জাগে—যেমন ধরুন, কারো ওপর চিৎকার করার ইচ্ছা—তখন সেই ইচ্ছা জাগা এবং তা বাস্তবে করে ফেলার (বা আবেগের বশবর্তী হয়ে কাজ করে ফেলার) মধ্যবর্তী সময়ে একটি বিরতি বা অবকাশ থাকে। আমরা যদি একটু ধীরস্থির হতে পারি, তবে আমাদের বিচারবুদ্ধি ও সচেতনতাকে কাজে লাগিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারি: “চিৎকার করার ইচ্ছা থাকলেও আমি কি সত্যিই চিৎকার করব, নাকি করব না?” চিৎকার করার ইচ্ছা জাগলেই যে আমাদের চিৎকার করতেই হবে—এমন কোনো কথা নেই। আমাদের যদি সবসময় মেজাজ হারানোর অভ্যাসও থাকে, তবুও রাগ অনুভব করা এবং সেই রাগের বশবর্তী হয়ে কোনো কাজ করা বা কথা বলার মধ্যবর্তী সময়ে একটি অবকাশ থাকে। সুতরাং, আশার আলো অবশ্যই আছে!
যুক্তি-ভিত্তিক আত্মবিশ্বাস
তবে এমন নয় যে আমরা অসহায়। কোনো পরিস্থিতির প্রতি আমাদের প্রতিক্রিয়ার ধরন পরিবর্তন করার ক্ষমতা আমাদের রয়েছে। ‘শরণ গমন’-এর ক্ষেত্রে মানসিক অবস্থার যে দ্বিতীয় দিকটির কথা বলা হয়, তা হলো—পরিবর্তন সম্ভব—এই বিষয়ে আত্মবিশ্বাস। আমাদের মধ্যে বিদ্যমান অশান্তকারী আচরণ বা অভ্যাসের ধারাগুলোই যে চিরকাল বজায় রাখতে হবে, এমন কোনো কথা নেই। মস্তিষ্কের ‘নিউরোপ্লাস্টিসিটি’ বা নমনীয়তার উদাহরণের মতোই, যুক্তির ওপর ভিত্তি করেই আমরা এই বিষয়ে নিশ্চিত হতে পারি। আমরা সবসময়ই যে কোনো নির্দিষ্ট উপায়ে কাজ করতে বাধ্য—এমনটা আগে থেকেই নির্ধারিত নয়। আমরা নিজেদের নতুন করে গড়ে তুলতে পারি; মনের কার্যপদ্ধতি বা ‘প্রোগ্রাম’-এর ত্রুটিগুলো সংশোধন করে মনকে নতুনভাবে সচল বা ‘রিবুট’ করতে পারি।
আমরা আগেই আলোচনা করেছি যে, আমাদের ধ্বংসাত্মক আচরণ, অশান্তকারী আবেগ, বাধ্যতামূলক গঠনমূলক আচরণ এবং অশান্তকারী মনোভাব—এসবই মূলত আমাদের ‘নিজেকে নিয়ে অতিরিক্ত মগ্নতা’ বা আত্মকেন্দ্রিকতাকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়। এগুলোর অনিয়ন্ত্রিত ও পুনরাবৃত্তিমূলক প্রকৃতি ইঙ্গিত দেয় যে, এই অভ্যাসগুলো আমাদের মধ্যে অত্যন্ত গভীরভাবে প্রোথিত আছে। এগুলো আমাদের মস্তিষ্কে দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত স্নায়বিক পথ বা ‘ন্যুরাল পাথওয়ে’—যা মূলত আমাদের মনের কার্যপদ্ধতিকেই নির্দেশ করে। তাছাড়া, মস্তিষ্কের নিউরোপ্লাস্টিসিটি সম্পর্কে জানার মাধ্যমে আমরা জানি যে—যেমন শরীরের ডান পাশ অবশ হয়ে গেলেও আমরা বাম পাশ ব্যবহার করা শিখতে পারি—মস্তিষ্কের এই নমনীয়তার কারণে নতুন স্নায়বিক পথ এবং চিন্তার নতুন ধারা তৈরি করা সম্ভব।
বিষয়টি নিয়ে ভাবা প্রয়োজন—আমাদের চিন্তার ধরন পরিবর্তন করা এবং নতুন চিন্তার পথ ও অভ্যাস গড়ে তোলা সত্যিই সম্ভব। আমরা কি জীবনে কখনো এমনটা করেছি? আমরা কি আদৌ এমনটা করতে পারি? আর যদি আমরা তা করতে পারি—অর্থাৎ কোনোভাবে নেতিবাচক অভ্যাস ও চিন্তার পথগুলোকে অতিক্রম করে শেষ পর্যন্ত সেগুলোকে মুছে ফেলতে পারি—তবে কি আমরা আরও সুখী হব?
চিন্তার এই নতুন ধারার মূলে রয়েছে আত্মবিশ্বাস এবং এই দৃঢ় বিশ্বাস যে, নমনীয় হওয়া এবং অভ্যাস পরিবর্তন করা সম্ভব। এই দৃঢ় প্রত্যয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ—অর্থাৎ এটা যে করা সম্ভব, সে বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া। আমাদের জীবনে একটি নিরাপদ ও সঠিক দিকনির্দেশনা গ্রহণের ক্ষেত্রে অনুপ্রেরণা হিসেবে যে মানসিক অবস্থাটি গড়ে তোলা প্রয়োজন, এটিই হলো তার দ্বিতীয় পর্যায়। যখন আমরা এমন মনোভাব পোষণ করি যে, “আমি কখনোই বদলাতে পারব না, আমি এমনই”—তখন তা আমাদের অত্যন্ত অসুখী এক জীবনধারার মধ্যে আটকে ফেলে।
একটি উদাহরণের কথা ভাবা যাক: আমরা সাধারণত লেখার জন্য ডান হাত ব্যবহার করি, কিন্তু স্ট্রোকের কারণে যদি শরীরের ডান পাশ অবশ বা পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে পড়ে, তখন কী হয়? আমাদের মস্তিষ্ককে এমনভাবে পুনর্গঠিত করা বা ‘রিওয়্যার’ (rewire) করা কি সম্ভব যাতে আমরা বাম হাত দিয়ে লিখতে পারি? হ্যাঁ, তা অবশ্যই সম্ভব। তাহলে, কোনো পরিস্থিতিতে চট করে রেগে যাওয়া বা মেজাজ হারানোর পরিবর্তে ধৈর্য ও বোঝাপড়ার মনোভাব গড়ে তোলার ক্ষেত্রেও কি আমাদের মানসিক প্রক্রিয়াকে একইভাবে পরিবর্তন করা সম্ভব নয়? এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। যদি শারীরিক স্তরে এমন নমনীয়তা ও পুনর্গঠন সম্ভব হয়, তবে আমাদের সেই আত্মবিশ্বাসটুকুও গড়ে তুলতে হবে যে, অন্যান্য আচরণ ও আবেগের ক্ষেত্রেও পরিবর্তন আনা সম্ভব। এটিই হলো ‘শরণ’ গমনের দ্বিতীয় দিক—অর্থাৎ, এই ইতিবাচক পথে এগিয়ে যাওয়া সম্ভব—এমন দৃঢ় বিশ্বাস।
সুতরাং, আমরা এই সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারি যে পরিবর্তন হওয়া, বিকশিত হওয়া এবং নতুন ও উন্নত উপায়ে কাজ করা সম্ভব। আমরা তো সবসময়ই এমনটা করে থাকি। কম্পিউটার বা মোবাইল ফোনের সফটওয়্যার যখন আপডেট করা হয়, তখন শুরুতে হয়তো কিছুটা অনীহা কাজ করে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত আমরা সেগুলো ব্যবহার করা শিখে ফেলি, তাই না? নতুন কিছু শেখা বা তার সাথে মানিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে বয়সের কোনো বাধা নেই। আসলে, নতুন ও ভিন্ন কিছু করাটা বেশ আনন্দদায়ক ও উদ্দীপনাপূর্ণ, তাই না? তাই এ নিয়ে ভীত হওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই।
তাছাড়া, সবকিছুর—বিশেষ করে কার্য-কারণ সম্পর্কের ক্ষেত্রে—যে পারস্পরিক সংযোগ ও নির্ভরশীলতা রয়েছে, তা আমরা উপলব্ধি করতে পারি না; এটিই প্রমাণ করে যে, আমাদের চিত্ত সীমাবদ্ধ। কোনো কাজ বা পরামর্শের দীর্ঘমেয়াদী ফলাফল কী হতে পারে তা আমরা দেখতে পাই না, যা আমাদের চিত্তের সীমাবদ্ধতারই পরিচায়ক। এই সীমাবদ্ধতার মূল কারণ হলো, আমাদের চিত্ত সবকিছু এবং সবাইকে আলাদা আলাদা খোপে বা গণ্ডিতে ভাগ করে দেখার প্রবণতা রাখে। আমরা সামগ্রিক চিত্রটি দেখতে পাই না। আমরা কেবল পরিস্থিতির একটি ক্ষুদ্র অংশ বা অল্প কিছু বিষয় বিবেচনা করি; যেমন, আমরা ভাবি যে কোনো একটি কাজ করলে নির্দিষ্ট কোনো ফলাফলই পাওয়া যাবে। অথচ আমরা বুঝতে পারি না যে, চূড়ান্ত ফলাফলের ওপর আরও অনেক বিষয় বা উপাদান প্রভাব ফেলে।
তবে, আমাদের চিত্ত যদি সংকীর্ণ না হয়—অর্থাৎ সাবমেরিন থেকে পেরিস্কোপ দিয়ে দেখার মতো কেবল ক্ষুদ্র কোনো অংশ না দেখে—তবে আমরা ক্রমশ আরও উন্মুক্ত হতে পারি এবং বৃহত্তর চিত্রটি দেখতে শুরু করতে পারি। বিষয়টি অনেকটা এমন: যখন কোনো সমস্যার সমাধান খুঁজতে যাই, তখন আমরা হয়তো কেবল সমস্যাটির দিকেই তাকাই এবং বলি, “ব্যাস, এই পদ্ধতিতেই সমাধান হয়ে যাবে”—কিন্তু বাস্তবে আমরা হয়তো কেবল দু-একটি ধাপের কথাই ভাবছি। এর পরিবর্তে আমাদের প্রশ্ন করা উচিত, “আমি যদি এই সমাধানটি প্রয়োগ করি, তবে কি তা আরও নতুন কোনো সমস্যার সৃষ্টি করবে?” সমাধানের প্রথম ধাপটির বাইরে গিয়েও আমাদের চিন্তা করতে হবে।
উদাহরণস্বরূপ, আমাদের সন্তান যখন স্কুলে যায়, তখন আমরা হয়তো বলি, “তোমার এটা করা উচিত,” “তোমার এমন পোশাক পরা উচিত” ইত্যাদি। কিন্তু আমরা হয়তো ভাবি না যে তার সহপাঠীরা এতে কেমন প্রতিক্রিয়া দেখাতে পারে বা এর ফলে সন্তানের জন্য আরও বড় কোনো সমস্যা তৈরি হতে পারে কি না। তাই আমরা যদি বৃহত্তর পরিসরে চিন্তা করতে পারি—এবং আমাদের সেই সক্ষমতা আছে, তবে আমরা সামগ্রিক পরিস্থিতিটি আরও ভালোভাবে বুঝতে পারব এবং সঠিক পরামর্শ দিতে পারব। পাশাপাশি, আমাদের এই বিশ্বাসটিও গড়ে তুলতে হবে যে আমরা আমাদের চিত্তকে উন্মুক্ত করতে পারি; আমাদের চিত্ত আরও ব্যাপক ও সামগ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে এবং আরও অনেক বিষয় বিবেচনা করে চিন্তা করতে সক্ষম। তবে শেষ পর্যন্ত আমাদের এটাও ভেবে দেখা প্রয়োজন যে, এমনটা করলে আমরা কি আরও সুখী হব? আমরা কি সত্যিই এমনটা করতে সক্ষম? এটি কি এমন কোনো পদক্ষেপ যা নেওয়াটা লাভজনক হতে পারে?
একটি ভালো উদাহরণ দেওয়া যাক: আমাদের অনেক কাজ পড়ে আছে, তাই আমরা ভাবি, “আচ্ছা, দিনে ১২ ঘণ্টা কাজ করলেই তো কাজটা শেষ হয়ে যাবে।” কিন্তু আমরা এর পরের বিষয়টি আর ভাবি না যে, যদি আমরা একটানা ১২ ঘণ্টা কাজ করি এবং কোনো বিরতি না নিই, তবে আমরা চরম ক্লান্ত বা ‘বার্ন-আউট’-এর শিকার হব। এতে সমস্যার সমাধান তো হবেই না, বরং নতুন আরও সমস্যা তৈরি হবে। আমি ঠিক এই ধরনের দূরদৃষ্টিহীন চিন্তাভাবনার কথাই বলছি।
এই বিষয়গুলো বিবেচনা করলে আমরা কিছুটা আত্মবিশ্বাস পেতে পারি যে, যদি আমরা আমাদের চিন্তাভাবনা ও আচরণে আরও নমনীয় হতে পারি, তবে আমাদের জীবনযাত্রার মান উন্নত করা সম্ভব হবে। এটি এমন একটি পথ যার দিকে আমরা এগোতে চাই এবং সেই পথে এগোনোটা সত্যিই সম্ভব।
তাহলে, এটি হলো আত্মবিশ্বাসের প্রথম ধরন; অর্থাৎ, এমন এক যৌক্তিক আত্মবিশ্বাস যা আমাদের সেই নেতিবাচক আচরণ-ধরনগুলো পরিবর্তন করার সম্ভাবনার ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠে—যেসব ধরন আমাদের ভীত বা আতঙ্কিত করে তোলে। আরও মুক্তমনা হওয়া সম্ভব।
সুচিন্তিত আত্মবিশ্বাস
বৌদ্ধধর্মে বর্ণিত আত্মবিশ্বাসের দ্বিতীয় ধরনটিকে বলা হয় “সুচিন্তিত আত্মবিশ্বাস” (clear-headed confidence)। এটি হলো পরিবর্তনের ক্ষমতার ওপর এমন এক আস্থা যা আমাদের চিন্তাকে স্বচ্ছ ও পরিষ্কার রাখে। আমাদের নেতিবাচক প্রবণতার বশবর্তী হয়ে কোনো কিছু করার বা বলার ইচ্ছা দমন করার যে নতুন কৌশল, তার কারণে সৃষ্ট হতাশা, বিরক্তি বা ক্ষোভ থেকে এটি আমাদের মনকে মুক্ত রাখে। উদাহরণস্বরূপ, হয়তো আমাদের ইচ্ছে হলো কারো ওপর চিৎকার করতে বা খুব কটু কোনো কথা বলতে। কিন্তু আমরা আত্মবিশ্বাসী থাকি যে আমরা চুপ থাকতে পারি এবং কথাটি না-ও বলতে পারি; কারণ কথাটি বললে আমরা রেগে যাব এবং বড় ধরনের তর্ক-বিতর্কে জড়িয়ে পড়ব—যা পরিস্থিতিকে অত্যন্ত কদর্য করে তুলবে। সুতরাং, যা বলতে ইচ্ছে করছে তা-ই সবসময় বলতে হবে এমন কোনো কথা নেই। এখন, আমরা হয়তো খুব হতাশ, বিরক্ত বা ক্ষুব্ধ বোধ করতে পারি এই ভেবে যে: “আমি তো কথাগুলো ভেতরেই চেপে রাখছি। অথচ আমি সত্যিই তা বলতে চাই”—এ ধরনের চিন্তা। এটি মনের একটি অস্বস্তিকর অবস্থা। কিন্তু যদি আমরা আত্মবিশ্বাসী হই যে এই কটু কথাগুলো বলা থেকে বিরত থাকা সম্ভব ও যুক্তিযুক্ত, এবং বিরত না থাকলে যে পরিণতি হবে তা নিয়ে যদি আমরা আতঙ্কিত বোধ করি, তবে তা না বলার কারণে আমাদের মনে কোনো ক্ষোভ বা হতাশা জন্মায় না। আত্মবিশ্বাস বা বিশ্বাসের এই সুচিন্তিত দিকটি গড়ে তোলা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
সংকল্পপূর্ণ আত্মবিশ্বাস
আত্মবিশ্বাসের তৃতীয় ধরনটি হলো সেই আত্মবিশ্বাস যার মাধ্যমে আমরা ক্ষতিকর আচরণ বা কদর্য পরিস্থিতি সৃষ্টি করা থেকে বিরত থাকার সংকল্প করি। একটি উদাহরণের মাধ্যমে আমরা দেখতে পাই যে, আপনার কথার জবাবে যদি আমি চিৎকার করি বা কটু কথা বলি, তবে তা একটি বিশ্রী পরিস্থিতির সৃষ্টি করবে। বিষয়টি আমাকে আতঙ্কিত করে তোলে; কারণ এ ধরনের বিশ্রী পরিস্থিতির অভিজ্ঞতা আমাদের যথেষ্ট হয়েছে। এতে কোনো লাভ হয় না; বরং আমরা দুজনেই অসুখী হই। তাই আমি আত্মবিশ্বাসী যে বিরত থাকা সম্ভব, এবং এতে আমি হতাশও হই না কারণ আমি জানি যে, এটাই সর্বোত্তম পন্থা। এই আকাঙ্ক্ষা-প্রসূত আত্মবিশ্বাসটি গড়ে ওঠে যুক্তি ও স্বচ্ছ চিন্তার ওপর ভিত্তি করে; এটি আমাদের এমন এক অবস্থার দিকে নিয়ে যায় যেখানে এই গুণগুলো আমাদের স্বভাবের অবিচ্ছেদ্য ও স্বতঃস্ফূর্ত অংশে পরিণত হয়। মূলত, এর অর্থ হলো এটা উপলব্ধি করা যে, কোনো বিষয় দেখে তীব্র অস্বস্তি বা আতঙ্ক বোধ করা এবং একই সাথে আত্মবিশ্বাসী হওয়া—এই দুটি বিষয়ই একে অপরের পরিপূরক হতে পারে। তখন আমরা অনুভব করি যে, আমরা ঠিক এই পথেই এগোতে চাই—অর্থাৎ নিজেদের এমনভাবে গড়ে তুলতে চাই যাতে কোনো উদ্দীপক বা উসকানির মুখে আমরা কেবল যান্ত্রিকভাবে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া না দেখাই; যেমনটা ঘটে কোনো কুকুরকে খোঁচা দিলে সে সাথে সাথে গর্জন করে ওঠে।
আসুন, আমাদের নিজেদের জীবনের কিছু প্রাসঙ্গিক উদাহরণের ক্ষেত্রে এই ‘তীব্র অস্বস্তি বোধ’ ও ‘আত্মবিশ্বাস’-এর বিষয়টি প্রয়োগ করে দেখি। উদাহরণস্বরূপ, আমরা হয়তো এমন একটি আচরণের ধরন বিশ্লেষণ করতে পারি: “কেউ আমার সাথে দেখা করতে এলেই আমি সবসময় অভিযোগ করতে থাকি—সবকিছু কত বাজে, পৃথিবীটা কত জঘন্য, আমার জীবনটা কত দুর্বিষহ—ইত্যাদি; আর এর ফলে কেউ আসলে আমার সঙ্গ পছন্দ করে না। এর পরিণতিতে আমি একাকীত্ব ও বিষণ্নতায় ভুগি। এই বিষয়টি আমাকে আতঙ্কিত বা অত্যন্ত বিচলিত করে তোলে; আমি চাই না এমনটা চলতে থাকুক। তাই, যখন আমি কারও সাথে থাকব এবং অভিযোগ করার সেই তাড়না বা ইচ্ছাটি জেগে উঠবে—তখন আমি সেই অনুযায়ী কাজ করব না বা অভিযোগ করব না।”
আমরা সিদ্ধান্ত নিই যে, এখন থেকে আমরা এ বিষয়েই কাজ শুরু করব। আমরা আত্মবিশ্বাসী যে, এমনটা করলে মানুষের সাথে আমাদের সম্পর্কের সত্যিই উন্নতি ঘটবে। আমরা বুঝতে পারি যে, কেউ-ই আমাদের অভিযোগ শুনতে চায় না। আমরা ঠিক এই পথেই এগোতে বা এমনটাই অর্জন করতে চাই—অর্থাৎ সারাক্ষণ অভিযোগ করা বন্ধ করা, কারণ এতে কোনো লাভ হয় না। বরং এটি পরিস্থিতিকে আরও খারাপ করে তোলে এবং অন্যদের দূরে সরিয়ে দেয়। আমরা যদি সঠিক উপায়ে এটি করতে পারি, তবে আমাদের চিন্তাভাবনা স্বচ্ছ থাকে এবং আমরা হতাশায় ভুগি না—সেই সংকীর্ণ মানসিকতা থেকে মুক্ত থাকি যেখানে মনে হয়, “আমি, আমি, আর আমিই—আমাকে আমার অভিযোগগুলো বলতেই হবে কারণ সেগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।”
মনে রাখবেন, কোনো বিষয় যদি আমাদের পীড়া দেয়, তবে তা অন্য কাউকে খুলে বলায় কোনো দোষ নেই। তবে আমাদের কী কষ্ট দিচ্ছে তা ব্যাখ্যা করা আর “হায় কপাল! আমার কত কষ্ট!”—এমন মনোভাব নিয়ে অভিযোগ করার মধ্যে বিশাল পার্থক্য রয়েছে। সত্যিই অনেক বড় পার্থক্য। দয়া করে আপনার নিজের অভিজ্ঞতার আলোকে বিষয়টি এভাবে বিশ্লেষণ করে দেখুন।
[ধ্যান]
করুণা
এরপর, আমরা আত্মবিশ্বাসের সাথে করুণাকে যুক্ত করি—যা আমাদের জীবনকে একটি নিরাপদ ও সঠিক পথে পরিচালিত করার তৃতীয় কারণ। এক্ষেত্রে আমরা ‘আমি কতই না অসহায়’—এমন মনোভাব নিয়ে অভিযোগ করার উদাহরণটি বিবেচনা করতে পারি। আমরা যদি ভাবি যে, এমন আচরণ চালিয়ে গেলে কী ঘটবে, তাহলে নিজের আচরণের কথা ভেবেই আমরা শিউরে উঠি। এ ধরনের আচরণ মানুষকে কেবল দূরেই ঠেলে দেয়, যার ফলে আমরা একাকী ও বিষণ্ন হয়ে পড়ি। আমরা নিশ্চয়ই এমনটা চাই না। এর পরিবর্তে, আমরা আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠি যে এই অবস্থা কাটিয়ে ওঠা সম্ভব এবং আমরা নতুন অভ্যাস গড়ে তুলতে পারি। উদাহরণস্বরূপ, কোনো বিষয় যদি আমাদের পীড়া দেয়, তবে আমরা ‘আমি কতই না অসহায়’—এমন মনোভাব না দেখিয়েই বিষয়টি সহজভাবে ব্যাখ্যা করতে পারি। করুণার বিষয়টি হলো, আমরা চাই না অভিযোগের পাহাড় চাপিয়ে বা অনবরত নালিশ করে অন্যদের ওপর আমাদের মানসিক আবর্জনা বা নেতিবাচকতার বোঝা চাপিয়ে দিতে; কারণ এতে তারা দূরে সরে যায়। অর্থাৎ, অন্যদের প্রতি করুণা থেকেই আমরা চাই না আমাদের সব বাজে চিন্তা বা নেতিবাচক বিষয় দিয়ে তাদের চিত্তকে ভারাক্রান্ত বা দূষিত করতে। যেমনটা আমি আগেই বলেছি, ভয়, আত্মবিশ্বাস ও করুণা— এই তিনটি বিষয় একে অপরের সাথে যুক্ত। আর তখন, ভালো অভ্যাস গড়ে তোলার লক্ষ্যে নিজেদের ওপর কাজ করার এই পথেই আমরা এগিয়ে যেতে চাই।
উপসংহার
‘শরণ গমন’ বা আশ্রয় নেওয়ার মূল বিষয়টাই হলো—আমাদের জীবনে একটি ইতিবাচক ও নিরাপদ অভিমুখ বা দিক নির্ধারণ করা। এর লক্ষ্য হলো ক্রমশ অধিকতর দুঃখ-কষ্ট ও সমস্যা প্রতিরোধ করা এবং তা থেকে দূরে থাকা। আমরা ধাপে ধাপে অগ্রসর হই—সেই চূড়ান্ত ধাপ পর্যন্ত, যেখানে আমরা বুদ্ধত্ব লাভের পথে কাজ শুরু করি। এমনকি সেই পথে মাত্র কয়েকটি পদক্ষেপ ফেলাও অত্যন্ত সার্থক ও মূল্যবান হতে পারে। আর যদি আমরা তা করি, তবে তা আমাদের জীবনে সত্যিই এক উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আনবে। জীবনের সেই পরিবর্তনটিই হলো শরণ গমনের মূল কথা; এটি আমাদের জীবনকে ইতিবাচক ও উদ্দেশ্যপূর্ণ করে তোলে।
যেমনটা আমি আগেই বলেছি, শরণ গমনের মতো সুদৃঢ় ভিত্তি—অর্থাৎ জীবনের এই নিরাপদ অভিমুখ—না থাকলে, যখন আমাদের মনে উচ্চতর তন্ত্র, কালাচক্র বা জোগচেন (Dzogchen) অনুশীলনের আকাঙ্ক্ষা জাগে, তখন আমাদের বুঝতে হবে যে সেই অনুশীলন গড়ে তোলার মতো কোনো ভিত্তিই আমাদের নেই। আমরা আসলে কীসের জন্য এসব করছি? কেন করছি? এর পেছনে একটি বলিষ্ঠ ভিত্তি থাকা প্রয়োজন। তবেই সবকিছুর একটি স্থিতিশীল ভিত্তি গড়ে উঠবে। এটি নিরাপদ অভিমুখ বা পথে চলার সামগ্রিক প্রক্রিয়ারই একটি অংশ। আমরা এই অনুশীলনগুলো করছি যাতে দুঃখ-কষ্ট এড়ানো যায় এবং প্রকৃত ও আন্তরিকভাবে অন্যদের আরও বেশি সহায়তা করা সম্ভব হয়। এগুলো কেবল ফাঁকা আওয়াজ বা অর্থহীন কথাবার্তা নয়। উচ্চতর অনুশীলনগুলো করার জন্য যখন আমরা অত্যন্ত উৎসাহী হয়ে উঠি, তখন নিজেদের এই প্রশ্নগুলোই করা উচিত: “আমি কি সত্যিই যথাযথভাবে শরণ গমন করেছি?”
বিষয়টি বেশ কৌতূহলোদ্দীপক—যখন আমরা ‘ঙোনড্রো’ (ngondro) বা প্রাথমিক অনুশীলনের কথা ভাবি (সেই কঠিন কাজগুলো, যা আমাদের লক্ষ লক্ষ বার পুনরাবৃত্তি করতে হয়)—তখন দেখা যায়, যদি আমরা সেগুলোকে অকালে বা কোনো অর্থ না বুঝেই কেবল মন্ত্রপাঠ ও প্রণাম করার মাধ্যমে সম্পন্ন করি, তবে সেগুলোর প্রভাব খুবই সামান্য হয়।
যখন আমরা ‘ঙোনড্রো’ অনুশীলন করি—অর্থাৎ সেই প্রাথমিক ও প্রস্তুতিমূলক কাজগুলোর লক্ষ লক্ষ বার পুনরাবৃত্তি করি, যার মধ্যে সর্বদা শরণ গমনের বিষয়টিও অন্তর্ভুক্ত থাকে—তখন আমরা আসলে কী করি? আমরা আমাদের মস্তিষ্কে নতুন স্নায়বিক পথ (neural pathways) তৈরি করি; আর তা করি এই সঠিক ও আন্তরিক মানসিক অবস্থা সৃষ্টির মাধ্যমে—যেখানে আমরা জীবনের সেই নিরাপদ অভিমুখটিকে গ্রহণ করি এবং তাকে আমাদের জীবনের অংশ করে তুলি। এর অর্থ হলো প্রতিটি ‘ঙোনড্রো’ (ngondro) বা প্রাথমিক সাধনা সম্পর্কে প্রকৃত বোঝাপড়া থাকা: অর্থাৎ, আমাদের মনের কোন অবস্থাটি তৈরি করতে হবে এবং তার উদ্দেশ্য কী। এরপর, মনের সেই অবস্থাগুলো কীভাবে গড়ে তুলতে হয় তা নিয়ে যথাযথ অনুশীলনের পর, কোনো শ্লোক পাঠ বা সাষ্টাঙ্গ প্রণাম ইত্যাদির মাধ্যমে লক্ষবার সেই মানসিক অবস্থাটি সৃষ্টি করা। যখন আমরা সমাধি ও স্মৃতির সাথে এই কাজ করি, তখন মস্তিষ্কে নতুন স্নায়বিক পথ (neural pathways) তৈরি হতে শুরু করে। ‘ঙোনড্রো’-র মূল উদ্দেশ্যই হলো এটি। এর পদ্ধতিটি বেশ বৈজ্ঞানিক। আর অবশ্যই, অনাদিকাল ধরে চলে আসা নেতিবাচক মানসিক ধারা বা অভ্যাসগুলোকে অতিক্রম করার জন্য কেবল লক্ষবার অনুশীলনই যথেষ্ট নয়; তাই আমাদের পুরো সাধনা-পরিক্রমা জুড়ে এই প্রক্রিয়া চালিয়ে যেতে হবে। আর মনে রাখবেন, আধ্যাত্মিক পথের প্রতিটি সাধনা বা অনুশীলনের শুরুতেই ‘শরণ গমন’ (refuge) থাকা আবশ্যক। আমাদের নিশ্চিত করতে হবে যে, এটি যেন কেবল অর্থহীন বাক্য বা দায়সারা কোনো কাজ না হয়।
এ কারণেই পরম পূজ্য দালাই লামা বৌদ্ধ সাধনাকে ‘মনের বিজ্ঞান’ বলে অভিহিত করেন। আমরা অত্যন্ত বৈজ্ঞানিক উপায়ে আমাদের মনকে নতুন করে বিন্যস্ত করছি যাতে আরও কল্যাণকর অভ্যাস গড়ে তোলা যায়। এর অর্থ হলো আমাদের অনুশীলনগুলোর পুনরাবৃত্তি করা। প্রাত্যহিক ধ্যানের ক্ষেত্রেও আমরা ঠিক এটাই করি—বারবার পুনরাবৃত্তি। ‘ঙোনড্রো’-র ক্ষেত্রেও আমরা তাই করি—পুনরাবৃত্তি। আমরা নতুন ধরণ, নতুন অভ্যাস এবং নতুন স্নায়বিক পথ গড়ে তুলছি—শুধু ধ্যানের সময় নয়, বরং দৈনন্দিন জীবনেও এটা গড়ে তুলতে হবে।
অবশ্যই, জীবনে আমাদের প্রত্যেকের ভিন্ন ভিন্ন দায়িত্ব রয়েছে। এমন অনেক বিষয় আছে যার দেখভাল আমাদের করতে হয়। স্বাভাবিকভাবেই, আমরা সবাই এর জন্য আমাদের সময়ের শতভাগ ব্যয় করতে পারি না। তা সত্ত্বেও, এটিই সেই অভিমুখ যার দিকে আমরা এগোতে চাই এবং আমরা এটার জন্য সাধ্যমতো চেষ্টা করি।
আমার মনে হয়, আমাদের অনেক কিছু নিয়ে ভাবার আছে। দয়া করে এই বিষয়গুলো নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করুন; আমরা পরবর্তী অধিবেশনে আলোচনা চালিয়ে যাব।
[ধ্যান]