ভূমিকা
আমাদের এই সপ্তাহান্তের সেমিনারে আমরা ‘শরণ গমন’-এর (refuge) ওপর আলোকপাত করব। বৌদ্ধ ধর্মগ্রন্থগুলোর দিকে তাকালে দেখা যায়, শরণ গমনকে সর্বদা বৌদ্ধপথের সবচেয়ে মৌলিক বিষয় হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। বস্তুত, এটিই বৌদ্ধধর্মে প্রবেশের প্রবেশদ্বার। আমরা যখন কেবল বৌদ্ধধর্ম সম্পর্কে খোঁজ খবর নিই বা এটি গ্রহণের কথা বিবেচনা করি, আর যখন আমরা প্রকৃতপক্ষে বৌদ্ধপথের অনুসারী হওয়ার সংকল্প করি— এই দুয়ের মধ্যে পার্থক্যকারী রেখাটিই হলো শরণ গমন। আমাদের প্রতিটি বৌদ্ধিক অনুশীলনই শুরু হয় শরণ গমনের বিষয়টি পুনরায় নিশ্চিত করার মধ্য দিয়ে। সুতরাং, এর নিশ্চয়ই বিশেষ কোনো তাৎপর্য রয়েছে।
‘আমি বুদ্ধ, ধর্ম ও সংঘের শরণ নিচ্ছি’—কেবল এই কথাগুলো উচ্চারণ করার চেয়ে শরণ গমন অনেক গভীর ও ব্যাপক একটি বিষয়। এটি আমাদের সত্তার এমন এক মৌলিক বিষয়কে নির্দেশ করে যা আমাদের জীবনে আমূল পরিবর্তন নিয়ে আসে। একারণেই, প্রাত্যহিক জীবনে শরণ গমনের প্রকৃত অর্থ কী, তা গভীরভাবে অনুধাবন করা অত্যন্ত জরুরি।
এই সেমিনারে আমি এমন কিছু চিন্তন- প্রক্রিয়া বা অনু ধ্যানের বিষয়ে আলোচনা ও নির্দেশনা দেব, যা আমাদের নিজেদের অন্তরের দিকে তাকাতে এবং ব্যক্তিগত জীবনে শরণ গমনের প্রকৃত অর্থ কী হতে পারে তা বোঝার চেষ্টা করতে সহায়তা করবে। এর অর্থ হলো, আমরা বেশ কিছু বিষয় নিয়ে আলোচনা করব এবং প্রতিটি বিষয়ের পর আমরা কয়েক মিনিট বিরতি নিয়ে সে সম্পর্কে গভীরভাবে চিন্তা ও অনুধাবন করব। বৌদ্ধধর্মের যে কোনো বিষয়ের ক্ষেত্রেই আমাদের এমনটিই করা প্রয়োজন—প্রতিটি বিষয় নিয়ে ভাবার জন্য সময় নেওয়া এবং নিজেকে প্রশ্ন করা: “বিষয়টি কি আমার কাছে যৌক্তিক মনে হচ্ছে? এর কি কোনো অর্থ বা তাৎপর্য আছে?” যদি বিষয়টি অর্থবহ বা বোধগম্য না হয়, তবে পরবর্তী ধাপে যাওয়ার কী প্রয়োজন?
নিজের ওপর কাজ করার প্রক্রিয়াটি হতে হবে ধাপে ধাপে বা পর্যায়ক্রমিক; আর শুরুর ধাপটিই যদি অত্যন্ত অনিশ্চিত বা অস্থিতিশীল হয়, তবে পরবর্তী সবধাপই ভেঙে পড়বে—আর সমগ্র বৌদ্ধ পথের সবচেয়ে মৌলিক ভিত্তি হলো এই শরণ গমন।
জীবনের অর্থ নিয়ে ভাবনা
প্রথমেই আমরা যে বিষয়টি খতিয়ে দেখতে চাই তা হলো: আমাদের জীবনের কি কোনো অর্থ আছে? আমরা নিজেদের অন্তরের দিকে তাকাই এবং প্রশ্ন করি, “আমার জীবনের কি কোনো অর্থ আছে? এটি কোন দিকে এগিয়ে চলেছে? আমি আমার জীবন নিয়ে কী করছি?” যদি আমরা আমাদের জীবনের কোনো অর্থ বা উদ্দেশ্য খুঁজে না পাই, তবে আমাদের ভেবে দেখা প্রয়োজন: “জীবনে কি কোনো অর্থ খুঁজে পাওয়া সম্ভব?” এটিই সেই মৌলিক প্রশ্ন যার উত্তর ‘শরণ গমন’-এর (refuge) ধারণায় পাওয়া যায়। তাই অনুগ্রহ করে কয়েক মিনিট সময় নিয়ে বিষয়টি নিয়ে ভাবুন— নিজেই যাচাই করে দেখুন। “আমার জীবনের কি কোনো অর্থ আছে? আমি আমার জীবন নিয়ে কী করছি এবং তা কি আমাকে পরিতৃপ্তি দিচ্ছে?”
[ধ্যান]
এভাবে নিজেদের যাচাই করাটা বেশ গভীর ও ভাবনার উদ্রেককারী একটি বিষয়—যেমনটা হয়তো আমরা এইমাত্র অনুভব করলাম। এটি খুব একটা স্বস্তিদায়ক প্রশ্ন নয় এবং সচরাচর আমরা নিজেদের মধ্যে এমন প্রশ্ন নিয়ে ভাবিনা। কিন্তু যখন আমরা গভীরভাবে চিন্তা করতে শুরু করি, তখন বুঝতে পারি যে এটি আসলে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রশ্ন। প্রায়শই আমরা আবিষ্কার করি যে, আমাদের জীবন যেভাবে চলছে তা নিয়ে আমাদের মনে এক ধরণের মৌলিক অসন্তোষ রয়েছে। মনে হয়না এর কোনো প্রকৃত অর্থ বা স্পষ্ট কোনো দিক নির্দেশনা আছে। আর স্বাভাবিকভাবেই, যখন আমরা এমনটা অনুভব করি—যে আমাদের জীবন আসলে বিশেষ কোনো গন্তব্যের দিকে এগোচ্ছে না—তখন আমরা নিজেদের মূল্যবোধ বা আত্মমর্যাদা বোধ হারিয়ে ফেলি। আমরা তখন “যাইহোক—এতে আসলে কিছু যায় আসে না”—এমন এক উদাসীন মনোভাবের বশবর্তী হয়ে পড়ি। তখন গণমাধ্যম বা বিজ্ঞাপনের দেখানো পথেই আমরা চলতে থাকি, যা সাধারণ মানুষ অনুসরণ করে; আমরাও স্রোতের টানে গা ভাসাই— প্রচুর অর্থ উপার্জন করি, উচ্চপদ লাভ করি কিংবা জীবনসঙ্গী হিসেবে চমৎকার কাউকে খুঁজে নিই। কিন্তু কোনোভাবেই এসবের কোনোটিই আমাদের প্রকৃত পরিতৃপ্তি দেয় না।
উদাহরণস্বরূপ, প্রচুর অর্থ উপার্জনের চেয়েও জীবনের নিশ্চয়ই আরও বড় কোনো উদ্দেশ্য বা তাৎপর্য রয়েছে। এমন অনেক অত্যন্ত ধনী ব্যক্তি আছেন যারা প্রচুর অর্থ-সম্পদের মালিক হওয়া সত্ত্বেও চরম অসুখী। পরম পূজ্য দালাই লামা সবসময় বলেন যে, জীবনের লক্ষ্য হলো সুখ অর্জন করা। তাই, দীর্ঘস্থায়ী সুখ কীসে পাওয়া যাবে, তা আমাদের সংজ্ঞায়িত করতে হবে। আমাদের সুখ ও ক্ষণস্থায়ী আনন্দ বা আমোদ-প্রমোদের পার্থক্য বুঝতে হবে। সারাক্ষণ কেবল আনন্দ ও আমোদ-প্রমোদের খোঁজ করা— যেমন পরবর্তী কোন ভালো সিনেমাটি দেখা যায় বা কোন গানটি শোনা যায়—তা কি সত্যিই মানুষকে তৃপ্ত করে? সুখ মানে তো আর নিছক আনন্দ, আমোদ বা বিনোদন নয়, তাই না?
সুখ নিয়ে ভাবনা
সুখ হলো মনের এমন এক অবস্থা যা একবার অনুভব করলে আমরা আর তা হারাতে চাই না। আমরা চাই এই অনুভূতি যেন চলতেই থাকে। এটি আমাদের ইন্দ্রিয় গ্রাহ্য কোনো বাহ্যিক বিষয়ের ওপর নির্ভর করে না। কোনো বিনোদনমূলক অনুষ্ঠানে গিয়ে আমরা সুখী হতে পারি, আবার সেখানে গিয়েও চরম হতাশাও বোধ করতে পারি; অর্থাৎ সুখ আসলে সেই বিনোদনের ওপর নির্ভর করে না, তাই না? উদাহরণস্বরূপ, অন্যেরা হয়তো এমন কিছু করছে যা তাদের কাছে খুব আনন্দদায়ক, কিন্তু আমাদের কাছে তা একেবারেই অর্থহীন বা বোকামি বলে মনে হতে পারে।
আমরা যখন সুখের সন্ধান করি, তখন আসলে এমন কিছুর খোঁজ করি যা অনেকবেশি মৌলিক ও স্থিতিশীল—এমন কিছু যা সবসময় আমাদের মনের গভীরে এক স্থায়ী অনুভূতি হিসেবে বিরাজ করবে। সবচেয়ে মৌলিক স্তরে বলতে গেলে, এই সুখ আসে একধরনের সংযোগ বা একাত্মবোধ থেকে—অন্যদের সাথে সংযোগ; কারণ আমরা সবাই তো সামাজিক জীব। অন্যদের সাথে এই গভীর সংযোগ অনুভব করলে আমরা নিজেদের গুরুত্ব ও জীবনের সার্থকতা খুঁজে পাই। দয়া করে বিষয়টি নিয়ে ভাবুন এবং কেবল ক্ষণস্থায়ী আনন্দ বা আমোদ-প্রমোদের সাথে প্রকৃত সুখের পার্থক্য বোঝার চেষ্টা করুন।
[ধ্যান]
এখানে আমরা যে পার্থক্যটি বোঝার চেষ্টা করছি তাহলো: কোনো পার্টিতে যাওয়া, ভালো কোনো সিনেমা দেখা কিংবা সুন্দর কোনো গান শোনার সময় আমাদের মনে যে অনুভূতির সৃষ্টি হয়—তার সাথে অন্য কোনো মানুষের বা অন্যদের সাথে গভীর সংযোগ অনুভব করার সময় কার অনুভূতির তুলনা করে দেখুন। কোন অনুভূতিটি বেশি তৃপ্তিদায়ক? কোন অনুভূতিটি দীর্ঘস্থায়ী হয়? জীবনের নানা পরিস্থিতি সামলানোর জন্য কোন অনুভূতিটি আমাদের বেশি শক্তি জোগায়? দুটির মধ্যে বেশ বড় পার্থক্য আছে, তাই না? ভালো কোনো সিনেমা দেখা বা প্রিয় গান শোনার সাথে প্রিয়জনের সাথে একাত্মতা বা সংযোগ অনুভব করার মধ্যে নিশ্চয়ই পার্থক্য রয়েছে।
অন্যদের সাথে এই সংযোগ বা একাত্মবোধের বিপরীত অবস্থাটি কী? তাহলো আত্মকেন্দ্রিকতা বা কেবল নিজের কথা ভাবা। তখন কী ঘটে? আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি অত্যন্ত সংকীর্ণ হয়ে পড়ে। আমরা মূলত অন্যদের থেকে নিজেদের বিচ্ছিন্ন করে ফেলি; আর এর ফলাফল কী হয়? আমরা একাকীত্ব ও বিচ্ছিন্ন অনুভব করি। আর মনের এমন অবস্থা নিশ্চয়ই অত্যন্ত দুঃখজনক, তাই না? আমরা যত বেশি কেবল নিজেদের কথা ভাবি, তত বেশি নিজেদের দুশ্চিন্তার জালে আটকা পড়ে যাই। পক্ষান্তরে, যখন আমাদের হৃদয় অন্যদের জন্য উন্মুক্ত থাকে, তখন আমরা অনেক বেশি সুখী হই।
অবশ্যই, এর মূল লক্ষ্য কেবল নিজেদের জন্য সুখ অর্জন করা নয়, বরং অন্যদের জীবনেও সুখ বয়ে আনা। এতে আমাদের নিজেদের মনেও কিছুটা আনন্দের সঞ্চার হয়, তাই না? অনেকটা যেন এক বাড়তি প্রাপ্তি বা উপজাত ফলের মতো। বিষয়টি অনেকটা এমন—আমাদের কোনো ছোটশিশুকে যখন এমন কিছু দিই যা সে খুব পছন্দ করে, তখন আমরাও আনন্দ পাই, তাই না? কিংবা যখন আমরা অন্যকারও জন্য ভালো কিছু করি, তখনও আমাদের ভালো লাগে।
এই অনুভূতিটি আসে অন্যদের প্রতি যত্নশীল হওয়ার মনোভাব এবং সুখের বোধ থেকে। অন্যদের খেয়াল রাখা, ভালো কাজ করা, কারো জন্য খাবার তৈরি করা কিংবা কেবল একটু হাসি বিনিময় করা—এসবই আমাদের মনে ভালোলাগার সৃষ্টি করে। যখন আমরা অন্যকাউকে সামান্য সুখ দিতে পারি—তা রাস্তার কোনো ভিক্ষুককে কয়েকটি পয়সা দেওয়া হলেও—তখন আমাদের মধ্যে নিজের গুরুত্ব বা সার্থক তা সম্পর্কে এক ইতিবাচক বোধ তৈরি হয়; আমরা বুঝতে পারি যে কারো জীবনে আমরা কোনো না কোনো প্রভাব ফেলতে পারছি, তা যতই সামান্য হোক না কেন। দয়া ও করুণার এই ছোট ছোট কাজগুলো অন্যদের প্রতি মমতা, বন্ধুত্ব এবং পারস্পরিক সংযোগের অনুভূতি গড়ে তুলতে সহায়তা করে।
পারস্পরিক সংযোগের বিষয়টি নিয়ে ভাবনা
অন্যের উপকারে বা তাদের জীবনে সামান্য একটু সুখ বয়ে আনতে আমরা যে ছোটখাটো কাজও করতে পারি—সেই বোধ বা সংযোগের অনুভূতি এবং নিজের গুরুত্বের উপলব্ধি আমাদের মানসিক সহায়তা জোগায় ও নিজের সম্পর্কে ভালো ধারণা তৈরি করে। এটি সুখের এমন এক ভিত্তি গড়ে তোলে, যা কোনো নাটকীয় বা ক্ষণস্থায়ী আনন্দ নয়, বরং অত্যন্ত স্থিতিশীল এক অনুভূতি। আমার মতে, একে ‘মানসিক সহায়তা’ হিসেবে অভিহিত করাটাই যথার্থ। বিষয়টি নিয়ে ভাবা প্রয়োজন। আমাদের নিজস্ব অভিজ্ঞতা এবং যৌক্তিক দৃষ্টিকোণ— উভয়দিক থেকেই কি বিষয়টি অর্থবহ মনে হয়? যদি তাই হয়, তবে প্রশ্ন জাগে— আমরা কি সত্যিই এমনটা চাই? যদি উত্তর ‘হ্যাঁ’ হয়, তবে আমরা যখন নিজেদের প্রশিক্ষিত করি—যেমনটা ধ্যানের মাধ্যমে করা হয়—তখন আমরা চিন্তাভাবনার একটি নতুন ও শক্তিশালী ধারা গড়ে তুলি। সেই ধারাটি হলো: অন্যের প্রতি করুণার মাধ্যমে তাদের সাথে এক মৌলিক সংযোগ স্থাপন করা এবং এমনকি ছোটখাটো সদয় কাজ করাটাও অত্যন্ত উপকারী ও অর্থবহ একটি বিষয়।
ছোটখাটো সদয় কাজ বন্ধুত্ব গড়ে তোলে এবং বন্ধুত্ব মানসিক সহায়তা প্রদান করে। অন্যদিকে, অন্যদের সাথে স্বার্থপরের মতো আচরণ করলে আমরা তাদের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ি; তখন তারা আর আমাদের সান্নিধ্য চায় না এবং আমরা সম্পূর্ণ একা হয়ে পড়ি। অনুগ্রহ করে এই বৈপরীত্যটি নিয়ে ভাবুন— এই প্রচেষ্টাটি কি সার্থক? আর এই যে মানসিক সহায়তার অনুভূতি, তা কি আমরা অর্জন করতে চাই? আর যদি কিছুটা হলেও সেই অনুভূতি আমাদের মধ্যে থেকে থাকে, তবে আমরা কি একে আরও বিকশিত করতে চাই না?
ফেসবুক-কেন্দ্রিক পুরো বিষয়টি বা ঘটনাপ্রবাহ পর্যালোচনা করা বেশ আকর্ষণীয় বলে আমার মনে হয়। আপনাদের মধ্যে কতজন ফেসবুকে আছেন তা আমি জানি না, তবে আমি নিশ্চিত যে আমরা এমন অনেককেই চিনি যারা সেখানে সক্রিয়। সেখানে সবচেয়ে প্রচলিত বিষয়গুলোর একটি হলো কোনোকিছু পোস্ট করা এবং কত গুলো ‘লাইক’ (like) পাওয়া গেল, তারজন্য অপেক্ষা করা। এর পেছনে আসলে কী কাজ করে? কেন আমরা এই ‘লাইক’ পেতে চাই?
আমার ধারণা, এর পেছনে থাকে অন্যদের সাথে সংযুক্ত থাকার আকাঙ্ক্ষা। সোশ্যাল মিডিয়া বা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের মূল ধারণাটি তো এটাই, তাই না? কিন্তু ফেসবুকে বিড়ালের ছবি বা এ-জাতীয় কিছু পোস্ট করে যখন আমরা ‘লাইক’ পেতে চাই, তখন আসলে আমরা কী ভাবি— এই ‘লাইক’-এর মাধ্যমে কার উপকার হচ্ছে? আমাদের নিজেদের, নাকি অন্যদের? এনিয়ে আমরা কেন উদ্বিগ্নবোধ করি? কতগুলো ‘লাইক’ পেলাম, তা নিয়ে আমরা কেন এত বেশি চিন্তিত হয়ে পড়ি? আর যদি খুব বেশি লাইক না পাই, তবে আমরা সত্যিই হতাশ হয়ে পড়ি, তাই না? আমরা তখন অখুশি থাকি। আর সেই সাথে কাজ করে এক ধরণের উদ্বেগ—প্রতি কয়েক মিনিট পরপরই আমাদের ফোনটা চেক করতে হয় এটা দেখার জন্য যে, আরও কোনো লাইক এল কিনা। আসলে, এটি কিন্তু আমাদের অন্যদের সাথে প্রকৃত অর্থে সংযুক্ত করে না। আমাদের মূল চিন্তার বিষয় হয়ে দাঁড়ায়—বিড়ালের ওই ছবিটির কারণে কতজন মানুষ আমাদের পছন্দ করল। আমরা কি সত্যিই এমন কিছু করার কথা ভাবছি যা তাদের খুশি করবে?
[ধ্যান]
আমরা কেন এই পোস্টগুলো দিচ্ছি—তা বিশ্লেষণ করে দেখাটা বেশ আকর্ষণীয় একটি বিষয়। আমার মনে হয়, এই আচরণের গভীরে অন্যদের সাথে সংযুক্ত থাকার এক প্রবল আকাঙ্ক্ষা কাজ করে; আর ঠিক একারণেই আমরা সোশ্যাল মিডিয়ায় যুক্ত থাকি। তবে কোনো এক কারণে, এটি অন্যদের সাথে সন্তোষজনকভাবে সংযুক্ত হওয়ার ক্ষেত্রে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছে না; কারণ দিন শেষে আমাদের মূল মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে থাকে— কতজন মানুষ আমাদের পছন্দ করল।
আমাদের আত্মকেন্দ্রিকতা— অর্থাৎ কেবল নিজেদের নিয়েই ভাবার প্রবণতা— অন্যদের সাথে প্রকৃত সংযোগ স্থাপনের ক্ষমতাকে কি বিপন্ন করে তুলছে না? বিষয়টি নিয়ে একটু ভেবে দেখুন— বিশেষ করে যদি আপনার ফেসবুক বা অন্য কোনো সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারের অভিজ্ঞতা থাকে। এটি ব্যবহারের পেছনে আপনার উদ্দেশ্য কী? অন্যদের সাথে সংযুক্ত থাকার সেই উদ্দেশ্য পূরণে এটি কতটা সফল? যদি তা কাজ না করে, তবে কেন করছে না? কত গুলো ‘লাইক’ পেলাম তা নিয়ে আমরা কেন উদ্বিগ্নবোধ করি? কেন আমরা প্রতি পাঁচমিনিট অন্তর ফোন চেক করতে থাকি?
আমরা যদি সত্যিই অন্যদের সাথে সংযোগ অনুভব করতে চাই— এমন এক প্রকৃত সংযোগ যা কেবল অগভীর বা অতৃপ্তিদায়ক কিছু নয়— এবং সেই সাথে মানসিক সমর্থন ও সুখ লাভ করতে চাই, তবে প্রশ্ন হলো সেটা কীভাবে অর্জন করা সম্ভব? আমাদের চিত্ত ও হৃদয়কে অন্যদের কথা ভাবার জন্য উন্মুক্ত করতে হবে; কেবল তারা যেন আমাদের পছন্দ করে— এমনটা না চেয়ে, বরং তাদের সুখ ও কল্যাণের বিষয়ে প্রকৃতভাবে যত্নশীল হতে হবে। এটি করার জন্য আমাদের নিজেদের ওপর কাজ করতে হবে। আমাদের আত্মমগ্নতা ও নিজেকেই অতিরিক্ত গুরুত্ব দেওয়ার প্রবণতা কাটিয়ে উঠতে হবে। তবে বিষয়টি বেশ জটিল: আত্মমগ্নতা কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করতে গিয়ে যদি আমরা সেই আত্মমগ্নতার ওপরই ভিত্তি করে কাজ করি, তবে তা ফলপ্রসূ হয় না—আমার কথাটি কি বুঝতে পারছেন?
আমরা অনেক সময় এমন এক সংকীর্ণ চিন্তার মধ্যে আটকে থাকি— যেমন, “আমি খুব খারাপ, আমার নিজেকে শুধরানো দরকার,” বা “আমি খুব স্বার্থপর”—অথচ এর মাধ্যমেও আমরা আসলে নিজেদের মনকে অন্যদের জন্য উন্মুক্ত করছি না। আমাদের এই বিষয়টিতেই কাজ করতে হবে— অন্যদের প্রতি এক ধরণের মৌলিক উন্মুক্ততা গড়ে তুলতে হবে। একেবারে মৌলিক বা মূলগত দিক থেকে বিচার করলে, জীবনের জন্য এমন একটি অভিমুখ বা দিকনির্দেশনা অত্যন্ত উপকারী। এটি আমাদের জীবনকে অর্থবহ করে তুলবে। অন্যদের প্রতি আরও উন্মুক্ত হওয়া এবং আত্মমগ্নতার কারণে সৃষ্ট বিচ্ছিন্নতা কাটিয়ে ওঠার প্রচেষ্টা আমাদের জীবনকে অর্থবহ করে তুলবে; এটি আমাদের মানসিক সমর্থন ও মৌলিক সুখ প্রদান করবে। সামগ্রিকভাবে, ‘শরণ’ (refuge) গমনের মূল অর্থও এটাই— জীবনে একটি নিরাপদ ও ইতিবাচক দিক নির্দেশনা গ্রহণ করা। এর লক্ষ্য হলো অন্যদের জন্য আরও বেশি কল্যাণকর হয়ে ওঠার মাধ্যম হয়ে ওঠা এবং সেই লক্ষ্যে নিজেদের ওপর কাজ করার মাধ্যমে একটি সুখী ও অর্থবহ জীবন গড়ে তোলা।
বুদ্ধ এবং মহান গুরুরা এই কাজটি সম্পন্ন করেছেন এবং আমাদের শিখিয়েছেন কীভাবে তা করতে হয়— তাঁরা আমাদের পথ দেখিয়েছেন। তাঁরা বুঝিয়েছেন যে, এই পারস্পরিক সংযোগের বিষয়টি আমরা নিজেরা অর্জন করতে পারি এবং এটি অর্জন করার সক্ষমতাও আমাদের রয়েছে— এটি কোনো অসম্ভব বিষয় নয়। এটি অর্জনের জন্য কেবল প্রয়োজন একটি দৃঢ়সংকল্প বা অনুপ্রেরণা, যা আমাদের নিজেদের নিয়ে কাজ করার এবং সঠিক পদ্ধতিগুলো যথাযথভাবে অনুসরণ করার শক্তি জোগায়। বিষয়টি নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করুন।
[ধ্যান]
শরণ গমনের বিষয়টি অনুধাবন করা
মূলত, শরণ গমন বা আশ্রয় নেওয়ার অর্থ হলো এমন একটি পথে অগ্রসর হওয়া, যা আমাদের নানাবিধ বিপদ ও সমস্যা এড়াতে সহায়তা করবে। একারণেই বৌদ্ধধর্মে এর ভূমিকা অত্যন্ত মৌলিক। জীবনকে লক্ষ্যহীন বা নেতিবাচক পথে চালিত হতে না দিয়ে, আমরা একে একটি ইতিবাচক পথে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করি। আর এই প্রচেষ্টা আমাদের জীবনকে অর্থ ও উদ্দেশ্য প্রদান করে। আমরা যত বেশি সেই অভীষ্ট পথের দিকে অগ্রসর হওয়ার চেষ্টা করব, অন্যদের সাথে আমাদের সংযোগ ততটাই গভীর ও নিবিড় হবে; শরণ গমন আমাদের মানসিক ও আবেগিক সহায়তা জোগায়— যে সহায়তা আমরা পাই তাদের কাছ থেকে যারা অতীতে এই পথে চলেছেন এবং অন্যদের সাথে নিবিড় সংযোগ স্থাপনের মাধ্যমে। এই সহায়তা ছাড়া, আমাদের উচ্চতর আধ্যাত্মিক অনুশীলনগুলোর মধ্যেও সর্বদা কোনো না কোনো ঘাটতি থেকে যাবে। বৌদ্ধধর্মের সমগ্র যাত্রাপথে শরণ গমন আমাদের শক্তি, ভিত্তি ও স্থিতিশীলতা প্রদান করে। বিষয়টি নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করুন।
[ধ্যান]
শরণ গমনের বিষয়টি নিয়ে অধ্যয়ন করার সময় আমরা চাইলে বুদ্ধের শরীরের ৩২ টি প্রধান লক্ষণ, তাঁর বাকশক্তির ৬৪ টি গুণ এবং বুদ্ধের চিত্তের অগণিত গুণের তালিকা নিয়ে আলোচনা করতে পারি। আমরা ধর্ম ও সংঘের সমস্ত গুণাবলি সম্পর্কে জানতে পারি; এমনকি সারা জীবন ধরে “আমি বুদ্ধ, ধর্ম ও সংঘের শরণ নিচ্ছি”—এই মন্ত্র জপ করতে পারি এবং একই সাথে লক্ষ লক্ষবার প্রণামও করতে পারি। কিন্তু দিন শেষে, এসব কাজ আমাদের জীবনে খুব একটা উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আনে না। অবশ্য এর কিছু প্রভাব তো থাকেই— যেমন অন্তত কিছুটা শৃঙ্খলার বোধ তৈরি হওয়া। তবে, শরণ গমনের মূল ধারণাটি এবং এটি আমাদের জীবনে কী সংযোজন করে— তা না বুঝলে এর প্রকৃত তাৎপর্য উপলব্ধি করা কঠিন হয়ে পড়ে। শেষ পর্যন্ত বিষয়টিকে অপ্রাসঙ্গিক বলেই মনে হতে পারে।
একবার যখন আমরা শরণ গমনের প্রকৃত অর্থ— এর উদ্দেশ্য, কার্যকারিতা ও সুফল— সম্পর্কে সম্যক ধারণা লাভ করি, তখন বুদ্ধের এই গুণাবলিকে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক দৃষ্টিতে দেখার সক্ষমতা অর্জন করি। উদাহরণ স্বরূপ, বুদ্ধের সেই ৩২ টি প্রধান লক্ষণ এবং ৮০ টি গৌণ লক্ষণের কথাই ধরা যাক— এগুলোর তাৎপর্য আসলে কী? আমরা কি সত্যিই এমন কান পেতে চাই যা কাঁধ পর্যন্ত ঝুলে থাকে? এতে কি সত্যিই আমাদের জীবনে কোনো অর্থ বা তাৎপর্য যুক্ত হবে? না, আসলে তা নয়। অবশ্যই, আমরা চাইলে কানে বড় কোনো চাকতি বা ডিস্ক পরতে পারি এবং কান প্রসারিত করে কাঁধ পর্যন্ত নামিয়ে আনতে পারি— কিন্তু তাতে কী লাভ? আমরা এখন যা বুঝতে পারছি— এবং বিষয়টি সত্যিই চমৎকার— বিষয়টি হল, বুদ্ধের প্রতিমূর্তি বা রূপ আসলে এক ধরণের ‘ইনফোগ্রাফিক’ (তথ্যচিত্র)।
ইনফোগ্রাফিক হলো এমন এক ধরণের চিত্র যার বিভিন্ন অংশ বা উপাদান আমাদের কাছে তথ্য পৌঁছে দেয়। বুদ্ধের শারীরিক বৈশিষ্ট্যগুলো নিয়ে যখন আমরা অধ্যয়ন করি, তখন দেখা যায় যে প্রতিটি বৈশিষ্ট্যের পেছনেই একটি নির্দিষ্ট কারণ রয়েছে। এগুলোকে ‘নির্দেশক বৈশিষ্ট্য’ (indicative features) বলা হয়, কারণ এগুলো তাদের পেছনের কারণটিকে নির্দেশ করে— এটিই হলো শব্দার্থ। বুদ্ধের কান কতটা লম্বা— সেদিকে মনোযোগ না দিয়ে আমরা বরং দেখি যে এই বৈশিষ্ট্যটি কী নির্দেশ করছে; এটি আমাদের সেই কারণটিরই একটি রূপক উপস্থাপন। বুদ্ধত্ব লাভের জন্য বুদ্ধকে কী করতে হয়েছিল? কানের এই লম্বা লতিটি মূলত সেই প্রক্রিয়ারই একটি ইনফোগ্রাফিক বা প্রতীকী উপস্থাপনা।
তান্ত্রিক দেব-দেবীদের রূপও আসলে ইনফোগ্রাফিক। যেমন, ছয়টি হাত ছয়টি ‘পারমিতা’ বা পূর্ণতার গুণাবলীকে নির্দেশ করে; আবার অবলোকিতেশ্বরের চারটি হাত চারটি ‘অপরিমেয় মনোভাব’ (four immeasurable attitudes)- এর প্রতীক। এসবই হলো ইনফোগ্রাফিক উপস্থাপনা। এই প্রতীকী রূপগুলোর মাধ্যমে আমরা সেই বিষয়গুলোকে মনে রাখার চেষ্টা করি যা তারা নির্দেশ করে। বুদ্ধের ক্ষেত্রে, প্রধান বিবেচ্য বিষয় হলো— কীভাবে এমন গুণাবলী অর্জন করা সম্ভব হলো বা এর পেছনের কারণগুলো কী। বুদ্ধের ৩২ টি প্রধান ও ৮০ টি গৌণ শারীরিক বৈশিষ্ট্য আসলে সেইসব কাজের এক বিশাল ও অসাধারণ তালিকার প্রতিনিধিত্ব করে, যা একজন ব্যক্তি অন্যদের সাথে গভীর সংযোগ অনুভব করতে, আত্মকেন্দ্রিকতা জয় করতে এবং অন্যদের সুখপ্রদান করতে সম্পাদন করেন। এটি এমন সব কাজের এক চমৎকার তালিকা যা বুদ্ধত্বলাভের পথ প্রশস্ত করে। মূলত, এটি আমাদের সেই দিক নির্দেশনা দেয় যে পথে আমরা এগিয়ে যেতে চাই।
তখন আমরা বুঝতে পারি বৌদ্ধধর্ম কতটা উন্নত ও গভীর—যেখানে আড়াই হাজার বছর আগেই তারা ইনফোগ্রাফিক বা চিত্রভিত্তিক তথ্যের ব্যবহার করেছিল।
‘শরণ গমন’ (refuge) বিষয়ক এই সমস্ত খুঁটিনাটি বিষয় আমরা জানতে পারি; আমরা এগুলো নিয়ে পড়াশোনা করতে পারি, তালিকাগুলো মুখস্থ করতে পারি ইত্যাদি। কিন্তু এগুলোর প্রকৃত অর্থ তখনই বোঝা সম্ভব যখন আমরা এই প্রশ্নগুলোর উত্তর জানি: “শরণ গমনের মূল বিষয়টি কী?” “এর উদ্দেশ্য কী, এটি কীভাবে কাজ করে এবং কীভাবে এটি আমার জীবনে পরিবর্তন আনে?”
বিষয়টি গভীরভাবে অনুধাবন করার জন্য একটু সময় নিন, এরপর আমরা প্রশ্নোত্তরের পর্বে যেতে পারি। আগামীকাল আমরা সেই বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা শুরু করব যা আমাদের এই পথে অগ্রসর হতে বাধা দিচ্ছে এবং কোন বিষয়গুলোর ওপর আমাদের কাজ করা প্রয়োজন। কারণ, যখন আমরা বুঝতে পারব কী আমাদের জীবনে এই পথ অনুসরণে বাধা দিচ্ছে, তখন তা কাটিয়ে ওঠার অনুপ্রেরণা আমরা পাব এবং শেষ পর্যন্ত সেই পথের সুফলগুলো অর্জন করতে পারব।
এখানে দ্বিমুখী অনুপ্রেরণা কাজ করে: “এই বিষয়টি আমাকে সেই গভীর সংযোগ অনুভব করা ও জীবনে সুখ লাভ করা থেকে বিরত রাখছে,” এবং “আমি আসলে কী অর্জন করতে চাই? আমি অমুক বিষয়টি এড়াতে চাই এবং তমুক বিষয়টি লাভ করতে চাই।” এছাড়া, জীবনে এই পথটি গ্রহণ করার জন্য আমাদের কিছু বিশেষ আবেগ বা মানসিক অবস্থার প্রয়োজন হয়— যেমন ভয়, আত্মবিশ্বাস এবং করুণা। শরণ গমনের বিষয়টি অর্থবহ হতে হবে; এটি কেবল এমন হওয়া উচিত নয় যে—“আমি নরকে যাওয়ার ভয়ে ভীত, তাই বুদ্ধ আমাকে রক্ষা করুন।” এটি অত্যন্ত গভীর ও বাস্তবসম্মত একটি বিষয়। পরজন্ম বা পুনর্জন্মে আমরা বিশ্বাস করি কি না, তা এখানে মুখ্য নয়; শরণ গমনের বিষয়টি অত্যন্ত উপকারী। যখনই আমরা বৌদ্ধধর্ম নিয়ে পড়াশোনা করব, তখন বিষয়টিকে আরও গভীরভাবে দেখার চেষ্টা করব। “এটি কীভাবে বাস্তবে, আমার প্রাত্যহিক জীবনে প্রয়োগ করা যেতে পারে?” যখন আমরা সেই অর্থ ও প্রাসঙ্গিকতা খুঁজে পাই, তখনই আমরা তাতে মন প্রাণ ঢেলে দিতে পারি। অন্যথায়, এটি কেবলই একটি শখ বা বিনোদনের বিষয় হয়ে দাঁড়ায়— হয়তো ভাবলাম “কী চমৎকার!”, কিন্তু এরপর আর কিছুই হলো না। অথবা হয়তো মনে হলো “কী একঘেয়ে ব্যাপার!”, আর আমরা তা ছেড়ে দিলাম। কিছুক্ষণ সময় নিয়ে এই বিষয়গুলো ভালোভাবে অনুধাবন করুন। মূলত, এই সপ্তাহান্তের সেমিনারে আমরা কোন পথে এগোতে যাচ্ছি, তারই একটি আগাম ধারণা বা রূপরেখা এখানে তুলে ধরা হলো। তবে, আমি আপনাদের কোনো তালিকা ধরিয়ে দেব না। তালিকাগুলো আপনারা আমার ওয়েবসাইট বা অন্যান্য উৎস থেকে পড়ে নিতে পারবেন।
[ধ্যান]
প্রশ্ন
আপনি সর্বোচ্চ সক্ষমতা বা আধ্যাত্মিক সামর্থ্য সম্পন্ন ব্যক্তির দৃষ্টিকোণ থেকে ‘শরণ গমনের’ কারণ ব্যাখ্যা করেছেন। ‘লাম-রিম’-এর প্রথম খণ্ডে, নিম্ন ও মধ্যম স্তরের অনুপ্রেরণা বা মানসিকতা সম্পন্ন ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে এই কারণটিকে ‘ভয়’-এর সাথে তুলনা করা হয়েছে। প্রথম ক্ষেত্রে এটি হলো পরবর্তী জন্মে ভালো অবস্থা না পাওয়ার ভয়, আর দ্বিতীয়ক্ষেত্রে তা হলো ‘সংসার’ বা জন্ম-মৃত্যুর চক্রে আটকা পড়ার ভয়। তাহলে কি এর অর্থ এই যে, শেষোক্তটির তুলনায় এই দুটি স্তর কম গুরুত্বপূর্ণ বা কম অর্থবহ?
না, অনুপ্রেরণার প্রতিটি স্তরই অর্থবহ ও গুরুত্বপূর্ণ। সপ্তাহান্তের আলোচনায় আমরা ‘ভয়’-এর প্রকৃত অর্থ নিয়ে বিস্তারিত কথা বলব, তবে এগুলোর সবই প্রয়োজনীয়। বৌদ্ধপথের পুরোটা জুড়েই রয়েছে করুণা বা সমবেদনা—অনুপ্রেরণার সবস্তরেই করুণা এবং সুখের আকাঙ্ক্ষা বিদ্যমান। খুব বিস্তারিত ভাবে না গিয়ে বলা যায়, প্রাথমিক স্তরে আমরা অশান্তকারী আচরণ থেকে বিরত থাকতে চাই কারণ সেটা নিম্নতর বা খারাপ জন্মে নিয়ে যায়; এর অর্থ হলো আমাদের অন্যদের ক্ষতি করা থেকে বিরত থাকতে হবে এবং এভাবেই আমরা অন্যদের প্রতি যত্নশীল হয়ে উঠি।
মধ্যবর্তী স্তরে, আমরা অনিয়ন্ত্রিতভাবে বারবার জন্ম নেওয়ার চক্র—অর্থাৎ ‘সংসার’—থেকে মুক্তি পেতে চাই। আমাদের যেসব মানসিক বিকার বা অশান্তকারী আবেগ— যেমন ক্রোধ, আসক্তি ইত্যাদি— এই মুক্তি অর্জনে বাধা দেয়, সেগুলোকে জয় করাই আমাদের লক্ষ্য। ক্রোধ বা আসক্তির বশবর্তী হয়ে যাতে অন্যদের ক্ষতি না করি, সেজন্য আমরা এই আবেগগুলোকে জয় করার চেষ্টা করি। অনেক সময় অন্যদের প্রতি আমাদের ক্রোধ বা তীব্র আকাঙ্ক্ষা জাগে। থেরবাদ পথের কথা যদি ধরি— যা মূলত এই মধ্যবর্তী স্তরেরই প্রতিফলন— সেখানে ‘চারটি অপরিমেয় গুণ’ বা ‘চারটি ব্রহ্মবিহার’-এর ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়: মৈত্রী (প্রেমময় করুণা), করুণা, মুদিতা (সহ-আনন্দ) এবং উপেক্ষা (সমচিত্ততা)। অশান্তকারী আবেগগুলোকে জয় করার জন্যই এই গুণগুলোর চর্চা করা হয়। আর উচ্চতর স্তরের মূল বিষয় হলো অন্যদের প্রতি মৈত্রী ও করুণা পোষণ করা, যাতে তাদের কল্যাণ সাধন করা যায়। প্রথম দুটি স্তর হলো ক্রোধবশতঃ কোনো কাজের মাধ্যমে অন্যদের ক্ষতি করা থেকে বিরত থাকা, আর তৃতীয়স্তরটি হলো সক্রিয়ভাবে অন্যদের সহায়তা করা। সুতরাং, পুরো পথ জুড়েই করুণার উপস্থিতি রয়েছে। আমার মনে হয়, এই বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্ব দিয়ে বলা প্রয়োজন।
অন্যদের সাথে এই সংযোগ স্থাপনের বিষয়ে কথা বলার সময় আপনি বলেছিলেন যে, এই পথে চলার সময় আমরা ভয় ও করুণার মতো অনুভূতিগুলোর সম্মুখীন হই। একই সাথে করুণা ও ভয় অনুভব করা কি সম্ভব?
হ্যাঁ, অবশ্যই। সপ্তাহান্তের আলোচনায় আমরা এবিষয়ে আরও বিস্তারিত আলোচনা করব। আপাতত এটুকু বলি যে, আমাদের জীবনে এই অভিমুখ বা দিকটি বেছে নেওয়ার পেছনে তিনটি মূল কারণ রয়েছে। আমরা চাই না অন্যদের কষ্ট দিতে— বা অন্যদের কষ্ট দেওয়া, তাদের ওপর রাগ করা কিংবা তাদের উপেক্ষা করার মাধ্যমে নিজের জন্য আরও বেশি দুঃখ ডেকে আনতে; তাই এই বিষয়টি ভয়ের ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠলেও এর একটি ইতিবাচক দিক রয়েছে। করুণা হলো অন্যদের দুঃখ থেকে মুক্ত দেখার আকাঙ্ক্ষা। সুতরাং, আমরা চাই তারা দুঃখ থেকে মুক্ত থাকুক এবং আমরা তাদের কষ্ট দিতে চাই না— আর এই কষ্ট দেওয়ার বিষয়টিই আমাদের ভয়ের কারণ। এই বিষয়গুলো একে অপরের সাথে চমৎকার ভাবে মিশে আছে। আমরা অত্যন্ত সতর্ক থাকি কারণ আমরা অন্যদের কষ্ট দিতে চাই না এবং চাই না তারা দুঃখভোগ করুক। সবশেষে রয়েছে সেই আত্মবিশ্বাস যে, অন্যদের ক্ষতি করার ফলে নিজের জন্য যে সমস্যা তৈরি হতে পারে, তা এড়ানোর উপায় আমাদের জানা আছে। এই তিনটি বিষয়— ভয়, আত্মবিশ্বাস এবং করুণা— একে অপরের পরিপূরক হিসেবে কাজ করে।
দেখুন, আমরা যদি সত্যিই ধর্মে শরণ নিই, তবে আমাদের মনে এই আত্মবিশ্বাস গড়ে ওঠে যে বৌদ্ধশিক্ষাগুলোর যৌক্তিক ভিত্তি রয়েছে। অবশ্য এটি এক ধরনের পূর্ব ধারণা— আমরা ধরে নিই যে শিক্ষাগুলোর অর্থপূর্ণ তাৎপর্য আছে। কিন্তু যদি শুরুতেই আমরা ধরে নিই যে কোনো কোনো শিক্ষা অর্থহীন বা অযৌক্তিক, তবে সেগুলোর কোনো অর্থই আমাদের কাছে ধরা দেবে না; আমরা কখনোই সেগুলোর মর্মার্থ বুঝতে পারব না। তাই আমরা ধরে নিই যে এগুলোর যৌক্তিক ভিত্তি আছে এবং তারপর শিক্ষাগুলো বোঝার চেষ্টা করি। ধর্মে প্রকৃত শরণ নেওয়ার এটিই একটি গুরুত্বপূর্ণ ফলাফল।
এই জীবনে আমরা যে শরণ গমন করি, তা আমাদের মানসিক ধারারই একটি অংশ। পরবর্তী জীবনে কি আমরা এই শরণের কথা মনে রাখতে পারব, অথবা এর কোনো অনুভূতি বা এমনকোনো প্রবণতা কি আমাদের মধ্যে কাজ করবে যা আমরা পরবর্তী জীবনে বিকশিত করতে পারব?
আসলে, আমরা অনেকেই জানি না গতকাল কী করেছিলাম, আর আগের জীবনের কথা মনে থাকার তো প্রশ্নই ওঠে না। তবে আমরা মূলত যা নিয়ে আলোচনা করছি, চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় তাকে বলা হয় ‘নিউরোপ্লাস্টিসিটি’ (neuroplasticity) বা মস্তিষ্কের নমনীয়তা। নির্দিষ্ট অভ্যাসের ওপর ভিত্তি করে মস্তিষ্কে কিছু স্নায়বিক পথ তৈরি হয়। ধরা যাক এমন কিছু ঘটল যার ফলে শরীরের ডানদিক অবশ হয়ে গেল; তখন আমাদের মস্তিষ্ক নিজেকে এক অর্থে নতুন করে বিন্যস্ত বা ‘রিওয়্যার’ (rewire) করে নিতে পারে, যাতে ডানহাতের কাজগুলো আমরা বাম হাত দিয়ে করতে পারি। সেই অর্থে মস্তিষ্ক নমনীয় বা পরিবর্তনযোগ্য। মনের বা মানসিক কার্যকলাপের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। নিউরোপ্লাস্টিসিটি মস্তিষ্কের ভৌত বা শারীরিক স্তরের বিষয় হলেও, আমরা মনের অভিজ্ঞতার স্তরের কথাও বলতে পারি।
একইভাবে, আমরা নতুন অভ্যাস গড়ে তুলতে পারি। এটি প্রশিক্ষণের বিষয়। বৌদ্ধধর্মে আমরা প্রবণতা, সম্ভাবনা এবং অভ্যাস গড়ে তোলার প্রসঙ্গে এনিয়ে আলোচনা করি। ভবিষ্যতের জীবনে, সেই প্রবণতার তীব্রতা এবং আমাদের অন্যান্য প্রবণতাও কর্ম-সম্ভাবনার ওপর ভিত্তি করে সেই নির্দিষ্ট প্রবণতাটি টিকে থাকবে। পারিভাষিক অর্থে, ধর্মগ্রন্থগুলোতে এদের ‘মানসিকধারার ওপর আরোপিত বিষয়’ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে— এরা এমনকিছু যা ভৌত বা বস্তুগত কোনো রূপও নয়, আবার কোনোকিছু সম্পর্কে সচেতন হওয়ার প্রক্রিয়াও নয়; বরং এরা একঅর্থে কোনো ভিত্তির সাথে ‘যুক্ত’ থাকে এবং সেই ভিত্তি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে এদের অস্তিত্ব বা জ্ঞান— কোনোটাই সম্ভব নয়। আমরা এদের অবচেতন বলতে পারি; কোনো প্রবণতা থেকে যখন কোনো দৃশ্যমান বা সচেতন বিষয় বা ক্রিয়া তৈরি হয়, তখন তারজন্য উপযুক্ত পরিস্থিতির প্রয়োজন হয়। যেমন, আইসক্রিম পছন্দ করার প্রবণতা হয়তো আমাদের মধ্যে আছে, কিন্তু যদি আমাদের ক্ষুধা না থাকে বা আইসক্রিম হাতের কাছে না পাওয়া যায়, তবে সেই প্রবণতাটি জেগে ওঠে না। কেবল ক্ষুধা পেলেই তা সক্রিয় হয়ে ওঠে।
আমরা যদি পুনর্জন্মে আরশোলা বা মুরগি হিসেবেও জন্ম নিই, তবুও ইতিবাচক পথে অগ্রসর হওয়ার সেই প্রবণতাটি আমাদের মধ্যে সুপ্ত অবস্থায় থেকে যায়— যদিও সেটা প্রকাশের মতো উপযুক্ত পরিস্থিতি তখন আর থাকে না। সেই প্রবণতাটিকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার জন্য উপযুক্ত পরিস্থিতির প্রয়োজন হয়— যেমন, পুনরায় কোনো মূল্যবান মানব জন্মলাভ করা; তবেই সেটা প্রকাশিত হতে পারে। এটি নির্ভর করে সেই প্রবণতাটি কতটা প্রবলতার ওপর। বিষয়টি অনেকটা এমন যে, আমরা যদি কেবল দু-একবার আমাদের সচরাচর ব্যবহৃত হাতের বদলে অন্য হাতটি দিয়ে লেখার চেষ্টা করি, তবে সেই অন্যহাত দিয়ে লেখার প্রবণতাটি খুব একটা জোরালো হয়ে ওঠে না; এর জন্য প্রচুর অনুশীলনের প্রয়োজন হয়। আমাদের চিন্তাধারার ক্ষেত্রেও বিষয়টি ঠিক তেমনই। কেবল ধ্যান কক্ষে বসে ধ্যান করার মাধ্যমেই আমরা এই কল্যাণকর অভ্যাসটি গড়ে তুলি না। এটি অনুধাবন করা অত্যন্ত জরুরি যে, কেবল ধ্যানের সময় নিষ্ক্রিয়ভাবে অনুশীলন বা মহড়া হিসেবে নয়, বরং বাস্তব জীবনে তা প্রয়োগ করার মাধ্যমেই আমরা এই অভ্যাসটি গড়ে তুলি।
অন্যকে সাহায্য করার ফলে কি সব সময়ই সুখের অনুভূতি পাওয়া যায়, নাকি পরিমিতভাবে সাহায্য করলেও আমরা সুখ পেতে পারি?
সুখের তীব্রতার বিভিন্ন স্তর রয়েছে। অন্যরা যাতে আমাদের পছন্দ করে—এমন উদ্দেশ্যে কিছু করলে আমরা কিছুটা সুখ পাই ঠিকই, কিন্তু তা দীর্ঘস্থায়ী হয় না; কারণ আমাদের মনে সবসময়ই এক ধরনের অনিশ্চয়তা কাজ করে— “হয়তো তারা আসলে আমাদের পছন্দ করছে না।” সুখের অনেক উৎস ও বিভিন্ন ধরন রয়েছে। যেমন, ‘শমথ’ (মানসিক প্রশান্তি ও একাগ্রতা) অনুশীলনের মাধ্যমে আমরা একধরনের আনন্দময় ও উৎফুল্ল মানসিক অবস্থা লাভ করি। তবে, যতক্ষণ না আমরা সেই অবস্থাকে অন্যকে সাহায্য করার কাজে লাগাচ্ছি, ততক্ষণ তা সরাসরি অন্যকে সাহায্য করার বিষয় হয়ে ওঠে না। সুতরাং, সুখের নানা ধরন থাকলেও আমি বা দালাই লামা মূলত এমন এক মৌলিকস্তরের সুখের কথা বলি যা যেকারও ক্ষেত্রেই সম্ভব। আমরা ধ্যান করি বা বৌদ্ধধর্ম অনুসরণ করি— তা কোনো বিষয় নয়; ধর্মনিরপেক্ষ নৈতিকতার মৌলিক মানবিক মূল্যবোধ চর্চার মাধ্যমে প্রত্যেকেই এই সুখ লাভ করতে পারে।
অন্যকে সাহায্য করার সময় বিষয়টি নিয়ে একটু ভেবে দেখা প্রয়োজন। যেমন, কেউ যখন প্রয়োজনের অতিরিক্ত সাহায্য করতে যান— হয়তো অপর ব্যক্তিটি আমাদের পরামর্শ চাননি বা তাঁর আদৌ সেই পরামর্শের প্রয়োজন নেই— তবুও আমরা সাহায্য করার তাগিদে তা দিয়ে বসি। তখন হয়তো তিনি বলে ওঠেন, “আমাকে আমার মতো থাকতে দিন, আমি তো আপনার কাছে কিছু চাইনি!” একই ভাবে, বিবাহিত মেয়েকে যখন আমরা সংসার চালানো বা সন্তান বড় করার বিষয়ে উপদেশ দিতে থাকি— তখন সেই সুখের উৎসটা আসলে কোথায়?
আমাদের উদ্দেশ্য বা অভিপ্রায় আমাদের সুখী করে তোলে; কিন্তু যখন আমরা তা বাস্তবে রূপ দিতে যাই, তখন অনেক সময় তার সাথে ‘নিজের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করার’ আকাঙ্ক্ষা মিশে যায়। আমরা নিজেকে সাহায্যকারী হিসেবে দেখতে চাই, কিন্তু অন্যরা আসলে কী চাইছে বা তাদের কী প্রয়োজন— তা খুঁজে বের করে পূরণ করার বিষয়টি সব সময় আমাদের মুখ্য উদ্দেশ্য থাকে না। অবশ্য শুরুতে কিছু করার ইচ্ছায় আমরা আনন্দ পাই— অর্থাৎ সুখের সেই অনুভূতিটুকু থাকে— কিন্তু তা খুবই সামান্য এবং তা আমাদের কোনো গভীর মানসিক অবলম্বন বা প্রশান্তি দেয় না। আমাকে বলতেই হবে যে, বোধিসত্ত্বের পথ অনুসরণ করার চেষ্টার ক্ষেত্রে এটি অন্যতম বড় একটি ঝুঁকি— আমরা সাহায্য করতে চাই, অথচ অনেক সময় এমন পরিস্থিতিতে তা করি যখন অন্যরা আমাদের সাহায্য চায় না। আমাদের প্রয়োজন সঠিক বিচার-বিবেচনা ও প্রজ্ঞা—অর্থাৎ কখন সাহায্য করা উচিত এবং কখন কেবল সাহায্য করার মানসিকতা বা সদিচ্ছা পোষণ করাই যথেষ্ট (অথচ মুখে কিছু বলার প্রয়োজন নেই)— তা বুঝতে পারা। তবে বিষয়টি অত্যন্ত কঠিন। আমরা প্রায়শই এমন সাহায্য করতে যাই যার কোনো প্রয়োজন নেই; এর মূলে থাকে নিজের অহংবোধ বা আত্ম-কেন্দ্রিকতা—অর্থাৎ “আমি” সাহায্য করতে চাই, আমিই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে চাই— এমন মনোভাব।
যাইহোক, আলোচনাটি এখানেই শেষ করা যাক। আমিও নিজে এই দোষে দুষ্ট, তাই বিষয়টি নিয়ে হাসি পাচ্ছে। সবশেষে একটি শুভ সংকল্প বা উৎসর্গ-কামনা করা যাক। এই আলোচনার মাধ্যমে যে ইতিবাচক শক্তি ও উপলব্ধির সঞ্চার হয়েছে, তা যেন আরও গভীর হয় এবং সবার আত্ম-কেন্দ্রিকতা বা অহংবোধ কাটিয়ে ওঠার ক্ষেত্রে সহায়ক ভূমিকা পালন করে। ‘চিত্ত প্রশিক্ষণের সাতটি ধাপ’ (The Seven-Point Mind Training) গ্রন্থে বলা হয়েছে যে, সমস্ত দোষ কেবল একটি বিষয়ের ওপরই আরোপ করা উচিত— আর তা হলো আত্ম-কেন্দ্রিক মনোভাব। তাই, সবাই যেন নিজেদের আত্ম-কেন্দ্রিকতা জয় করতে পারে, অন্যদের প্রতি হৃদয় উন্মুক্ত করতে পারে এবং এর মাধ্যমে জীবনের এক নিরাপদ ও সঠিক দিশা খুঁজে পায়—যাতে শেষ পর্যন্ত সবার কল্যাণে বোধি লাভ করা সম্ভব হয়।